মঙ্গলবার, ১৩ অক্টোবর ২০২৬

মঙ্গলবার, ১৩ অক্টোবর ২০২৬

বিজ্ঞাপন
দুই প্যারেড, চার ফোবানা, বিভক্তির বৃত্তে বাংলাদেশি কমিউনিটি

সবাই পারে, আমরা কেন পারি না?

একই পতাকা, একই দেশ তবু আলাদা মঞ্চ কেন?
সবাই পারে, আমরা  কেন পারি না?

বিজ্ঞাপন
অভিবাসীর দেশ আমেরিকা। পৃথিবীর প্রায় প্রতিটি দেশের মানুষ এখানে এসেছে নিজের স্বপ্ন নিয়ে, সঙ্গে নিয়ে এসেছে নিজের ভাষা, সংস্কৃতি, পোশাক, খাবার, সংগীত ও ইতিহাস। সেই বৈচিত্র্যের সবচেয়ে দৃশ্যমান প্রকাশগুলোর একটি নিউইয়র্কের বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠীর প্যারেড।
ভারতীয়দের ইন্ডিয়া ডে প্যারেড, ক্যারিবিয়দের ওয়েস্ট ইন্ডিয়ান ডে প্যারেড, গ্রিক, আইরিশ, কলম্বিয়ান, ইকুয়েডরিয়ান, নেপালি কিংবা অন্যান্য কমিউনিটির প্যারেড, রাস্তার দুই পাশে দাঁড়িয়ে অন্য জাতিগোষ্ঠীর মানুষও দেখে তাদের সংস্কৃতি ও শক্তির প্রদর্শন। একটি সফল প্যারেড শুধু আনন্দ-উৎসব নয়। এটি রাজনৈতিক দৃশ্যমানতা, সাংস্কৃতিক পরিচয় এবং একটি কমিউনিটির সাংগঠনিক সামর্থ্যের প্রদর্শনী।
নিউইয়র্কের বাংলাদেশিরাও এখন সংখ্যায়, অর্থনৈতিক সক্ষমতায় এবং রাজনৈতিক প্রভাবের দিক থেকে আর ছোট কোনো কমিউনিটি নয়। অথচ প্রশ্ন উঠছে- আমাদের সক্ষমতা যত বেড়েছে, আমাদের ঐক্য কি তত বেড়েছে? চলতি বছর নিউইয়র্কের বাংলাদেশিদের দুটি পৃথক প্যারেড যেন সেই প্রশ্নটিই আরো প্রকট করে সামনে নিয়ে এসেছে।
নিউইয়র্কে প্রথম বাংলাদেশ ডে প্যারেড অনুষ্ঠিত হয় ২০২৪ সালে জ্যাকসন হাইটসে। নিউইয়র্ক সিটির মেয়রের দপ্তরের নথি এবং বাংলাদেশি-আমেরিকান ইতিহাস নিয়ে প্রকাশিত শিক্ষামূলক গবেষণাতেও ২০২৪ সালের আয়োজনটিকে নিউইয়র্কের প্রথম বাংলাদেশ ডে প্যারেড হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। মেয়র এরিক অ্যাডামস ওই প্যারেডে অংশ নিয়েছিলেন। সেটি ছিল একটি সম্ভাবনার সূচনা। চার দশকেরও বেশি সময় ধরে গড়ে ওঠা নিউইয়র্কের বাংলাদেশি জনপদ প্রথমবারের মতো নিজের পতাকা, ভাষা, মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস, পোশাক, সংগীত ও সংস্কৃতি নিয়ে নিউইয়র্কের রাজপথে একটি বড় পরিচয়ের মিছিল করার সুযোগ পেয়েছিল।
২০২৫ সালের ১৩ এপ্রিলও জ্যাকসন হাইটসে বাংলাদেশ ডে প্যারেড অনুষ্ঠিত হয়। সে বছরের আয়োজনের সঙ্গে বাংলাদেশ সোসাইটির নামও যুক্ত ছিল। কিন্তু প্যারেড যত প্রতিষ্ঠিত হওয়ার কথা ছিল, তার সঙ্গে সঙ্গে দৃশ্যমান হতে শুরু করে নেতৃত্ব ও নিয়ন্ত্রণ নিয়ে দ্বন্দ্বও। আর ২০২৬ সালে এসে সেই দ্বন্দ্ব আর আড়ালে থাকেনি।
