সাইলেন্ট বারুদে ঢাকা 💣 গুজব-উসকানির আনলিমিটেড ফান্ড
আর্মি-বিজিবি চিফকে চটানো-হটানোর ব্লুপ্রিন্ট
ঠিকানা রিপোর্ট
প্রকাশ : ১৪ অক্টোবর ২০২৬, ১১:১৯
•
অনলাইন সংস্করণ
দুর্ভিক্ষ নয়, একদিকে অভাব-অনটন; আরেকদিকে গত মাস কয়েকে কিছু লোকের অকল্পনীয় বিত্তবৈভবের ক্ষোভে ফুঁসছে বাংলাদেশ। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, গত ১৮ মাসে দেশে নতুন করে ১২ হাজারের বেশি লোক কোটিপতি হয়েছে। এর বিপরীতে বাংলাদেশে মূল্যস্ফীতি এখন ৮.৩৪ শতাংশ। এ নিয়ে দৃশ্যত আওয়াজ নেই, ভেতরে ভেতরে চলছে ফোঁসফাঁস।
এর জেরে বিস্ফোরণটা কখন, কীভাবে ঘটবে—সেই অপেক্ষা উৎসাহী মহলে। ক্ষমতায় এলে প্রথম ১৮ মাসে ১ কোটি কর্মসংস্থানের অঙ্গীকার ছিল বিএনপির। সেখানে নতুন আরও বেকার তৈরি হয়েছে। বিশ্বব্যাংকের সাম্প্রতিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, এক বছরের ব্যবধানে বাংলাদেশে প্রায় ২১ লাখ মানুষ নতুন করে দারিদ্র্যসীমার নিচে নেমে গেছেন। জাতীয় দারিদ্র্যের হার বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২২.৫ শতাংশে। নিম্ন মধ্যবিত্ত শ্রেণিতে থাকা আরও প্রায় ৬ কোটি ২০ লাখ মানুষ দরিদ্র হয়ে পড়ার ঝুঁকিতে। এমন ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থার মাঝে মূল্যস্ফীতির সাইলেন্ট বারুদ। এ বারুদের শব্দ নেই, গন্ধও নেই। ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে হাটে-ঘাটে-মাঠে। তা শীতাতপনিয়ন্ত্রিত প্রাসাদকে উত্তপ্ত করে না, ক্ষমতার করিডোরে হাঁটে না। পরিসংখ্যান ছাড়া দেখা না যাওয়া এ বারুদ সময়দৃষ্টে আরও কিছুর রসায়নে অঘটন ঘটায় ৮২, ৯০, ২০০৭ বা ২০২৪ এর মতো।
চতুর মহল তাই চলমানে ঘুরতে থাকা বারুদটির বিস্ফোরণ চায়। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান দলীয় এমপি ও নেতাদের সতর্ক করেছেন। বলেছেন, রাজনৈতিক পরিস্থিতি যেদিকে যাচ্ছে, তাতে অচিরেই ‘স্বৈরাচার’ ও ‘গুপ্ত’রা একসঙ্গে হতে পারে। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির কাঙ্ক্ষিত উন্নতি না হওয়ার কথা জানিয়ে তারেক রহমান সংসদ সদস্যদের উদ্দেশে বলেন, সরকারকে অনেক বৈরী পরিস্থিতি মোকাবিলা করতে হচ্ছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমগুলোতে সরকারের বিরুদ্ধে রীতিমতো মব সৃষ্টি করা হচ্ছে। সংসদ সদস্যদের বৈরী পরিস্থিতি মোকাবিলায় প্রস্তুত থাকার কথা বলেন তিনি। আসন্ন দুর্গাপূজা উপলক্ষে দলের নেতা-কর্মীদের সতর্ক থাকার নির্দেশও