রবিবার, ১১ অক্টোবর ২০২৬

রবিবার, ১১ অক্টোবর ২০২৬

বিজ্ঞাপন

ঢাকার নদী সুরক্ষায় চাই গতি

ঢাকার নদী সুরক্ষায় চাই গতি

বিজ্ঞাপন
তায়েব মিল্লাত হোসেন : ঢাকা বুড়িগঙ্গা নদীর তীরে অবস্থিত। এ কোনো নতুন কথা নয়। শত শত বছর ধরে একরকম প্রবাদ বাক্যেই পরিণত হয়েছে। প্রাচ্য থেকে পাশ্চাত্য; যারা জানেন ঢাকাকে, তারা জানেন বুড়িগঙ্গাকেও। এই নদী ঘিরেই রচিত হয়েছে ঢাকার নানা ইতিহাস। কেননা এই জলপথ ধরে যেমন শহরে প্রথম এসেছিলেন মুঘল সুবাদার ইসলাম খান, তেমনি ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি বুড়িগঙ্গার বুক চিরেই এগিয়ে নিয়েছিল নিজেদের বাণিজ্যের ভাগ্যের চাকা। এভাবে ইতিহাসের নানা ঘটনার সাক্ষী ঢাকার নদ-নদী। তবে এই নদীগুলো, বিশেষত তুরাগ, বালু, বুড়িগঙ্গা ও শীতলক্ষ্যা এখন নিজেরাই ধুঁকছে। এটা অবশ্য বয়সের ভারে নয়। দূষণে দূষণে কাবু হয়ে আছে তারা।
সংকটে থাকা এই নদীগুলোকে বাঁচাতে হবে। সদ্যই এমন তাগিদ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। এ নিয়ে ৬ আগস্ট করেছেন বৈঠকও। যে আয়োজনের কেতাবি নাম ছিল ‘বুড়িগঙ্গা নদীর পানি ও পরিবেশ উন্নয়ন’। বুড়িগঙ্গা, তুরাগ, বালু ও শীতলক্ষ্যার পরিবেশগত পরিস্থিতি নিয়ে সেই বৈঠকে আলোচনা হয়। দূষণের সব কারণও তুলে ধরেন বিশেষজ্ঞরা। এর মধ্যে শিল্পকারখানার অপরিশোধিত বর্জ্য নদীতে নিঃসরণ, অপর্যাপ্ত পয়োনিষ্কাশন ও ড্রেনেজ-ব্যবস্থা, খালগুলোর নাব্যতা হ্রাস এবং কঠিন বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় দুর্বলতার প্রসঙ্গ সামনে আসে। এগুলো হচ্ছে নদীদূষণের প্রধান প্রধান কারণ। প্রতিকার হিসেবে তাই বলা হয়, শিল্পকারখানায় বর্জ্য শোধনাগার (ইটিপি) কার্যকরভাবে পরিচালনা নিশ্চিত করার কথা। খাল ও ড্রেনেজ-ব্যবস্থার উন্নয়নের প্রস্তাব রাখা হয়। দূষণকারীদের বিরুদ্ধে নিয়মিত অভিযান পরিচালনার কথাও আলোচনায় আসে। এর পাশাপাশি নদী সুরক্ষায় সরকারের সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর মধ্যে সমন্বয়ের প্রয়োজনীয়তাও তুলে ধরা হয়। আলোচনার বাইরে থাকেনি জনসচেতনতা বৃদ্ধির বিষয়টি। আর নদীরক্ষায় যে নাগরিকদেরও যার যার জায়গা থেকে দায়িত্ব পালন করতে হবে, সেটাও মনে করিয়ে দেওয়া হয়। সবশেষে রাজধানী ঢাকার চারপাশের নদীগুলোর দূষণ রোধে দ্রুত একটি সমন্বিত কর্মপরিকল্পনা প্রণয়ন ও তা বাস্তবায়নের নির্দেশ দেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপির