চট্টগ্রামে ভয়াবহ গ্যাস সংকট: উৎপাদন কমেছে শিল্পে, বেড়েছে লোডশেডিং
ঠিকানা অনলাইন
প্রকাশ : ০৩ অগাস্ট ২০২৬, ১০:৫০
•
অনলাইন সংস্করণ
চট্টগ্রামে গ্যাস সংকট আরও তীব্র আকার ধারণ করেছে। আবাসিক গ্রাহকদের দিনের বেশিরভাগ সময় চুলায় গ্যাস থাকছে না, শিল্প-কারখানায় উৎপাদন কমেছে, সিএনজি স্টেশনগুলোতে দীর্ঘ লাইনে অপেক্ষা করেও গ্যাস পাচ্ছেন না চালকেরা। গ্যাস সরবরাহ কমে যাওয়ায় বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর উৎপাদনও ব্যাহত হচ্ছে, ফলে বাড়ছে লোডশেডিং। সব মিলিয়ে দেশের প্রধান বন্দরনগরীর জনজীবন, শিল্প, পরিবহন ও ব্যবসা-বাণিজ্যে নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে।
কর্ণফুলী গ্যাস ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি লিমিটেড (কেজিডিসিএল) সূত্র জানায়, চট্টগ্রামে দৈনিক গ্যাসের চাহিদা প্রায় ৩৫০ মিলিয়ন ঘনফুট। কিন্তু বর্তমানে সরবরাহ নেমে এসেছে প্রায় ২০০ মিলিয়ন ঘনফুটে, যা আগস্টের শুরুতে আরও কমে যাওয়ায় সংকট প্রকট হয়েছে।
নগরীর হালিশহর, আগ্রাবাদ, চান্দগাঁও, চকবাজার, বাকলিয়া, পতেঙ্গাসহ অধিকাংশ এলাকায় ভোরের পর থেকেই গ্যাসের চাপ প্রায় শূন্যে নেমে আসে। ফলে অনেক পরিবার দুপুরের খাবার রান্না করছেন বিকেলে বা গভীর রাতে। কেউ কেউ বাধ্য হয়ে প্রতিদিন হোটেল-রেস্তোরাঁর খাবারের ওপর নির্ভর করছেন।
আসকার দিঘির পাড় এলাকার বাসিন্দা ইশরাত জাহান বলেন, এক সপ্তাহ ধরে পরিবারের খাবারের কোনো নির্দিষ্ট সময় নেই। সকালে গ্যাস চলে গেলে দুপুরে রান্না করা যায় না। ছোট শিশুদের নিয়মিত বাইরের খাবার খাওয়াতে হওয়ায় উদ্বেগ বাড়ছে।
একই চিত্র সিএনজি স্টেশনগুলোতেও। গ্যাসের চাপ কম থাকায় ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়েও গ্যাস পাচ্ছেন না চালকেরা। মইজ্জার টেক এলাকার অটোরিকশাচালক মোহাম্মদ ফরহাদ আলম বলেন, আগে ১০-২০ মিনিটেই গ্যাস নেওয়া যেত, এখন চার ঘণ্টা অপেক্ষার পরও অনেক সময় খালি হাতেই ফিরতে হয়। এতে আয় কমে যাওয়ায় সংসার চালানো কঠিন হয়ে পড়েছে।
গ্যাস সংকটের সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়েছে শিল্প খাতে। কেজিডিসিএলের তথ্য অনুযায়ী, চট্টগ্রাম ইউরিয়া সার কারখানাসহ (সিইউএফএল) বিভিন্ন শিল্পপ্রতিষ্ঠানে উৎপাদন ৩৫ থেকে ৫০ শতাংশ পর্যন্ত কমে গেছে। অনেক কারখানা সক্ষমতার অর্ধেকেরও কম উৎপাদন করছে। এতে ইস্পাত, টেক্সটাইল, খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ ও রপ্তানিমুখী শিল্প ক্ষতির মুখে পড়েছে।
গ্যাসের অভাবে বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর উৎপাদনও কমে যাওয়ায় চট্টগ্রামসহ বিভিন্ন এলাকায় লোডশেডিং বেড়েছে। শিল্পাঞ্চলের পাশাপাশি আবাসিক এলাকাগুলোতেও দিনের বিভিন্ন সময়ে বিদ্যুৎ বিভ্রাটের অভিযোগ পাওয়া যাচ্ছে। সংশ্লিষ্টদের মতে, গ্যাস সরবরাহ স্বাভাবিক না হলে বিদ্যুৎ উৎপাদনও স্বাভাবিক হবে না, ফলে শিল্প ও অর্থনীতির ওপর চাপ আরও বাড়বে।
চট্টগ্রাম চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (সিসিসিআই) সভাপতি আমিরুল হক বলেন, গ্যাস সংকটের কারণে অনেক শিল্পপ্রতিষ্ঠান উৎপাদন কমাতে বাধ্য হচ্ছে, কোথাও কোথাও সাময়িকভাবে উৎপাদন বন্ধ রাখার পরিস্থিতিও তৈরি হয়েছে। এতে রপ্তানি আদেশ বাস্তবায়ন, সময়মতো পণ্য সরবরাহ এবং উৎপাদন ব্যয়—সব ক্ষেত্রেই নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে। তিনি দ্রুত গ্যাস সরবরাহ স্বাভাবিক করতে সরকারের কার্যকর উদ্যোগের আহ্বান জানান।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, গত ২১ জুলাই কক্সবাজারের মহেশখালীতে ভাসমান এলএনজি (এফএসআরইউ) টার্মিনালে অগ্নিকাণ্ড ও কারিগরি ত্রুটি দেখা দেওয়ার পর জাতীয় গ্রিডে রিগ্যাসিফাইড এলএনজির সরবরাহ উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যায়। প্রতিদিন প্রায় ১০০ কোটি ঘনফুট সরবরাহ অর্ধেকে নেমে আসায় জাতীয় পর্যায়েই গ্যাস ঘাটতি তৈরি হয়েছে। সেই ঘাটতি মোকাবিলায় চট্টগ্রামের অংশের একটি বড় অংশ ঢাকার চাহিদা মেটাতে সরিয়ে নেওয়ায় স্থানীয় সংকট আরও তীব্র হয়েছে।
কেজিডিসিএলের মহাব্যবস্থাপক (ইঞ্জিনিয়ারিং সার্ভিস ডিভিশন) প্রকৌশলী মো. তাজউদ্দিন ঢালী বলেন, জাতীয় গ্রিড থেকেই চাহিদা অনুযায়ী গ্যাস পাওয়া যাচ্ছে না। সীমিত সরবরাহ রেশনিংয়ের মাধ্যমে বিতরণ করা হচ্ছে। পরিস্থিতি স্বাভাবিক করতে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখা হচ্ছে।
জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, ক্ষতিগ্রস্ত ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল পুরোপুরি মেরামত করে চালু করতে পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠান আগামী ১০ আগস্ট পর্যন্ত সময় চেয়েছে। ফলে টার্মিনালটি সচল না হওয়া পর্যন্ত চট্টগ্রামে গ্যাস সংকট দ্রুত কাটার সম্ভাবনা কম বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।