৯/১১-এর ২৫ বছর পরও স্বাস্থ্যঝুঁকিতে এফডিএনওয়াই সদস্যরা
নতুন প্রতিবেদনে দীর্ঘমেয়াদি অসুস্থতার ভয়াবহ চিত্র, ১০ হাজার ৫৬২ সদস্যের শারীরিক অসুস্থতা স্বীকৃত; ক্যানসারে আক্রান্ত ৪ হাজার ২৫৭
নাশরাত আর্শিয়ানা চৌধুরী
প্রকাশ : ০২ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১১:২৮
•
অনলাইন সংস্করণ
২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বরের সন্ত্রাসী হামলার ২৫ বছর পেরিয়ে গেলেও সেই দিনের ধ্বংসযজ্ঞের স্বাস্থ্যগত অভিঘাত কাটিয়ে উঠতে পারেননি নিউইয়র্ক সিটি ফায়ার ডিপার্টমেন্টের (এফডিএনওয়াই) হাজারো সদস্য। ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টারে উদ্ধার, অনুসন্ধান ও পুনরুদ্ধার কাজে অংশ নেওয়া দমকলকর্মী, জরুরি চিকিৎসাকর্মী, কর্মকর্তা, বেসামরিক কর্মী এবং অবসরপ্রাপ্ত সদস্যদের একটি বড় অংশ এখনো নানা শারীরিক ও মানসিক অসুস্থতার চিকিৎসা নিচ্ছেন।
৯/১১-এর ২৫ বছর পূর্তি সামনে রেখে প্রকাশিত নতুন এক স্বাস্থ্য প্রতিবেদনে উঠে এসেছে এই দীর্ঘস্থায়ী বিপর্যয়ের বিস্তৃত চিত্র। নিউইয়র্ক সিটির মেয়র জোহরান কওয়ামে মামদানি এবং এফডিএনওয়াই কমিশনার লিলিয়ান বনসিনিয়র ১ সেপ্টেম্বর ‘ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টার ২৫ ইয়ার হেলথ ইমপ্যাক্ট রিপোর্ট’ প্রকাশ করেন। এফডিএনওয়াই ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টার হেলথ প্রোগ্রামের ২৫ বছরের চিকিৎসা পর্যবেক্ষণ, স্বাস্থ্যসেবা এবং গবেষণার তথ্য বিশ্লেষণ করে প্রতিবেদনটি তৈরি করা হয়েছে।
প্রতিবেদনটির সবচেয়ে উদ্বেগজনক তথ্য হলো, ১০ হাজার ৫৬২ জন এফডিএনওয়াই সদস্যের অন্তত একটি ৯/১১-সম্পর্কিত শারীরিক অসুস্থতার আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি রয়েছে। এসব রোগের মধ্যে রয়েছে নিম্ন শ্বাসনালির বিভিন্ন রোগ, ওপরের শ্বাসনালির রোগ এবং গ্যাস্ট্রোইসোফেজিয়াল রিফ্লাক্স ডিজিজ বা জিইআরডি। অর্থাৎ হামলার দিন ও পরবর্তী উদ্ধার অভিযানে ধুলো, ধোঁয়া, ধ্বংসাবশেষ এবং বিভিন্ন রাসায়নিক ও দূষিত উপাদানের সংস্পর্শে আসার প্রভাব বহু বছর পরও তাদের শরীরে রয়ে গেছে।
ক্যানসারের চিত্রটিও বিশেষভাবে উদ্বেগজনক। বর্তমানে ৪ হাজার ২৫৭ জন এফডিএনওয়াই সদস্যের ক্যানসার-সংক্রান্ত স্বাস্থ্য সনদ রয়েছে। তাদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি দেখা গেছে নন-মেলানোমা স্কিন ক্যানসার। এরপর রয়েছে প্রোস্টেট ক্যানসার। চিকিৎসা ও গবেষণার দীর্ঘমেয়াদি তথ্য বিশ্লেষণ করে স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা ৯/১১-এর ধ্বংসাবশেষ ও দূষিত পরিবেশের দীর্ঘস্থায়ী সংস্পর্শ এবং পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন রোগের সঙ্গে সম্পর্ক বোঝার চেষ্টা করে আসছেন।
