তায়েব মিল্লাত হোসেন : বেসরকারি উদ্যোগের মাধ্যমে অগ্রগতি- এমন কর্মে যাদের পরিচিতি পৃথিবীজোড়া তাদের অন্যতম অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূস। সেই তিনি এখন বাংলাদেশের সরকারপ্রধান। এক বছর পার হয়ে গেছে এই দায়িত্বে আছেন। ড. ইউনূসের আমলে রোহিঙ্গা সংকট থেকে মুক্তির কোনো পথ মিলবে, এই আকাঙ্খা রয়েছে দেশজুড়ে। তিনি নিজেও দেশবাসীকে সেই স্বপ্নের কথাই বলেছেন। গত রমজানে জাতিসংঘ মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেসকে নিয়ে তিনি যখন উখিয়ায় লাখো রোহিঙ্গাকে নিয়ে ইফতার করেন, তখন তাদের দোয়া দিয়ে বলেছিলেন, শরণার্থী শিবিরে থাকা ১২ লাখ রোহিঙ্গা পরের ঈদ নিজ দেশ তথা মিয়ানমারে করবেন।
ঈদুল ফিতরের পর ঈদুল আজহা পার হয়ে গেছে। আমরা ধরে নিতে পারে ড. ইউনূস পরের বছরের রোজার ঈদের কথাই বুঝিয়েছিলেন। তা আসতে যে সময় হাতে আছে, তাতে বিপুল সংখ্যক রোহিঙ্গা শরণার্থী বিবেচনা করলে প্রত্যাবাসনের বিষয়টি বাস্তব রূপ দেওয়া কঠিন এক ব্যাপার। তেমন কোনো আলামতও দেখা যাচ্ছে না। উল্টো এই এক বছরে লাখ দেড়েক রোহিঙ্গা বাংলাদেশে প্রবেশ করেছে, গণমাধ্যম মারফত আমরা পাচ্ছি এমন খবর। কিন্তু এই অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ই যে একটা সময় আমরা খুব প্রচারণা দেখতে পেয়েছিলাম- এক লাখ ৮০ হাজার রোহিঙ্গাকে ফেরত নিতে চলেছে মিয়ানমার। এ নিয়ে আর কোনো অগ্রগতি নেই কেন? এতেও কী আসলে কোনো ফোকর রয়ে গেছে? মূল বিষয়টি হচ্ছে বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়া এক লাখ ৮০ হাজার রোহিঙ্গাকে প্রত্যাবাসনের যোগ্য হিসাবে তখন চিহ্নিত করে মিয়ানমার৷ এটা দুই সরকারের এক ধরনের সংখ্যাতাত্ত্বিক বোঝাপড়া। এরই অংশ হিসেবে ২০১৮-২০২০ সালের মধ্যে ছয় দফায় আশ্রয় নেওয়া আট লাখ রোহিঙ্গার তালিকা মিয়ানমারকে দিয়েছিল বাংলাদেশ। গত এপ্রিলেই অন্তর্বর্তী সরকার জানিয়েছিল, এখান থেকেই আরো সাড়ে পাঁচ লাখ রোহিঙ্গার তথ্য দ্রুতই যাচাই করতে রাজি হয়েছে মিয়ানমার। এ বিষয়ে অগ্রগতি আমরা এখনো জানতে পারিনি।
কক্সবাজার অঞ্চল হালে যে লাখ লাখ রোহিঙ্গা শরণার্থীর আশ্রয় শিবিরে পরিণত হয়, সেই মানবঢলটার সূচনা হয় ২০১৭ সালের ২৫ আগস্ট। সে হিসেবে কয়েক দশকের যে সংকট, এবারের অধ্যায়ের হিসেবে হলো তার আট বছর। আগের বছরগুলোর মতোই এই সোমবার রোহিঙ্গা শরণার্থীরা পিতৃভূমিতে ফেরার আকুতি জানিয়ে নানা কর্মসূচি পালন করেছে। বসে থাকেনি বাংলাদেশ সরকার, দেশি-বিদেশি এনজিওরা। বিশেষ করে রোববার থেকে মঙ্গলবার পর্যন্ত ‘স্টেকহোল্ডারস ডায়ালগ: টেকঅ্যাওয়ে টু দ্য হাই-লেভেল কনফারেন্স অন দ্য রোহিঙ্গা সিচুয়েশন’ শীর্ষক সংলাপ হয়েছে কক্সবাজারে। এই বৈশ্বিক আয়োজনে অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূস ২৫ আগস্ট সোমবার বক্তব্য দেন। যেখানে আঁচ করা যাচ্ছে, প্রত্যাবাসন নিজের মেয়াদে হবে কি না, তা নিয়ে অনিশ্চয়তায় আছেন। কারণ লাখ লাখ শরণার্থীর জন্য যে ব্যয়, সেই যোগানে সহায়তা দিতে বিশ্বনেতাদের দিকে আলো ফেলেছেন তিনি। আর শরণার্থী নিয়ে কথা বলতে গেলে, প্রত্যাবাসন নিয়ে দুটো কথা বলতেই হয়। সেক্ষেত্রে ড. ইউনূস বলেছেন, রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসনে বাস্তবভিত্তিক পথ-নকশা তৈরিতে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় যাতে এগিয়ে আসে।
