প্রকাশ : ১২ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০০:৪৪
•
অনলাইন সংস্করণ
ছবি সংগৃহীত
৯/১১ এর ২৫ বছর পর নিউইয়র্কের ‘গ্রাউন্ড জিরো’ এবং যুক্তরাষ্ট্রজুড়ে আয়োজিত শোকাবহ অনুষ্ঠানের মাধ্যমে হারানো হাজার হাজার প্রাণের প্রতি শ্রদ্ধা জানাল আমেরিকানরা। সমগ্র জাতি এক ছাতার নিচে সমবেত হয়েছিল শোকাবহ এ দিনটিকে স্মরণ করতে। কে ডেমোক্র্যাট ও কে রিপাবলিক্যান এ ভেদাভেদ ছিল না। বিভেদের বেড়াজাল খুঁজে পাওয়া যায়নি প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ও সাবেক প্রেসিডেন্ট ওবামা—ক্লিনটন অনুসারীদের মধ্যে। নিউইয়র্কের মেয়র মামদানি ও তার কড়া সমালোচক রুডি জুলিয়ানিও পাশাপাশি দাঁড়িয়ে। ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স ও সাবেক প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন শ্রদ্ধা জানাতে নীরবতায় একই ঠিকানায়। কোনো উৎসব নয়। কোনো দলীয় ব্যানারে সমাবেশ নয়। জাতির এই ঐতিহাসিক ক্রান্তিকালের ৯/১১ দিনটিকে স্মরণ করতে তারা শোকের পাথর নিয়ে হাজির হয়েছিলেন গ্রাউন্ড জিরোতে। যেখানে ২৫ বছর আগে ৩ হাজার নীরিহ মানুষকে হত্যা করা হয়েছিল সন্ত্রাসী বিমান হামলায়। দেশপ্রেম ও জাতির প্রতি দায়িত্ববোধ থেকেই তারা সন্মান জানালেন একসাথে।
ওয়াশিংটনে নিহতদের স্মরণে আয়োজিত অনুষ্ঠানের আগে শুক্রবার শুক্রবার (১১ সেপ্টেম্বর) খুব ভোরে পেন্টাগনের ছাদ থেকে একটি বিশাল মার্কিন পতাকা উন্মোচন করা হয়। নিউইয়র্কে না এলেও প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প স্ত্রী মেলানিয়া ট্রাম্পকে সাথে নিয়ে সেখানে ৯/১১ হামলায় নিহতদের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করেন। আবেগঘন বক্তৃতায় তিনি স্মরণ করেন ২৫ বছর আগে হারিয়ে যাওয়া দেশপ্রেমিকদের।
আজ থেকে ঠিক পঁচিশ বছর আগের এক শুভ্র সকাল। অত্যন্ত পরিষ্কার ও নীল আকাশের বুক চিরে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে ছিল নিউইয়র্কের টুইন টাওয়ার। ঘণ্টায় ৪০০ মাইলেরও বেশি গতিতে ছুটে আসা ১৩৫ টনের একটি যাত্রীবাহী বিমান একটি টাওয়ারের ৯৬ তলায় আঘাত হানে। এর কয়েক মিনিট পর দ্বিতীয় টাওয়ারেও আরেকটি বিমানের হামলা। মাত্র ১৫ মিনিটিই সন্ত্রাসীরা নিউইয়র্কের মানচিত্রই পাল্টে দেয়। এর মাধ্যমেই শুরু হয় নিউইয়র্কসহ আমেরিকান জাতির ইতিহাসের অন্যতম অন্ধকার ও প্রাণঘাতী দিনটির। বিমান হামলা হয় ওয়াশিংটনে আমেরিকান সামরিক সদর দফতর পেন্টাগনে। ছিনতাই হওয়া চতুর্থ যাত্রীবাহী বিধ্বস্ত হয় পেনসিলভানিয়ায়।
২০০১ সালের পর থেকে প্রতি ১১ সেপ্টেম্বরের মতোই আজও ম্যানহাটনে সমবেত হন বেঁচে যাওয়া ব্যক্তি, শোকসন্তপ্ত স্বজন ও রাজনীতিবিদরা। শহরের সবচেয়ে শোকাবহ এই আয়োজনে নিউইয়র্ক, পেন্টাগন এবং পেনসিলভানিয়ার শ্যাঙ্কসভিলের সন্ত্রাসী হামলায় নিহত প্রায় ৩ হাজার মানুষের নাম পাঠ করে।
