বুধবার, ১৪ অক্টোবর ২০২৬

বুধবার, ১৪ অক্টোবর ২০২৬

বিজ্ঞাপন

নিউইয়র্কে ‘পাইরেটেড’  ঢালিউড অ্যাওয়ার্ড!

ঢাকায় ৮ জানুয়ারি ২৬তম আসরের আয়োজক আলমগীর খান আলম ০ দেশে বাংলা সিনেমার আকাল, তবু পুরষ্কারের আয়োজন আমেরিকায়
নিউইয়র্কে ‘পাইরেটেড’  ঢালিউড অ্যাওয়ার্ড!

বিজ্ঞাপন
বাংলাদেশের চলচ্চিত্রশিল্প যখন দর্শকসংকট, প্রেক্ষাগৃহের সংখ্যা হ্রাস, নির্মাণব্যয় বৃদ্ধি ও ব্যবসায়িক অনিশ্চয়তাসহ নানা সংকটের মুখোমুখি, তখন বিশ্বের রাজধানী খ্যাত ও সবচেয়ে ব্যয়বহুল শহর যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কে অনুষ্ঠিত ‘ঢালিউড ফিল্ম অ্যান্ড মিউজিক অ্যাওয়ার্ড’ নিয়ে সৃষ্টি হয়েছে নতুন বিতর্ক। অনুষ্ঠানের মান, পুরস্কারপ্রাপ্তদের নির্বাচন প্রক্রিয়া ও আয়োজনের স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন দর্শকদের একাংশ। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন-নিউইয়র্কে অনুষ্ঠিত আসরটি কি মূল ঢালিউড অ্যাওয়ার্ডের ধারাবাহিক আয়োজন, নাকি একই নামে পৃথক উদ্যোগ? 
বিতর্কের সূত্রপাত মূলত ঢালিউড অ্যাওয়ার্ডের প্রবর্তক ও শোটাইম মিউজিকের কর্ণধার আলমগীর খান আলমের আগামী ২০১৭ সালের ৮ জানুয়ারি ঢাকায় ২৬তম আসর আয়োজনের ঘোষণাকে কেন্দ্র করে। 
অন্যদিকে, আলমগীর খান আলম যুক্তরাষ্ট্র ছেড়ে যাওয়ার পর নিউইয়র্কে ঢালিউড অ্যাওয়ার্ড আয়োজনের দায়িত্ব নিয়েছেন তাঁর একসময়ের সহযোগী খায়রুল ইসলাম খোকন। তিনি নিজেকে শোটাইম মিউজিকের প্রেসিডেন্ট এবং ঢালিউড অ্যাওয়ার্ডের আয়োজক হিসেবে দাবি করছেন।
গত ১০ অক্টোবর শনিবার নিউইয়র্কে অনুষ্ঠিত ঢালিউড অ্যাওয়ার্ডের আয়োজন নিয়ে ঠিকানার সঙ্গে কথা বলেন খায়রুল ইসলাম খোকন। তাঁর দাবি, তিনিই ঢালিউড অ্যাওয়ার্ডের বর্তমান আয়োজক এবং শোটাইম মিউজিকের প্রেসিডেন্ট। নিউইয়র্কের সর্বশেষ আসরটি তিনি এককভাবে আয়োজন করেছেন। তাঁর স্পনসরশিপে আট থেকে নয়জন শিল্পী যুক্তরাষ্ট্রের ভিসা পেয়েছেন বলেও জানান তিনি। তবে বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের জনপ্রিয় তারকা শাকিব খান যুক্তরাষ্ট্রের স্থায়ী বাসিন্দা হওয়ায় তাঁর ভিসার প্রয়োজন হয়নি।