প্রতিবেদনের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো ক্যানসারে আক্রান্ত উদ্ধারকর্মীদের বেঁচে থাকার তুলনামূলক চিত্র। ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টারের উদ্ধার ও পুনরুদ্ধার কাজে অংশ নেওয়া এবং পরবর্তীতে ক্যানসারে আক্রান্ত ব্যক্তিদের পাঁচ বছর পর বেঁচে থাকার হার ৮৬ শতাংশ। একই ধরনের ক্যানসারে আক্রান্ত হলেও ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টারের ধুলো, ধ্বংসাবশেষ ও অন্যান্য দূষিত উপাদানের সংস্পর্শে না আসা নিউইয়র্ক স্টেটের বাসিন্দাদের ক্ষেত্রে পাঁচ বছর পর বেঁচে থাকার হার ছিল ৬৩ শতাংশ। এই পার্থক্য চিকিৎসা পর্যবেক্ষণ, রোগ শনাক্তকরণ ও স্বাস্থ্যসেবার সময়োপযোগিতার গুরুত্বও সামনে নিয়ে আসে।
তবে ৯/১১-এর ক্ষত শুধু শরীরে সীমাবদ্ধ নেই। দীর্ঘস্থায়ী মানসিক আঘাতও বহন করছেন হাজারো সদস্য। প্রতিবেদনে দেখা গেছে, ৪ হাজার ৪৯৬ জন এফডিএনওয়াই সদস্যের অন্তত একটি মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যার আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি রয়েছে। হামলার পরপরই পোস্ট-ট্রমাটিক স্ট্রেস ডিসঅর্ডার বা পিটিএসডি এবং বিষণ্নতার উপসর্গ তুলনামূলকভাবে বেশি দেখা গেলেও সময়ের সঙ্গে এসব উপসর্গের রিপোর্ট করা হার কিছুটা কমেছে। কিন্তু এর অর্থ এই নয় যে মানসিক স্বাস্থ্যের ঝুঁকি শেষ হয়ে গেছে। বরং বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে শারীরিক অসুস্থতা, সহকর্মীদের মৃত্যু এবং দীর্ঘদিনের ট্রমা অনেকের মানসিক অবস্থাকে নতুন করে প্রভাবিত করতে পারে।
এ কারণেই ৯/১১-সম্পর্কিত স্বাস্থ্যসেবাকে স্বল্পমেয়াদি কর্মসূচি হিসেবে না দেখে আজীবন চিকিৎসা সহায়তার কাঠামো হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। এফডিএনওয়াই ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টার হেলথ প্রোগ্রাম গত ২৫ বছর ধরে আক্রান্ত সদস্যদের স্বাস্থ্য পরীক্ষা, রোগ শনাক্তকরণ, চিকিৎসা এবং গবেষণা পরিচালনা করছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ৯/১১-সম্পর্কিত স্বাস্থ্যঝুঁকির ক্ষেত্রে যত দ্রুত সম্ভব স্বাস্থ্য পর্যবেক্ষণ শুরু করা এবং দীর্ঘমেয়াদে তা অব্যাহত রাখা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
