মঙ্গলবার, ১৩ অক্টোবর ২০২৬

মঙ্গলবার, ১৩ অক্টোবর ২০২৬

বিজ্ঞাপন

​প্রধানমন্ত্রীর নিউইয়র্ক সফর ঘিরে আ’লীগ-বিএনপি মুখোমুখি

গণসংবর্ধনায় কড়াকড়ি, আমন্ত্রিত অতিথিরাই অংশ নিতে পারবেন
​প্রধানমন্ত্রীর নিউইয়র্ক সফর ঘিরে আ’লীগ-বিএনপি মুখোমুখি

বিজ্ঞাপন
ক্ষমতার পালাবদল হয়েছে বাংলাদেশে, বদলে গেছে নিউইয়র্কের প্রবাসী রাজনীতির পক্ষগুলোর অবস্থানও। কিন্তু জাতিসংঘের সাধারণ অধিবেশন ঘিরে বাংলাদেশের শীর্ষ রাজনৈতিক নেতার নিউইয়র্ক সফরের আগে যে উত্তেজনা, পাল্টাপাল্টি কর্মসূচি আর সংঘাতের আশঙ্কা বহু বছর ধরে দেখা গেছে, এবারও যেন সেই পুরোনো দৃশ্যেরই পুনরাবৃত্তির শঙ্কা তৈরি হয়েছে।
পার্থক্য শুধু এক জায়গায়। আগে আওয়ামী লীগ ছিল ক্ষমতায়, বিএনপি ছিল বিরোধী শিবিরে। শেখ হাসিনার নিউইয়র্ক সফরের সময় আওয়ামী লীগ তাঁকে স্বাগত জানাত, আর বিমানবন্দর থেকে জাতিসংঘ সদর দপ্তর পর্যন্ত প্রতিবাদ করত বিএনপি। এখন রাজনৈতিক পট পরিবর্তন হয়েছে। বিএনপি ক্ষমতায়, দলের চেয়ারম্যান তারেক রহমান বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী। আর রাজনৈতিক কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা এবার সরকারবিরোধী ভূমিকায় নিউইয়র্কের রাজপথে নামার প্রস্তুতি নিচ্ছেন।
আগামী সেপ্টেম্বরে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনে যোগ দিতে নিউইয়র্ক সফরের কথা রয়েছে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের। সফরকালে প্রবাসী বাংলাদেশিদের একটি সংবর্ধনা অনুষ্ঠানেও তাঁর অংশ নেওয়ার প্রস্তুতি চলছে। এই সফর সামনে রেখে যুক্তরাষ্ট্র আওয়ামী লীগ ও বিএনপির স্থানীয় নেতাকর্মীদের মধ্যে পাল্টাপাল্টি কর্মসূচির প্রস্তুতি শুরু হয়েছে। রাজনৈতিক কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের স্থানীয় নেতাকর্মীরা ইতোমধ্যে একাধিক বিক্ষোভ ও অবস্থান কর্মসূচির জন্য অনুমতি নিয়েছেন বলে জানা গেছে। অন্যদিকে বিএনপিও বিমানবন্দর, প্রধানমন্ত্রীর সম্ভাব্য অবস্থানস্থল ও গণসংবর্ধনা ঘিরে বড় ধরনের কর্মসূচির প্রস্তুতি নিচ্ছে।
এরই মধ্যে নিউইয়র্কে অবস্থানরত আওয়ামী লীগ নেতা ও সাবেক সংসদ সদস্য শামীম ওসমান দলীয় নেতাকর্মীদের সঙ্গে ধারাবাহিক বৈঠক ও মতবিনিময় করছেন। কুইন্সে এমন একটি সভায় প্রধানমন্ত্রীর সফর ঘিরে আওয়ামী লীগের আসন্ন কর্মসূচি সম্পর্কে কথা বলতে গিয়ে তিনি একে ‘খেলা নয়, সরাসরি যুদ্ধ’ হিসেবে বর্ণনা করেন। ঠিকানা টেলিভিশনের প্রতিবেদনে তাঁর এ বক্তব্য উঠে এসেছে। রাজনৈতিক উত্তেজনার বর্তমান পরিবেশে এমন বক্তব্য নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছে। বিএনপির কয়েকজন নেতা বক্তব্যটিকে উসকানিমূলক হিসেবে অভিহিত করেছেন।
বিএনপি নেতাদের অভিযোগ, আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা সব কর্মসূচির অনুমতি সরাসরি দলীয় নামে নিচ্ছেন না; মানবাধিকার, সংখ্যালঘু অধিকারসহ বিভিন্ন সংগঠন ও ব্যানারের নামেও কর্মসূচি আয়োজনের প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে।