এ বছরের বাংলাদেশ ডে প্যারেড অনুষ্ঠিত হয় ১৭ মে রোববার বাংলাদেশিদের প্রাণকেন্দ্র জ্যাকসন হাইটসের ৩৭ অ্যাভিনিউতে। 
বাংলাদেশ সোসাইটিকে প্যারেডের একক নেতৃত্ব না দেওয়াকে কেন্দ্র করে সংগঠনটি এ আয়োজনে অংশগ্রহণ না করার সিদ্ধান্ত নেয়। তার প্রায় তিন মাস পর গত ৯ আগস্ট রোববার একই জ্যাকসন হাইটসে বাংলাদেশ সোসাইটির উদ্যোগে অনুষ্ঠিত হয় সাউথ এশিয়ান ইউনিটি প্যারেড। প্যারেডের প্রচারে বাংলাদেশ, ভারত, পাকিস্তান, নেপাল, শ্রীলঙ্কা, ভুটান ও মালদ্বীপসহ দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোকে সামনে রেখে ঐক্যের আহ্বান জানানো হয়েছিল। কিন্তু এখানেই তৈরি হয়েছে বড় প্রশ্ন- সাউথ এশিয়ান ইউনিটি’ নাম দেওয়া হলেও বাস্তবে কতটা দক্ষিণ এশীয় ঐক্য সেখানে প্রতিফলিত হয়েছে?
কমিউনিটির অনেকের মতে, অন্য দক্ষিণ এশীয় কমিউনিটির অংশগ্রহণ ছিল সীমিত; আবার প্রত্যাশিত বাংলাদেশি জনসমাগমও দেখা যায়নি।
অন্যদিকে ১৭ মে রোববার অনুষ্ঠিত বাংলাদেশ ডে প্যারেডেও উপস্থিতি নিয়ে আয়োজকদের প্রত্যাশা ও বাস্তবতার মধ্যে ব্যবধান ছিল বলে কমিউনিটির একটি অংশ মনে করে। অর্থাৎ জয়ী হয়নি কোনো পক্ষ। বরং একই বছরে দুটি প্যারেড করে বাংলাদেশি কমিউনিটি হয়তো প্রমাণ করেছে- আমাদের মানুষের অভাব নেই, সংগঠনের অভাব নেই, টাকারও অভাব নেই; অভাব একটি গ্রহণযোগ্য যৌথ কাঠামোর।
প্রশ্নটা ‘কার প্যারেড’ নয়, ‘বাংলাদেশের প্যারেড’ কেন নয়? একটি জাতীয় পরিচয়ের প্যারেডের সবচেয়ে বড় শক্তি হওয়া উচিত এর মালিকানা কারও একার নয়।
বাংলাদেশ ডে প্যারেড যদি সত্যিকার অর্থেই ‘বাংলাদেশ’-এর হয়, তাহলে সেটি কোনো ব্যক্তির নয়, কোনো এক সংগঠনের নয়, কোনো ব্যবসায়ীর নয়, এমনকি বাংলাদেশ সোসাইটিরও একক সম্পত্তি হওয়ার কথা নয়।
বাংলাদেশ সোসাইটি দীর্ঘদিনের আমব্রেলা সংগঠন, তাই তার একটি গুরুত্বপূর্ণ এবং স্বাভাবিক নেতৃত্বের ভূমিকা থাকা উচিত। কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ নেতৃত্ব আর একক কর্তৃত্ব এক বিষয় নয়।
একইভাবে অন্য কোনো সংগঠন যদি মনে করে, অর্থ জোগাড় করেছে বা আয়োজনের সূচনা করেছে বলেই প্যারেডের নিয়ন্ত্রণ স্থায়ীভাবে তাদের হাতে থাকবে—সেই ধারণাও একটি জাতীয় কমিউনিটি প্যারেডের সঙ্গে সাংঘর্ষিক।
দুই প্যারেডের বিরোধ নিয়ে কমিউনিটির সঙ্গে কথা বললে কয়েক ধরনের অভিযোগ বারবার শোনা যায়। কার নাম সামনে থাকবে? কে হবেন গ্র্যান্ড মার্শাল? কে মঞ্চে বসবেন? কে রাজনীতিকদের পাশে থাকবেন? কার সংগঠনের ব্যানার সামনে থাকবে? কার হাতে থাকবে অর্থ সংগ্রহ ও ব্যয়ের নিয়ন্ত্রণ?
