প্রবাসীরা শুধু বাংলাদেশের অর্থনীতির চালিকাশক্তিই নন, দেশের গণতান্ত্রিক পুনর্গঠন, টেকসই উন্নয়ন এবং বহির্বিশ্বে ইতিবাচক ভাবমূর্তি তৈরিতেও তাদের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে, এমন বার্তা দিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্র সফররত নোয়াখালী-৫ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য মো. ফখরুল ইসলাম। গত ৯ আগস্ট রোববার পেনসিলভানিয়ায় আপার ডারবিতে আয়োজিত এক নাগরিক সংবর্ধনায় তাঁর বক্তব্য উপস্থিত প্রবাসীদের মধ্যে ব্যাপক সাড়া ফেলে।
দেশের বর্তমান রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক বাস্তবতা তুলে ধরে ফখরুল ইসলাম প্রবাসীদের আরো সুসংগঠিত ও ঐক্যবদ্ধ হওয়ার আহ্বান জানিয়ে বলেন, দেশের সামনে এখন যে নতুন বাস্তবতা তৈরি হয়েছে, সেখানে শুধু রাজনৈতিক দলগুলোর নয়, বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ছড়িয়ে থাকা বাংলাদেশিদেরও দায়িত্ব রয়েছে।
প্রবাসীদের অবদানের স্বীকৃতি দিয়ে তিনি বলেন, “প্রবাসীরা হলেন আমাদের দেশের অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি। আপনারা বিদেশে হাড়ভাঙা খাটুনি খেটে যে রেমিট্যান্স পাঠান, তা কেবল দেশের অর্থনীতিকেই সচল রাখে না, বরং আমাদের মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে সাহায্য করে। বিদেশের মাটিতে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল করতে আপনাদের অবদান অনস্বীকার্য।”
ফখরুল ইসলাম আরো বলেন, প্রবাসীদের অবদানকে শুধু বৈদেশিক মুদ্রা বা রেমিট্যান্সের হিসাবে দেখলে তা অসম্পূর্ণ থেকে যাবে। বিদেশে বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব, দেশের পক্ষে জনমত সৃষ্টি এবং সংকটের সময়ে দেশের মানুষের পাশে দাঁড়ানোর ক্ষেত্রেও প্রবাসীদের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ।
বাংলাদেশের বর্তমান পরিস্থিতির প্রসঙ্গ টেনে সাবেক এই সংসদ সদস্য বলেন, দেশ একটি নতুন রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক বাস্তবতার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক সংকটের পর দেশের গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান ও রাষ্ট্রীয় কাঠামোকে শক্তিশালী করা এবং একটি স্থিতিশীল ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করাই এখন বড় চ্যালেঞ্জ।
তিনি বলেন, “এই ক্রান্তিলগ্নে দেশের টেকসই উন্নয়ন এবং গণতান্ত্রিক পুনর্গঠনে প্রবাসীদের আরও সুসংগঠিত ও ঐক্যবদ্ধ ভূমিকা পালন করতে হবে।”
বিএনপি দলীয় সংসদ সদস ফখরুল ইসলামের বক্তব্যে বারবার উঠে আসে জাতীয় ঐক্যের প্রয়োজনীয়তা। তিনি মনে করেন, দেশ যখন পরিবর্তন ও পুনর্গঠনের পথে এগোয়, তখন নানা স্বার্থান্বেষী মহল অস্থিতিশীলতা সৃষ্টির চেষ্টা করতে পারে। এমন পরিস্থিতিতে দেশের ভেতরে ও বাইরে গণতান্ত্রিক শক্তিগুলোর মধ্যে বিভক্তির পরিবর্তে ঐক্য প্রয়োজন।