সাংবাদিক ইলিয়াস হোসেনের ইউটিউব চ্যানেলে প্রচারিত এক টকশোতে নিউইয়র্ক বিএনপির নেতা শেখ জামানের দাবি, প্রধানমন্ত্রীর সফর ঘিরে আওয়ামী লীগ-সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা অন্তত ১১টি কর্মসূচির অনুমতি নিয়েছেন। সম্ভাব্য হোটেলগুলোর সামনে অবস্থান কর্মসূচিও এর মধ্যে রয়েছে বলে তাঁর দাবি।
বিএনপির নেতাদের ধারণা, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সম্ভাব্য অবস্থানস্থল হিসেবে ম্যানহাটনের গ্র্যান্ড হায়াতসহ কয়েকটি হোটেলকে সামনে রেখে কর্মসূচির প্রস্তুতি নিচ্ছেন আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা।
শেখ জামানের আরো দাবি, প্রবাসীদের সংবর্ধনা অনুষ্ঠানকে কেন্দ্র করেও আওয়ামী লীগপন্থীরা বিক্ষোভ এবং এর আগের দিন অনুষ্ঠানস্থলের আশপাশে জনসংযোগের অনুমতি নিয়েছেন। এসব দাবি অবশ্য আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে স্বাধীনভাবে নিশ্চিত করা সম্ভব হয়নি।
একই টকশোতে বিএনপির কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য ও যুক্তরাষ্ট্র বিএনপির সাবেক সিনিয়র সহ-সভাপতি গিয়াস আহমেদ জানিয়েছেন, তারেক রহমানের সফরকে ঘিরে দলীয়ভাবে ব্যাপক প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে। বিমানবন্দরে প্রধানমন্ত্রীকে স্বাগত জানানো, তাঁর সম্ভাব্য হোটেলের আশপাশে নেতাকর্মীদের উপস্থিতি এবং প্রবাসীদের সংবর্ধনা অনুষ্ঠান—সব মিলিয়ে সফরের সময়জুড়ে কর্মসূচি পালনের প্রস্তুতি রয়েছে বিএনপির। 
তবে নিজেদের প্রস্তুতির মধ্যেও সমন্বয়ের ঘাটতি নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন নিউইয়র্ক বিএনপির নেতা শেখ জামান ও মতিউর রহমান লিটু। টকশোতে তারা উল্লেখ করেন, দীর্ঘদিন যুক্তরাষ্ট্র বিএনপির পূর্ণাঙ্গ সাংগঠনিক কাঠামো না থাকায় বিভিন্ন গ্রুপ ও নেতার কর্মসূচির মধ্যে সমন্বয় নিশ্চিত করা বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াতে পারে। আর দুই পক্ষ যদি একই সময় কাছাকাছি স্থানে কর্মসূচি দেয়, সেই সমন্বয়হীনতাই সংঘর্ষের ঝুঁকি আরও বাড়িয়ে দিতে পারে।
নিউইয়র্কে বাংলাদেশের রাজনৈতিক বিভাজন রাজপথে সংঘাতে রূপ নেওয়া নতুন নয়। বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী বা সরকারপ্রধানের জাতিসংঘ সফর এলেই বছরের পর বছর ম্যানহাটনের জাতিসংঘ সদর দপ্তর, জেএফকে বিমানবন্দর এবং বাংলাদেশি-অধ্যুষিত জ্যাকসন হাইটস পরিণত হয়েছে পাল্টাপাল্টি রাজনৈতিক কর্মসূচির কেন্দ্রে।
বিভিন্ন সময়ে এসব কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে হাতাহাতি, ধাওয়া-পাল্টাধাওয়া, আহত, পুলিশি হস্তক্ষেপ, মামলা ও গ্রেপ্তারের ঘটনা ঘটেছে। রাজনৈতিক মতবিরোধ অনেক সময় এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে নিউইয়র্ক পুলিশের হস্তক্ষেপ ছাড়া পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হয়নি।