এই কর্মসূচির একটি উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য হলো, শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্যকে আলাদা করে দেখার পরিবর্তে সমন্বিত চিকিৎসার ওপর গুরুত্ব দেওয়া। ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টারের ধ্বংসস্তূপে কাজ করা সদস্যদের অনেকেই একই সঙ্গে শ্বাসযন্ত্রের সমস্যা, ক্যানসার, হজমসংক্রান্ত রোগ এবং মানসিক চাপের সঙ্গে লড়ছেন। ফলে তাদের চিকিৎসায় দীর্ঘমেয়াদি শারীরিক পর্যবেক্ষণের পাশাপাশি মানসিক স্বাস্থ্যসেবাও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
৯/১১-পরবর্তী স্বাস্থ্য গবেষণা শুধু নিউইয়র্কের উদ্ধারকর্মীদের চিকিৎসাতেই সীমাবদ্ধ থাকেনি; এটি যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল স্বাস্থ্যনীতি ও ক্ষতিপূরণ ব্যবস্থাকেও প্রভাবিত করেছে। এফডিএনওয়াই ও অন্যান্য উদ্ধারকর্মীদের ওপর পরিচালিত গবেষণার তথ্যের ভিত্তিতে কংগ্রেস ২০১০ সালে জেমস জাড্রোগা ৯/১১ হেলথ অ্যান্ড কমপেনসেশন অ্যাক্ট অনুমোদন করে। পরবর্তী সময়ে কর্মসূচিটি পুনরায় অনুমোদন করা হয়। ২০২৬ সালেও কর্মসূচির পূর্ণ অর্থায়ন নিশ্চিত করা হয়েছে, যাতে ৯/১১-এর উদ্ধারকর্মী ও বেঁচে থাকা ব্যক্তিরা প্রয়োজন অনুযায়ী জীবনের শেষ সময় পর্যন্ত স্বাস্থ্যসেবা পেতে পারেন।
মেয়র মামদানি প্রতিবেদন প্রকাশের সময় বলেন, ২৫ বছর আগে নিউইয়র্কের সবচেয়ে অন্ধকার দিনে এফডিএনওয়াই সদস্যরা বিপদের দিকে এগিয়ে গিয়েছিলেন। ধ্বংসস্তূপের কেন্দ্রে দিনের পর দিন কাজ করে তারা শুধু মানুষের জীবন উদ্ধারে ভূমিকা রাখেননি, পুরো নগরীকে ঘুরে দাঁড়াতেও সহায়তা করেছেন।
মামদানি বলেন, বর্তমানে ১০ হাজারের বেশি এফডিএনওয়াই সদস্য ৯/১১-সম্পর্কিত অসুস্থতা নিয়ে জীবনযাপন করছেন। আগুন নেভানো বা ধ্বংসস্তূপ সরানোর কাজ শেষ হওয়ার সঙ্গে তাদের প্রতি নিউইয়র্কের দায়িত্ব শেষ হয়ে যায়নি। যারা মানুষের জীবন বাঁচাতে নিজেদের জীবন ঝুঁকিতে ফেলেছিলেন, তাদের চিকিৎসা ও প্রয়োজনীয় সহায়তা নিশ্চিত করা নগরীর দায়িত্ব।
এফডিএনওয়াই কমিশনার লিলিয়ান বনসিনিয়রও ‘নেভার ফরগেট’ কথাটিকে শুধু স্মরণসভা বা আনুষ্ঠানিক স্লোগান হিসেবে দেখছেন না। তার মতে, ২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বর এবং তার পরবর্তী দিন ও সপ্তাহগুলোতে লোয়ার ম্যানহাটনে থাকা মানুষের স্মৃতিতে ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টারের ধুলো ও ধ্বংসাবশেষ এখনো স্পষ্ট। এফডিএনওয়াই যখন বলে ‘নেভার ফরগেট’, তখন তারা সেই কথাটি বাস্তব অর্থেই বলে—বিশেষ করে সেইসব সদস্যের ক্ষেত্রে, যারা ২৫ বছর পরও ৯/১১-সম্পর্কিত অসুস্থতায় ভুগছেন।
