(পূর্ব প্রকাশের পর)
পঞ্চাশ ও ষাটের দশকে বাংলা ভাষার ওপর পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর ষড়যন্ত্র ও তার বিরোধিতার সূত্রে বাংলা বানান ও বর্ণমালা সংস্কার সম্পর্কে বেশ কিছু প্রস্তাব রচিত হয়। তবে ওইসব প্রস্তাব গৃহীত বা কার্যকর হয়নি এবং প্রস্তাবকারীদের প্রায় সবাই পরে নিজেদের প্রস্তাবকে আর সমর্থন করেননি।
বাংলা বানানের সমতাবিধানের প্রচেষ্টা সাম্প্রতিককালেও অব্যাহত রয়েছে। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বানানের নিয়ম সমিতির পক্ষে সমিতির সভাপতি অসিতকুমার বন্দ্যোপাধ্যায় ভাষার ‘গতির স্বাভাবিক ধারার সঙ্গে সঙ্গতি রক্ষা করে’ বাংলা বানান আমূল পরিবর্তনের কিছু প্রস্তাব দিয়েছেন। অতি সম্প্রতি পশ্চিমবঙ্গ বাংলা আকাদেমি এ-সংক্রান্ত কিছু সংস্কার প্রস্তাব করেছে; আমাদের দেশের জাতীয় শিক্ষাক্রম ও টেক্সট বুক বোর্ড বাংলা বানানের সমতাবিধানের একটি নীতিমালাও গ্রহণ করেছে। এসব প্রস্তাব ও নীতিমালায় বাংলা বানানের সংস্কার প্রস্তাবের সঙ্গে সঙ্গে বাংলা বর্ণমালার দৃষ্টিগ্রাহ্য রূপের পরিবর্তনের প্রস্তাবও অন্তর্ভুক্ত। তা ছাড়া আধুনিক প্রযুক্তিতে এ ধরনের কিছু পরিবর্তন ইতোমধ্যেই ঘটেছে। কিন্তু সর্বমান্য কোনো প্রস্তাব বা সিদ্ধান্তে এখনো উপনীত হওয়া যায়নি।
কিন্তু এসব সত্ত্বেও এ-কথাও সত্য, বাংলা বানানের একটি চিরন্তন নিয়ম রয়েছে। সাম্প্রতিককালে বানান নিয়ে যে বিভ্রান্তি ও অনাচার লক্ষণীয়ভাবে বেড়ে চলেছে, আসলে তার মূলে রয়েছে বানানের নিয়ম সম্পর্কে অজ্ঞতা এবং নিয়ম জানার ক্ষেত্রে আগ্রহ ও নিষ্ঠার অভাব। বাংলা ভাষার প্রতি অনেকের শ্রদ্ধাবোধের ঘাটতিও এর জন্য অনেকাংশে দায়ী।
নির্মম হলেও সত্য, আমরা পুঁথিগত শিক্ষিতরা অনেকেই বানান ভুলের জন্য লজ্জা বোধ করি না; ভাবি না, শিক্ষিত হিসেবে এটি আমাদের জন্য অসম্মানজনক। অন্যদিকে বিদেশি ভাষা শেখার জন্য আমরা যে শ্রম ব্যয় করি, তার সামান্যতম অংশও আমরা মাতৃভাষা আয়ত্ত করার জন্য দিই না। বরং এ দোষ ঢাকার জন্য বাংলা ভাষার ওপর দায় চাপিয়ে বলি, বাংলা ভাষা খুব কঠিন, এর বানান ভারি ঝামেলার।
স্বীকার করতেই হবে, বাংলা ভাষা ও তার বানানে কিছু স্বাভাবিক জটিলতা রয়েছে। অন্যান্য বিদেশি ভাষাও তাদের নিজস্ব জটিলতা থেকে মুক্ত নয়। আবার এ-কথাও সত্য, বাংলা ভাষা বিশ্বের বিজ্ঞানসম্মত ভাষাগুলোর একটি, এর বানানে জটিলতা থাকলেও তার পেছনে সুনির্দিষ্ট নিয়ম রয়েছে। আমাদের কাজ হলো, ভাষা শুদ্ধ করে লেখার জন্য সেসব নিয়ম ভালোভাবে বুঝে নেওয়া, শিখে নেওয়া। এর জন্য দরকার সামান্য আগ্রহ ও আন্তরিকতা।
