সোমবার, ২৬ অক্টোবর ২০২৬
সর্বশেষ :
• সংসদের নিম্নকক্ষের মেয়াদ ৪, উচ্চকক্ষের ৬ বছর করার প্রস্তাব • অপদার্থদের কথায় কান দেওয়ার সময় নেই : বিচ্ছেদের গুঞ্জনে ফারুকী • যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল থেকে দূরত্ব বজায় রাখুন, ইউরোপকে ইরানের আহ্বান • লিড নিয়েও পর্তুগালের কাছে হারল বাংলাদেশ • শাশুড়ির প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশের দিন আজ • জানুয়ারি-ফেব্রুয়ারিতে পদ্মা ব্যারাজ নির্মাণ প্রকল্পের কাজ শুরু হবে • বাংলাদেশে পুনরায় বিদ্যুৎ রপ্তানি শুরু করেছে নেপাল • এনায়েতুল্লাহ আব্বাসীকে ক্ষমা চাইতে আইনি নোটিশ • আগামী জাতীয় নির্বাচন নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনেই অনুষ্ঠিত হবে • বাংলাদেশ-যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্যিক সম্পর্ক আরও শক্তিশালী হচ্ছে : মার্কিন রাষ্ট্রদূত

সোমবার, ২৬ অক্টোবর ২০২৬

বিজ্ঞাপন

​সভাপতির আসনে ড. খলিল, অনন্য উচ্চতায় বাংলাদেশ

​সভাপতির আসনে ড. খলিল, অনন্য উচ্চতায় বাংলাদেশ

বিজ্ঞাপন
জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশন ৮ সেপ্টেম্বর মঙ্গলবার নিউইয়র্কে জাতিসংঘ সদর দপ্তরের সাধারণ পরিষদের হলে প্রথম পূর্ণাঙ্গ বৈঠকের মধ্য দিয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হয় আর এ অধিবেশনে সভাপতিত্ব করেন বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান। এর আগে তিনি ২০২৬ সালের ২ জুন নিউইয়র্কে জাতিসংঘের সদর দপ্তরে অনুষ্ঠিত একটি হাড্ডাহাড্ডি ও গোপন ব্যালট ভোটের মাধ্যমে সাইপ্রাসের একমাত্র প্রতিদ্বন্দ্বী আন্দ্রেয়াস এস কাকৌরিসের সঙ্গে ৮ ভোটের ব‍্যবধানে এই ঐতিহাসিক বিজয় অর্জন করেন। উভয়ের প্রাপ্ত ভোট যথাক্রমে ৯৯ ও ৯১। প্রাপ্ত ভোটের ব‍্যবধান মাত্র ৮। যার ফলে ড. খলিল সাধারণ অধিবেশনে সভাপতিত্ব করার গৌরব অর্জন করেন, যা শুধু তাকে গৌরবান্বিত করেনি, এ বিজয়ের ফলে বাংলাদেশের ভাবমূর্তিও বিশ্বের কাছে উজ্জ্বল হয়েছে।
জাতিসংঘের নিয়ম অনুযায়ী সাধারণ পরিষদের সভাপতি পদটি প্রতিবছর পাঁচটি আঞ্চলিক গ্রুপের মধ্যে আবর্তিত হয়। সে অনুযায়ী জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের সভাপতি নির্বাচন প্রক্রিয়াটি একটি নির্দিষ্ট আঞ্চলিক ঘূর্ণমান পদ্ধতি এবং গণতান্ত্রিক ভোটাভুটির মাধ্যমে পরিচালিত হয়। এই গ্রুপগুলো হলো আফ্রিকা, এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চল, পূর্ব ইউরোপ, লাতিন আমেরিকা ও ক্যারিবীয় এবং পশ্চিম ইউরোপ ও অন্যান্য রাষ্ট্র।

