সম্পত্তি হস্তান্তর আইন সংশোধনে বিতর্ক নিরসনে সরকারের করণীয়
মাহমুদ রহমান
প্রকাশ : ০৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১৮:৫১
•
অনলাইন সংস্করণ
ইসলামে সম্পত্তি হস্তান্তরের কয়েকটি পদ্ধতি রয়েছে। যার মধ্যে অন্যতম হচ্ছে ওয়ারিশ বা উত্তাধিকার, হেবা বা দান এবং ওসিয়ত বা উইল।
জাতীয় সংসদে সম্পত্তি হস্তান্তর আইনটি সংশোধন করা হয়েছে। এই আইনের হেবা বা দান সম্পর্কিত বিধান নিয়ে বিতর্ক দেখা দিয়েছে। হেবার ক্ষেত্রে যে পরিবর্তন আনা হয়েছে তা ইসলামিক স্কলারদের মতে ইসলামের নীতির পরিপন্থী।
সরকার বলছে, এই আইন সংশোধনের উদ্দেশ্য হচ্ছে বাবা-মার আর্থিক নিরাপত্তা বিধান। সম্পত্তি হেবা বা দান করার পরও তারা যাতে আর্থিক সমস্যায় না পড়েন এজন্য আইনটি সংশোধন করা হয়েছে। এই পরিবর্তনের ফলে দান করার পরও সম্পত্তিতে জীবন স্বত্ব বলবৎ থাকবে। অর্থাৎ দাতা যতদিন বেঁচে থাকবেন ততদিন তিনি এই সম্পত্তি ভোগ দখল করতে পারবেন। দাতার মৃত্যুর পর গ্রহীতা সম্পত্তির মালিকানা গ্রহন করবেন। এই পরিবর্তনে ধরে নেয়া হয়েছে যে, জীবদ্দশায় উত্তরাধিকারদের সম্পত্তি দান করার পর দাতা নিঃস্ব হয়ে পড়েন। তখন দাতাকে দেখা-শোনা বা আর্থিক নিরাপত্তা দেয়ার দায়িত্ত্বটি সন্তানরা পালন করেন না অনেক সময়। এরকম বিব্রতকর পরিস্থিতি এড়াতে যাতে দাতার ভোগ-দখলের আইনি অধিকার থাকে সম্পত্তিতে সেই লক্ষ্য হাসিলে আইনটি সংশোধন করা হয়েছে।
এই উদ্দেশ্য নিশ্চয়ই ভালো। কিন্তু এটা অপ্রয়োজনীয়। ওয়ারিশ বা উত্তরাধিকার আইন থাকতে ছেলে-মেয়েদের আগে দান করার কী দরকার? পিতা-মাতার মৃত্যুর পর ওয়ারিশানদের মধ্যে ইসলামের বন্ঠন নীতি অনুযায়ী স্বয়ংক্রিয়ভাবে সম্পদ হস্তান্তরিত হবে। এখানে তড়িঘড়ি করে আগেভাগে সম্পত্তি দান করার প্রয়োজন নেই। তারপরও বিশেষ পরিস্থিতিতে প্রয়োজনীয়তা দেখা দিলে ইসলামে বিকল্প ব্যবস্থা রয়েছে ওসিয়ত বা উইল। জীবিত অবস্থায় যেকোনো ব্যক্তি ওসিয়ত বা উইল করতে পারেন যা কার্যকর হয় তার মৃত্যুর পর। ওসিয়তকৃত সম্পত্তি ভোগ-দখল ও মালিকানা সবই বহাল থাকে তবে মৃত্যুর পর উইল বাস্তবায়িত হয়। মৃত ব্যক্তির ওসিয়ত জীবিতদের উপর পালন করা অবশ্য কর্তব্য। এক্ষেত্রে সমস্যা হয় তখনই যখন মৃত ব্যক্তি মুখে মুখে ওসিয়ত করে যান। তার মৃত্যুর পর একেকজন একেকভাবে উইলটি বর্ণনা করেন। যিনি উইলের মাধ্যমে কোনো সম্পদ অর্জন করেন না তিনি তা অস্বীকার করেন। অন্যদিকে কেউ কেউ মৃত ব্যক্তির নামে মিথ্যা ওসিয়ত বানিয়ে সম্পত্তি কেড়ে নিতে চান।