তিনি বলেন, হামলার পরপরই এফডিএনওয়াইয়ের ব্যুরো অব হেলথ সার্ভিসেস এবং ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টার হেলথ প্রোগ্রাম আক্রান্ত সদস্যদের স্বাস্থ্য সুরক্ষায় কাজ শুরু করে। ২৫ বছর পরও সেই দিনের স্বাস্থ্যগত প্রভাব অনুভূত হচ্ছে। দীর্ঘমেয়াদি গবেষণা শুধু বর্তমান রোগীদের চিকিৎসায় সহায়তা করছে না, ভবিষ্যতে একই ধরনের বিপর্যয়ে আক্রান্ত মানুষের জীবন রক্ষার ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা দিচ্ছে।
প্রতিবেদনে আরও উঠে এসেছে কর্মসূচির সঙ্গে উদ্ধারকর্মীদের দীর্ঘস্থায়ী সম্পৃক্ততার চিত্র। ৯/১১-সম্পর্কিত স্বাস্থ্য কর্মসূচিতে নিবন্ধিত উদ্ধারকর্মীদের ৮৪ শতাংশের বেশি এখনো এফডিএনওয়াই ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টার হেলথ প্রোগ্রামের সঙ্গে যুক্ত রয়েছেন। অর্থাৎ এক-চতুর্থাংশ শতাব্দী পেরিয়ে গেলেও তাদের স্বাস্থ্যসেবার প্রয়োজন শেষ হয়নি।
এই পরিসংখ্যান ৯/১১-এর মানবিক উত্তরাধিকারের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক সামনে নিয়ে আসে। হামলায় নিহত মানুষের সংখ্যা যেমন ইতিহাসের একটি স্থায়ী অধ্যায়, তেমনি যারা বেঁচে গিয়ে অন্যদের জীবন রক্ষা করেছিলেন, তাদের অনেকের শরীর ও মনেও সেই দিনের ক্ষত স্থায়ী হয়ে আছে। ধ্বংসস্তূপের ধুলো হয়তো বহু আগেই পরিষ্কার হয়ে গেছে, কিন্তু সেই ধুলোর সংস্পর্শে আসা অনেক মানুষের জন্য স্বাস্থ্যঝুঁকি এখনো শেষ হয়নি।
নিউইয়র্কে ৯/১১-এর ২৫ বছর পূর্তি তাই শুধু স্মরণ, শ্রদ্ধা ও শোক প্রকাশের সময় নয়; এটি সেই দিনের উদ্ধারকর্মীদের প্রতি দীর্ঘমেয়াদি দায়িত্বের কথাও নতুন করে স্মরণ করিয়ে দিচ্ছে। নতুন স্বাস্থ্য প্রতিবেদন দেখাচ্ছে, ‘নেভার ফরগেট’ কথাটির বাস্তব অর্থ শুধু নিহতদের স্মরণ করা নয়। যারা সেদিন বিপদের দিকে ছুটে গিয়েছিলেন এবং পরে দীর্ঘদিনের অসুস্থতা নিয়ে বেঁচে আছেন, তাদের চিকিৎসা, সম্মান, আর্থিক নিরাপত্তা ও ভবিষ্যৎ স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করাও সেই অঙ্গীকারের অবিচ্ছেদ্য অংশ।
৯/১১-এর ২৫ বছর পর সবচেয়ে বড় শিক্ষা সম্ভবত এটাই—একটি সন্ত্রাসী হামলার তাৎক্ষণিক ধ্বংস কয়েক ঘণ্টা বা কয়েক দিনে দৃশ্যমান হয়, কিন্তু তার স্বাস্থ্যগত অভিঘাত একটি প্রজন্মের জীবনকে কয়েক দশক ধরে প্রভাবিত করতে পারে। এফডিএনওয়াইয়ের ২৫ বছরের স্বাস্থ্যতথ্য সেই দীর্ঘস্থায়ী বাস্তবতারই প্রমাণ। এখন সামনে মূল প্রশ্ন, আগামী প্রজন্মের কাছে ৯/১১-এর স্মৃতি কীভাবে পৌঁছাবে তার পাশাপাশি সেই দিনের জীবিত নায়ক ও আক্রান্তদের জন্য আমেরিকা কতদিন এবং কতটা দায়িত্ব বহন করবে।