নিরাপত্তা পরিষদের স্থায়ী সদস্য exclusions : জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের পাঁচটি স্থায়ী সদস্যদেশ (যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স, রাশিয়া ও চীন) কখনোই সাধারণ পরিষদের সভাপতি পদে প্রার্থী বা নির্বাচিত হতে পারে না, যাতে ক্ষমতার ভারসাম্য বজায় থাকে। ৮১তম অধিবেশনের জন্য সভাপতি নির্বাচনের দায়িত্ব ছিল এশিয়া-প্যাসিফিক গ্রুপের ওপর। সাধারণ পরিষদের কার্যবিধি অনুযায়ী, সভাপতি নির্বাচন সরাসরি গোপন ব্যালটে ভোটাভুটির মাধ্যমে অনুষ্ঠিত হয়। সদস্য রাষ্ট্রগুলোর সাধারণ সংখ্যাগরিষ্ঠতার (Simple Majority) ভিত্তিতে বিজয়ী নির্ধারিত হয় এবং সাধারণ পরিষদের একজন সভাপতি এক বছরের পূর্ণ মেয়াদের জন্য নির্বাচিত হন, যা সাধারণত প্রতিবছরের সেপ্টেম্বর মাসে শুরু হয়। নির্বাচনের পর ড. খলিলুর রহমান ২০২৬ সালের ৮ সেপ্টেম্বর আনুষ্ঠানিকভাবে ৮১তম অধিবেশনের সভাপতি হিসেবে শপথ নেন এবং দায়িত্বভার গ্রহণ করেন। তিনি এক বছর মেয়াদে (সেপ্টেম্বর ২০২৬—সেপ্টেম্বর ২০২৭) এই দায়িত্ব পালন করবেন।

বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান বৈঠকে সভাপতির আসনে বসে অধিবেশনের কার্যক্রম উদ্বোধন করেন। তার বাঁ পাশে ছিলেন জাতিসংঘ মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস এবং ডান পাশে ছিলেন সাধারণ পরিষদ ও সম্মেলন ব্যবস্থাপনা বিষয়ক জাতিসংঘের আন্ডার সেক্রেটারি জেনারেল মভসেস আবেলিয়ান।
বৈঠকের শুরুতে উপস্থিত প্রতিনিধিরা দাঁড়িয়ে এক মুহূর্ত নীরবতা পালনের পর উদ্বোধনী বক্তব্য দেন জাতিসংঘ মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস।

৮ সেপ্টেম্বর অধিবেশনের উদ্বোধনী বক্তব্যে ড. খলিলুর রহমান জাতিসংঘের প্রতি আস্থা পুনরুজ্জীবিত করতে নিরলসভাবে কাজ করার অঙ্গীকার ব্যক্ত করেন। তার মতে, সদস্য রাষ্ট্রগুলোর সম্মিলিত উদ্যোগ সফল করার ক্ষেত্রে এই প্রতিষ্ঠানের প্রতি আস্থা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে বাংলাদেশ প্রতিনিধি এ পর্যন্ত দুবার সভাপতিত্ব করেন। প্রথমবার জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৪১তম অধিবেশনে (১৯৮৬-১৯৮৭ মেয়াদে) সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন তৎকালীন পররাষ্ট্রমন্ত্রী ও ডিপ্লোম্যাট হুমায়ুন রশীদ চৌধুরী। দীর্ঘ প্রায় ৪০ বছর পর জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের এই মর্যাদাপূর্ণ পদে দ্বিতীয়বার সভাপতি পদে নির্বাচিত হয়েছেন বাংলাদেশের প্রতিনিধি ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান এবং সেপ্টেম্বর ২০২৬ থেকে শুরু হওয়া ৮১তম অধিবেশনে দায়িত্ব গ্রহণ করেছেন। ড. খলিলুর রহমানের এই মেয়াদেই (ডিসেম্বর ২০২৬) বর্তমান জাতিসংঘ মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেসের স্থলাভিষিক্ত কে হবেন, তা নির্বাচনের মতো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি বৈশ্বিক প্রক্রিয়ায় পরিচালিত হবে।

জাতিসংঘের কার্যক্রম মূলত আন্তর্জাতিক শান্তি রক্ষা, মানবিক সহায়তা প্রদান, টেকসই উন্নয়ন এবং মানবাধিকার সুরক্ষার মতো প্রধান ক্ষেত্রগুলোর চারপাশে আবর্তিত হয়। ১৯৪৫ সালে প্রতিষ্ঠার পর থেকে সংস্থাটি বিশ্বব্যাপী বিভিন্ন কার্যপদ্ধতির মাধ্যমে কাজ করে আসছে। জাতিসংঘের প্রধান কার্যক্রম ও ক্ষেত্রসমূহ নিম্নরূপ :
আন্তর্জাতিক শান্তি ও নিরাপত্তা রক্ষা : সংঘাত প্রতিরোধ, যুদ্ধবিরতি তত্ত্বাবধান এবং সংঘাতপূর্ণ অঞ্চলে শান্তিরক্ষী বাহিনী মোতায়েনের মাধ্যমে বিশ্ব শান্তি নিশ্চিত করে। এ ক্ষেত্রে নিরাপত্তা পরিষদ ও শান্তিরক্ষা মিশনসমূহ অত্যন্ত শক্তিশালী ভূমিকা পালন করে।