বিশ্বনেতারা রোহিঙ্গা সংকট সমাধানে এই কতটা নজর দিবেন, এ বিষয়ে সংশয় রাখতেই হয়। কারণ ডনাল্ড ট্রাম্পের শুল্ক-যুদ্ধ ভূরাজনীতির হিসাব-নিকাশই পাল্টে দিয়েছে। তিনি নিজে মিয়ানমার জান্তা সরকারের প্রতি আগের তুলনায় নমনীয় হচ্ছেন, এমন ইঙ্গিতও রয়েছে। এছাড়া এবার ক্ষমতায় এসেই বিশ্বজুড়ে ত্রাণ সহায়তায় লাগাম টেনে ধরেছেন। ফলে জাতিসংঘের শান্তিরক্ষা কার্যক্রমের তহবিলে টান পড়েছে। নিজেদের নানা কার্যক্রম গুটিয়ে নিতে বাধ্য হচ্ছে ইউনিসেফ। এভাবে ত্রাণধর্মী বৈশ্বিক নানা কাজই বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। ইউএস এআইডি বন্ধ করতে যা যা দরকার তার সবই করে চলেছে ট্রাম্প প্রশাসন। বিশ্বমোড়লের এই কৃপণতায় রোহিঙ্গা শরণার্থীদের বাসস্থান, খাবারসহ অন্যান্য মৌলিক চাহিদা মেটানোর তহবিলেও টান পড়ছে। শরণার্থী শিবিরে রোহিঙ্গা শিশুদের পড়ালেখার মতো প্রকল্পগুলো বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্রের পরিবর্তে ইউরোপের কিছু দেশ এগিয়ে আসায় এখন পর্যন্ত খাবার যোগান দেওয়া সম্ভব হচ্ছে। সেটাও যে সহজসাধ্য নয়, এই সোমবার সেটাও বলেছেন ড. ইউনূস। স্পষ্টই করে দিয়েছেন যে, অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে রোহিঙ্গাদের জন্য কিছু সংগ্রহ করার সামর্থ্য আর বাংলাদেশের নেই।
ত্রাণ সহায়তা নিশ্চিত করা যতটা কঠিন, তার চেয়েও কঠিন রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন নিশ্চিত করা। কারণ মিয়ানমারজুড়েই চলছে গৃহযুদ্ধ। বিশেষ করে রোহিঙ্গাদের যেখানে বাড়িঘর সেই রাখাইন রাজ্যে জান্তা সরকারের নিয়ন্ত্রণ রয়েছে খুব কম এলাকায়েই। সেখানে বেশিরভাগ অঞ্চল দখল করে আছে আরাকান আর্মি। আর এই সশস্ত্র গোষ্ঠীর সঙ্গে রোহিঙ্গাদের সম্পর্ক ভালো নয়। গত এক বছরে নতুন করে দেড় লাখ রোহিঙ্গার প্রবেশ কিন্তু সেই কারণেই। মিয়ানমারের গৃহযুদ্ধে অন্যভাবেও আক্রান্ত বাংলাদেশ। প্রায়ই সীমান্ত এলাকায় গোলাগুলি হচ্ছে। এতে বাংলাদেশিরাও আহত-নিহত হওয়ার ঘটনা ঘটছে। অনেকেই বাড়িঘর ছেড়ে নিরাপদ অঞ্চলে গিয়ে আশ্রয় নিচ্ছেন। আবার সীমান্তবর্তী বাংলাদেশের গহীন লোকালয়ে সশস্ত্র যোদ্ধারা প্রায়ই এসে আশ্রয় নিচ্ছে।
অন্যদিকে বঙ্গোপসাগরের মোহনা ও নাফ নদীর বড় অংশ যে আরাকান আর্মির নিয়ন্ত্রণে রয়েছে সেই আলামতও। মাঝেমাঝেই বাংলাদেশি জেলেদের ধরে নিয়ে যাচ্ছে তারা। এই সপ্তাহের তিন-চার দিনেই প্রায় ৪০ জনকে অপহরণ করার খবর এসেছে। এটা করে মূলত নিজেদের রসদ সংগ্রহের জন্য। তাই জেলেদের ধরে নিয়ে যাওয়া একভাবে মুক্তিপণ আদায়ের মতোই ব্যাপার।
মিয়ানমারের গৃহযুদ্ধে নানাভাবেই আক্রান্ত বাংলাদেশের সীমান্তবর্তী মানুষ। যা থেকে উত্তরণে এই গৃহযুদ্ধের অবসান জরুরি। আসলে এরপর আসবে রোহিঙ্গা শরণার্থী প্রত্যাবাসন প্রসঙ্গ। এক্ষেত্রে বিশ্বমোড়লদের উদ্যোগ ছাড়া কোনো অগ্রগতিই সম্ভব নয়। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্র ও চীনকে এক কাতারে এসে দাঁড়াতে হবে। ট্রাম্পের লাগিয়ে দেওয়া বাণিজ্য যুদ্ধের সময় যা দুঃসাধ্য ব্যাপার। আর একই কারণে ভারতের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের যে দূরত্ব বাড়ছে, তাতে নরেন্দ্র মোদি চীনের দিকে ঝুঁকছেন। ভারত তাই মিয়ানমারকে চীনের চোখ দিয়ে দেখলে বিস্ময়ের কিছু হবে না।
রোহিঙ্গাদের দিকে যাদের নজর রয়েছে জাতিসংঘ, ইইউ, ওআইসি- তারা ত্রাণ সহায়তার দিক দিয়ে দারুণ সক্রিয়। কিন্তু প্রত্যাবাসনের বিষয়ে মিয়ানমারের বর্তমান জান্তা সরকার শুধু নয়, এর আগের অং সান সু চির সরকারও বৈশ্বিক সংস্থাগুলোকে পাত্তা দেয়নি। তাই ড. ইউনূসের আমলে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের আশা ও স্বপ্ন বেগবান হতেই পারে। নাটকীয় কোনো মোড় না এলে কার্যকর করার বিষয়টি বহু দূরেই থেকে যাবে, এ নিয়তি মেনে নেওয়া ছাড়া উপায় নেই- আপাতত, সেটাই বাস্তব।