হাপেপারে প্রবীণ কুঞ্জ বিজ্ঞাপন দেখে একটু হাসলাম। আজ আমি প্রবীণ কুঞ্জের অতিথি। আমার স্ত্রী মারা যাওয়ার পর আমি অসহায় হয়ে পড়ি, ঘরেই থাকি। বাসার ছেলেটা বলে, দাদা, সামনেই একটা পার্ক, সেখানে যান। ওর কথামতো হাঁটতে যাই। কয়েকজন বন্ধু হয়ে যায়। আমাকে খুব ভালোবাসে। এক-দুদিন যাইতে পারি নাই। বন্ধুরা এল দেখা করতে। বলে, বউ বিরহে যাস না। বলি, শরীরটা ভালো না। বলে, মন খারাপ না করে বের হবি।
ছেলেটাকে বলি, ওদের চা দিতে। ওদের চা দেওয়াতে বউমা রেগে বলে, এটা কোনো অতিথিশালা না, লোক এলে চা দিতে হবে। মনে খুব কষ্ট পেলাম। ছেলের জন্য জীবনপাত করেছি। ছেলের বন্ধুরা আসবে শুনলে কী না করতাম? ছেলে বাড়ি বিক্রি করতে বলেছিল, আজ ছেলের কথায় বাড়ি পর্যন্ত বিক্রি করে দিলাম। কী লাভ হলো আমার।
বন্ধুদের চা দেওয়াতে আপত্তি। মনটা খুব খারাপ। দুপুরে খেতে যাই নাই, কেউ ডাকেও নাই। রাতের বেলা ছেলে বলে, বাবা, তুমি নাকি খাও নাই। চলো, খেতে চলো। বাপ-ছেলে খেয়ে আসার সময় বউমার কথাগুলো বলি। ছেলে বলে, নীলিমা খারাপ কিছু বলে নাই। তুমি সকালে তোমার নাতিকে নিয়ে স্কুলে দিয়ে বাজার করে আসতে পারো। তোমার কাজের ছেলেটা কী করবে, ওকে কিছু বলা যায় না।
নিজের মনকে প্রশ্ন করি, এখন আমি বাজার করার লোক! সারা রাত ঘুমাতে পারি না। তনিমার কথা মনে পড়ে-আমার স্ত্রী। স্ত্রী বলেছিল, শোনো, আমি ছিলাম সং তুমি ছিলে সার। দুজন মিলে গড়েছিলাম সংসার। দেখো, সেই সংসার কোথায়? বাড়ি বিক্রি করে দিলে, সেই টাকা সব দিয়েছ ছেলেকে কেন? সব দিয়ো না, তোমার নিজের কাছে রেখো। বাড়িটা থাকলে চলে যেতাম। বাসায় কাজ করতে হতো না।
আমি জোক করি, বাড়ি বিক্রি করে আটতলায় আছ, ঢাকার বড় বড় দালাল দেখো।
তা অবশ্য ঠিক, তবে থাকার জায়গা হয়েছে কাজের মানুষের রুমে। কত সুখ। আমাকে বলে, শোনো, আমি যদি না থাকি, তবে তুমি বৃদ্ধাশ্রমে চলে যেয়ো। মেয়েদের বিড়ম্বনায় ফেলো না। আমি মরলে আমাকে তোমাদের দেশের করা স্থানে মাটি দিয়ো।
কেন, সেখানে কেন? সেখানে আমার শ্বশুর মসজিদ করেছেন। হুজুর পাঁচ ওয়াক্ত আজান দেন, আমি শুনব। স্মৃতি নিখুঁত সত্য, একে একে সব মনে করিয়ে দেয়।
মা কেবল ছেলে ছেলে করতেন। একদিন আমি রেগে বলি, আমার দুটি মেয়ে আছে। মেয়েদের বিয়ে দেবে, ছেলে তোমার পাশে দাঁড়াবে। এই ছেলের জন্য মেয়েদের লেখাপড়া করতে দিইনি। নিজের জীবনপাত করেছি ছেলেকে বিজ্ঞানী করার জন্য।
ছেলে কি পাশে দাঁড়াল? সকাল সকাল বের হই প্রবীণ কুঞ্জ খোঁজার জন্য। পেয়ে যাই। সাইনবোর্ড দেখি। গেটে দারোয়ান দেখি, ডেকে কথা বলি। বলে, আমার মালিক শনি ও রোববার থাকেন। আমি একটা চিরকুট লিখে দারোয়ানকে দিই।