বাংলা ভাষার প্রচলন ও দাপ্তরিক ব্যবহারের জন্য নিম্নবর্ণিত আইন প্রণয়ন করা হয় :
(১) এই আইন ‘বাংলা ভাষা প্রচলন আইন, ১৯৮৭’ নামে অভিহিত হইবে।
(২) ইহা অবিলম্বে বলবৎ হইবে।
ক. সংজ্ঞা-বিষয় বা প্রসঙ্গের পরিপন্থী কোন কিছু না থাকিলে, এই আইনে ‘অনুচ্ছেদ’ অর্থে সংবিধানের অনুচ্ছেদ বুঝাইবে।
খ. প্রবর্তন ও কার্যকরী ব্যবস্থা-(১) এই আইন প্রবর্তনের পর বাংলাদেশের সর্বত্র তথা সরকারী অফিস, আদালত, আধা সরকারী, স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান কর্তৃক বিদেশের সাথে যোগাযোগ ব্যতীত অন্যান্য সকল ক্ষেত্রে নথি ও চিঠিপত্র, আইন আদালতের সওয়াল জবাব এবং অন্যান্য আইনানুগত কার্যাবলী অবশ্যই বাংলায় লিখিতে হইবে। (২) খ(১) উপধারায় উল্লেখিত কোন কর্মস্থলে যদি কোন ব্যক্তি বাংলা ভাষা ব্যতীত অন্য কোন ভাষায় আবেদন বা আপীল করেন তাহা হইলে উহা বেআইনী ও অকার্যকর বলিয়া গণ্য হইবে।
(৩) যদি কোন কর্মকর্তা বা কর্মচারী এই আইন অমান্য করেন তাহা হইলে উক্ত কার্যের জন্য তিনি সরকারী কর্মচারী শৃঙ্খলা ও আপীল বিধির অধীনে অসদাচরণ করিয়াছেন বলিয়া গণ্য হইবে এবং তাহার বিরুদ্ধে সরকারী কর্মচারী শৃঙ্খলা ও আপীল বিধি অনুসারে ব্যবস্থা গ্রহণ করা হইবে।
(৪) বিধি প্রণয়নের ক্ষমতা-সরকার সরকারী গেজেট বিজ্ঞপ্তি দ্বারা এই আইনের উদ্দেশ্য পূরণকল্পে বিধি প্রণয়ন করিতে পারিবেন।
কিন্তু ওই আইন বাংলাদেশে কতটুকু কার্যকর হয়েছে, তা পাঠক সমাজই ভালো বলতে পারবেন। সে আইন কাগজেই রয়ে গেছে, বাস্তবে বাস্তবায়নের বিন্দুমাত্র চেষ্টা করা হয়নি।
বাংলা বানান নিয়ে বিভ্রান্তি দিনে দিনে বাড়ছে। বানানের নিয়মকানুন যে প্রতিদিন বদলাচ্ছে, তা নয়; বানান আয়ত্ত করার বিষয়ে আমাদের ঔদাসীন্য ও অবহেলা বাড়ছে, বাড়ছে একধরনের হঠকারিতাও।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইমেরিটাস অধ্যাপক আনিসুজ্জামান যে মন্তব্য করেছেন, তা নিচে তুলে ধরা হলো :
‘অনেকের অভিযোগ, বাংলা বানান বড় কঠিন। সব ভাষার বানানই যত্ন করে শিখতে হয়। অনেকের পর্যবেক্ষণ, উচ্চারণের সঙ্গে বানানের মিল নেই বাংলায়। আমরা প্রত্যেকে যদি নিজেদের উচ্চারণ অনুযায়ী বানান লিখতাম, তাহলে কী ভয়ংকর পরিণামই না হতো। তা ছাড়াও উচ্চারণ আর বানানের যোগ অনেক ভাষাতেই থাকে না।’
