প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সম্ভাব্য ভারত সফর ঘিরে ঢাকা ও নয়াদিল্লির কূটনৈতিক যোগাযোগ অব্যাহত থাকলেও আগস্টে এ সফরের সম্ভাবনা অনেকটাই ক্ষীণ হয়ে পড়েছে। দুই দেশের মধ্যে যোগাযোগ চলমান থাকলেও সফরের আনুষ্ঠানিক তারিখ এখনো চূড়ান্ত হয়নি। কূটনৈতিক মহলের ধারণা, রাজনৈতিক পরিস্থিতি অনুকূলে থাকলে সেপ্টেম্বরেই সফরটি অনুষ্ঠিত হতে পারে।
ভারত সরকার প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে দ্বিপক্ষীয় সফরের পাশাপাশি আগামী সেপ্টেম্বরে অনুষ্ঠিতব্য ব্রিকস সম্মেলনের আউটরিচ সেশনে অংশ নেওয়ার আমন্ত্রণ জানিয়েছে। তবে ঢাকা স্পষ্ট করে জানিয়েছে, প্রধানমন্ত্রীর প্রথম ভারত সফরকে শুধু সৌজন্য সাক্ষাৎ বা কোনো আন্তর্জাতিক সম্মেলনের পার্শ্বসূচি হিসেবে দেখতে চায় না। বরং দুই দেশের সম্পর্কের ভবিষ্যৎ দিকনির্দেশনা নির্ধারণে এটি একটি পূর্ণাঙ্গ দ্বিপক্ষীয় সফর হওয়াই বাংলাদেশের অগ্রাধিকার।
কূটনৈতিক সূত্র জানায়, গত কয়েক সপ্তাহ ধরে সফর নিয়ে দুই দেশের মধ্যে নিবিড় যোগাযোগ চললেও ৫ আগস্ট নয়াদিল্লিতে অবস্থানরত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার প্রকাশ্য বক্তব্যের পর পরিস্থিতি কিছুটা জটিল হয়ে ওঠে। এরপর আগস্টের তৃতীয় সপ্তাহে সফরের সম্ভাবনা নিয়ে বিভিন্ন মহলে আলোচনা হলেও কোনো দেশই আনুষ্ঠানিকভাবে তারিখ ঘোষণা করেনি।
২১ আগস্ট ভারতের রাষ্ট্রপতি ভবনের একটি বিজ্ঞপ্তি নতুন করে জল্পনা তৈরি করে। সেখানে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর সম্ভাব্য রাষ্ট্রীয় অভ্যর্থনার মহড়ার কারণে ‘চেঞ্জ অব গার্ড’ অনুষ্ঠান স্থগিতের কথা উল্লেখ করা হয়। তবে এক ঘণ্টার মধ্যেই বিজ্ঞপ্তিটি প্রত্যাহার করা হয়। এতে ধারণা করা হয়, সফরকে ঘিরে প্রস্তুতি থাকলেও সময়সূচি ও রাজনৈতিক সমন্বয় তখনো চূড়ান্ত হয়নি।
বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকেও জানানো হয়েছে, সফর নিয়ে এখনো কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি। ফলে আগস্টের পরিবর্তে সেপ্টেম্বরের প্রথম সপ্তাহে সফরের সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা জোরদার হয়েছে। যদিও সম্ভাব্য বিভিন্ন তারিখ কূটনৈতিক মহলে ঘুরে বেড়াচ্ছে, তবু এ বিষয়ে আনুষ্ঠানিক ঘোষণা এখনো আসেনি।
সফরের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে উঠেছে শেখ হাসিনা ইস্যু। রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর থেকে তিনি ভারতে অবস্থান করছেন। বাংলাদেশ সরকার তার প্রত্যর্পণের জন্য আনুষ্ঠানিক অনুরোধ জানিয়েছে। পাশাপাশি অন্যান্য পলাতক আসামি ও কয়েকটি মামলার অভিযুক্তদের ফিরিয়ে দেওয়ার বিষয়েও ভারতের সহযোগিতা চেয়েছে।
