প্রধানমন্ত্রীর নিউইয়র্ক সফর ও প্রবাসীদের প্রত্যাশা
আহবাব চৌধুরী খোকন
প্রকাশ : ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১৮:৪৬
•
অনলাইন সংস্করণ
দীর্ঘ ফ্যাসিবাদী যুগের অবসানের পর বাংলাদেশের নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী হিসেবে জনাব তারেক রহমানের জাতিসংঘ সাধারণ অধিবেশনে যোগদান জাতীয় ও আন্তর্জাতিক অঙ্গনে একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা। তাঁর এই সফরকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্রস্থ সকল বাংলাদেশির মধ্যে বিরাজ করছে উৎসব আমেজ। জনাব তারেক রহমান বাংলাদেশের ঐতিহ্যবাহী একটি রাজনৈতিক পরিবারের গর্বিত সন্তান। তাঁর পিতা ও মাতা দুজনই রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ পদে থেকে আমৃত্যু দেশের জন্য কাজ করেছেন। তাই তাঁর পরিবারের দেশপ্রেম ও আত্মত্যাগ দেশের মানুষ সর্বদা শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করে। তবে রাষ্ট্রের এই সর্বোচ্চ দায়িত্বে অধিষ্ঠিত হওয়ার পথটি তাঁর জন্য কখনো সহজ ছিল না। দীর্ঘ আন্দোলন-সংগ্রাম ও অনিশ্চয়তার মধ্য দিয়ে তাঁকে এই পর্যায়ে আসতে হয়েছে। প্রায় দেড় যুগ নির্বাসনে থেকে তিনি তাঁর রাজনৈতিক নেতৃত্ব ও সাংগঠনিক কর্মকাণ্ড অব্যাহত রেখেছেন এবং দেশের মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠায় আপসহীনভাবে কাজ করেছেন। তাই বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে জাতিসংঘের সাধারণ অধিবেশনে তাঁর অংশগ্রহণ শুধু একটি রাষ্ট্রীয় সফর নয়, বরং এটি দীর্ঘ রাজনৈতিক সংগ্রাম, গণতন্ত্রের আকাঙ্ক্ষা এবং একটি নতুন বাংলাদেশের প্রত্যাশার প্রতীক হিসেবেও বিবেচিত হচ্ছে।
বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বসবাসরত দেড় কোটি প্রবাসী অত্যন্ত আনন্দিত ও গর্বিত এই ভেবে যে দীর্ঘ দিন পর বাংলাদেশের মানুষ এমন একজন ব্যক্তিকে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে পেয়েছ, যিনি নিজেও দীর্ঘ দিন প্রবাসী ছিলেন। তাই প্রবাসীদের সমস্যা ও সম্ভাবনা তাঁর নখদর্পণে। তিনি ইতিমধ্যে বহু প্রবাসীকে রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ পদে অধিষ্ঠিত করে তাঁদের অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগানোর সুযোগ দিয়েছেন। বাংলাদেশের অর্থনীতিতে প্রবাসীদের অবদান কোনো অংশে কম নয়। জীবিকার তাগিদে প্রতিবছর বিপুলসংখ্যক বাংলাদেশি বিশ্বের বিভিন্ন দেশে পাড়ি জমান। কেউ শ্রমিক হিসেবে, কেউ ব্যবসা করতে, আবার কেউ উচ্চশিক্ষা ও পেশাগত দক্ষতা অর্জনের জন্য বিদেশে যান। বিদেশের মাটিতে দিনের পর