দিয়েছেন। অন্যদিকে সুচতুর মহলটি ব্যস্ত নানা কারসাজিতে। তাদের এখন বিশেষ টার্গেট সেনাসহ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও বাহিনীগুলোর প্রধানেরা। রীতিমতো কাঠগড়ায় দাঁড় করানোর চেষ্টা সেনাপ্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান এবং বিজিবির প্রধান মেজর জেনারেল মোহাম্মদ আশরাফুজ্জামান সিদ্দিকীকে। সোশ্যাল তথা ভার্চুয়াল মিডিয়া এবং অনলাইনভিত্তিক প্ল্যাটফর্মে বাহিনী, বাহিনী প্রধান ও শীর্ষ কর্মকর্তাদের নিয়ে যাচ্ছেতাই কল্প-কিচ্ছা বানানোর ধুম পড়েছে নতুন করে। তাদেরকে অপমান, বিরক্ত, চটানো, খেপানোর কনটেন্ট তৈরির বাজেট বিশাল। শত উসকানিতেও ধৈর্যশীল-ক্যারিশমাটিক সেনাপ্রধানকে যেকোনো মূল্যে চটানোর হেন চেষ্টা নেই, যা না করা হচ্ছে। বিজিবিকে বুলিংয়ে বিভ্রান্তিকর ও চরম উদ্দেশ্যপ্রণোদিত তথ্য বাজারজাত করতে গিয়ে চব্বিশের জুলাই-আগস্টের ঘটনাবলিকে এমনভাবে তরতাজা করা হচ্ছে, যেন এগুলো কয়েক দিন আগের ঘটনা। বিজিবির এ-যাবৎকালের অন্যতম চৌকস ডিজি আশরাফুজ্জামান সম্পর্কে কেবল অপতথ্য নয়, মনগড়া সিনেমাটিক ভিডিও পর্যন্ত ছেড়ে দেওয়া হয়েছে। এতে চব্বিশের জুলাই-আগস্টে বিজিবির গুলিতে ৮৬ জন নিহতের দাবিই নয়, বিভিন্ন জায়গায় নির্বিচার গুলিবর্ষণ এবং ঊর্ধ্বতন পর্যায় থেকে প্রাণঘাতী অস্ত্র ব্যবহারের নির্দেশ দেওয়ার মতো অভিযোগ পর্যন্ত দাঁড় করানো হয়েছে বিশেষ অ্যাজেন্ডায়।
চব্বিশের ৫ আগস্ট পরবর্তীতে রূপান্তরিত পরিস্থিতিতে জনগণকে সঙ্গী করে একদিকে সেনাবাহিনীকে জনতার নিরাপত্তাসহ যাবতীয় কাজে নিয়োগ রাখার ঘটনা বাহিনীটির প্রধানের প্রশংসা গোটা বিশ্বে আলোচিত। আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে প্রশংসিত। অন্যদিকে সীমান্ত হত্যা, পুশইন, কাঁটাতার স্থাপন, মাদক ও মানবপাচার প্রতিহত করা, মিয়ানমার সীমান্তের অস্থিতিশীলতা এবং পার্বত্য চট্টগ্রামের প্রত্যন্ত অঞ্চলে সশস্ত্র সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে বিজিবির সাহসী ভূমিকা বাহিনীটির প্রধানসহ বিজিবি জনমনে কেবল আস্থা ফেরায়নি, নতুন ভরসাও জাগিয়েছে। আন্তর্জাতিক আইন অমান্য করে ভারতীয় রক্ষীবাহিনী বিএসএফের যেকোনো ‘পুশইন’ রুখে দিচ্ছে দৃঢ়তার সঙ্গে। দেশের সীমান্ত ও সার্বভৌমত্ব রক্ষায় এ কার্যক্রমে স্বতঃস্ফূর্তভাবে স্থানীয়দের সম্পৃক্ত করতে পারা একটি মাইলফলক ঘটনা, যা একটি মহলের কাছে ঈর্ষণীয় হওয়া অস্বাভাবিক নয়। তাদের সেই ঈর্ষা এখন চলে গেছে শত্রুতার পর্যায়ে। এর প্রতিশোধের অংশ হিসেবে বিজিবির শীর্ষ নেতৃত্বকে প্রমাণহীন ব্যক্তিগত আক্রমণের অপচেষ্টা। সেই সঙ্গে সেনাবাহিনীতে একটি কেওয়াজ বাধানোর হাইভোল্টেজ আয়োজন।