এমনকি বিভিন্ন সময়ে পদ, স্পনসরশিপ এবং আর্থিক লেনদেনকে ঘিরেও নানা অভিযোগ উঠেছে। ২০২৪ সালের প্যারেডের সময় ‘গ্র্যান্ড মার্শাল’ পদ ঘিরে অর্থ দাবির অভিযোগের কথাও একটি সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছিল। তবে সংশ্লিষ্ট অভিযোগগুলো নিয়ে পক্ষগুলোর ভিন্ন বক্তব্য রয়েছে এবং স্বাধীনভাবে সব অভিযোগের সত্যতা প্রতিষ্ঠিত হয়নি। তাই প্রমাণ ছাড়া কাউকে অভিযুক্ত করার সুযোগ নেই। কিন্তু অভিযোগ সত্যি হোক বা না হোক, আরও বড় একটি সত্য এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগও নেই।
বাংলাদেশি কমিউনিটির বড় বড় আয়োজনের সঙ্গে পদ-পদবি, কর্তৃত্ব, সামাজিক মর্যাদা এবং অর্থের প্রশ্ন জড়িয়ে পড়ছে—এমন একটি ধারণা কমিউনিটির মধ্যে গভীরভাবে তৈরি হয়েছে। আর সেই ধারণাটিই ভয়ংকর। কারণ মানুষের বিশ্বাস হারিয়ে গেলে প্যারেডের জন্য রাস্তার পারমিট পাওয়া যায়, ব্যানার বানানো যায়, মঞ্চ বানানো যায়—কিন্তু মানুষকে আর রাস্তায় নামানো যায় না।
বাংলাদেশি কমিউনিটির বিভক্তির গল্প নতুন নয়। প্যারেড তার সর্বশেষ দৃশ্যমান উদাহরণ মাত্র। একসময় উত্তর আমেরিকার বাংলাদেশিদের সবচেয়ে বড় সম্মেলন হিসেবে যে ফোবানা একটি শক্তিশালী ব্র্যান্ড তৈরি করেছিল, সেটিও দীর্ঘদিন ধরে নেতৃত্বের বিরোধ ও পাল্টাপাল্টি দাবিতে বিভক্ত।
২০২৬ সালেও ফোবানর বিভাজন নিয়ে একাধিক পক্ষের নেতৃত্ব দাবি এবং দীর্ঘদিনের সাংগঠনিক দ্বন্দ্বের কথা উঠে এসেছে। পুরোনো আয়োজকদের মতে, নেতৃত্বের নির্বাচন ও নিয়ন্ত্রণ নিয়ে বিরোধ থেকেই বিভিন্ন পক্ষ আলাদা প্ল্যাটফর্ম তৈরি করেছে। বাস্তবতা এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে সাধারণ প্রবাসীর কাছে প্রশ্ন- আসল ফোবানা কোনটি?
