লেখার শিরোনামে ব্যবহৃত ইংরেজি শব্দ ভ্যানিটির (Vanity) বাংলা প্রতিশব্দ খুঁজতে অভিধান খুলে দেখলাম, এর অর্থ লেখা রয়েছে দম্ভ, অহংকার, আত্মগর্ব ইত্যাদি। বিস্তারিত অর্থ বর্ণনায় বলা হয়, মূলত নিজের সৌন্দর্য ও সাফল্যের প্রতি অতিরিক্ত গর্ব ও অহংকার বোঝাতে এই শব্দ ব্যবহৃত হয়। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের কিছু কথাবার্তা ও কার্যকলাপ দেখে এই শব্দটি মনে পড়ায় আলোচন্য লেখার অবতারণা করা।
অর্থনীতির সাম্প্রতিক হালহকিকত থেকে শুরু করে আরও কিছু বিষয়ে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের কথাবার্তা ও পদক্ষেপের বিষয়ে মার্কিন রাজনৈতিক দল ও জনগণের মধ্যে ব্যাপক ক্ষোভ সৃষ্টি হতে দেখা গেলেও, তিনি তার এসব পদক্ষেপকে অত্যন্ত সফল ও যুগান্তকারী উল্লেখ করেন, যা নিজের কাজকর্ম সম্পর্কে তার অতিরিক্ত অহংবোধ বা ভ্যানিটির বহিঃপ্রকাশ বলা যায়। কারণ, বিদ্যমান পরিস্থিতিকে তিনি যতটা চমৎকার ভাবছেন, অধিকাংশ ক্ষেত্রে পরিস্থিতির চিত্র অনেকটাই ভিন্ন বলে বহু মহলের ধারণা।
রেজিম পরিবর্তন, পরমাণু অস্ত্র তৈরির কথিত কার্যক্রম বন্ধ, হরমুজ প্রণালি খোলা ইত্যাদি উদ্দেশ্য সাধনের লক্ষ্যে গত ফেব্রুয়ারিতে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ইসরায়েলের সঙ্গে যৌথভাবে ইরান যুদ্ধ শুরু করে কাক্সিক্ষত লক্ষ্য অর্জনের পর দু-চার দিনের মধ্যে যুদ্ধ সমাপ্তির ঘোষণা দিলেও যুদ্ধের তিন মাস পেরিয়ে গেলেও যুদ্ধ শুরুর ঘোষিত একটি লক্ষ্যও অদ্যাবধি অর্জিত না হওয়া সত্ত্বেও প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প লক্ষ্য অর্জনে যথেষ্ট সাফল্যের দাবি করেন, যা ব্যাপক মার্কিন জনগোষ্ঠী দূরের কথা, নিজের অনেক সমর্থকও বিশ্বাস করেন বলে মনে হয় না। হরমুজ প্রণালি যুদ্ধের পূর্বে সকল দেশের জাহাজ চলাচলের জন্য খোলা ছিল, যা যুদ্ধ শুরুর পর ইরান সামরিক কৌশলগত কারণে বন্ধ করে দিতে বাধ্য হয়। যুদ্ধে মি. ট্রাম্প একাধিকবার ইরানের নৌ ও বিমানবাহিনী পুরোপুরি অকেজো ও ধ্বংস করে দেওয়ার দাবি করে হরমুজ প্রণালি নিজের নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার দাবি করেন, যদিও সে ঘোষণা পরে অসত্য প্রমাণিত হয়। যে কারণে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে চলমান আলোচনায় এটি একটি অন্যতম প্রধান ইস্যু হিসেবে গণ্য হচ্ছে। গত বছরের জুনে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ইরানের ১২ দিনের যুদ্ধে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প অত্যাধুনিক বি-টু বোমারু বিমান থেকে বোমাবর্ষণ করে ইরানের পরমাণু কর্মসূচি পুরোপুরি ধ্বংসের (Obliterate) দাবি করেন। পরবর্তী সময়ে তার এই দাবিটিও অসত্য প্রমাণিত হওয়ায় চলমান আলোচনায় ইরানের এনরিচড ইউরেনিয়াম ইস্যুটি (Centerpiece) হয়ে উঠতে দেখা যায়।