দিন কঠোর পরিশ্রম করে তাঁরা শুধু নিজের ও পরিবারের ভবিষ্যৎ গড়ে তোলেন না, তাঁদের পাঠানো রেমিট্যান্স দেশের অর্থনীতির অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি হিসেবেও কাজ করে। বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ শক্তিশালী করা, আমদানি ব্যয় মেটানো এবং গ্রামীণ অর্থনীতিকে সচল রাখতে প্রবাসীরা গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখেন।
কিন্তু অত্যন্ত দুঃখজনক বাস্তবতা হলো, দেশের জন্য এত অবদান রাখার পরও প্রবাসীরা দেশে ফিরলে নানা সমস্যার সম্মুখীন হন। তাঁদেরকে সামান্য একটি জাতীয় পরিচয়পত্র বা এনআইডি কার্ড পেতে সীমাহীন দুর্ভোগ পোহাতে হয়। ব্যাংক হিসাব, জমি কেনাবেচা, ব্যবসা ও বিভিন্ন সরকারি কাজে এনআইডি কার্ড খুবই গুরুত্বপূর্ণ। অথচ বিদেশে বসবাসরত প্রবাসীদের জন্য এনআইডি পাওয়ার প্রক্রিয়া বেশ দীর্ঘ ও জটিল। দূতাবাসে আবেদন করে মাসের পর মাস, এমনকি বছরের পর বছর অপেক্ষা করেও অনেকে এনআইডি পান না। ডিজিটাল প্রযুক্তির মাধ্যমে দ্রুত পরিচয় যাচাই ও তথ্য সংগ্রহ সম্ভব হলে এবং সংশ্লিষ্ট দূতাবাসগুলোকে এনআইডি সেবা প্রদানের যথাযথ ক্ষমতা অর্পণ করা হলে এই দীর্ঘসূত্রতা অনেকটাই কমানো সম্ভব।
প্রবাসীদের আরেকটি বড় সমস্যা তাঁদের অর্জিত সম্পদ ও বিনিয়োগের নিরাপত্তাহীনতা। একজন প্রবাসী বহু বছর বিদেশে কঠোর পরিশ্রম করে অর্থ সঞ্চয় করেন। তাঁর স্বপ্ন থাকে দেশে ফিরে বাড়ি করবেন, ব্যবসা করবেন কিংবা কোনো উৎপাদনশীল খাতে বিনিয়োগ করবেন। কিন্তু দেশে ফিরে অনেকে দেখতে পান, তাঁদের অনুপস্থিতির সুযোগ নিয়ে জমি দখল, জাল দলিল, প্রতারণা কিংবা সম্পত্তি নিয়ে বিরোধ সৃষ্টি হয়েছে। কখনো কখনো আত্মীয়স্বজন ও পরিচিত ব্যক্তিরাও প্রবাসীর সম্পদ আত্মসাৎ করেন। এসব সমস্যার প্রতিকার পেতে তাঁদের দীর্ঘ দিন আদালত, ভূমি অফিস, থানা কিংবা বিভিন্ন সরকারি দপ্তরে ঘুরতে হয়। অর্থ, সময় ও মানসিক শক্তি ব্যয় করেও অনেক সময় দ্রুত প্রতিকার মেলে না। ফলে দেশে বিনিয়োগের প্রতি তাঁদের আস্থা কমে যায়। জমি কেনাবেচা, ট্রেড লাইসেন্স, ঋণ গ্রহণ, কর-সংক্রান্ত বিষয়, ব্যাংকিং কার্যক্রম ও বিভিন্ন সরকারি অনুমোদনের ক্ষেত্রেও প্রবাসীদের নানা জটিলতার মুখোমুখি হতে হয়। কোথাও দীর্ঘসূত্রতা, কোথাও আমলাতান্ত্রিক জটিলতা, আবার কোথাও হয়রানি তাঁদের নিরুৎসাহিত করে।
