শিক্ষার্থী সামলানোর অ্যাজেন্ডায় সরকার ★ শরিকদের জন্য তোহফা
দিল্লিতে ককরোচ, ঢাকায় চিকেন!
ঠিকানা রিপোর্ট
প্রকাশ : ২২ জুলাই ২০২৬, ১২:২৭
•
অনলাইন সংস্করণ
এবার ভিন্ন মাত্রায় এগোচ্ছে শিক্ষার্থী আন্দোলন। মুরগি ইস্যুতে চলমান আন্দোলন নেহাতই সারফেস। অন্তরালে ঘটনাপ্রবাহ নানামুখী। উইন্ডো অনেক। যেখানে স্কুল, কলেজ, সরকারি-বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়, কওমি-আলিয়া মাদ্রাসা ইত্যাদি ফের। নমুনা ও তথ্যদৃষ্টে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান দীর্ঘদিনের আন্দোলনের শরিকদের সঙ্গে একটি দফারফার তাগিদ জরুরি মনে করেছেন। ক্ষমতার ৫ মাস পূর্তিতে যমুনায় শুভেচ্ছা বৈঠকটি এর মহড়া মাত্র। তারা ধীরে ধীরে সরে যাচ্ছে বলে উপলব্ধিতেই এ আয়োজন। তাদের মধ্যে আবার তারেক রহমানকে মাহাথির মোহাম্মদ, কামাল আতাতুর্কের সঙ্গে তুলনা করে বাতাস দেওয়ার নেতাও আছেন। দূরত্ব তৈরি হওয়া জনা কয়েককে রাষ্ট্রীয়, প্রাতিষ্ঠানিক পদ-পদবির তোহফা দিয়ে সরকারের অংশ করার একটি সমীকরণ চলছে।
প্রকাশ্যে সংস্কার নিয়ে তাচ্ছিল্য, জুলাই সনদকে প্রতারণার দলিল নামে নিন্দা করা হলেও বৈঠকে টোন ডাউন করে আনা হয়েছে। সনদ ও ৩১ দফা অক্ষরে অক্ষরে পালনের কথা বেশি করে শোনানো হয়েছে। বিচার বিভাগের স্বাধীনতা, আলাদা সচিবালয়, বিচারক নিয়োগসহ বেশ কিছু বিষয় নিয়ে ভেতরে ভেতরে ঝড় যাচ্ছে। এইচএসসি পরীক্ষা, আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীদের নিয়ে মন্ত্রী এহছানুল হক মিলনের কুমন্তব্য, অতি স্মার্ট শো আপের জেরে গড়ে ওঠা আন্দোলনের নেপথ্যে জামায়াত-এনসিপিসহ কয়েকটি দলের সম্পৃক্ততা ও ভবিষ্যৎ টার্গেট সরকারের জন্য উদ্বেগের। একটা পর্যায়ে তা ভিন্ন দিকে মোড় নেবে এবং সামলানো কঠিন হতে পারে বলে বিশেষ সতর্কবার্তা পেয়েছে সরকার। সেখানে এসেছে ভারতে ‘ককরোচ জনতা পার্টি’-সিজেপির প্রসঙ্গ। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হওয়ার ঠিক দুই মাস পর ককরোচের অনুসারীদের তুড়ি মেরে ঘায়েল করতে গিয়ে নরেন্দ্র মোদির শক্তিমান সরকার নাকানি-চুবানিতে পড়েছে। দিল্লির যন্তর মন্তর মানমন্দিরে সিজেপির অবস্থান কর্মসূচি থেকে শিক্ষাবিদ ও আন্দোলনকর্মী সোনম ওয়াংচুককে জোরপূর্বক সরিয়ে দিয়েছে পুলিশ। অনির্দিষ্টকালের অনশনের ২১তম দিনে তার ইচ্ছার বিরুদ্ধে তাকে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। ককরোচরা দমছে না। এ ঘটনার পর বিক্ষোভকারীরা সমাবেশ করেন। সিজেপির প্রতিষ্ঠাতা অভিজিৎ দিপকেও অনশন শুরু করেছেন। বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তি পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁসের প্রতিবাদে আন্দোলনকারীরা ভারতের পার্লামেন্টের দিকে যাত্রা করেন। প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনায় দেশজুড়ে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। বিক্ষোভকারীরা শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগ দাবি করছেন। এমনকি প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির পদত্যাগের দাবিও উঠেছে।
