প্রকৃতির প্রতিশোধ : বাংলাদেশ কি নিজের ভবিষ্যতের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে আছে?
মামুন আশরাফী
প্রকাশ : ২০২৬-১০-০১ ১১:০০:০০
•
অনলাইন সংস্করণ
প্রকৃতি কখনো মানুষের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করে না। তার কোনো সংসদ নেই, কোনো রাজনৈতিক দল নেই, কোনো প্রতিহিংসার ভাষাও নেই। তবু মানুষ যখন প্রকৃতির স্বাভাবিক নিয়মকে অমান্য করে, নদীর পথ রুদ্ধ করে, বন কেটে ফেলে, জলাভূমি ভরাট করে, মাটিকে বিষাক্ত করে, বাতাসকে দূষিত করে এবং সীমাহীন ভোগের জন্য পৃথিবীর সম্পদ নিঃশেষ করতে থাকে—তখন প্রকৃতি তার নিজস্ব ভাষায় জবাব দেয়। বন্যা আসে, নদীভাঙন বাড়ে, তাপমাত্রা ওঠে, ফসলের উৎপাদন ব্যাহত হয়, জীববৈচিত্র্য হারিয়ে যায়, খাদ্য ও পানির নিরাপত্তা হুমকির মুখে পড়ে। আমরা তাকে বলি, ‘প্রকৃতির প্রতিশোধ’।
কিন্তু প্রকৃতির এই প্রতিশোধের সবচেয়ে ভয়াবহ দিক হলো—এর দায় প্রকৃতি নেয় না, নেয় মানুষ; আর তার মূল্য দিতে হয় প্রায়শই সেই মানুষকেই, যে সিদ্ধান্তটি নেয়নি।
বাংলাদেশের সংকট তাই কেবল পরিবেশের সংকট নয়। এটি আমাদের চেতনা, শিক্ষা, সংস্কৃতি, নৈতিকতা, ধর্মীয় মূল্যবোধ, জ্ঞান-বিজ্ঞান, দর্শন, রাজনীতি, অর্থনীতি এবং নেতৃত্বের সম্মিলিত সংকট। প্রকৃতিকে আমরা যতটা ধ্বংস করেছি, তার চেয়েও ভয়ংকর হলো—আমরা নিজেদের চিন্তার ভেতর থেকেই প্রকৃতির সঙ্গে সম্পর্কটি হারিয়ে ফেলেছি।
উন্নয়ন বনাম ধ্বংসের বিভ্রান্তি
বাংলাদেশের নদী, মাটি, কৃষি, বৃষ্টি, বন ও জলাভূমি আমাদের সভ্যতার ভিত্তি। অথচ উন্নয়নের নামে আমরা অনেক সময় এমন কর্মকাণ্ডকে অগ্রাধিকার দিই, যা দীর্ঘমেয়াদে সেই ভিত্তিকেই দুর্বল করে।
নদী দখল করে স্থাপনা নির্মাণ, জলাভূমি ভরাট করে আবাসন, পাহাড় কেটে বসতি, অপরিকল্পিত নগরায়ণ, কৃষিজমি নির্বিচারে শিল্প ও বাণিজ্যিক ব্যবহারে নিয়ে আসা—এসবকে যদি উন্নয়নের স্বাভাবিক মূল্য হিসেবে মেনে নেওয়া হয়, তবে একদিন উন্নয়নই আমাদের সবচেয়ে বড় বিপদের কারণ হয়ে দাঁড়াবে।
একটি শহরে যত বেশি কংক্রিট ঢালা হয় কিন্তু পানি নিষ্কাশনের প্রাকৃতিক পথ যত বেশি বন্ধ করা হয়, জলাবদ্ধতার ঝুঁকি তত বাড়ে। নদীর প্রবাহ কমিয়ে দিলে বন্যা ও ভাঙনের চরিত্র বদলে যায়। বন ধ্বংস করলে শুধু গাছ হারায় না; হারায় মাটি, পানি, জীববৈচিত্র্য এবং জলবায়ুর ভারসাম্য। অর্থাৎ প্রকৃতির বিরুদ্ধে নেওয়া প্রতিটি সিদ্ধান্ত আসলে ভবিষ্যতের বিরুদ্ধে নেওয়া সিদ্ধান্ত।
আমাদের মূল সংকট কোথায়?