তিনি আরও বলেছেন, ‘বাংলা ভাষার অধিকাংশ না হলেও এক বড় অংশ জুড়ে আছে তৎসম শব্দ। এসব শব্দ সরাসরি সংস্কৃত থেকে নেওয়া হলেও পুরোনো বাংলায় তার বানান সব সময় সংস্কৃতের অনুসরণ করেনি। তারপর বাংলা শব্দভান্ডারে আছে তদ্ভব, দেশি ও বিদেশি শব্দ। তদ্ভব শব্দের বানানও এককালে লোকে ইচ্ছেমতো লিখেছেন। দেশি ও বিদেশি শব্দের বানানেও তেমন শৃঙ্খলা ছিল না। সেই শৃঙ্খলা আনার চেষ্টা হলো উনিশ শতকে-অভিধান, ব্যাকরণ, বর্ণপরিচয় সংকলন-প্রণয়নের সময় থেকে। সংস্কৃতের শাসন মেনে তখন অনেক শব্দের বানান গঠিত হলো-প্রয়োজনে যেমন, অপ্রয়োজনেও। কিন্তু তাতেও বানানের, বিশেষ করে অসংস্কৃত শব্দের বানানের নিয়ম একরকম হলো না। ১৯৩৬ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় প্রধানত অসংস্কৃত শব্দের, সামান্য ক্ষেত্রে সংস্কৃত শব্দেরও, বানানের নিয়ম তৈরি করল। এর সঙ্গে আবার কিছু ভেদ হলো বিশ্বভারতীর প্রবর্তিত বানানে। তাই আমরা দোটানায় পড়ে গেলাম : বাঙালী লিখব না বাঙালি?’
ইমেরিটাস অধ্যাপক আনিসুজ্জামানের মতে, ‘১৯৩৬ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়-প্রবর্তিত বানানের নিয়ম আমাদের দেশে ব্যাপকভাবে গৃহীত হয়নি। এসব নিয়মের সঙ্গে অপরিচয় এবং সংবাদপত্র ও পাঠ্যপুস্তক প্রভৃতিতে দৃষ্ট রক্ষণশীলতা তার কারণ। সাধু ও চলিত দুই রীতি পাশাপাশি চলায়ও কিছু বিভ্রান্তি বেড়েছে। তার ওপর অনেক দিন ধরে বিদ্যালয়ে আর যত্ন করে বানান শেখানো হয় না। ফলে বহু যুক্তবর্ণের সঙ্গেও আমাদের শিক্ষিত ব্যক্তিদের যথার্থ পরিচয় নেই-বানানের
সঙ্গেও নেই।’
‘বাংলা বানানের নিয়ম’ বইতে লেখক ও অধ্যাপক মাহবুবুল হক বলেছেন, ‘বাঙালির মতো স্ববিরোধী ও আত্মপ্রবঞ্চক জাতি আর দ্বিতীয়টি আছে কি না সন্দেহ! মাতৃভাষা ও মাতৃভূমির জন্য যারা প্রাণ উৎসর্গ করে, তারাই আবার দৈনন্দিন কর্মক্ষেত্রে মাতৃভাষাকে অবহেলা করে, অশুদ্ধ ভাষা লেখে এবং সে জন্য বিন্দুমাত্র কুণ্ঠিত বা লজ্জিত হয় না-এমন ঘটনার নজির সত্যিই দুর্লভ; কিন্তু পরিহাস এই যে, নিজের অক্ষমতা বা ঔদাসীন্যজনিত অপরাধের বোঝা আমরা আমাদের মাতৃভাষার ওপরই চাপিয়ে মনকে চোখ ঠারি। বাংলা নাকি ভারি কঠিন ভাষা,