নিউইয়র্ক সিটির বর্তমান ও প্রাক্তন মেয়ররা গ্রাউন্ড জিরোতে উপস্থিত ছিলেন। জোহরান মামদানি এবং সাবেক মেয়র বিল ডি ব্লাসিও দীর্ঘ সময় ধরে আলাপচারিতায় ছিলেন মগ্ন। সেখান থেকে কয়েক ফুট দূরে আরেক সাবেক মেয়র রুডলফ ডব্লিউ. জুলিয়ানি দাঁড়িয়ে ছিলেন। যিনি ৯/১১-এর হামলার সময় শহরটির নেতৃত্ব দিয়েছিলেন। যাকে বিশ্বের মেয়র হিসেবে অ্যাখ্যায়িত করা হয়। অন্য অতিথিদের সাথে কথা বলছিলেন। গত রোববার কট্টর ডানপন্থী সংবাদমাধ্যম ‘নিউজম্যাক্স’-এ মুসলিম-বিদ্বেষী এক বক্তব্যে জুলিয়ানি বলেছিলেন,স্মরণানুষ্ঠানে মামদানির উপস্থিতি তাকে ক্ষুব্ধ করবে। তবে মামদানি ও জুলিয়ানির মধ্যে কোনো কথাবার্তা হয়েছে কি না জানা যায়নি। অনুষ্ঠানে আরও ছিলেন কংগ্রেসের ‘হাউস মাইনরিটি লিডার’ হাকিম জেফ্রি এবং নিউইয়র্কের অ্যাটর্নি জেনারেল লেটিশিয়া জেমস।
মামদানি—যিনি এই অনুষ্ঠানের আগে ইসলাম বিদ্বেষের (ইসলামোফোবিয়া) শিকার হয়েছিলেন এবং এমনকি স্মরণসভায় তার যোগ না দেওয়ার দাবিও উঠেছিল। অথচ তিনিই স্মরণসভায় আসেন সবার আগে। ৯/১১-এর ঘটনায় নিহতদের সবার নাম পাঠের সময় উপস্থিত ছিলেন।
এগারোই সেপ্টেম্বরের বিপর্যয় আমেরিকার মানুষের মহৎ মানবিক সত্তাকে জাগিয়ে তুলেছিল। দমকলকর্মী ও জরুরি সেবাকর্মীরা অসামান্য সাহসিকতার পরিচয় দিয়েছিলেন। সাধারণ মানুষ রক্ত দেওয়ার জন্য লাইনে দাঁড়িয়েছিলেন। জাতি এমন এক অভূতপূর্ব ঐক্যের নজির গড়েছিল এবং বিশ্বজুড়ে সহানুভূতি পেয়েছিল। যার মধ্যে ছিল রাশিয়ার সহায়তার প্রতিশ্রুতি ও ইরানের মোমবাতি প্রজ্জ্বলন কর্মসূচি।
তৎকালীন প্রেসিডেন্ট জর্জ ডব্লিউ বুশ ৯/১১ এর ৩ দিন পর ১৪ সেপ্টেম্বর নিউইয়র্কের ‘গ্রাউন্ড জিরো’ পরিদর্শন করেন। ধ্বংসস্তূপের ওপর দাঁড়িয়ে মেগাফোন হাতে ঘোষণা করেন, “যারা এই ভবনগুলো গুঁড়িয়ে দিয়েছে, তারা শীঘ্রই আমাদের সবার কণ্ঠস্বর শুনতে পাবে।” এরপরই আফগানিস্তান ও ইরাকে হামলা করে আমেরিকা।
টুইন টাওয়ার হামলা বদলে দেয় বিশ্ব রাজনীতির গতিধারা। আল-কায়েদাকে ধ্বংস করতে এবং তাদের আশ্রয়দাতা তালেবান সরকারকে উৎখাত করতে যুক্তরাষ্ট্র আফগানিস্তানে আগ্রাসন চালায়। সেই যুদ্ধ ২০ বছর ধরে চলেছিল। অথচ শেষ পর্যন্ত তালেবানরাই আবার ক্ষমতায় ফিরে আসে। তাদের হাতেই কার্যত ক্ষমতা হস্তান্তর করে আমেরিকা সেখান থেকে বিদায় নেয়।
সাদ্দাম হোসেনের কাছে গণবিধ্বংসী মারণাস্ত্র রয়েছে,এমন মিথ্যা অজুহাতে বুশ ইরাকে আক্রমণ চালান। যার ফলে লক্ষ লক্ষ মানুষের প্রাণহানি ঘটে। ২৫ বছর পরে ‘দ্য গার্ডিয়ান’—এর সাথে আলাপকালে ইতিহাসবিদ ও নীতিনির্ধারণী বিশেষজ্ঞরা মত দিয়ে বলেছেন, ৯/১১-এর ঘটনায় যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিক্রিয়া ছিল এক গভীর কৌশলগত ভুল পদক্ষেপ।
অবশ্য পেন্টাগনে আয়োজিত স্মরণসভার বক্তব্যে ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরুর সিদ্ধান্তকে যৌক্তিক প্রমাণ করার জন্যও এই উপলক্ষটি কাজে লাগিয়ে ট্রাম্প বলেন, “আমরা কখনোই ভুলব না। আর তাই আজ আমরা লড়াই করছি। আমাদের সামনে অন্য কোনো পথ খোলা নেই। জয় ছাড়া অন্য কোনো বিকল্প নেই।” তথ্যসূত্র : গার্ডিয়ান, রয়টার্স ও নিউইয়র্ক টাইমস