আমাদের প্রথম সংকট চেতনার। প্রকৃতিকে আমরা সম্পদ হিসেবে দেখি, উত্তরাধিকার হিসেবে নয়। দ্বিতীয় সংকট শিক্ষার—শিক্ষা আমাদের চাকরিপ্রার্থী বানিয়েছে, কিন্তু সব সময় দায়িত্বশীল নাগরিক বানাতে পারেনি। তৃতীয় সংকট নৈতিকতার—ব্যক্তিগত লাভকে অনেক সময় জনস্বার্থের ওপরে স্থান দেওয়া হয়।
চতুর্থ সংকট রাজনীতির। দীর্ঘমেয়াদি রাষ্ট্রীয় পরিকল্পনার পরিবর্তে স্বল্পমেয়াদি রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক স্বার্থ যখন সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করে, তখন পরিবেশ সবচেয়ে সহজ শিকার হয়। পঞ্চম সংকট নেতৃত্বের। একটি রাষ্ট্রকে শুধু জনপ্রিয় নেতা নয়, দূরদর্শী, জ্ঞানভিত্তিক, নৈতিক ও সাহসী নেতৃত্ব প্রয়োজন—যে নেতৃত্ব প্রয়োজন হলে জনপ্রিয়তার বিরুদ্ধেও সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে পারে।
কেমন নেতৃত্ব প্রয়োজন?
বাংলাদেশের সবচেয়ে জরুরি প্রয়োজন এমন এক নেতৃত্ব, যে শুধু ক্ষমতা পরিচালনা করবে না—রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ নির্মাণ করবে। দক্ষ নেতৃত্বের প্রথম বৈশিষ্ট্য হবে দীর্ঘমেয়াদি চিন্তা। পাঁচ বছর নয়, তাকে ভাবতে হবে পঞ্চাশ বছর পরের বাংলাদেশ নিয়ে। দ্বিতীয়ত, তাকে বিজ্ঞান ও তথ্যের ওপর সিদ্ধান্ত নিতে হবে। পরিবেশ, কৃষি, পানি, নগরায়ণ, অর্থনীতি ও জনসংখ্যা—সবকিছুকে বিচ্ছিন্নভাবে নয়, একটি সমন্বিত রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থার অংশ হিসেবে দেখতে হবে।
তৃতীয়ত, নেতৃত্বকে হতে হবে নৈতিক ও স্বার্থনিরপেক্ষ। নদী দখলদার যত শক্তিশালীই হোক, তার বিরুদ্ধে আইন প্রয়োগ করতে হবে। অবৈধ শিল্প যত অর্থই সৃষ্টি করুক, পরিবেশ ধ্বংস করলে তাকে জবাবদিহির আওতায় আনতে হবে।
চতুর্থত, নেতৃত্বকে জনগণকে সঙ্গে নিতে হবে। পরিবেশ রক্ষা শুধু আইন দিয়ে সম্ভবপর হবে না; মানুষের জীবনযাত্রা, কর্মসংস্থান ও অর্থনৈতিক বাস্তবতাকেও বিবেচনায় নিতে হবে।
সমাধান কোথায়?
প্রথম কাজ হওয়া উচিত বাংলাদেশের একটি জাতীয় পরিবেশ ও ভূ-ব্যবহার পরিকল্পনা তৈরি করা—যেখানে নদী, জলাভূমি, কৃষিজমি, বন, পাহাড়, উপকূল ও নগর এলাকার ব্যবহার বৈজ্ঞানিকভাবে নির্ধারিত থাকবে। কোনো সরকার বা ব্যক্তি যেন রাজনৈতিক ক্ষমতার জোরে সেই মৌলিক পরিকল্পনা নির্বিচারে পরিবর্তন করতে না পারে।
দ্বিতীয়ত, সব নদী ও জলাধারের সীমানা ডিজিটালভাবে চিহ্নিত করে অবৈধ দখল উচ্ছেদ করতে হবে। শুধু ছোট দখলদার নয়, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিকভাবে প্রভাবশালী দখলদারদের বিরুদ্ধেও একই আইন প্রয়োগ করতে হবে।
তৃতীয়ত, নগর পরিকল্পনায় কংক্রিটনির্ভর উন্নয়নের বদলে প্রাকৃতিক পানিপ্রবাহ, খাল, জলাধার ও সবুজ এলাকার সংরক্ষণ বাধ্যতামূলক করতে হবে।