যে ইশতেহার, সেখানেও কিন্তু ২০ হাজার কিলোমিটার নদী ও খাল খনন এবং পুনঃখননের কথা ছিল। আধুনিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনা চালুর বিষয়ও আছে এতে। সবটা মিলে ইশতেহারে লক্ষ্যটা ছিল : পরিবেশ রক্ষা ও জলবায়ুর নেতিবাচক পরিবর্তন ঠেকানো। ক্ষমতায় আসার পর খাল খননে দ্রুত হাত লাগিয়েছে বিএনপি সরকার। কিন্তু নদ-নদীর নাব্যতা বৃদ্ধি বা দূষণমুক্ত করার আলাদা কোনো উদ্যোগ এখানো দৃশ্যমান নয়। আর ঢাকার নদী তো দূরে থাক, খাল নিয়েও বিশেষায়িত কোনো উদ্যোগের খবর সামনে আসেনি। পাঁচ দশক আগেও ঢাকায় সচল খাল ছিল ৫৭টি। এখন সেখানে আছে ২৬টি। কিছু খাল ভরাট করে তৈরি করা হয়েছে প্রধান সড়ক। বিকল্প হিসেবে যে বক্স কালভার্ট রয়েছে কিছু এলাকায়, সেগুলো অতিবৃষ্টিতে পানি সরাতে সক্ষমতার পরিচয় দিতে পারছে না। তাই জলাবদ্ধতায় প্রায়ই নাকাল হতে হয় নগরবাসীকে। সারা দেশে খাল খননে বিএনপি সরকার যেভাবে নজর দিয়েছে, সেই নজরখানি দ্রুতই ঢাকার বেলায় পড়বে, এই আশার কথা জানিয়ে রাখতে পারি আমরা। যাই হোক, ঢাকার নদীতে ফিরে আসি। এই নগরকে বাঁচাতে হলে নদী বাঁচানোর কোনো বিকল্প নেই। এ বিষয়ে তাগিদ শুধু কর্তাব্যক্তিরা দিয়ে থাকেন, এমন নয়। বিষয়টি নিয়ে উচ্চ আদালতেরও নির্দেশনা রয়েছে। যার কারণে দূষণ ও দখলে বিপর্যস্ত তুরাগ, বালু, বুড়িগঙ্গা ও শীতলক্ষ্যা নদীকে রক্ষায় ২০০৯ সালে প্রতিবেশগত সংকটাপন্ন এলাকা (ইকোলজিকালি ক্রিটিক্যাল এরিয়া-ইসিএ) ঘোষণা করা হয়। একই রায়ে নদীগুলো দখলমুক্ত ও সীমানা নির্ধারণের নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল।
কিন্তু ১৭ বছর পার হলেও উচ্চ আদালতের নির্দেশনার পুরোটা বাস্তবায়ন হয়নি। সীমানা নির্ধারণে পিলার বসানোর কাজ শুরু হলেও তা আজও শেষ হয়নি। এটা যদি শেষ করা যায়, তাহলে অন্তত বেহাত ও ভরাটের হাত থেকে অনেকটাই রক্ষা পাবে নদীগুলো। এরপর বাকি থাকে দূষণ নিয়ন্ত্রণে আনা, খনন করা, নাব্যতা বৃদ্ধির মতো কিছু কাজ। বুড়িগঙ্গায় বাজে গন্ধযুক্ত কালো পানির নদী থেকে তার স্বাভাবিক পানি নিয়ে প্রবাহিত হবে, সেই দিন যদি না ফেরে, তাহলে শহর ঢাকাও কিন্তু যেকোনো দিক দিয়ে মনুষ্য বসতির অনুপযোগী হয়ে যেতে পারে। তেমন কোনো শঙ্কা এড়াতে আমাদের কর্তারা এবার নদীরক্ষায় উদ্যোগী হবেন, চাইছি সেই আশার পানে।

নিউজটি শেয়ার করুন


© 2026 All Rights Reserved by Thikana Group Of Media
Maintained by SolveEz