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মতে, প্রধানমন্ত্রীর প্রথম ভারত সফরের আগে দুই দেশের মধ্যে একটি ইতিবাচক ও আস্থাপূর্ণ পরিবেশ তৈরি হওয়া জরুরি। বাংলাদেশের প্রত্যাশা, প্রত্যর্পণ-সংক্রান্ত বিষয়ে দৃশ্যমান অগ্রগতি হলে তা দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের জন্য ইতিবাচক বার্তা বহন করবে। অন্যদিকে ভারতের অবস্থান হলো, বিষয়টি বিদ্যমান আইন ও দ্বিপক্ষীয় চুক্তির আলোকে প্রাতিষ্ঠানিক প্রক্রিয়ায় বিবেচনা করা হচ্ছে। ফলে রাজনৈতিক প্রত্যাশা ও আইনি প্রক্রিয়ার মধ্যে একটি ব্যবধান এখনো রয়ে গেছে।
বিশ্লেষকদের মতে, রাষ্ট্রপতি ভবনের বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ ও পরে প্রত্যাহারের ঘটনাকে কূটনৈতিক ব্যর্থতা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। বরং এটি ইঙ্গিত দেয়, সফর নিয়ে প্রস্তুতি থাকলেও রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত ও আনুষ্ঠানিক সমঝোতা তখনো সম্পূর্ণ হয়নি।
সেপ্টেম্বরে সম্ভাব্য সফরের সঙ্গে ব্রিকস সম্মেলনের বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। আগামী ১২ ও ১৩ সেপ্টেম্বর নয়াদিল্লিতে অনুষ্ঠিতব্য ব্রিকস সম্মেলনের আউটরিচ সেশনে বাংলাদেশকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে। ফলে একই সফরে দ্বিপক্ষীয় বৈঠক এবং বহুপাক্ষিক কূটনৈতিক কর্মসূচিতে অংশ নেওয়ার সুযোগ তৈরি হতে পারে। তবে বাংলাদেশ চাইছে, ব্রিকসকে কেন্দ্র করে নয়, বরং নিজস্ব গুরুত্বে একটি পূর্ণাঙ্গ দ্বিপক্ষীয় সফর হোক।
সম্ভাব্য বৈঠকে বাণিজ্য, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সহযোগিতা, সীমান্ত ব্যবস্থাপনা, যোগাযোগ, ট্রানজিট, নিরাপত্তা, আঞ্চলিক সহযোগিতা এবং তিস্তা নদীর পানি বণ্টনসহ দীর্ঘদিনের অমীমাংসিত বিষয়গুলো গুরুত্ব পেতে পারে। একই সঙ্গে সীমান্ত হত্যা, মাদক ও মানবপাচার প্রতিরোধ এবং অর্থনৈতিক সহযোগিতা বাড়ানোর বিষয়েও আলোচনা হতে পারে।
পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবির বলেছেন, সফর নিয়ে সরকারের কোনো তাড়াহুড়া নেই। জাতীয় স্বার্থকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে উপযুক্ত সময়ে প্রধানমন্ত্রী ভারত সফর করবেন। তিনি জোর দিয়ে বলেন, প্রতিবেশী দেশ হিসেবে ভারতের সঙ্গে ইতিবাচক সম্পর্ক বজায় রাখতে বাংলাদেশ আগ্রহী, তবে জাতীয় স্বার্থের প্রশ্নে কোনো আপস করা হবে না।
আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষক ড. ইমতিয়াজ আহমেদের মতে, ব্রিকস সম্মেলন এবং দ্বিপক্ষীয় ভারত সফরকে পৃথকভাবে মূল্যায়ন করা উচিত। তার ভাষ্য, ব্রিকস একটি গুরুত্বপূর্ণ বহুপাক্ষিক প্ল্যাটফর্ম, যেখানে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের নেতাদের সঙ্গে একযোগে যোগাযোগের সুযোগ রয়েছে। তবে একই সঙ্গে বাংলাদেশের উচিত জাতীয় স্বার্থকে অগ্রাধিকার দিয়ে ভারত সফরের লক্ষ্য ও কৌশল নির্ধারণ করা।