তিনি বলেন, “আপনারা ঐক্যবদ্ধ থাকলে দেশের ভেতরের যেকোনো ষড়যন্ত্র মোকাবিলা করা এবং একটি সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়ে তোলা সহজ হবে।”
প্রবাসীদের রাজনৈতিক ও সামাজিক দায়িত্বের প্রসঙ্গেও কথা বলেন ফখরুল ইসলাম। তাঁর মতে, বিদেশে বসবাসরত বাংলাদেশিরা যে দেশেই থাকুন না কেন, সেখানকার মূলধারার সমাজ ও নীতিনির্ধারকদের কাছে বাংলাদেশের প্রকৃত পরিস্থিতি তুলে ধরার সুযোগ তাদের রয়েছে।
বাংলাদেশের স্বার্থ, গণতান্ত্রিক অধিকার এবং দেশের ইতিবাচক ভাবমূর্তি তুলে ধরতে প্রবাসীদের আরও সচেতন ও সক্রিয় হওয়ার আহ্বান জানান তিনি।
তাঁর ভাষায়, প্রবাসীদের ঐক্য শুধু রাজনৈতিক ক্ষেত্রেই নয়, দেশের অর্থনীতি ও ভবিষ্যৎ উন্নয়নের ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
বক্তব্যে দেশের অর্থনৈতিক পুনর্গঠনের সঙ্গে প্রবাসীদের আরও নিবিড়ভাবে সম্পৃক্ত করার প্রয়োজনীয়তাও তুলে ধরেন ফখরুল ইসলাম। প্রবাসীদের পাঠানো অর্থ যাতে কেবল পারিবারিক ব্যয়ে সীমাবদ্ধ না থেকে দেশের উৎপাদনশীল ও টেকসই অর্থনীতিতে ভূমিকা রাখতে পারে, সে জন্য নিরাপদ ও কার্যকর আর্থিক ব্যবস্থার ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।
একই সঙ্গে দেশে প্রবাসী বাংলাদেশিদের বিনিয়োগের ক্ষেত্রে আমলাতান্ত্রিক জটিলতা, হয়রানি এবং অনিশ্চয়তা দূর করার প্রয়োজনীয়তার কথাও উঠে আসে তাঁর বক্তব্যে। প্রবাসীদের উপার্জিত অর্থ দেশে বিনিয়োগে উৎসাহিত করতে হলে বিনিয়োগের নিরাপত্তা ও আস্থার পরিবেশ নিশ্চিত করা জরুরি বলে মত দেন তিনি।
বিদেশে বসবাসরত বাংলাদেশিদের নাগরিক অধিকার, প্রয়োজনীয় সরকারি সহায়তা এবং কনস্যুলার সেবা আরও সহজ ও কার্যকর করার বিষয়েও গুরুত্বারোপ করেন ফখরুল ইসলাম।
তিনি বলেন, “প্রবাসে আপনাদের নাগরিক অধিকার রক্ষা এবং দেশের কল্যাণে সবাইকে একযোগে কাজ করার আহ্বান জানাচ্ছি।”
ফখরুল ইসলামের বক্তব্যে দেশের রাজনীতি নিয়ে আলোচনা থাকলেও অনুষ্ঠানে তাঁর প্রবাসীকেন্দ্রিক বার্তাই বিশেষভাবে উপস্থিতদের দৃষ্টি কাড়ে। প্রবাসীদের ত্যাগের স্বীকৃতি, দেশের ভবিষ্যৎ নির্মাণে তাদের অংশীদার করার আহ্বান এবং ঐক্যের ওপর গুরুত্ব দেওয়ায় বক্তব্যটি উপস্থিত অনেকের কাছে প্রশংসিত হয়।
অনুষ্ঠানে পেনসিলভানিয়া ও আশপাশের অঙ্গরাজ্য থেকে প্রবাসী বাংলাদেশি, ব্যবসায়ী, কমিউনিটি ব্যক্তিত্ব এবং বিএনপি ও সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীরা অংশ নেন।
স্থানীয় বাংলাদেশি কমিউনিটি ও বিএনপি নেতাকর্মীদের উদ্যোগে আয়োজিত নাগরিক সংবর্ধনায় ফখরুল ইসলামকে ফুল দিয়ে বরণ করার পাশাপাশি সম্মাননা স্মারক দেওয়া হয়।
অনুষ্ঠানের অন্যান্য বক্তাও প্রবাসীদের মধ্যে ঐক্য বজায় রাখা, বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক অধিকার ও জাতীয় স্বার্থের পক্ষে জনমত তৈরি এবং প্রবাসীদের বিভিন্ন সমস্যা সমাধানে সম্মিলিতভাবে কাজ করার ওপর গুরুত্ব দেন।