নিউইয়র্কে অনুষ্ঠিত এবারের ঢালিউড অ্যাওয়ার্ডের মান নিয়ে দর্শকদের একাংশের মধ্যে অসন্তোষ দেখা দিয়েছে। কেউ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন, আবার অনেকে নিজেদের হতাশার কথা জানিয়েছেন।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক দর্শক বলেন, ‘শাকিব খান ছাড়া দর্শকদের আকৃষ্ট করার মতো তেমন কোনো তারকা ছিলেন না। মঞ্চে যাকে-তাকে পুরস্কার দেওয়া হয়েছে। শাকিব খান আগেও ঢালিউড অ্যাওয়ার্ডে এসেছেন। শুধু তাঁকে বারবার দেখানোয় নতুন কোনো আকর্ষণ তৈরি হয় না। আগে এই অনুষ্ঠানে অনেক গুণী শিল্পীর উপস্থিতি থাকত। এবারের আয়োজন আমাদের হতাশ করেছে।’
নিউইয়র্কের বিশিষ্ট অ্যাটর্নি মঈন চৌধুরীও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে অনুষ্ঠানের বিষয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন। তিনি লিখেছেন, ‘আজ নিউইয়র্কে ঢালিউড অ্যাওয়ার্ড অনুষ্ঠানে নায়ক শাকিব খানের শুধুমাত্র অ্যাওয়ার্ড বিতরণ ছাড়া কোনো পারফরম্যান্স না থাকায়, টিকিট কিনে হতাশ বলে অনেকে অভিযোগ করেন। অনুষ্ঠানের একজন ক্ষুদ্র স্পনসর হিসেবে আমি দুঃখিত।’
অনুষ্ঠানের অন্যতম আকর্ষণ হিসেবে শাকিব খানের উপস্থিতি প্রচার করা হলেও তাঁর কোনো মঞ্চ পরিবেশনা না থাকায় দর্শকদের একাংশ হতাশ হয়েছেন বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে।
এবারের ঢালিউড ফিল্ম অ্যান্ড মিউজিক অ্যাওয়ার্ডে প্রায় ৩০ জনকে পুরস্কৃত করা হয় বলে জানা গেছে। এত বিপুলসংখ্যক পুরস্কার বিতরণের যৌক্তিকতা ও মর্যাদা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন দর্শকদের কেউ কেউ। বিশেষ করে পুরস্কারপ্রাপ্তদের নির্বাচনের মানদণ্ড, বিচারকমণ্ডলীর পরিচয় এবং মূল্যায়নপ্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন সমালোচকেরা। এমনকি অর্থ ও স্পনসরশিপের বিনিময়ে পুরস্কার প্রদানের অভিযোগও উঠেছে। তবে এসব অভিযোগের পক্ষে স্বাধীনভাবে যাচাই করা প্রমাণ পাওয়া যায়নি।
ঢালিউড অ্যাওয়ার্ডকে ঘিরে পুরস্কার বাণিজ্যের অভিযোগ অবশ্য নতুন নয়। অতীতেও কাকে, কী বিবেচনায় পুরস্কৃত করা হচ্ছে এবং আয়োজকদের সঙ্গে আর্থিক বা ব্যবসায়িক সম্পর্ক পুরস্কার নির্বাচনে প্রভাব ফেলছে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
দীর্ঘ পুরস্কার বিতরণ পর্ব, অতিরিক্ত বক্তব্য, সাংস্কৃতিক পরিবেশনার মান এবং ঘোষিত তারকাদের উপস্থিতি নিয়েও বিভিন্ন সময়ে অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন দর্শকেরা। সমালোচকদের মতে, একসময় প্রবাসী বাংলাদেশিদের কাছে অন্যতম আকর্ষণীয় বিনোদন আয়োজন হিসেবে পরিচিত ঢালিউড অ্যাওয়ার্ড ক্রমেই তার আগের জৌলুশ হারাচ্ছে। তবে এসব সমালোচনার সঙ্গে একমত নন আয়োজক খায়রুল ইসলাম খোকন। অনুষ্ঠানের মান সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘সবাই অনুষ্ঠানের প্রশংসা করেছেন। সবাই বলেছেন, খুব ভালো অনুষ্ঠান হয়েছে।’