বানান নাকি ভয়ানক শক্ত ও ভজঘট! আমাদের জননীর মতো মাতৃভাষাও সর্বংসহা; সন্তানের দেওয়া এই অন্যায় অপবাদের বিরুদ্ধে সে কথা বলে না। পৃথিবীতে আর কোনো দেশের লোক নিজের ভাষা সম্বন্ধে এমন অদ্ভুত ও অশ্রদ্ধেয় উক্তি করে? প্রকৃত তথ্য এই, মাতৃভাষাও শুদ্ধভাবে বলতে ও লিখতে গেলে তা শিখতে হয়, চর্চা করতে হয়-সব জাতিই তাই করে। বাংলা ভাষা নির্ভুল লেখার প্রথম প্রতিবন্ধক সঠিক বানান না-জানা। এ দেশে শিক্ষার অবমূল্যায়ন এবং প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মান ক্রমনিম্নগামী হওয়ায় মাতৃভাষা সম্বন্ধে সচেতনতাও আজ লুপ্তপ্রায়। এর ফলে বহু শিক্ষিত ব্যক্তিও নির্ভুল বানান ও ভাষার শুদ্ধ প্রমিত প্রয়োগ জানেন না।’
ভাষা হিসেবে বাংলাকে প্রতিষ্ঠিত করার লড়াই নতুন কিছু নয়। ব্রিটিশ ভারত বিভক্ত হয়ে ভারতীয় উপমহাদেশে ভারত ও পাকিস্তান নামে দুটি স্বতন্ত্র ও স্বাধীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের জনগণ যেসব রাজনৈতিক আন্দোলন করেছিল, সেসবের মধ্যে ভাষা আন্দোলনই ছিল সবচেয়ে ব্যাপক, তীব্র ও গুরুত্বপূর্ণ। প্রকৃতপক্ষে এই আন্দোলনের মাধ্যমে পূর্ব বাংলার জনগণের পৃথক অস্তিত্বের চেতনা তথা বাঙালি জাতীয়তাবাদের প্রকাশ ঘটে। ১৯৪৭ সালের আগস্ট মাসে পাকিস্তান রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হওয়ার আগেই বাংলাকে পাকিস্তানের অন্যতম রাষ্ট্রভাষা করার দাবি উত্থিত হয়েছে।
১৯৪৪ সালে বঙ্গীয় প্রাদেশিক মুসলিম লীগের তৎকালীন সাধারণ সম্পাদক আ. হাশিম প্রাদেশিক কাউন্সিলে মাতৃভাষার মাধ্যমে শিক্ষাদানের বিষয়টি তাদের ম্যানিফেস্টোতে উল্লেখ করেন। ১৯৪৭ সালের ৩ জুন মুসলিম লীগ থেকে বের হয়ে বামপন্থী নেতারা গণআজাদী লীগ নামে একটি রাজনৈতিক দল গঠন করে ‘বাংলা হইবে পূর্ব পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা’ বাস্তবায়নের দাবি তোলেন। ওই সালের ৬/৪ সেপ্টেম্বর পূর্ব পাকিস্তানের শিক্ষার মাধ্যমে ও অফিস-আদালতে বাংলা ব্যবহারের দাবিতে যুব সম্মেলন করা হয়। ১৫/০২/১৯৪৭ তারিখে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-শিক্ষক সমন্বয়ে গঠিত হয় তমদ্দুন মজলিস এবং ১৫ সেপ্টেম্বর ‘পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা বাংলা না উর্দ্দু’ নামে একটি পত্রিকা প্রকাশিত হয়। ৫ ডিসেম্বর ঢাকায় বঙ্গীয় প্রাদেশিক মুসলিম লীগ ওয়ার্কিং কমিটির সভায় উর্দুকে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা করা যাবে না মর্মে সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়েছিল। (চলবে)
লেখক : জ্যেষ্ঠ আইনজীবী ও কলামিস্ট।