আরো দুঃখজনক হলো, একই প্রবণতা দেখা যায় বিভিন্ন আঞ্চলিক সমিতি, পেশাজীবী সংগঠন, সামাজিক সংগঠন থেকে শুরু করে সাংবাদিকদের সংগঠনেও।
একটি সংগঠন তৈরি হয়। নির্বাচন আসে। দুই পক্ষ তৈরি হয়। তারপর মামলা, পাল্টা কমিটি, পাল্টা সংবাদ সম্মেলন। এরপর দুই পক্ষই একই নাম অথবা কাছাকাছি নামে নিজেদের ‘মূল’ সংগঠন দাবি করতে থাকে। শেষ পর্যন্ত দুটো অনুষ্ঠান হয়, কিন্তু কমিউনিটির শক্তি অর্ধেক হয়ে যায়।
বাংলাদেশি কমিউনিটির একটি অস্বস্তিকর বাস্তবতা নিয়ে এখন কথা বলার সময় এসেছে। আমাদের প্রেসিডেন্টের অভাব নেই। চেয়ারম্যানের অভাব নেই। কনভেনরের অভাব নেই। প্রধান অতিথি, বিশেষ অতিথি, গ্র্যান্ড মার্শাল, প্রধান উপদেষ্টারও অভাব নেই। কিন্তু দীর্ঘস্থায়ী প্রতিষ্ঠান কতগুলো তৈরি হয়েছে?
নতুন প্রজন্মের জন্য বড় বৃত্তি তহবিল কোথায়? কমিউনিটির নিজস্ব গবেষণা প্রতিষ্ঠান কোথায়? বাংলাদেশিদের রাজনৈতিক তথ্যকেন্দ্র কোথায়? ইমিগ্র্যান্টদের জন্য বড় আইনি সহায়তা তহবিল কোথায়? বাংলাদেশি তরুণদের সিটি, স্টেট ও ফেডারেল প্রশাসনে পাঠানোর সংগঠিত কর্মসূচি কোথায়? নিজেদের ইতিহাস সংরক্ষণের মিউজিয়াম, আর্কাইভ কিংবা সাংস্কৃতিক কেন্দ্র কোথায়? এখানেই আমাদের আত্মসমালোচনা প্রয়োজন।
আমরা হয়তো প্রতিষ্ঠান তৈরির চেয়ে পদ তৈরি করেছি বেশি। অথচ বাংলাদেশিদের অর্জনের গল্প একেবারেই অন্যরকম। এই বিভক্তির বিপরীতে আরেকটি বাংলাদেশি আমেরিকার গল্প আছে। সেই গল্প আশার।
মাত্র কয়েক দশক আগে নিউইয়র্ক পুলিশ বিভাগে বাংলাদেশি সদস্য ছিলেন হাতে গোনা। এখন এনওয়াইপিডিতে এক হাজারের বেশি বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত ইউনিফর্মধারী কর্মকর্তা এবং প্রায় দেড় হাজার সিভিলিয়ান কর্মী আছেন। তাদের একটি শক্তিশালী সংগঠন আছে- বাংলাদেশি আমেরিকান পুলিশ অ্যাসোসিয়েশন (বাপা)। কিন্তু দুঃখজনক হলো- নেতৃত্বের কোন্দলে বাপা সরাসরি না ভাঙলেও একই ধরনের আরো দুটি সংগঠন প্রতিষ্ঠা পেয়েছে। 
সরকারি প্রশাসন, ব্যবসা, চিকিৎসা, প্রকৌশল, আইন, প্রযুক্তি, রিয়েল এস্টেট এবং গণমাধ্যমে নিজেদের অবস্থান তৈরি করেছেন। জ্যাকসন হাইটস, জ্যামাইকা, ওজন পার্ক, ব্রুকলিনের বিভিন্ন অংশ আজ বাংলাদেশের বাইরে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বাংলাদেশি জনপদগুলোর মধ্যে পড়ে। অর্থাৎ ব্যক্তি হিসেবে বাংলাদেশিরা এগোচ্ছেন। প্রশ্ন হলো- কমিউনিটি হিসেবে আমরা কি সেই একই গতিতে এগোচ্ছি? অন্যরা পারলে আমরা কেন পারব না?