বাংলাদেশেও নমুনা কাছাকাছি। আন্দোলনকারীরা এখন আর শিক্ষামন্ত্রীতে থাকছে না। শিক্ষামন্ত্রীকে নিয়ে ঝাঁজালো বক্তব্যের ফাঁকে প্রধানমন্ত্রীকেও আক্রমণ করছে তীব্রভাবে। গত মে মাসের মাঝামাঝি সময়ে ভারতের প্রধান বিচারপতি সূর্যকান্ত বেকার যুবকদের ‘তেলাপোকা’ বলে মন্তব্য করেছিলেন। তার এ মন্তব্যে দেশজুড়ে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়। এরপরই জন্ম নেয় সিজেপি। ভারতের তরুণদের মধ্যে এটি ব্যাপক সাড়া ফেলে। তারা একের পর এক বিশাল প্রতিবাদ কর্মসূচি গড়ে তোলে। সরকার এখন পর্যন্ত তাদেরকে শক্ত হাতে দমানোর চেষ্টা করছে। ভারতের সরকারের নীতি বিক্ষোভ নিয়ন্ত্রণ করা। আন্দোলনকে একটা নির্দিষ্ট সীমার মধ্যে আটকে রাখা এবং জোট ভেঙে যাওয়ার জন্য অপেক্ষা করা। কিন্তু সম্প্রতি সিজেপির এই উত্থান মোদির শাসনকে ভাবিয়ে তুলেছে। সিজেপিকে এখন আর কেবল সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের সাময়িক ভাইরাল ঝড় হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। এই ‘তেলাপোকা’ অনেক দূর এগিয়ে গেছে। ঢাকায় ভেতরে ভেতরে মুরগিরাও কম যাচ্ছে না। রাজাকারের নাতিপুতি গালমন্দের পর এক ঝলকে তাদের বিস্ফোরণ কোটা আন্দোলন ছাড়িয়ে হাসিনা পতনে চলে যাওয়া এখনো দগদগে ঘটনা হয়ে রয়েছে। ৬৯, ৭০, ৭১, ৭৫, ৯০ সালের ইতিহাসও তা-ই। সমাজে অস্থিরতা থাকলে এ অঞ্চলে ছাত্র আন্দোলন গড়ে ওঠা, ক্রমশ তা ভিন্ন দিকে মোড় নেওয়া এক ঐতিহাসিক বৈশিষ্ট্য। শুরুতে তারা কোনো মন্ত্রী বা ঘটনার বিরুদ্ধে নামলেও পরে সমাজ সংস্কার, বৈষম্যের অবসান, দুর্নীতি ইত্যাদির বিরুদ্ধে নামে। সেটা গিয়ে ঠেকে সরকার পতনে। কেবল বাংলাদেশে নয়, পৃথিবীর সব দেশেই একই ধরনের ঘটনা ঘটে। শেখ হাসিনার সরকার অবৈধভাবে ২০১৪ সালে বিনা ভোটে জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জয়ী হয়ে সরকার গঠন করতে তত বেগ পায়নি। দ্রুত এগিয়ে যায় দেশকে ফ্যাসিবাদের শৃঙ্খলে আবদ্ধকরণে। বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোর আন্দোলনকে কঠোর হাতে দমিয়ে ক্ষমতায় গিয়ে সকলকে চমকে দেন শেখ হাসিনা। হয়ে ওঠেন রাজনীতির মেসি, আয়রন লেডিসহ অনেক কিছু।
পরের বছর, ২০১৫ সালে বাংলাদেশের বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের টিউশন ফির ওপর ৭.৫% হারে ভ্যাট আরোপে গিয়ে শিক্ষার্থীদের ‘নো ভ্যাট অন এডুকেশন’ আন্দোলনে ছোট ধাক্কা খায়। তাদের টানা বিক্ষোভ, সড়ক অবরোধ ও ব্যাপক জনসমর্থনের মুখে সরকার শেষ পর্যন্ত ভ্যাট প্রত্যাহারে বাধ্য হয়। ঘোষণা দেয়, এই ভ্যাট শিক্ষার্থীদের নয়, বরং বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষকে দিতে হবে। এরপর আরেক ধাক্কা আসে ২০১৮ সালে নিরাপদ সড়ক চাই আন্দোলনে। ওই বছরের ২৯ জুলাই