২০২১ সালে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নিউইয়র্ক সফর ঘিরে জ্যাকসন হাইটসে আওয়ামী লীগ ও বিএনপির কর্মীরা সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়েন। এতে একাধিক ব্যক্তি আহত হন। পরে ওই ঘটনাকে কেন্দ্র করে মামলা হয় এবং পুলিশি তৎপরতাও দেখা যায়।
পরবর্তী সময়েও জ্যাকসন হাইটসের ডাইভার্সিটি প্লাজা ও আশপাশের এলাকায় রাজনৈতিক কর্মসূচি ঘিরে হাতাহাতি ও উত্তেজনার ঘটনা ঘটেছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতেও পরিস্থিতির খুব বেশি পরিবর্তন হয়নি।
জাতিসংঘ অধিবেশন কিংবা বাংলাদেশের রাজনৈতিক নেতাদের নিউইয়র্ক সফর ঘিরে কখনো বিমানবন্দর, কখনো জ্যাকসন হাইটস, আবার কখনো জাতিসংঘ সদর দপ্তরের সামনে দুই পক্ষ মুখোমুখি হয়েছে। কিছু ঘটনায় কর্মীরা আহত হয়েছেন, আবার কিছু ঘটনায় নিউইয়র্ক পুলিশ সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের আটক বা গ্রেপ্তার করেছে। ফলে রাজনৈতিক বিরোধ শুধু স্লোগান আর প্রতিবাদে সীমাবদ্ধ থাকেনি; তা কখনো কখনো মামলা, আদালত ও গ্রেপ্তার পর্যন্ত গড়িয়েছে।
প্রবাসের রাজনীতি নিয়ে সবচেয়ে বড় প্রশ্নটি অবশ্য আওয়ামী লীগ বা বিএনপির জয়-পরাজয় নয়। প্রশ্ন হচ্ছে- এর মূল্য দিচ্ছে কে?
নিউইয়র্কে বাংলাদেশি কমিউনিটি এখন ব্যবসা, পেশা, শিক্ষা, গণমাধ্যম এবং মূলধারার রাজনীতিতে আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি দৃশ্যমান। জ্যাকসন হাইটসের একটি সড়ক ‘বাংলাদেশ স্ট্রিট’ হিসেবে পরিচিতি পেয়েছে; নিউইয়র্কের নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি থেকে সিটি ও স্টেট প্রশাসন পর্যন্ত বাংলাদেশিদের উপস্থিতি ও প্রভাব বেড়েছে।
এ অবস্থায় বাংলাদেশের রাজনৈতিক বিরোধ যখন নিউইয়র্কের রাস্তায় গালাগাল, ডিম নিক্ষেপ, ধাক্কাধাক্কি, মারামারি কিংবা পুলিশের হস্তক্ষেপে গড়ায়, তখন তার পরিচয় কেবল ‘আওয়ামী লীগ-বিএনপি সংঘর্ষ’ হিসেবে থাকে না। বাইরের মানুষের চোখে সেটি হয়ে ওঠে বাংলাদেশি কমিউনিটির ঘটনা।
অতীতে সংঘর্ষের সময় আশপাশের ব্যবসায়ী, পথচারী ও সাধারণ মানুষকে অস্বস্তিকর পরিস্থিতিতে পড়তে হয়েছে। কয়েকজন রাজনৈতিক কর্মীর আচরণের দায় এভাবেই অনেক সময় বহন করতে হয় গোটা কমিউনিটিকে।
এবারের পরিস্থিতিতে সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় হলো রাজনৈতিক ভূমিকাবদল।নদীর্ঘ সময় আওয়ামী লীগ সরকারে থাকাকালে শেখ হাসিনার জাতিসংঘ সফরে নিউইয়র্কে তাঁকে স্বাগত জানাতে আওয়ামী লীগ বড় জমায়েত করত। বিপরীতে বিএনপি কালো পতাকা, বিক্ষোভ ও প্রতিবাদ কর্মসূচি পালন করত।নকখনো একই ফুটপাতের দুই পাশে, কখনো পুলিশ ব্যারিকেডের দুই দিকে দাঁড়িয়ে দুই পক্ষ পরস্পরের বিরুদ্ধে স্লোগান দিয়েছে।