চতুর্থত, কৃষিজমি রক্ষায় কঠোর ভূমি-ব্যবহার নীতি প্রয়োজন। একই সঙ্গে কৃষিকে লাভজনক করতে আধুনিক প্রযুক্তি, উন্নত বীজ, পানি ব্যবস্থাপনা, সংরক্ষণ ও বাজারব্যবস্থার সংস্কার করতে হবে। কারণ কৃষিজমি রক্ষা শুধু পরিবেশ রক্ষা নয়—খাদ্যনিরাপত্তা রক্ষা।
পঞ্চমত, শিক্ষাব্যবস্থায় পরিবেশকে পরীক্ষার একটি অধ্যায় না বানিয়ে জীবনদর্শনের অংশ করতে হবে। শিশুদের প্রকৃতির সঙ্গে পরিচিত করতে হবে; বিজ্ঞান, নৈতিকতা ও নাগরিক দায়িত্বকে একই শিক্ষাচিন্তার মধ্যে আনতে হবে।
ষষ্ঠত, শিল্পায়ন বন্ধ নয়—বরং সবুজ ও দায়িত্বশীল শিল্পায়ন নিশ্চিত করতে হবে। দূষণকারী শিল্পকে আধুনিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও পরিবেশগত মানদণ্ড মানতে বাধ্য করতে হবে এবং আইন ভঙ্গের ক্ষেত্রে জরিমানার বদলে প্রয়োজন অনুযায়ী কার্যকর শাস্তি ও ক্ষতিপূরণের ব্যবস্থা করতে হবে।
সপ্তমত, জলবায়ু পরিবর্তনের বাস্তবতা বিবেচনায় উপকূল, নদীভাঙনপ্রবণ অঞ্চল ও নগরাঞ্চলের জন্য আলাদা দীর্ঘমেয়াদি অভিযোজন পরিকল্পনা প্রয়োজন। দুর্যোগের পর ত্রাণ দেওয়ার চেয়ে দুর্যোগের আগে ঝুঁকি কমানো অনেক বেশি কার্যকর।
শেষ কথা
বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ শুধু অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির ওপর নির্ভর করছে না; নির্ভর করছে আমরা কেমন মানুষ, কেমন সমাজ এবং কেমন রাষ্ট্র তৈরি করতে পারি তার ওপর।
প্রকৃতি আমাদের শত্রু নয়। সে আমাদের আয়না। নদী শুকিয়ে গেলে, শহর ডুবে গেলে, মাটি অনুর্বর হলে, বাতাস বিষাক্ত হলে প্রকৃতি আমাদের ওপর প্রতিশোধ নেয় না—বরং আমাদের নিজেদের ভুলের হিসাব আমাদের সামনে তুলে ধরে।
তাই বাংলাদেশের প্রয়োজন শুধু নতুন সেতু, নতুন ভবন কিংবা নতুন শিল্প নয়; প্রয়োজন নতুন রাষ্ট্রচিন্তা। প্রয়োজন এমন নেতৃত্ব, যে আজকের করতালির চেয়ে আগামী প্রজন্মের নিরাপত্তাকে বেশি মূল্য দেবে; এমন শিক্ষা, যা মানুষকে শুধু দক্ষ নয়, বিবেকবান করবে; এমন অর্থনীতি, যা প্রকৃতিকে নিঃশেষ না করে সম্পদ সৃষ্টি করবে; এমন রাজনীতি, যেখানে রাষ্ট্রীয় স্বার্থ ব্যক্তিগত ও দলীয় স্বার্থের ঊর্ধ্বে থাকবে।
আমাদের সামনে পথ দুটি—একটি হলো প্রকৃতিকে জয় করার অহংকার, অন্যটি প্রকৃতির সঙ্গে সহাবস্থানের প্রজ্ঞা।
প্রথম পথ আমাদের সাময়িক সাফল্য দিতে পারে, কিন্তু শেষ পর্যন্ত ধ্বংস ডেকে আনবে। দ্বিতীয় পথ কঠিন, ধীর এবং রাজনৈতিকভাবে সব সময় জনপ্রিয় নয়—কিন্তু সেটিই টেকসই বাংলাদেশের পথ।
প্রকৃতির প্রতিশোধ থেকে বাঁচার জন্য প্রকৃতিকে পরাজিত করতে হবে না; আমাদের পরাজিত করতে হবে আমাদের নিজেদের লোভ, অজ্ঞতা, দুর্নীতি, স্বল্পদৃষ্টিতা ও দায়িত্বহীনতাকে।
আর সেদিনই প্রকৃতি প্রতিশোধ নেওয়া বন্ধ করবে না—বরং আমাদের সঙ্গে আবার সহাবস্থান শুরু করবে।
লেখক : কবি, রাষ্ট্রচিন্তক ও পর্যটন বিশেষজ্ঞ।