গুজব ও ভুয়া কনটেন্ট বানিয়ে মানুষের মনোবল ভেঙে দেওয়া বর্তমানে একটি সুপরিকল্পিত এবং আন্তর্জাতিক স্তরের মাস্টারপ্ল্যান। তথ্যপ্রযুক্তির অপব্যবহার এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমকে হাতিয়ার করে এ অপতৎপরতার ফের একদম না বোঝার নয়। উদ্দেশ্য পরিষ্কার। প্রথমত, সঠিক তথ্যের অনুপস্থিতিতে বিভ্রান্তি ছড়িয়ে রাষ্ট্রে বা সমাজে বিশৃঙ্খলা ও দাঙ্গা-হাঙ্গামা তৈরি করা। দ্বিতীয়ত, প্রচলিত শাসনব্যবস্থা, দেশের উন্নয়নমূলক কাজ এবং মূলধারার গণমাধ্যমের ওপর থেকে মানুষের আস্থা ধূলিসাৎ করা। যেকোনো চাঞ্চল্যকর খবর বা ভিডিও দেখেই বিশ্বাস না করে বিশ্বস্ত তথ্য যাচাইকারী সাইট বা মূলধারার গণমাধ্যমের খবর মিলিয়ে দেখার প্রবণতা গড়ে না ওঠার সুযোগটিই নিচ্ছে তারা। বাংলাদেশের মতো দুর্যোগ-দুর্বিপাকসহ জাতীয় নানা প্রয়োজনে সেনাবাহিনীর ওপর ভরসা করার দৃষ্টান্ত বিশ্বে কম দেশেই আছে। আবার সেনাবাহিনী নিয়ে অবান্তর কথা, আজেবাজে ন্যারেটিভ তৈরির প্রবণতাও বিশ্বে বিরল। আরোপিত দোষারোপ, উড়িয়ে দেওয়া, গুঁড়িয়ে দেওয়া, ইট খুলে ফেলা, বিলুপ্ত করে দেওয়ার মতো কিছু একটা বলে কিছুদিন ঝিম মেরে থাকার মহলটি চিহ্নিত। চব্বিশের জুলাই-আগস্ট বিপ্লবের পর মাঝেমধ্যেই এ প্রবণতা ভর করছে। সেই সঙ্গে আচানক-আজগুবি, রাতের ঘুম নষ্ট করা গুজবের হাট। তাদের শনাক্তের চেষ্টায় সফল হতে পারছে না সরকার।
এ সীমাবদ্ধতার মাঝেই সরকারবিরোধী কার্যক্রমে যুক্ত থাকার অভিযোগে গ্রেপ্তার করা হয়েছে অবসরপ্রাপ্ত লেফটেন্যান্ট কর্নেল বিজয় দেবাশীষ নারায়ণ পাল ও লেফটেন্যান্ট কাজী গুলশান আরাকে। তাদের বিরুদ্ধে চাঞ্চল্যকর তথ্য উঠে এসেছে। অভিযোগ উঠেছে, শতাধিক অবসরপ্রাপ্ত সেনা কর্মকর্তাকে নিয়ে গঠিত বঙ্গবন্ধু সেনা পরিষদের সক্রিয় সদস্য তারা। নিজেদের নামসহ বিভিন্ন নামে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সরকারের বিরুদ্ধে অপপ্রচার চালিয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে ঘৃণা ছড়িয়ে দেশে অস্থিতিশীল পরিস্থিতি তৈরি করার চেষ্টা চালাচ্ছিলেন তারা। একই সঙ্গে সাবেক সেনাপ্রধান জেনারেল আজিজ, সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীসহ বিভিন্ন দেশের গুপ্তচরের সঙ্গে তাদের নিয়মিত যোগাযোগের কিছু তথ্য ঘুরছিল কয়েক দিন ধরেই।