এই সমস্যা সমাধানের জন্য ওসিয়ত কে রেজিস্ট্রেশন আইনের আওতায় বাধ্যতামূলক করা যায়। অন্যান্য দলিলের মতো ওসিয়ত বা উইল রেজিস্টার্ড হলে সেটা কেউ অস্বীকার বা পরিবর্তন করতে পারবেন না। তারপর এই রেজিস্টার্ড ওসিয়ত বা উইলকে আইনগতভাবে বলবৎযোগ্য করার জন্য সম্পত্তি হস্তান্তর আইনে প্রয়োজনীয় সংশোধন বা সংযোজন করা যেত। এর ফলে ওসিয়তকারী ব্যক্তি জীবিত অবস্থায় ওসিয়তকৃত সম্পত্তি ভোগ-দখল করলেও তার মৃত্যুর পর তার ইচ্ছা অনুযায়ী সম্পদ বেনিফিশিয়ারির হাতে চলে যেত। এই কাজটি করলে বর্তমান বিতর্কিত সংশোধনের উদ্দেশ্যও সফল হতো। অন্যদিকে ইসলামের প্রতিষ্ঠিত কোনো বিধানও লঙ্গিত হতো না।
কিন্তু আইনমন্ত্রী কেনো ভুল পথে হাঁটলেন তা তিনিই ভালো বলতে পারবেন। যা দান করিলেন তা ভোগ-দখলের অধিকার রাখার মতো বিড়ম্বনায় সবাইকে না ফেলে সহজে যে কাজটি করা যেতো তা তিনি সহজে করলেন না। জীবদ্দশায় ভোগ-দখল করে মৃত্যুর পর নিজ ইচ্ছায় সম্পত্তি হস্তান্তরের সর্বজনগ্রাহ্য পদ্ধতি ওসিয়ত বা উইলের পথে না হেঁটে কেন তিনি হেবা বা দান সম্পর্কিত ইসলামের প্রতিষ্ঠিত নীতিকে পরিবর্তন করতে গেলেন তা বোধগম্য নয়। বিজ্ঞ আইনমন্ত্রী এবং সম্মানিত সংসদ সদস্যরা ইসলামের ওসিয়তের মাধ্যমে সম্পত্তি দাতার মৃত্যুর পর হস্তান্তরের বিষয়টি না জানার কোনো কারণ নেই। আবার জেনেশুনে দেশের এই সংকটকালীন সময়ে আরও রাজনৈতিক বিভাজনের অদূরদর্শী পথে হাঁটবেন তাও মেনে নিতে পারছি না। তাহলে কেন এই কাজটি করতে গেলেন যা শতকরা নব্বই শতাংশ মুসলমানের দেশে জনগন সহজে মেনে নেবে না?
রাজনৈতিক, অর্থনৈতক ও জ্বালানি সংকটের সমাধানে নীতিনির্ধারকরা ব্যস্ত। এই বহুমূখী সংকটের মধ্যে নতুন আরেকটি অপ্রয়োজনীয় বিতর্কের সুত্রপাত করা হলো যা সহজেই এড়ানো যেত। এর ফলাফল বিএনপি সরকারের অনুকূলে যাবে বলে মনে হচ্ছে না।
বিনা কারণে বিএনপি সরকারের সঙ্গে আলেমদের দূরত্ব সৃষ্টির প্রয়োজন ছিল কি-না সরকারের সংশ্লিষ্টদের তা খতিয়ে দেখা উচিত। এখনও সময় আছে হেবার এই সংশোধনটি বাতিল করে বিজ্ঞ আলেমদের পরামর্শ নিয়ে ওসিয়ত বা উইলের মাধ্যমে আইনের উদ্দেশ্য সাধনে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়ার। আশা করি সরকার সঠিক পদক্ষেপটি নেবে যাতে আলেমদের সঙ্গে সরকারের দূরত্ব তৈরী না হয়। একইসঙ্গে যাতে সম্পত্তি হস্তান্তরের জটিলতাও দূর হয়।
রিয়েলটর ও মর্টগেজ ব্যাংকার
মিশিগান, যুক্তরাষ্ট্র।