উৎসবমুখর পরিবেশে আয়োজিত সংবর্ধনার শেষপর্বে ফখরুল ইসলাম উপস্থিত প্রবাসীদের সঙ্গে শুভেচ্ছা ও মতবিনিময় করেন।
ব্রুকলিনে সংবর্ধনা : নায়াখালী-৫ আসনের সংসদ সদস্য আলহাজ্ব ফখরুল ইসলামের যুক্তরাষ্ট্র সফর উপলক্ষে নিউইয়র্কে বর্ণাঢ্য নাগরিক সংবর্ধনা অনুষ্ঠিত হয়েছে। নোয়াখালী-৫ আসনের সর্বস্তরের প্রবাসীদের উদ্যোগে গত ৫ আগস্ট সন্ধ্যায় ব্রুকলিনের জলসা রেস্টুরেন্টে এ সংবর্ধনার আয়োজন করা হয়।
আয়োজক কমিটির সভাপতি ও বাংলাদেশ সোসাইটির ট্রাস্টি বোর্ডের সদস্য নাঈম টুটুলের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন ফখরুল ইসলাম এমপি।
বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বিএনপির কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য গিয়াস আহমেদ, যুক্তরাষ্ট্র বিএনপির নেতা মোস্তফা কামাল পাশা বাবুল, জসিম ভূঁইয়া ও কমিউনিটি নেতা সালামত উল্লাহ।
এ ছাড়া উপস্থিত ছিলেন আয়োজক কমিটির সদস্যসচিব মোশাররফ হোসেন ফয়সাল, যুগ্ম-আহ্বায়ক ইমতিয়াজ আহমেদ, মিজানুর রহমান ও মোতাসিম বিল্লাহ সিরাজী, প্রধান সমন্বয়কারী মোশারফ হোসেন সবুজ, যুগ্ম-সমন্বয়কারী আকরামুল হাসান ও দেলোয়ার হোসেন সাহেল, যুগ্ম-সদস্যসচিব নুরুল ইসলাম বাবু ও মোরসালিন হোসাইনসহ নোয়াখালী-৫ আসনের বিপুলসংখ্যক প্রবাসী।
সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে ফখরুল ইসলাম এমপি বলেন, দেশের অর্থনীতি ও উন্নয়নে প্রবাসী বাংলাদেশিদের অবদান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। নোয়াখালীর উন্নয়ন পরিকল্পনায় প্রবাসীদের পরামর্শ ও সহযোগিতাকে গুরুত্ব দেয়া হবে।
তিনি বলেন, নোয়াখালীকে আধুনিক ও বিনিয়োগবান্ধব জেলায় পরিণত করতে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা নিয়ে কাজ চলছে। জেলার যোগাযোগ ব্যবস্থা আরো উন্নত করতে আন্তর্জাতিক মানের একটি বিমানবন্দর প্রতিষ্ঠার আশাবাদও ব্যক্ত করেন তিনি।
ফখরুল ইসলাম বলেন, নোয়াখালীতে আন্তর্জাতিক মানের বিমানবন্দর প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব হলে যোগাযোগ ব্যবস্থার পাশাপাশি ব্যবসা-বাণিজ্য, পর্যটন ও প্রবাসীদের যাতায়াতে নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলবে। এ উদ্যোগ বাস্তবায়নে সরকার, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ ও প্রবাসীদের সম্মিলিত সহযোগিতা কামনা করেন তিনি।
বিশেষ অতিথির বক্তব্যে গিয়াস আহমেদ বলেন, দেশের উন্নয়ন ও অগ্রগতিতে প্রবাসীদের ভূমিকা অপরিসীম। নোয়াখালীর উন্নয়নেও প্রবাসীদের ঐক্যবদ্ধ অংশগ্রহণ ভবিষ্যতে আরো গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।
অনুষ্ঠানে ফখরুল ইসলাম এমপিকে ফুলেল শুভেচ্ছা জানানো হয়। পরে তাঁর হাতে সম্মাননা স্মারক তুলে দেন আয়োজকেরা।
আয়োজকদের পক্ষ থেকে নোয়াখালী-৫ আসনের প্রবাসীসহ অনুষ্ঠানে উপস্থিত সবাইকে আন্তরিক কৃতজ্ঞতা জানানো হয়। সংবর্ধনা অনুষ্ঠান সফল করতে সহযোগিতাকারীদের প্রতিও ধন্যবাদ জানানো হয়।