নিউইয়র্কের বড় প্যারেডগুলোর ইতিহাস দেখলে একটি বিষয় স্পষ্ট-সফল প্যারেড একদিনে তৈরি হয় না।
ইন্ডিয়া ডে প্যারেড, ক্যারিবিয়দের ওয়েস্ট ইন্ডিয়ান ডে প্যারেড, গ্রিক, আইরিশ, কলম্বিয়ান, ইকুয়েডরিয়ান, নেপালি কিংবা অন্যান্য কমিউনিটির প্যারেড আজ যে অবস্থানে পৌঁছেছে, তার পেছনে রয়েছে বহু বছরের প্রতিষ্ঠান, কাঠামো, ধারাবাহিকতা এবং কমিউনিটির মালিকানাবোধ।
বাংলাদেশিদের ক্ষেত্রে সম্ভাবনা কম নয়, বরং অনেক বেশি। বাংলাদেশ ডে প্যারেডে থাকতে পারে ৬৪ জেলার প্রতিনিধিত্ব। থাকতে পারে বাংলাদেশের ছয় ঋতু। ভাষা আন্দোলন থেকে মুক্তিযুদ্ধ। জামদানি থেকে নকশিকাঁথা। বাউল থেকে রবীন্দ্র-নজরুল, লালন থেকে আধুনিক বাংলা সংগীত। পহেলা বৈশাখ, পাহাড়ের সংস্কৃতি, আদিবাসী জনগোষ্ঠীর ঐতিহ্য। রিকশা আর্ট থেকে নৌকা। বাংলাদেশি আমেরিকান পুলিশ, চিকিৎসক, শিক্ষার্থী, ব্যবসায়ী, শ্রমজীবী ও নতুন প্রজন্ম। একটি অসাধারণ প্যারেড তৈরি করার মতো গল্প আমাদের অঢেল। অভাব শুধু সবাইকে একই রাস্তায় হাঁটানোর।
সমাধান হতে পারে একটি স্বাধীন বাংলাদেশ প্যারেড কাউন্সিল। সম্ভবত এখন পুরোনো মডেল থেকে বের হওয়ার সময় এসেছে।
বাংলাদেশ ডে প্যারেড কোনো ব্যক্তি বা একক সংগঠন আয়োজন না করে একটি স্বাধীন, অলাভজনক বাংলাদেশ প্যারেড কাউন্সিল-এর অধীনে দেওয়া যেতে পারে। সেখানে বাংলাদেশ সোসাইটি থাকবে। পেশাজীবী সংগঠন থাকবে। আঞ্চলিক সংগঠন থাকবে। সাংস্কৃতিক সংগঠন থাকবে। ব্যবসায়ী প্রতিনিধিত্ব থাকবে। নারী ও তরুণ প্রজন্ম থাকবে। বাংলাদেশি আমেরিকান পুলিশসহ বিভিন্ন পেশার প্রতিনিধিত্ব থাকবে। কিন্তু কোনো এক ব্যক্তি বা সংগঠন থাকবে না সংখ্যাগরিষ্ঠ নিয়ন্ত্রণে। প্রতি বছর আয়-ব্যয়ের হিসাব প্রকাশ করা হবে। স্পনসরশিপ হবে স্বচ্ছ। গ্র্যান্ড মার্শাল কিংবা সম্মাননা অর্থ দিয়ে কেনাবেচা করা যাবে না। রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব আসবেন অতিথি হিসেবে, মালিক হিসেবে নয়। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ, নেতৃত্ব বদলাবে; প্রতিষ্ঠান থাকবে।
প্রথম দেখায় মনে হতে পারে এটি কয়েকজন কমিউনিটি নেতার ব্যক্তিগত দ্বন্দ্ব। আসলে তা নয়। এই বিভক্তির সবচেয়ে বড় মূল্য দিচ্ছে নতুন প্রজন্ম।
