বৃহস্পতিবার, ০৮ অক্টোবর ২০২৬

বৃহস্পতিবার, ০৮ অক্টোবর ২০২৬

বিজ্ঞাপন
স্বজন ও শুভানুধ্যায়ীদের ভালোবাসায় সিক্ত গণউন্নয়ন কেন্দ্রের প্রতিষ্ঠাতা আব্দুস সালাম

নিউইয়র্কের আড্ডায় ফিরে এল গাইবান্ধা

নিউইয়র্কের আড্ডায় ফিরে এল গাইবান্ধা

এম. আব্দুস সালাম ও তাঁর সহধর্মিনী শামীমা মাহমুদা ইয়াসমিনকে ফুল দিয়ে শুভেচ্ছা জানান শুভানুধ্যায়ীরা। ছবি-ঠিকানা

বিজ্ঞাপন
রাত বাড়ছিল, আড্ডা ফুরাচ্ছিল না। একজনের স্মৃতিচারণ শেষ হতে না হতেই আরেকজন ফিরে যাচ্ছিলেন গাইবান্ধায়—গণউন্নয়ন কেন্দ্রের (জিউকে) কার্যালয়ে কাটানো সময় আর সেখানকার আন্তরিক আতিথেয়তার স্মৃতিতে। নিউইয়র্কের জ্যাকসন হাইটসের সানাই রেস্টুরেন্টে বসেও কথায় কথায় ফিরে আসছিল বাংলাদেশের উত্তরের জনপদটি।

এই আড্ডার মধ্যমণি ছিলেন গাইবান্ধাভিত্তিক বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা গণউন্নয়ন কেন্দ্রের (জিউকে) প্রতিষ্ঠাতা ও নির্বাহী প্রধান এম আব্দুস সালাম। সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্র সফরে আসা আব্দুস সালাম ৫ অক্টোবর সোমবার সপরিবারে নিউইয়র্কে পৌঁছান। সন্ধ্যায় তাঁকে ঘিরে একত্র হন স্বজন ও শুভানুধ্যায়ীরা।

আড্ডায় উপস্থিত ছিলেন এম. আব্দুস সালামের সহধর্মিণী, জিউকের প্রতিষ্ঠাতা সদস‍্য ও বিশিষ্ট সমাজসেবিকা শামীমা মাহমুদা ইয়াসমিন এবং তাদের ছেলে জিউকের অন‍্যতম পরিচালক আবু সায়েম মো. জান্নাতুল নূর রিশাত। 

আড্ডায় জমিয়ে রেখেছিলেন আড্ডার আয়োজক এবং অনলাইন সংবাদ পোর্টাল ‘সন্ধান’-এর সম্পাদক সনজীবন কুমার সরকার ও তাঁর সহধর্মিণী প্রতিমা সরকার, ঠিকানার বার্তা সম্পাদক শহীদুল ইসলাম, এটিএন বাংলা ও এটিএন নিউজের যুক্তরাষ্ট্রের বার্তা সম্পাদক কানু দত্ত, প্রজ্ঞা সম্পাদক উত্তম কুমার সাহা, সংস্কৃতিকর্মী দিলীপ মোদক, নিগার নাঈম তমা, লিনা আহমেদ, বঙ্কীম সাহা, রানা আহমেদ প্রমূখ। 

দেখা হওয়ার আনন্দে জমে ওঠে আলাপ। যাঁরা আগে জিউকে ঘুরে এসেছেন, তাঁদের স্মৃতিতে প্রতিষ্ঠানটির কাজের পাশাপাশি বারবার উঠে আসে সেখানকার মানুষের আন্তরিকতা। দূরদেশের এই মিলনসন্ধ্যায় সেই পুরোনো পরিচয়গুলো যেন নতুন করে উষ্ণ হয়ে ওঠে।

এম. আব্দুস সালামও সবাইকে গাইবান্ধায় জিউকে পরিদর্শন ও আতিথেয়তা গ্রহণের আমন্ত্রণ জানান। তিনি বলেন, “প্রবাস থেকে কেউ জিউকে ভ্রমণে গেলে আনন্দিত হই।” নিউইয়র্কে পরিচিতজনদের কাছে পেয়ে নিজের ভালো লাগার কথাও জানান তিনি। বলেন, “নিউইয়র্কে বেড়াতে এসে পরিচিত সবার সঙ্গে দেখা হলে খুব ভালো লাগে।”