সকাল ১০টায় ফোন বেজে উঠল। ধরে দেখি প্রবীণ কুঞ্জের ফোন। ফোন ধরতেই ওপাশ থেকে কথা বলে, শুনুন, আপনার একটা চিরকুট পেলাম। আপনি একজন প্রবীণ শিক্ষক। প্রবীণ কুঞ্জে আসার কথা প্রকাশ করেছেন। আপনি যেকোনো দিন আসতে পারেন। আমার অফিস খোলা। আমার সঙ্গে দেখা করতে চেয়েছেন। আমি শনি, রোববার থাকি।
ফোন পেয়ে দেখি দিনটা ছিল বৃহস্পতিবার। এক দিন পর শনিবার। কাল আমার সবকিছু গুছিয়ে চলে যাব। কাজের ছেলেটাকে বলি, আমার কাপড় ও জিনিসপত্র একটা ব্যাগে ভরে দিয়ো। গেটম্যানকে বলি, তুমি শনিবার সকালে আমাকে একটা সিএনজি ঠিক করে দিয়ো। আমি চলে যাব। কাউকে বলবা না।
শনিবার সকালে চলে এলাম প্রবীণ কুঞ্জে। মালিক আমাকে আদরে গ্রহণ করেন। প্রবীণ কুঞ্জের সব দেখালেন এবং আরও বললেন, এখানে আমার বাবা থাকেন। আমি প্রথমে অবাক হই। যখন তার রুমে আসি, সে আমাকে বলে, আরিফ, তুই! আমি সেলিমকে বলি, তুই এখানে! সেলিম বলে, এই প্রবীণ কুঞ্জ আমার ছেলে আমাকে উৎসর্গ করেছে।
-বাবা, তুমি ওনাকে চেনো?
-আমরা একই কলেজে পড়াশোনা করেছি।
-তাহলে তোমার বন্ধু পেলে।
ছেলেকে বলে, ওর বেডটা আমার রুমে দাও।
-বেশ, তা-ই করে দেব।
আমার জায়গা হলো তোমার রুমে। তোমাকে পেয়ে কত গল্পÑঅতীত, বর্তমান, কলেজ-জীবনের কথা, ফেলে আসা নানা কথা।
এবার প্রবীণ কুঞ্জে কেন? আমার বাসা ধানমন্ডিতে, এখনো ওই বাড়ি আছে। ছেলে সেখানেই বড় হয়েছে, স্কুল-কলেজ সেখান থেকেই শেষ করেছে। লেখাপড়া শেষ করে বলে, বাবা আমি লন্ডনে পড়তে যেতে চাই। বেশ তো, তুমি যেতে চাইলে যাবে। ছেলে যাওয়াতে আমরা খুব ভেঙে পড়ি, আমি প্রকাশ করি না। আমার স্ত্রী বলে, একটা মাত্র ছেলে, তা-ও বাইরে পাঠিয়ে দিলে। যদি বাইরে থেকে ভালো ডিগ্রি আনে, সেটা আমাদের গর্ব, তাই নয় কি? তা অবশ্য ঠিক।
সময় কাটাব কীভাবে? তুমি আমার বাড়ি আসো। আমি আর তুমি কতভাবে সময় কাটিয়েছি। বাড়িতে মা, বাবা, খুক ছিল আমার সাথি। সময় পার হয়ে যেত। খুকের বিয়ে হলো, বাবা-মা চলে গেল, এল রাহাত। রাহাতকে নিয়ে সময় চলে যেত। মাত্র তো কিছুদিন চলে যাবে। আমরা বেড়াব, আত্মীয়স্বজনের খোঁজ-খবর করব।
চলতে থাকি। ছেলের ফোন-বাবা, আমি খুব ভালো রেজাল্ট করে পাস করেছি। দেশে আসব কবে? আসবে? খুব শিগগিরই তোমাকে জানাব। তবে আমার সঙ্গে আর একজনও আসবে। আমি বলি, বেশ তো।
যথাসময়ে রাহাত এল, সঙ্গে একটি মেয়ে। বাসায় ঢুকে মা ও আমাকে সালাম করে বলে, বাবা, এই মেয়েটি আমার সঙ্গে একই সাবজেক্টে পড়ত। আমি ওকে বিয়ে করতে চাই। তাই সঙ্গে করে নিয়ে এসেছি।