এদিকে, অনুষ্ঠানে অংশ নিতে যুক্তরাষ্ট্রে আসা কয়েকজন নারী শিল্পীর ব্যক্তিগত ভ্রমণ ও বিভিন্ন ব্যক্তির সঙ্গে সময় কাটানোকে কেন্দ্র করেও প্রবাসী মহলে আলোচনা তৈরি হয়েছে।
অভিযোগ উঠেছে, কয়েকজন শিল্পীর সঙ্গে অর্থের বিনিময়ে কথিত কয়েকজন চিহ্নিত ব্যক্তি, যারা সারা বছর নায়িকাদের সান্নিধ্য পেতে মুখিয়ে থাকেন, তাদের তৎপরতা এ বছরও ছিল চোখে পড়ার মত। পি-৩ ভিসায় ঢালিউড অ্যাওয়ার্ড অনুষ্ঠানে আসা এসব নারী শিল্পী (একজন নায়িকাও রয়েছেন) নিউইয়র্কে ‘বিশেষ প্যাকেজ’ ঘোষণা করেছেন বলে কথিত আছে। একটি নির্দিষ্ট পরিমাণ অর্থ দিলেই তাদের সঙ্গে শপিং ও ভ্রমণ অর্থাৎ ডে আউটে যাওয়ার সুযোগ দেওয়া হচ্ছে। ইতিমধ্যে একজন নায়িকাকে দেখা গেছে বিভিন্ন জায়গায় কথিত একজন ব্যবসায়ীর সঙ্গে। নায়িকাকে বিলাসবহুল গাড়ি সেবা দিয়েছেন। শপিং মলে ঘুরেছেন। দেখা গেছে অ্যাপল স্টোরে। আরেকজন নারী শিল্পী গেছেন নিউইয়র্কের বাইরে লং ড্রাইভে। এটি লং ড্রাইভ ছিল নাকি অন্য স্টেটে বেড়াতে গেছেন তা নিশ্চিত হওয়া যায়নি। 
এ বিষয়ে আয়োজক খায়রুল ইসলাম খোকনকে প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেন, ‘যাঁরা পি-৩ ভিসায় এসেছেন, ১২ তারিখ পর্যন্ত তাঁরা আমার তত্ত্বাবধানে ছিলেন। এরপর তাঁরা কে কোথায় গেলেন বা যাবেন, কী করবেন, এটা তাঁদের ব্যাপার।’ 
তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, অনুষ্ঠানের পর শিল্পীদের ব্যক্তিগত কর্মকাণ্ডের দায়িত্ব আয়োজক হিসেবে তিনি নিচ্ছেন না।
এবারের আয়োজনকে ঘিরে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন তৈরি হয়েছে ঢালিউড অ্যাওয়ার্ডের প্রকৃত আয়োজকত্ব নিয়ে। দীর্ঘদিন ধরে শোটাইম মিউজিকের ব্যানারে ঢালিউড অ্যাওয়ার্ড আয়োজন করে আসছিলেন আলমগীর খান আলম। নিউইয়র্কের প্রবাসী বাংলাদেশিদের কাছে অনুষ্ঠানটির পরিচিতি গড়ে তোলার পেছনে তাঁর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। কিন্তু তিনি যুক্তরাষ্ট্র ছেড়ে যাওয়ার পর তাঁর একসময়ের সহযোগী খায়রুল ইসলাম খোকন একই নামে অনুষ্ঠান আয়োজন অব্যাহত রেখেছেন। খোকনের দাবি, তিনিই এখন শোটাইম মিউজিকের প্রেসিডেন্ট এবং ঢালিউড অ্যাওয়ার্ডের আয়োজক।