এম. আব্দুস সালামের জীবনের সঙ্গে জড়িয়ে আছে গণউন্নয়ন কেন্দ্রের চার দশকের পথচলা। ১৯৮৫ সালে গাইবান্ধায় প্রতিষ্ঠিত সংস্থাটি প্রান্তিক ও সুবিধাবঞ্চিত মানুষের জীবনমান উন্নয়নের লক্ষ্য নিয়ে যাত্রা শুরু করে। দারিদ্র্য, বন্যা ও নদীভাঙনে বিপর্যস্ত জনপদে শুরু হওয়া উদ্যোগটি ধীরে ধীরে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে বিস্তৃত হয়েছে। সংস্থার বর্তমান পরিচিতি অনুযায়ী, ১৭ জেলায় উন্নয়ন ও মানবিক সহায়তা কার্যক্রম পরিচালনা করছে জিউক। নারী ও শিশু এই কাজের বিশেষ অগ্রাধিকার।

এই উদ্যোগের পেছনে ছিল এম. আব্দুস সালামের নিজের জীবনের অভিজ্ঞতাও। শৈশবে পরিবারের আর্থিক সংগ্রাম এবং মায়ের পরিশ্রম তাঁকে দরিদ্র মানুষের জন্য কাজ করতে উদ্বুদ্ধ করেছিল। শুরুর দিকে স্ত্রীর সহযোগিতা এবং পরে নিজের চাকরির আয় দিয়ে সংস্থার কাজ এগিয়ে নেন। ১৯৮৭ সালের ভয়াবহ বন্যায় ত্রাণ কার্যক্রম পরিচালনা জিউকের বিকাশে একটি গুরুত্বপূর্ণ বাঁক হয়ে ওঠে। 

শিক্ষা, জীবিকার সুযোগ সৃষ্টি, নারীর ক্ষমতায়ন, দুর্যোগ মোকাবিলা ও জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকিতে থাকা মানুষের পাশে দাঁড়ানো—বিভিন্ন ক্ষেত্রে কাজ করছে সংস্থাটি।

জিউকের প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, অতিদরিদ্র পরিবারের ৩২ হাজারের বেশি নারী-পুরুষকে দক্ষতা ও মানবসম্পদ উন্নয়ন প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে। প্রত্যন্ত চরাঞ্চলে বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা, ঝরে পড়া শিশুদের জন্য উপানুষ্ঠানিক শিক্ষা এবং প্রতিবন্ধী শিশুদের শিক্ষায় অন্তর্ভুক্তির উদ্যোগও এর দীর্ঘদিনের কাজের অংশ। 

এই শিক্ষা উদ্যোগের নতুন সংযোজন জিইউকে রেসিডেন্সিয়াল মডেল স্কুল অ্যান্ড কলেজ। গাইবান্ধা শহরসংলগ্ন নশরৎপুরে প্রতিষ্ঠিত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানটির আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন হয় ২০২৪ সালের ৯ নভেম্বর। উদ্বোধন করেন সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা ড. হোসেন জিল্লুর রহমান। 

প্রায় ২০ বিঘা জায়গাজুড়ে গড়ে ওঠা এই প্রতিষ্ঠানে ২০২৫ সালে শিক্ষাকার্যক্রম শুরু হয়। আবাসন ও খেলার মাঠের পাশাপাশি রয়েছে বিজ্ঞান, ভাষা, বিতর্ক, সাংস্কৃতিক চর্চা ও রোবটিকসের সুযোগ। পড়ালেখার সঙ্গে সৃজনশীলতা, যোগাযোগের দক্ষতা এবং ভালো নাগরিক হিসেবে গড়ে ওঠার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। সালামের ভাষ্য অনুযায়ী, প্রতিষ্ঠানটির আয় এর উন্নয়ন এবং জিউকের অন্যান্য শিক্ষা কর্মসূচিতে ব্যয় করার লক্ষ্য রয়েছে। 

গাইবান্ধার সেই দীর্ঘ পথচলার মানুষটিকে এদিন নিউইয়র্কে পাওয়া গেল স্বজনদের মধ্যে। কাজের পরিচয়ের পাশে উঠে এল ব্যক্তিগত সম্পর্ক, পুরোনো দিনের কথা আর আবার দেখা হওয়ার আনন্দ।

রাত বাড়ছিল। গাইবান্ধার আতিথেয়তার স্মৃতি নিয়ে শুরু হওয়া আড্ডায় এবার যোগ হলো নিউইয়র্কের আরেকটি সন্ধ্যা। আর বিদায়ের আগে রইল আব্দুস সালামের আমন্ত্রণ—দেশে গেলে জিউকে আসবেন।

নিউজটি শেয়ার করুন


© 2026 All Rights Reserved by Thikana Group Of Media
Maintained by SolveEz