থেকে ৮ আগস্ট আন্দোলন বা গণবিক্ষোভ শেখ হাসিনা সরকারের ঘাম ছুটিয়ে ফেলে। ঢাকায় ২৯ জুলাই রাজধানীর বিমানবন্দর সড়কে দ্রুতগতির দুই বাসের সংঘর্ষে রমিজ উদ্দিন ক্যান্টনমেন্ট কলেজের দুই শিক্ষার্থী রাজীব ও দিয়া নিহত হয় ও ১০ জন শিক্ষার্থী আহতের ঘটনা সেখানে নতুন মাত্রা দেয়। এর পরিপ্রেক্ষিতে নিহত দুই কলেজ শিক্ষার্থীর সহপাঠীদের মাধ্যমে শুরু হওয়া বিক্ষোভ পরবর্তীতে সারা দেশে ছড়িয়ে পড়ে এবং নৌমন্ত্রীর পদত্যাগসহ ৯ দফা দাবিতে শিক্ষার্থীরা রাস্তায় নেমে আসে।
২০১৮ সালের ৩০ ডিসেম্বর একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠানের আগে ২০১৮ সালের ফেব্রুয়ারি মাস থেকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাধারণ শিক্ষার্থীরা নামে ‘বাংলাদেশ সাধারণ ছাত্র অধিকার সংরক্ষণ পরিষদ’-এর ব্যানারে। শুরু হয় ধারাবাহিক মানববন্ধন, বিক্ষোভ। তাদের দমনে চলে দমন-পীড়ন ও সংঘর্ষ। আর সরকারদলীয় ছাত্রসংগঠন ছাত্রলীগের হামলা। গুরুতর আহত হয় অনেক শিক্ষার্থী। সেই আন্দোলন মাঠে মারা যায়নি। শিক্ষার্থীদের লাগাতার ও তীব্র আন্দোলনের মুখে ২০১৮ সালের ১১ এপ্রিল তখনকার প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা কোটা পদ্ধতি পুরোপুরি বাতিলেরই ঘোষণা দিয়ে বসেন। এরপর ৪ অক্টোবর জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় সরকারি চাকরিতে (প্রথম ও দ্বিতীয় শ্রেণি) কোটা পদ্ধতি বাতিল করে একটি প্রজ্ঞাপন জারি করে। এর মাঝে ২০১৮ সালে দিনের ভোট রাতের কাজও সারিয়ে নেন শেখ হাসিনা। কোটা আন্দোলনে সরকারের পরিণতির পর সরকার বুঝতে পারে নিরপেক্ষ নির্বাচন হলে তাদের বিজয় অর্জন অসম্ভব। এরপর ২০২৪ সালের নির্বাচনে আরও অভিনবত্ব।
বিরোধী দলগুলোর বর্জনের মুখে ৭ জানুয়ারির নির্বাচনে নিজেদের বাছাই করা ডামি-আমি নির্বাচনী সার্কাসের পর কথা বলা শুরু করে শিক্ষার্থীরা। নানা ইস্যু ও ফরমেটে এর পরিণতি ঘটে ৫ আগস্ট। অল্প সময়ের ব্যবধানে ২০২৬ সালের জুলাইতে এইচএসসি ও সমমানের পরীক্ষার্থীদের ব্যানারে দেশজুড়ে ছাত্র আন্দোলন। আবারও পুরোনো তাচ্ছিল্য। তবে দমনের হুংকার দিলেও এখনো সেই পথ মাড়ানোর সিদ্ধান্তে যায়নি সরকার। এর পূর্ববর্তী পর্ব হিসেবে একসময়ের আন্দোলনের শরিকদের ম্যানেজ করার একটি মিশন শুরু করতে চায় সরকার। সরকার এ মিশনে গণমাধ্যমকে হাতিয়ার করতে চায়। মুখের বয়ানে নিরপেক্ষ সাংবাদিকতার কথা বলছে। বিএনপির পক্ষে সাংবাদিকতা না করে বরং সমালোচনা করার বয়ানও দেওয়া হচ্ছে। বাস্তবে ক্ষমতার ক্রিম খাওয়ানো হচ্ছে। বিভিন্ন কর্মক্ষেত্রে পদ-পদায়ন ছাড়াও রাষ্ট্রীয় নানা তোহফায় মুগ্ধ করা হচ্ছে। তা তাদেরকে নির্ঘাত ভবিষ্যৎ ঝুঁকিতে ফেলছে। আওয়ামী লীগের আমলে যারা ক্ষমতার সঙ্গে ঘনিষ্ঠ ছিলেন, তারা এখন হয় জেলে, না হয় দৌড়ের ওপর। হাল আমলে এ দলীয়পনায় শামিল হওয়া সাংবাদিকদের জন্য সামনে কোন দৃশ্যায়ণ অপেক্ষা করছে, এ প্রশ্নের ঘুরপাক গোটা মিডিয়াপাড়ায়।