এবার দৃশ্যপট উল্টো। বিএনপি ক্ষমতায় এবং তারেক রহমান প্রধানমন্ত্রী। আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক কার্যক্রম নিষিদ্ধ। ফলে এবার বাংলাদেশের ক্ষমতাসীন দলের নেতাকে স্বাগত জানাতে রাজপথে থাকবে বিএনপি, আর প্রতিবাদে থাকবে আওয়ামী লীগ।
পক্ষ বদলেছে, স্লোগান বদলেছে, কিন্তু সংঘাতের রাজনীতি যদি না বদলায়, তাহলে নিউইয়র্কের বাংলাদেশি কমিউনিটির জন্য ফলাফলও খুব বেশি বদলাবে না। এবারের সফরে নিরাপত্তার বিষয়টিকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে। 
এদিকে, প্রধানমন্ত্রীর সম্ভাব্য গণসংবর্ধনা অনুষ্ঠানে অতীতের মতো অবাধ প্রবেশাধিকার রাখা হচ্ছে না। আমন্ত্রিত অতিথি ও পূর্বনির্ধারিত তালিকাভুক্ত ব্যক্তিদেরই অনুষ্ঠানস্থলে প্রবেশের সুযোগ দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। আয়োজকদের একটি অংশ মনে করছেন, অনুষ্ঠানস্থলে পরিচয় গোপন করে বিরোধী রাজনৈতিক শক্তির অনেকে ঢুকে যেতে পারেন। যে কোনো অনাকাক্সিক্ষত ঘটনা এড়াতে এই সিদ্ধান্ত রনওয়া হয়েছে। 
বিমানবন্দর, হোটেল ও অনুষ্ঠানস্থলের বাইরেও স্থানীয় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থার সঙ্গে সমন্বয়ের বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
যুক্তরাষ্ট্রে শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদ, সরকারবিরোধী বক্তব্য কিংবা রাজনৈতিক সমাবেশ নাগরিক অধিকারের অংশ। আওয়ামী লীগ হোক বা বিএনপি, নিজ নিজ মত প্রকাশ এবং শান্তিপূর্ণ কর্মসূচি পালনের অধিকার সবারই রয়েছে। কিন্তু সেই অধিকার শারীরিক আক্রমণ, হুমকি বা সহিংসতার অনুমতি দেয় না।
নিউইয়র্কে রাজনৈতিক পরিচয়ের চেয়ে আইনের পরিচয় বড়। এখানে প্রতিপক্ষকে ধাক্কা দেওয়া, মারধর করা কিংবা হুমকি দেওয়ার পরিণতি বাংলাদেশের রাজনৈতিক সমীকরণ অনুযায়ী নির্ধারিত হয় না—নির্ধারিত হয় নিউইয়র্কের আইনে। অতীতের আহত, মামলা ও গ্রেপ্তারের ঘটনাগুলো সেই বাস্তবতার কথাই মনে করিয়ে দেয়।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সফরের সময় যত ঘনিয়ে আসছে, দুই পক্ষের প্রস্তুতি ও বক্তব্যে উত্তাপও তত বাড়ছে। এখন দেখার বিষয়, পাল্টাপাল্টি কর্মসূচি শান্তিপূর্ণ রাজনৈতিক মতপ্রকাশের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে, নাকি নিউইয়র্কের বাংলাদেশি কমিউনিটিকে আবারও পুরোনো সংঘাতের দৃশ্য দেখতে হয়।
এক সময় ক্ষমতায় থাকা আওয়ামী লীগকে স্বাগত জানাত তাদের কর্মীরা, প্রতিবাদ করত বিএনপি। এবার বিএনপির প্রধানমন্ত্রীকে স্বাগত জানাবে বিএনপি, প্রতিবাদ করবে আওয়ামী লীগ।
ইতিহাস যেন একই মঞ্চে শুধু পক্ষগুলোর অবস্থান বদলে আবার ফিরে এসেছে। নিউইয়র্কের বাংলাদেশি কমিউনিটির প্রত্যাশা—এবার অন্তত শেষ দৃশ্যটি যেন ভিন্ন হয়।

নিউজটি শেয়ার করুন


© 2026 All Rights Reserved by Thikana Group Of Media
Maintained by SolveEz