উল্লেখ্য, গত ৮ এপ্রিল থেকে ইরান যুদ্ধে যুদ্ধবিরতি বলবৎ রয়েছে, যদিও যুদ্ধবিরতির শর্ত লঙ্ঘন করে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের বন্দরে ব্লকেড দেওয়াসহ মাঝেমধ্যে ইরানের সামরিক স্থাপনায় হামলা অব্যাহত রেখেছে, যেটাকে অনেকে যুক্তরাষ্ট্র কর্তৃক ভয় দেখিয়ে ইরানকে যুদ্ধবিরতির শর্ত মানতে বাধ্য করার একটি কৌশল বলে মনে করেন। তবে এই কৌশলও বুমেরাং হতে দেখা যায়। যুক্তরাষ্ট্রের হামলার পাল্টা পদক্ষেপ হিসেবে ইরানও কুয়েতে মার্কিন সামরিক ঘাঁটি ও ইসরায়েলে হামলা চালায় এবং শর্ত বরখেলাপের কারণে ইরান যুদ্ধবিরতির আলোচনা থেকে সরে আসার ঘোষণা দেয়। যুদ্ধবিরতি চুক্তি করতে মরিয়া প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প লেবাননে ইসরায়েলের হামলার জন্য ফোন করে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহুকে সতর্ক করেন এবং ইসরায়েলের এহেন হামলার কারণে যুদ্ধবিরতির আলোচনা derail হওয়ার উপক্রম হয়েছে অভিযোগ করে তিনি নেতানিয়াহুকে একজন Crazy ও বিশ্বের সবচেয়ে অজনপ্রিয় ব্যক্তি হিসেবে উল্লেখ করেন বলে মিডিয়াসূত্রে জানা যায়। পরে অবশ্য ইসরায়েল সমর্থক লবির বিরূপ প্রতিক্রিয়ার মুখে মি. ট্রাম্প এ ধরনের বাক্যালাপের কথা অস্বীকার করে নেতানিয়াহুর সঙ্গ তার চমৎকার বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক রয়েছে বলে জানান।
ইরান যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের অংশগ্রহণের বিরুদ্ধে প্রবল মার্কিন জনমত এবং এই যুদ্ধের ফলে যুক্তরাষ্ট্রে সৃষ্ট বিরূপ প্রতিকূল অর্থনৈতিক পরিস্থিতি লক্ষ করে আগামী নভেম্বরে অনুষ্ঠেয় মার্কিন মধ্যবর্তী নির্বাচনে মি. ট্রাম্পের রিপাবলিকান দলের সম্ভাব্য বিপর্যয়ের আভাস পেয়ে মি. ট্রাম্প যেকোনো উপায়ে ইরান যুদ্ধ থেকে বেরিয়ে আসার পথ খুঁজছেন বলে প্রতীয়মান হয়ে। তবে যুদ্ধের এ পর্যায়ে তার দেওয়া শর্ত বজায় রেখে যুদ্ধের পথ থেকে নিজের মুখ রক্ষা করে বেরিয়ে আসার Off Ramp-এর খোঁজ পাওয়া তার জন্য বেশ কঠিন হবে বলে অনেকে মনে করেন। নেতানিয়াহুর সঙ্গ মি. ট্রাম্পের কথিত তিক্ত ফোনালাপ যুদ্ধ থেকে বেরিয়ে আসার তার মরিয়া প্রচেষ্টার ইঙ্গিতবহ বলে কেউ কেউ মনে করেন।
ভেনিজুয়েলায় সামরিক অভিযানে সাফল্যের পর মি. ট্রাম্পের মধ্যে বিশ্বের যেকোনো দেশে অনুরূপ অভিযান চালিয়ে একই ধরনের সাফল্য অর্জনের একপ্রকারের উদগ্র বাসনা ও প্রত্যাশা জাগ্রত হয়, যার ধারাবাহিকতায় তিনি ইরানে হামলার সূচনা করেন। হামলায় ভেনিজুয়েলার মতো সহজে দ্রুত সাফল্য লাভ সম্ভব হবে ধারণা করলেও বাস্তবে তার উল্টোটা হওয়ায় তিনি বিপাকে পড়েন, যেটা স্পষ্টত ছিল ধারণার বাইরে স্বীয় চরিত্রের মধ্যে বিদ্যমান ভ্যানিটির কারণে তার পক্ষে যথাযথ চিন্তা-ভাবনা করা সম্ভব হয়নি। যুদ্ধের চোরাবালিতে আটকা পড়া সত্ত্বেও তাকে যুদ্ধে পূর্ণ সাফল্য ও বিজয় লাভের অলীক মনগড়া দাবি করতে দেখা যায়, যা ছিল তার চরিত্রের সহজাত আত্মগর্বের বহিঃপ্রকাশ মাত্র।