প্রবাসীরা শুধু রেমিট্যান্সের উৎস নন; তাঁরা দেশের মানবসম্পদ ও জ্ঞানভান্ডারের অংশ। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে কাজ করতে গিয়ে তাঁরা শিল্প, ব্যবসা, আধুনিক প্রযুক্তি, ব্যবস্থাপনা, নির্মাণ, কৃষি, স্বাস্থ্য, তথ্যপ্রযুক্তিসহ নানা ক্ষেত্রে অভিজ্ঞতা অর্জন করেন। সরকার যদি প্রবাসীদের অভিজ্ঞতা ও জ্ঞান কাজে লাগাতে পারে, তাহলে দেশের উৎপাদনশীলতা ও দক্ষতা উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ানো সম্ভব। তাই প্রবাসীদের শুধু রেমিট্যান্স পাঠানো ব্যক্তি হিসেবে নয়, দেশের উন্নয়নের অংশীদার হিসেবে বিবেচনা করা উচিত। প্রবাসীদের সম্পদ ও বিনিয়োগের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পাশাপাশি তাঁদের জন্য সরকারি সেবা বিশেষ সহায়তা ডেস্ক বা ওয়ান-স্টপ সার্ভিস চালু করা যেতে পারে। বিনিয়োগের ক্ষেত্রে আমলাতান্ত্রিক জটিলতা কমিয়ে অনলাইনভিত্তিক ও স্বচ্ছ ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। দেশে ফিরে আসা প্রবাসীদের দক্ষতা ও অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে কর্মসংস্থান ও পুনর্বাসনের সুযোগ তৈরি করা যেতে পারে। যাঁরা ব্যবসা করতে চান, তাঁদের জন্য সহজ শর্তে ঋণ, প্রশিক্ষণ, কর-সুবিধা ও ব্যবসায়িক পরামর্শের ব্যবস্থা করা দরকার। একই সঙ্গে প্রতিটি জেলায় সরকারি উদ্যোগে প্রবাসীদের জন্য আবাসন ও শিল্প বিনিয়োগের সুযোগ তৈরি করা যেতে পারে। সরকারি কর্মকর্তারা যদি সরকারি প্লট বা আবাসন সুবিধা পাওয়ার সুযোগ পান, তাহলে দেশ ও পরিবারের জন্য সারা জীবন ত্যাগ স্বীকার করা প্রবাসীদের জন্যও ন্যায্য ও স্বচ্ছ নীতির ভিত্তিতে এমন সুযোগ বিবেচনা করা উচিত। প্রবাসীরা যেন দূতাবাসের মাধ্যমে দ্রুত ও হয়রানিমুক্ত সেবা পান, তা নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব। প্রবাসীদের দেশে আসা যেন দুর্ভোগের কারণ না হয়ে স্বস্তি, নিরাপত্তা ও সম্মানের হয়, সরকারকে সেই পরিবেশও নিশ্চিত করা উচিত। একজন প্রবাসী যেন দেশে ফিরে তাঁর নিজের সম্পদ নিয়ে নিরাপদে থাকতে পারেন এবং অর্জিত জ্ঞান, দক্ষতা ও অভিজ্ঞতা দেশের কাজে লাগাতে পারেন—রাষ্ট্রকে সেই পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে। প্রবাসীরা হচ্ছেন দেশের সম্পদ। তাঁদের সম্মান, নিরাপত্তা ও বিনিয়োগের নিশ্চয়তা দিতে পারলে তাঁরা দেশের অর্থনৈতিক ও সামাজিক ভবিষ্যৎ বদলে দেওয়ার অন্যতম শক্তিতে পরিণত হতে পারেন। তাঁদের শক্তিকে সঠিকভাবে কাজে লাগিয়ে বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান, প্রযুক্তি ও জ্ঞানভিত্তিক একটি শক্তিশালী অর্থনীতি গড়ে তোলা সম্ভব। তাই প্রবাসীদের সমস্যা দূর করে তাঁদের সম্ভাবনা কাজে লাগানো শুধু প্রবাসীদের স্বার্থে নয়, বাংলাদেশের সামগ্রিক উন্নয়নের স্বার্থেই অত্যন্ত জরুরি।
লেখক : কলামিস্ট ও রাজনীতিবিদ, সভাপতি
নিউইয়র্ক মহানগর বিএনপি (উত্তর), যুক্তরাষ্ট্র