মঙ্গলবার, ১৩ অক্টোবর ২০২৬

মঙ্গলবার, ১৩ অক্টোবর ২০২৬

বিজ্ঞাপন

বৈষম্যে ‘জিরো টলারেন্স’ নিউইয়র্ক সিটির, চার মামলায় বড় অঙ্কের ক্ষতিপূরণ

বৈষম্যে ‘জিরো টলারেন্স’ নিউইয়র্ক সিটির, চার মামলায় বড় অঙ্কের ক্ষতিপূরণ

বিজ্ঞাপন
নিউইয়র্ক: ধর্ম, প্রতিবন্ধিতা এবং সরকারি আবাসন সহায়তা (হাউজিং ভাউচার) পাওয়ার কারণে বৈষম্যের শিকার হওয়া নিউইয়র্কবাসীর পক্ষে একের পর এক গুরুত্বপূর্ণ রায় দিয়েছে নিউইয়র্ক সিটি কমিশন অন হিউম্যান রাইটস। কমিশন চারটি পৃথক মামলায় নিয়োগকর্তা, বাড়ির মালিক এবং রিয়েল এস্টেট প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে বৈষম্যের অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ায় মোট ৬ লাখ ৮২ হাজার ডলারের বেশি ক্ষতিপূরণ ও দেওয়ানি জরিমানা পরিশোধের নির্দেশ দিয়েছে।

কমিশনের চেয়ারপারসন ও কমিশনার ক্রিস্টিন ক্লার্ক বলেন, নিউইয়র্ক সিটির মানবাধিকার আইন লঙ্ঘনের ঘটনা কোনোভাবেই সহ্য করা হবে না। যারা বৈষম্যমূলক আচরণ করবে, তাদের আর্থিক ও আইনি পরিণতি ভোগ করতে হবে। একই সঙ্গে ভবিষ্যতে এ ধরনের ঘটনা রোধে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোকে সংশোধনমূলক পদক্ষেপ গ্রহণেরও নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

তিনি বলেন, “যখন কোনো নিউইয়র্কবাসীর অধিকার লঙ্ঘিত হয়, তখন সরকারের উচিত দ্রুত ব্যবস্থা নিয়ে তার প্রতিকার নিশ্চিত করা। কেউ যেন ধর্মের কারণে চাকরি না হারান, প্রতিবন্ধিতার কারণে নিজের বাড়িতে বন্দি হয়ে না থাকেন কিংবা সরকারি আবাসন সহায়তা ব্যবহার করার কারণে বাসা ভাড়া থেকে বঞ্চিত না হন—এটি নিশ্চিত করাই আমাদের দায়িত্ব।”

কমিশনের সাম্প্রতিক চারটি রায়কে নিউইয়র্ক সিটির বৈষম্যবিরোধী আইন বাস্তবায়নে নতুন বার্তা হিসেবে দেখা হচ্ছে। দীর্ঘদিন মামলা ঝুলিয়ে না রেখে দ্রুত নিষ্পত্তির মাধ্যমে ক্ষতিগ্রস্তদের ন্যায়বিচার নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে কমিশন।

চারটি মামলার প্রথমটিতে দেখা যায়, রিভাইভাল ফিজিক্যাল থেরাপি অ্যান্ড রিহ্যাবিলিটেশন সার্ভিসেস নামের একটি প্রতিষ্ঠান একজন মুসলিম কর্মীকে তার ধর্মীয় পরিচয়ের কারণে চাকরি থেকে বরখাস্ত করে। অভিযোগ অনুযায়ী, কর্মস্থলে বিরতির সময় তিনি নামাজ আদায় করেন—এ তথ্য জানার একদিনের মধ্যেই তাকে চাকরি থেকে ছাঁটাই করা হয়।

চাকরি হারানোর পর ওই কর্মী ও তার পরিবার চরম আর্থিক সংকটে পড়েন। মানসিকভাবেও তিনি গভীরভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হন। পরবর্তী সময়ে অন্য প্রতিষ্ঠানে চাকরির আবেদন করার সময় তিনি নিজের ধর্মীয় পরিচয় গোপন রাখতে বাধ্য হন, কারণ তার আশঙ্কা ছিল আবারও একই ধরনের বৈষম্যের শিকার হতে পারেন।

দ্বিতীয় মামলাটি আরও হৃদয়বিদারক। একজন প্রতিবন্ধী ভাড়াটিয়া চার বছরেরও বেশি সময় ধরে তার অ্যাপার্টমেন্ট ভবনে একটি র‍্যাম্প বা লিফট স্থাপনের অনুরোধ জানিয়ে আসছিলেন, যাতে তিনি নিরাপদে বাড়িতে প্রবেশ ও বের হতে পারেন। কিন্তু ভবনের মালিক তার আবেদন গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করেননি।

অভিযোগে বলা হয়, ভবনের জন্য প্রয়োজনীয় নকশা ও ব্যয়ের হিসাব বহু আগেই প্রস্তুত থাকলেও মালিকপক্ষ কোনো কার্যকর উদ্যোগ নেয়নি। বরং প্রায় ৪০ বছর ধরে যে বাড়িতে তিনি বসবাস করছিলেন, সেখান থেকে অন্যত্র চলে যাওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়। উপযুক্ত ব্যবস্থা না থাকায় তিনি কার্যত নিজের বাসাতেই বন্দি হয়ে পড়েন এবং বাইরের জগতের সঙ্গে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। শেষ পর্যন্ত প্রয়োজনীয় সুবিধা পাওয়ার আগেই তার মৃত্যু হয়।