টেকসই উন্নয়ন : টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (SDGs) অর্জনের লক্ষ্যে দারিদ্র্য বিমোচন, শিক্ষা বিস্তার এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির জন্য অর্থনৈতিক ও সামাজিক পরিষদ (ECOSOC) এই কার্যক্রমগুলোর মূল সমন্বয়ক হিসেবে কাজ করে। বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে যুদ্ধ, মহামারি বা প্রাকৃতিক দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের মধ্যে খাদ্য, চিকিৎসাসামগ্রী, মানবিক সহায়তা ও ত্রাণ জরুরি পৌঁছায়। এ ক্ষেত্রে বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচি (WFP) এবং ইউনিসেফ অগ্রণী ভূমিকা পালন করে।

মানবাধিকার সুরক্ষা : বিশ্বজুড়ে মৌলিক মানবাধিকার সমুন্নত রাখা এবং জাতি, ধর্ম-বর্ণ বা লিঙ্গ নির্বিশেষে সবার সমতা ও মর্যাদা রক্ষায় বিভিন্ন সনদ ও নীতিমালা বাস্তবায়ন করে, যদিও কাশ্মীর এবং ফিলিস্তিনের বিরোধ অদ‍্যাবধি বহাল রয়েছে এবং স্থায়ী শান্তি কখন প্রতিষ্ঠিত হবে, তা আদৌ কারও জানা নেই। এ বিষয়টি নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত বিশ্ব বিবেকের কাছে জাতিসংঘের ভূমিকা প্রশ্নবিদ্ধ হয়েই থাকবে। তাই এ বিষয়ে দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়া বিশ্বের শান্তিপ্রিয় মানুষদের জোর দাবি।

আন্তর্জাতিক আইন ও বিরোধ নিষ্পত্তি : সদস্য রাষ্ট্রগুলোর মধ্যকার সীমানা বা আইনি বিরোধ শান্তিপূর্ণভাবে মীমাংসা করার জন্য আন্তর্জাতিক বিচার আদালত (ICJ) কাজ করে থাকে।
জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনের সভাপতি পদে ১৯০টি ভোটের মধ্যে সবগুলো ভোট পড়েছে। এর মধ্যে ড. খলিলুর রহমান (বাংলাদেশ) ৯৯ ভোট পেয়ে বিজয়ী হয়েছেন। ভোটের ব্যবধান ৮। কোনো ভোট বাতিল হয়নি বা কেউ ভোটদানে বিরত ছিলেন না। তাই বাতিল বা অনুপস্থিত ভোট ০।

জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনে বাংলাদেশের প্রতিনিধি ড. খলিলুর রহমানের বিজয় বিশ্ব কূটনীতিতে একটি তাৎপর্যপূর্ণ ঘটনা। যেসব ঐতিহাসিক কারণে একটি দেশ সারা বিশ্বের কাছে পরিচিতি লাভ করে, এ বিষয়টি তার অন্যতম। এর আগে জাতিসংঘের শান্তিরক্ষা মিশনে বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব ছিল সবচেয়ে বেশি এবং গুরুত্বপূর্ণ, যার স্বীকৃতি হিসেবে বাংলাদেশ বিশ্বে ব‍্যাপক পরিচিতি লাভ করে ইতিবাচক ভাবমূর্তি গড়ে তোলে, যা এখনো বহাল আছে। আগামী এক বছরে ড. খলিলের ব‍্যক্তিগত ক্যারিশমা ও কূটনৈতিক দক্ষতায় আন্তর্জাতিক পর্যায়ে বংলাদেশের ভাবমূর্তি আরও বহুগুণ বৃদ্ধি পাবে বলে প্রত্যাশা করা হচ্ছে।

লেখক : কবি, প্রাবন্ধিক, গীতিকার
কলামিস্ট ও গবেষক, নিউইয়র্ক

নিউজটি শেয়ার করুন


সর্বশেষ আপডেট

 
© 2026 All Rights Reserved by Thikana Group Of Media
Maintained by SolveEz