অন্যদিকে, ঢালিউড অ্যাওয়ার্ডের প্রবর্তক আলমগীর খান আলম আগামী ৮ জানুয়ারি ঢাকায় অনুষ্ঠানটির ২৬তম আসর আয়োজনের ঘোষণা দিয়েছেন। ফলে একই আয়োজনের নাম ও ঐতিহ্যের দাবিদার দুই পক্ষের অবস্থান নিয়ে বিভ্রান্তি তৈরি হয়েছে।
নিউইয়র্কে আলমগীর খান আলমের ঘনিষ্ঠ এক বন্ধু ঠিকানাকে বলেন, ‘আলমগীর খান আলম যুক্তরাষ্ট্র ছেড়ে দেশে ফিরে যাওয়ার পর সেই সুযোগ কাজে লাগিয়েছেন তাঁর একসময়ের সহকারী খায়রুল ইসলাম খোকন।’
তিনি গত ১০ অক্টোবর নিউইয়র্কে অনুষ্ঠিত ঢালিউড অ্যাওয়ার্ডকে ‘পাইরেটেড’ আয়োজন বলে দাবি করেন।
এ বিষয়ে খায়রুল ইসলাম খোকন বলেন, আলমগীর খান আলম চলে যাওয়ার পর তিনি ঢালিউড অ্যাওয়ার্ডের ধারাবাহিকতা রক্ষা করে চলেছেন। ভবিষ্যতে ভুলত্রুটি সংশোধন করে আরও ভালো অনুষ্ঠান উপহার দেওয়ার আশ্বাসও দেন তিনি।
একসময় নিউইয়র্কে ঢালিউড অ্যাওয়ার্ড ছিল প্রবাসী বাংলাদেশিদের জন্য বছরের অন্যতম আলোচিত সাংস্কৃতিক আয়োজন। বাংলাদেশের চলচ্চিত্র ও সংগীতজগতের প্রতিষ্ঠিত শিল্পীদের উপস্থিতি, সাংস্কৃতিক পরিবেশনা এবং তারকাদের কাছ থেকে দেখার সুযোগ অনুষ্ঠানটিকে বিশেষ আকর্ষণ এনে দিয়েছিল। কিন্তু সাম্প্রতিক আয়োজনগুলো ঘিরে দর্শকদের একাংশের অভিযোগ, সেই আকর্ষণ ও গ্রহণযোগ্যতা ক্রমেই কমছে। এবার অনুষ্ঠানের মান নিয়ে অসন্তোষের পাশাপাশি আয়োজকত্বের বৈধতা ও পুরস্কার নির্বাচনের স্বচ্ছতা নিয়েও প্রশ্ন সামনে এসেছে।
আলমগীর খান আলমের ঢাকায় ২৬তম আসর আয়োজনের ঘোষণার পর প্রশ্নটি আরও তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে উঠেছে-ঢালিউড অ্যাওয়ার্ডের নাম, ঐতিহ্য ও আয়োজনের স্বত্ব আসলে কার? 
এ প্রশ্নের গ্রহণযোগ্য নিষ্পত্তির জন্য দুই পক্ষের দাবি, প্রতিষ্ঠানের মালিকানা এবং আয়োজনের স্বত্বসংক্রান্ত নথি স্পষ্ট হওয়া প্রয়োজন। কারণ ঢালিউড অ্যাওয়ার্ড কেবল একটি অনুষ্ঠানের নাম নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে প্রবাসী বাংলাদেশিদের দীর্ঘদিনের আবেগ, প্রত্যাশা ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য। সেই ঐতিহ্যের মর্যাদা রক্ষা করতে হলে শুধু পুরস্কারের সংখ্যা বাড়ালেই চলবে না, ফিরিয়ে আনতে হবে আয়োজনের স্বচ্ছতা, মান ও দর্শকদের আস্থা।

নিউজটি শেয়ার করুন


© 2026 All Rights Reserved by Thikana Group Of Media
Maintained by SolveEz