আমি বলি, এই মেয়ের বাবা-মা কোথায় থাকেন? ছেলে বলে, ওর মা-বাবা নাই, শুধু একটা ভাই আছে। রংপুর ওদের বাড়ি। ভাই সেখানে থাকে। আমি আর কিছু বলি না। আমার স্ত্রী কোনোমতেই এই বিয়ে মানতে চায় না।
আমি বলি, ওরা যদি বিয়ে করে সুখী হতে চায়, তাতে আপত্তি থাকা উচিত নয়। আমার স্ত্রী বলে, একটি মাত্র ছেলে, বিয়ে দেব। বেশ তো বিয়ে দেব। ওর মত আমাদের মত হওয়া উচিত। তুমি অমত করিয়ো না।
ছেলেকে বলি, মেয়ের ভাইকে আসতে বলো। তোমাদের বিয়ের ব্যবস্থা করি। আত্মীয়স্বজন সবাইকে বিয়ের দাওয়াত দিই। ভাই এলে তার সামনে বিয়ে দিই। ভাই বলে, আমাদের মা-বাবা নাই। আমার বোন পেল মা-বাবা, আর আমি পেলাম ভাই।
ভালোই সকলে সময় পার করি। তবে আমার স্ত্রী খুব একটা খুশি থাকত না। একটা নাতি হলো, তার দিকে বেশ মনোযোগ দিত না। বউমা বলে, মা-ও রইল, আয়া আছে, তবু দেখবেন। আস্তে আস্তে কেবল বলে, আমি ভালো নাই।
আমি মনে মনে হাসতাম, এখনো সহজ হতে পারলে না? বুকের যন্ত্রণা ভুলতে পারলে না। বউমা বলে, মা চলুন, ডাক্তারের কাছে যাই। ডাক্তার সবকিছু পরীক্ষা করতে দেন। দুই দিন পরে জানাবে।
দুই দিন পরে এল সর্বনাশা রোগ-ক্যান্সার। আমার মাথায় যেন বাজ পড়ল। ছেলে রিপোর্ট দেখে বলে, বাবা চিন্তা করো না। আমি মাকে বিদেশে নিয়ে যাব। সেখানে চিকিৎসা করাব। আমি অক্সফোর্ডে পড়ার সময় আমার অনেক ডাক্তার বন্ধু ছিল।
ছেলে মায়ের জন্য সব কাগজপত্র, পাসপোর্ট তৈরি করতে আরম্ভ করল। সবকিছু ঠিক হলো। বউমা এসে বলে, মা, আপনার ব্যাগটা গুছিয়ে নিই। কবে যাবে, কে কে যাবে? আমি, মা, আপনার ছেলে। টিকু থাকবে আপনার কাছে। আয়া তো আছেই। টিকুর কষ্ট হবে না, একটু তো বড় হয়েছে।
ব্যাগ গোছাতে দেখে আমার দিকে এমনভাবে তাকিয়ে আছে, তীক্ষè দৃষ্টিতে, বুঝি আমাকে হারানোর ভয়। কাছে গিয়ে বলি, ভয় পেয়ো না, ভালো হয়ে যাবে। সুখে থাকো। সেই দিন যে ওর শেষ দিন, বুঝি নাই।
সকালবেলা বিছানা থেকে উঠতে গিয়ে পড়ে যায়। তাড়াতাড়ি তুলে ছেলেকে ডাকি। ছেলে এসে ডাক্তার ডাকে। ডাক্তার এসে দেখে বলে, উনি আর আমাদের মাঝে নাই। চলে গেছেন না ফেরার দেশে।
সব শেষ। সবাই এসে দোয়া করেন। তাকে রেখে আমি শবযাত্রীর সাথে। সবাই চলে গেল। আমার কোনো মেয়ে ছিল না; আমার বোন ছিল। বলে, আমি তোমার সঙ্গে থাকব। বেশ, ও থাকে। ওর সঙ্গে সময় কাটাই।
অনেক দিন পার হলো। একদিন বলে, দাদা, আমি আমার সংসারে যাব। বেশ তো, ওর জামাইকে ফোন করি। ওর যাওয়ার কথা বলি। জামাই এসে ওকে নিয়ে যায়।
আমি অসহায় হয়ে পড়ি। কোনো কিছুই ভালো লাগে না। কারও সঙ্গে কথা বলতে ভালো লাগে না।
একদিন ছেলে বলে, বাবা, তুমি নাকি ঘর থেকে বের হও না, তোমার নাতির সঙ্গেও কথা বলো না। আমি বলি, শোন, ভাত আর মুড়ি এক না, চাল একই। ফুপি গেল কেন?