তৃতীয় মামলায় এক অন্তঃসত্ত্বা নারীকে সরকারি হাউজিং ভাউচার ব্যবহার করতে চাওয়ার কারণে অ্যাপার্টমেন্ট ভাড়া দিতে অস্বীকৃতি জানায় নিউ আমেরিকান রিয়েলটি করপোরেশন। সন্তান জন্মের প্রাক্কালে তিনি উচ্ছেদের মুখে পড়ে পরিবারের সহায়তাকারী আত্মীয়স্বজনের কাছাকাছি একটি বাসা খুঁজছিলেন।

অভিযোগে বলা হয়, সংশ্লিষ্ট রিয়েল এস্টেট ব্রোকার তার গর্ভাবস্থা এবং বৈবাহিক অবস্থা নিয়ে অবমাননাকর মন্তব্য করেন। এই অভিজ্ঞতার কারণে তিনি পরবর্তীতে অন্য কোনো ব্রোকারের কাছেও নিজের ভাউচার ব্যবহার করতে ভয় পান। শেষ পর্যন্ত সরকারি সহায়তা থাকা সত্ত্বেও তিনি সেই ভাউচার ব্যবহার করতে পারেননি এবং বাধ্য হয়ে নিজের পরিচিত এলাকা ও সামাজিক সহায়তা ব্যবস্থা থেকে অনেক দূরে বসবাস শুরু করেন।

চতুর্থ মামলায় এনওয়াই পিরামিড গ্রুপ করপোরেশন একটি পরিবারকে সরকারি আবাসন ভাউচার থাকার কারণে অ্যাপার্টমেন্ট ভাড়া দিতে অস্বীকৃতি জানায়। পরিবারের সদস্যসংখ্যা বাড়ায় তারা বড় একটি বাসা খুঁজছিলেন।

অভিযোগ অনুযায়ী, ব্রোকার প্রথমে জানতে চান তারা কীভাবে ভাড়া পরিশোধ করবেন। পরিবারটি জানায় যে তারা সরকারি হাউজিং ভাউচার ব্যবহার করবে। তখন ব্রোকার স্পষ্টভাবে বলেন, তাদের প্রতিষ্ঠান ভাউচারধারীদের সঙ্গে কাজ করে না। পরিবারটি জানায়, এটি নিউইয়র্ক সিটির আইনে অবৈধ বৈষম্য। তখন ব্রোকার ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া জানিয়ে বলেন, “এ নিয়ে তোমরা কী করবে?”

পরে কমিশনের একজন গোপন পরীক্ষক (টেস্টার) একই প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যোগাযোগ করে একই ধরনের অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হন। তিনিও ভাউচার ব্যবহারের কথা জানালে তাকে বাসা ভাড়া দিতে অস্বীকৃতি জানানো হয়। এ ঘটনার পর পরিবারটি নতুন বাসা খোঁজার চেষ্টা ছেড়ে দেয় এবং অনুপযুক্ত ও অস্বাস্থ্যকর বাসস্থানে থাকতে বাধ্য হয়।

কমিশনের মতে, নিউইয়র্ক সিটির মানবাধিকার আইন অনুযায়ী ধর্ম, প্রতিবন্ধিতা, পারিবারিক অবস্থা, বৈবাহিক অবস্থা কিংবা আয়ের উৎস—যেমন সরকারি হাউজিং ভাউচার বা অন্যান্য সরকারি সহায়তা—এর ভিত্তিতে বৈষম্য করা সম্পূর্ণ বেআইনি।

সাম্প্রতিক চারটি রায়ের মাধ্যমে কমিশন স্পষ্ট বার্তা দিয়েছে যে, বৈষম্যের শিকার ব্যক্তিদের ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে তারা আরও দ্রুত ও কঠোর পদক্ষেপ নেবে। শুধু ক্ষতিপূরণ বা জরিমানাই নয়, ভবিষ্যতে একই ধরনের বৈষম্য ঠেকাতে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোকে নীতিমালা পরিবর্তন, কর্মীদের প্রশিক্ষণ এবং আইনের প্রতি পূর্ণাঙ্গ আনুগত্য নিশ্চিত করারও নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

মানবাধিকার বিশেষজ্ঞদের মতে, এই রায়গুলো নিউইয়র্ক সিটির বৈষম্যবিরোধী আইন বাস্তবায়নে একটি গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে। বিশেষ করে ধর্মীয় স্বাধীনতা, প্রতিবন্ধী ব্যক্তির অধিকার এবং সরকারি আবাসন সহায়তা গ্রহণকারীদের সমান সুযোগ নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে এসব সিদ্ধান্ত ভবিষ্যতের জন্য শক্তিশালী বার্তা বহন করছে।

ঠিকানা/এসআর

নিউজটি শেয়ার করুন


© 2026 All Rights Reserved by Thikana Group Of Media
Maintained by SolveEz