এই ছাত্রছাত্রীরা, তোমরা শোনো-চোর কি কখনো নিজের ঘর থেকে চুরি করে? কখনো না। অথচ তোমরা নিজেদের পরিবার থেকে টাকা-পয়সা নিয়ে এসে আড্ডা দাও, বন্ধুবান্ধব মিলে এখানে-সেখানে ঘুরে বেড়াও; পড়ালেখার কোনো খোঁজখবর নেই। বাবাকে চিঠি লেখো, টাকা লাগবে। বাবা মাথার ঘাম পায়ে ফেলে হাড়ভাঙা পরিশ্রম করে টাকা উপার্জন করেন এবং ডাকযোগে সেই টাকা পাঠিয়ে দেন। আর তোমরা সেই টাকা নিয়ে এসে পড়াশোনা না করে খাও-দাও, ঘুমাও, সময় নষ্ট করো। তোমাদের লজ্জা থাকা উচিত। তোমরা কি শুধু চোর? না, তোমরা চোরের চেয়েও বড় চোর।
আমাদের সবার শ্রদ্ধেয় স্যার ইংরেজি শেখার প্রতি বিশেষভাবে উৎসাহ দিতেন। তিনি বাংলা মাধ্যমের বইয়ের পাশাপাশি ইংরেজি মাধ্যমের বই পড়তে উদ্বুদ্ধ করতেন। ক্লাসের সব ছাত্রছাত্রীকে একটি নির্দিষ্ট ম্যানুয়েল বই সঙ্গে রাখতে বলতেন। স্যারের কথা ছিল, প্রত্যেক ছাত্রের ব্যাগে বইটি অবশ্যই থাকতে হবে।
বই ছাড়া ক্লাসে ঢুকলে ছাত্রছাত্রীরা মহাবিপদে পড়ে যেত। তিনি ছাত্রদের রিডিং পড়তে বলতেন। একজনের পড়া শেষ হলে সেখান থেকে আরেকজনকে পড়তে বলতেন। যাদের ইংরেজিতে কিছুটা দুর্বলতা ছিল, তারা প্রথমে ভয় পেত; কিন্তু ধীরে ধীরে অনেক উন্নতি করত।
স্যার ক্লাসে এলে আমাদের মধ্যে একধরনের ভীতি কাজ করত। আমরা তাঁকে অনেক সম্মান করতাম এবং একই সঙ্গে ভয়ও পেতাম। রোল কল শেষে তিনি জিজ্ঞাসা করতেন, ‘বই নিয়ে আসোনি কে?’ কারও কাছে বই না পেলে তাকে ক্লাসে থাকতে দিতেন না। বলতেন, ‘বের হও আমার ক্লাস থেকে। তোমরা ছাত্র, নাকি অছাত্র? আমি অছাত্রকে পড়াব না। প্রয়োজন হলে একজনকে পড়াব কিন্তু তাকে মানুষের মতো মানুষ বানাব।’
স্যারের ভাষায়, শিক্ষিত মানুষ শুধু সুস্থ দেহ ও মনের অধিকারী নয়; তার ভেতরে জন্ম নেয় এক নতুন মানুষ। তিনি ছাত্রদের শেখানোর জন্য ব্যাকুল হয়ে থাকতেন। বেশি বেশি অ্যাসাইনমেন্ট দিতেন, যাতে ছাত্ররা পড়ালেখার মধ্যেই ডুবে থাকে। তারা যেন জীবন ও জগৎ সম্পর্কে নতুন নতুন তথ্য জানতে পারে এবং নিজেদের যুগোপযোগী করে গড়ে তুলতে পারে।
স্যার একই বিষয়ে একাধিক বই পড়ার পরামর্শ দিতেন। তিনি বলতেন, ‘দশটি বই পড়লে নিজের ভেতরে একটি নতুন বই তৈরি হয়ে যাবে।’ তিনি সব সময় নতুনত্ব আশা করতেন। বই পড়ে নোট তৈরির ওপরও তিনি বিশেষ গুরুত্ব দিতেন। বলতেন, ভালো ফল করতে হলে উন্নতমানের নোট তৈরি করতে হবে। ছাত্রদের নোট তৈরি করে দেখাতে বলতেন। কোথাও ভুল পেলে সংশোধন করে দিতেন এবং আরও ভালোভাবে নোট তৈরির নানা কৌশল শিখিয়ে দিতেন। লেকচারের সময় তিনি মূল বিষয়গুলো খাতায় লিখে রাখতে বলতেন। কোনো কিছু না বুঝলে প্রশ্ন করতে উৎসাহিত করতেন।