বউমা বলে, আমি বলছি, সংসার ছেড়ে ভাইয়ের কাছে কত দিন থাকবেন? আমি বুঝি, একাকিত্ব মানুষকে পঙ্গু করে দেয়। ছেলে কোনো কথা বলে না। তোমার বউমা ভালো মেয়ে।
একদিন রাতে বউমা বলে, বাবা, আমরা সকালে বেড়াতে যাব। আপনি, টিকু, সবাই। সবাই এসে এই গেটে দাঁড়াতে ছেলে চাবি দিয়ে বলে, বাবা, এই প্রবীণ কুঞ্জ তোমার। আমি হতবাক হয়ে চেয়ে থাকি। তোমার মতো প্রবীণরা এখানে থাকবে।
ভেতরে এসে দেখি বিরাট আয়োজন। ছেলে বড় বড় কোম্পানির সাহায্য নিয়ে আমাকে সাহায্য করেছে। আমি নীরবে ছেলের দিকে তাকিয়ে থাকি।
বাবা, চলেন বাসায় যাই।
আমি বলি, বাসায় কেন?
আপনি যদি এখানে থাকতে চান, থাকবেন। বাসায়ও যাবেন, টিংকুকে দেখবেন।
সত্যিই তুমি তোমার ছেলেকে লেখাপড়া শিখিয়ে মানুষ করেছ। আমি আমার ছেলেকে লেখাপড়া শিখিয়ে অমানুষ করেছি, তার মধ্যে মনুষ্যত্ব নাই।
কখন ছেলে পেছনে ছিল বুঝতে পারিনি। ছেলে বলে, কাকু, আপনার ছেলে বা আমি মানুষ হই নাই। বর্তমান সমাজের সন্তানরা যদি শিরদাঁড়া সোজা করে বলতে পারি, আমরা আমাদের বাবা-মাকে আমাদের বুকের পাঁজরে রাখব। আমাদের বাবা-মা আমাদের রাখতেন।
বয়স হলে প্রবীণরা বোঝে না; কিন্তু আমরাও ছোটবেলায় অনেক কিছু করতাম। বাবা-মা সহ্য করে নিতেন। আমরা কেন বাবা-মাকে সহ্য করতে পারব না?
বাবার ঘাড় ধরে দাঁড়ানো, মায়ের একান্ত পরিশ্রমে পড়া ও অক্ষরজ্ঞান দিয়েছেন। সেই সন্তানেরা ভুলে যাই, তাদের জ্ঞানে আজ আমরা প্রতিষ্ঠিত।
প্রতিষ্ঠিত সন্তানরা প্রতিষ্ঠিত বাবা-মাকে কাছে না রেখে বৃদ্ধাশ্রমে দিয়ে দেয়। সন্তান, একবার ভাবো তো বাবা-মার কথা।
তবে বৃদ্ধাশ্রম বলে কিছু থাকত না। বাবা-মাকে বৃদ্ধাশ্রমে দেওয়া হয়। বাবা-মা মনে মনে শুধু বলেন, জীবনে সবচেয়ে যাদের ভালোবাসলাম, তাদের কাছে পেলাম কী?
তবু সন্তান ও নাতি-নাতনি ভালো থাকুক।
ঠিকানার জন্য অজস্র ভালোবাসা। তারা সুস্থ থাকুক, তাদের জীবনে সাফল্য আসুক ঘরে ঘরে লেখাগুলো পৌঁছে দেওয়ার জন্য। ঠিকানার আগামীতে আরও উন্নতি হোক।