মার্কিন শ্রম দপ্তরের সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে মে মাসে মার্কিন অর্থনীতিতে প্রায় ১ লাখ ৭২ হাজার নতুন কর্মসংস্থান যুক্ত হওয়ার তথ্য দেওয়া হয়। বেকারত্বের হার বিগত বেশ কিছু সময় ধরে ৪.৩ ভাগে স্থির রয়েছে, যদিও অন্য একটি সূত্রমতে, ২২ থেকে ২৭ বছর বয়সী মার্কিন কলেজ গ্র্যাজুয়েটদের মধ্যে বেকারত্বের হার ৫.৬ ভাগ। মুদ্রাস্ফীতির হার ৪ ভাগের কিছুটা নিচে এবং স্টক মার্কেটের অবস্থা কিছু সময় পূর্বের ক্ষতি কাটিয়ে বর্তমানে উন্নতির দিকে যেতে লক্ষ করা যায়। তবে গ্যাস, ইউটিলিটিসহ প্রায় সকল পণ্যের মূল্যবৃদ্ধির সঙ্গে পাল্লা দিয়ে মানুষের আয়-উপার্জন তেমনভাবে না বাড়ায় তাদের আর্থিক দুর্ভোগ-দুর্গতি কমেনি বরং তা আরও জটিল হয়েছে। এ কারণে অর্থনীতির বর্তমান হালহকিকত সম্পর্কে অধিকাংশ মার্কিন জনগণের মনোভাব বেশ হাতাশাজনক, যা সাম্প্রতিক বিভিন্ন জনমত জরিপে স্পষ্টভাবে প্রতিফলিত হতে দেখা যায়। পরিস্থিতির এরূপ অবস্থা দেখার পরও মি. ট্রাম্প বর্তমান সময়ে দেশের অর্থনীতিকে ‘The greatest economy’ বলার প্রয়াস পান, যা তার আরেকটি আত্মগর্বের বহিঃপ্রকাশ। মি. ট্রাম্পের মতো আত্মপ্রশংসাপ্রিয় (Narcissistic) একজন নেতা পরিস্থিতিকে এভাবে দেখবেন, তাতে আর অবাক হওয়ার কী আছে।
বিভিন্ন ইস্যুতে মি. ট্রাম্পের এহেন মূল্যায়ন দেখে হ্যান্স ক্রিশ্চান অ্যান্ডারসনের ‘The Emperor’s Clothes’ রূপকথাটির কথা মনে পড়ছে। এক রাজা তার চেহারা ও পোশাক নিয়ে খুব মোহাবিষ্ট ও গর্বিত ছিলেন। এটা দেখে তার মন্ত্রিবর্গের অনেকে রাজার আনুকূল্য পেতে তার প্রশংসায় সর্বদা পঞ্চমুখ থাকতেন। একসময় দুই প্রতারক দর্জি তার দরবারে এসে তাকে এমন এক জাদুকরি অদৃশ্য ধরনের পোশাক বানিয়ে দেওয়ার প্রস্তাব দেন, যেটা কেবল বুদ্ধিমান ও বিজ্ঞজনদের পক্ষেই দেখা সম্ভব হবে, বোকাদের পক্ষে নয়। অভিনব পোশাকের এই প্রস্তাব রাজা সঙ্গে সঙ্গে আনন্দচিত্তে লুফে নেন। বোকা বলে পরিচিত হওয়ার ভয়ে মন্ত্রিবর্গ রাজার পোশাক সম্পর্কে কোনোরূপ মন্তব্য করা থেকে বিরত থাকেন। পরে এক শোভাযাত্রায় অংশ নিতে রাজা ওই পোশাক পরে রাস্তায় এলে জনৈক বালক রাজার পরনে কোনো পোশাক না থাকার কথা চিৎকার করে জানান দেয় (Look at the king, he is wearing nothing at all the king is naked.)।
বালকের চিৎকার শুনে সবাই রাজাকে উলঙ্গ অবস্থায় দেখে সশব্দে হাসিতে ফেটে পড়ে। বলা বাহুল্য, রাজার কাছ থেকে বালকটির কোনো চাওয়া-পাওয়া না থাকায় সত্য প্রকাশে তার মধ্যে কোনো দ্বিধা ছিল না। স্পষ্টত গল্পটিতে গর্ব ও অহংবোধের পরিবর্তে সততা ও সত্য প্রকাশের গুরুত্বের বিষয়টি তুলে ধরা হয়।
বিশ্বের শ্রেষ্ঠ পরাশক্তি ও সমৃদ্ধ দেশ যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট হিসেবে স্বীয় শ্রেষ্ঠত্ব জাহির, অহমিকা, চাটুকারিতা এবং কারও প্ররোচনায় প্রভাবিত ও নিজের খেয়াল-খুশিমতো সিদ্ধান্ত গ্রহণ এবং বাক্যালাপ পরিহারপূর্বক অগ্র-পশ্চাৎ সার্বিক ভালো-মন্দ বিচার করে সুধীমহলের অর্থবহ পরামর্শ ও জনমতকে আমলে নিয়ে নিজের কথায় ও কাজে সুবিবেচনার পরিচয় দিলে একদিকে তাকে গল্পের রাজার মতো যেমন যত্রতত্র বিব্রত ও হাস্যাস্পদ হতে হবে না, তেমনিভাবে বিশ্ববাসী যুদ্ধবিগ্রহসহ নানা দুর্ভোগ-ভোগান্তি থেকেও পরিত্রাণ পাবে বলে মনে করি।
লেখক : কলামিস্ট