আমাদের বিভাগে প্রায়ই বিভিন্ন বিষয়ে সেমিনার হতো। সেখানে শ্রদ্ধেয় শিক্ষকেরা তাঁদের মূল্যবান বক্তব্য উপস্থাপন করতেন। ক্যাম্পাসের কাজী নজরুল ইসলাম মিলনায়তনেও নানা বিষয়ে সেমিনার অনুষ্ঠিত হতো। কোনো বিষয় না বুঝলে বা জানার প্রয়োজন হলে প্রশ্ন করার সুযোগ ছিল।
কত মূল্যবান উপদেশ যে শিক্ষকেরা দিতেন! একজন শিক্ষক বলতেন, ‘জীবনকে বাতাসা না বানিয়ে চিড়ার মতো বানাও; ভেতরে কিছু অর্জন করো।’ আরেকজন বলতেন, ‘Just coming and going results in nothing।’
ক্যাম্পাসে নানা ধরনের ছাত্র দেখা যেত। কেউ পড়াশোনায় মগ্ন থাকত, আবার কেউ আড্ডায় সময় কাটাত। মৌমাছির মতো কেউ সংগ্রহ করত মধু, আর মাকড়সার মতো কেউ সংগ্রহ করত বিষ।
আমাদের আরেকজন শিক্ষক প্রায়ই বলতেন, ‘আগুন রান্নার কাজেই ব্যবহার করো।’ তিনি মূলত ধূমপানকারী ছাত্রদের উদ্দেশে এ কথা বলতেন। তাঁর আরেকটি প্রিয় কথা ছিল, ‘অলস মস্তিষ্ক শয়তানের কারখানা।’ তিনি বিশ্বাস করতেন, মস্তিষ্ককে যত বেশি কাজে লাগানো যাবে, ততই তা উর্বর হবে।
একবার এক শিক্ষক দুঃখ করে বলেছিলেন, আগের ব্যাচের ছাত্রদের তুলনায় পরের ব্যাচের ছাত্ররা যেন এক ধাপ করে পিছিয়ে যাচ্ছে। কেন ছাত্রদের মধ্যে পড়ালেখার প্রতি এত অনীহা-তা ভেবে তিনি বিস্মিত হতেন।
আমাদের আরেকজন স্যার প্রায়ই বলতেন, ‘বি এ জার্মান।’ তিনি বোঝাতে চাইতেন, জার্মানরা সব সময় পড়াশোনার মধ্যে থাকে। বাসে বসেও তারা বই পড়ে। সামান্য অবসর পেলেই ব্যাগ থেকে বই বের করে পড়ে।
ইংরেজি শেখার জন্য আরেকজন স্যার প্রায়ই বলতেন, ‘প্রতিদিন অন্তত পাঁচটি নতুন ইংরেজি শব্দ শিখবে।’ একবার তাঁর সঙ্গে দেখা হলে আমি বলেছিলাম, ‘স্যার, আপনি ক্লাসে এই কথা বলতেন।’ স্যার হেসে বলেছিলেন, ‘বলি তো অনেক কিছু, কিন্তু তোমরা তো শোনো না।’
আসলে জানতে হলে পড়তে হবে। স্যারের সেই কথা আজও মনে পড়ে। সত্যিই, আমরা অনেকেই চোরের চেয়েও বড় চোর। যে সময় পড়াশোনা করার কথা ছিল, সে সময় আমরা আড্ডা দিয়েছি। সময়ের কাজ সময়মতো করিনি। তাই আজ তার মাশুল দিতে হচ্ছে। অনেকে কাক্সিক্ষত লক্ষ্যে পৌঁছানোর আগেই ঝরে পড়েছে। আমরা যে ভুল করেছি, তোমরা সেই ভুল কোরো না। তোমরা আমাদের মতো বড় চোর হয়ো না। তোমাদের নীড়ে সারা বছর সাফল্য এসে বাসা বাঁধুক।