নিউইয়র্কে জন্ম নেওয়া একটি বাংলাদেশি শিশু যখন ইন্ডিয়া ডে প্যারেড, ক্যারিবিয়দের ওয়েস্ট ইন্ডিয়ান ডে প্যারেড, গ্রিক, আইরিশ, কলম্বিয়ান, ইকুয়েডরিয়ান, নেপালি কিংবা অন্যান্য কমিউনিটির প্যারেড বা অন্য কমিউনিটির বিশাল আয়োজন দেখে, সে তাদের সংগঠিত শক্তি দেখতে পায়। নিজের কমিউনিটিতে এসে যদি দেখে একই পতাকা নিয়ে দুই দল দুই দিনে হাঁটছে—তার কাছে আমরা কী বার্তা দিচ্ছি
বাংলাদেশের রাজনীতির বিভাজন থেকে হাজার মাইল দূরে এসে আমরা যদি একই সংস্কৃতি পুনর্র্নিমাণ করি, তাহলে অভিবাসনের সবচেয়ে বড় সুযোগটিই হয়তো আমরা হারাচ্ছি। কারণ আমেরিকা আমাদের শুধু অর্থনৈতিক সুযোগ দেয়নি। আমেরিকা আমাদের নতুন করে প্রতিষ্ঠান তৈরির সুযোগও দিয়েছে।
দুটি প্যারেড হয়ে গেছে। এখন কে কত মানুষ এনেছে, কার মঞ্চ বড় ছিল, কার পাশে কোন রাজনীতিক দাঁড়িয়েছেন—এই হিসাব দিয়ে আর লাভ নেই। বরং দুই পক্ষকেই একটি প্রশ্ন করা উচিত-  ২০২৭ সালে কি আবার দুটি প্যারেড হবে? যদি উত্তর ‘হ্যাঁ’ হয়, তাহলে সেটি কোনো পক্ষের বিজয় নয়। সেটি বাংলাদেশি কমিউনিটির পরাজয়।
এখন প্রয়োজন বাংলাদেশ সোসাইটি, বাংলাদেশ ডে প্যারেডের বর্তমান আয়োজক, পেশাজীবী সংগঠন, ব্যবসায়ী, সাংস্কৃতিক সংগঠন এবং নতুন প্রজন্মের প্রতিনিধিদের একই টেবিলে বসা। কারও আত্মসমর্পণ নয়। কারও একক কর্তৃত্বও নয়। প্রয়োজন একটি প্রতিষ্ঠান।
কারণ প্যারেডের প্রথম সারিতে কে হাঁটবেন, তার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো, তার পেছনে পুরো বাংলাদেশি কমিউনিটি হাঁটবে কি না। নিউইয়র্কের রাস্তায় বাংলাদেশের লাল-সবুজ পতাকা বছরে একদিন উড়বে—না দুইদিন, সেটি আসল প্রশ্ন নয়।
চার ফোবানা, দুই প্যারেড, বিভক্ত সংগঠন আর পাল্টাপাল্টি নেতৃত্বের সংস্কৃতি থেকে বের হতে না পারলে হয়তো একদিন ইতিহাস লিখবে, বাংলাদেশিরা নিউইয়র্কে সংখ্যায় বড় হয়েছিল, অর্থে শক্তিশালী হয়েছিল, রাজনীতিতেও দৃশ্যমান হয়েছিল; কিন্তু নিজেদের মধ্যে ছোট ছোট ভাগে বিভক্ত হয়ে নিজেদের পূর্ণ শক্তিটা কখনোই দেখাতে পারেনি।
সেই ইতিহাস এখনও লেখা হয়নি। এটি বদলানোর সময় এখনও আছে।

নিউজটি শেয়ার করুন


© 2026 All Rights Reserved by Thikana Group Of Media
Maintained by SolveEz