সোমবার, ১২ অক্টোবর ২০২৬
সর্বশেষ :

সোমবার, ১২ অক্টোবর ২০২৬

বিজ্ঞাপন

​সন্তানদের বিয়ে নিয়ে উদ্বেগ ও অনিশ্চয়তায় প্রবাসীরা

​সন্তানদের বিয়ে নিয়ে উদ্বেগ ও অনিশ্চয়তায় প্রবাসীরা

বিজ্ঞাপন
যুক্তরাষ্ট্রে অভিবাসন নীতিতে সাম্প্রতিক কঠোরতা ও স্ট্যাটাস অ্যাডজাস্টমেন্ট প্রক্রিয়ার পরিবর্তনের কারণে দেশি পাত্র-পাত্রীকে বিয়ে করে স্বামী-স্ত্রীকে যুক্তরাষ্ট্রে নিয়ে আসার প্রবণতা নিয়ে নতুন করে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। একসময় বাংলাদেশে গিয়ে বিয়ে করে সহজেই স্ত্রী বা জামাতাকে যুক্তরাষ্ট্রে আনার যে প্রক্রিয়া তুলনামূলক দ্রুত ও স্বাচ্ছন্দ্যপূর্ণ ছিল, এখন তা দীর্ঘসূত্রতা, জটিলতা এবং মানসিক চাপের কারণে অনেক পরিবারকে সতর্ক করে তুলেছে। ফলে অনেক অভিভাবক ও প্রবাসী তরুণ-তরুণী দেশি বিয়ের পরিকল্পনা পুনর্বিবেচনা করছেন।
আগে যুক্তরাষ্ট্রপ্রবাসী অনেক পরিবার দেশে গিয়ে ছেলেমেয়ের বিয়ে দিতেন এবং পরে স্পাউস ভিসার মাধ্যমে স্বামী বা স্ত্রীকে যুক্তরাষ্ট্রে নিয়ে আসতেন। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ইমিগ্রেশন প্রক্রিয়া কঠোর হওয়ায় সেই প্রক্রিয়া আর আগের মতো সহজ নেই। এখন স্পাউস ভিসা বা গ্রিনকার্ড প্রসেসিংয়ে মাসের পর মাস নয়, বরং বছরের পর বছর অপেক্ষা করতে হচ্ছে। এই দীর্ঘ অপেক্ষা অনেক দম্পতির মধ্যে মানসিক চাপ, দূরত্বজনিত সম্পর্কের টানাপোড়েন এবং পারিবারিক অস্থিরতা সৃষ্টি করছে।
অনেক ক্ষেত্রেই দেখা যাচ্ছে, বিয়ের পর একজন যুক্তরাষ্ট্রে এবং আরেকজন বাংলাদেশে অবস্থান করছেন দীর্ঘ সময় ধরে। এতে দাম্পত্য জীবনে মানসিক চাপ বাড়ছে, পাশাপাশি কর্মজীবনেও ব্যাঘাত ঘটছে। এমনকি কিছু ক্ষেত্রে প্রবাসীরা বারবার দেশে যাতায়াত করতে বাধ্য হয়ে চাকরি হারানোর ঘটনাও ঘটছে। অন্যদিকে অনেক পরিবার দীর্ঘ বিচ্ছেদের ভয়ে দেশি বিয়ের সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসছেন।
বিশেষজ্ঞদের মতে, যুক্তরাষ্ট্রে জন্ম নেওয়া বা ছোটবেলা থেকে বেড়ে ওঠা তরুণ-তরুণীদের জন্য বাংলাদেশ থেকে আসা জীবনধারা, খাদ্যাভ্যাস, পারিবারিক কাঠামো এবং দৈনন্দিন দায়িত্বের সঙ্গে মানিয়ে নেওয়া অনেক সময় কঠিন হয়ে পড়ে। বিশেষ করে রান্না, বাজার, গৃহস্থালি কাজ কিংবা অর্থনৈতিক দায়িত্ব পরিচালনায় ভিন্ন সংস্কৃতির কারণে অনেকেই শুরুতে সমস্যায় পড়েন। কেউ কেউ সহজে মানিয়ে নিলেও অনেকে মানসিকভাবে চাপে পড়েন, যা দাম্পত্য জীবনে প্রভাব ফেলে।
এদিকে সম্প্রতি ইউএস সিটিজেনশিপ অ্যান্ড ইমিগ্রেশন সার্ভিসেস নতুন নীতিগত দিকনির্দেশনা ঘোষণা করেছে, যেখানে বলা হয়েছে অ্যাডজাস্টমেন্ট অব স্ট্যাটাস প্রক্রিয়া সাধারণভাবে যুক্তরাষ্ট্রে বসে সম্পন্ন করা যাবে না, বরং অধিকাংশ ক্ষেত্রে আবেদনকারীদের নিজ দেশে ফিরে গিয়ে কনস্যুলার প্রসেসিংয়ের মাধ্যমে আবেদন সম্পন্ন করতে হবে। কেবল ‘এক্সট্রা অর্ডিনারি সারকামস্ট্যান্স’ প্রমাণ করতে পারলেই যুক্তরাষ্ট্রে বসে প্রক্রিয়া চালিয়ে যাওয়া সম্ভব হবে।
এই নীতির ফলে সবচেয়ে বেশি অনিশ্চয়তায় পড়েছেন আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থী ও অস্থায়ী ভিসাধারীদের সঙ্গে বিবাহিত দম্পতিরা। অনেকেই এখন চিন্তায় রয়েছেন-বিয়ে করার পর যদি আবেদন অনুমোদিত না হয়, তাহলে দেশে ফিরে গিয়ে ভিসা প্রসেসিংয়ে জটিলতা তৈরি হবে কি না। আবার কনস্যুলার ইন্টারভিউয়ের পর ভিসা প্রত্যাখ্যান হলে দীর্ঘ বিচ্ছেদ বা সম্পর্ক ভেঙে যাওয়ার ঝুঁকিও থেকে যাচ্ছে।
নীতিমালায় বলা হয়েছে, প্রতিটি আবেদন ‘কেস বাই কেস’ ভিত্তিতে বিবেচনা করা হবে এবং আবেদনকারীর অতীত অভিবাসন ইতিহাস, আইন মানা হয়েছে কি না, কোনো অপরাধ বা তথ্য গোপন করা হয়েছে কি নাÑএসব বিষয় বিস্তারিতভাবে যাচাই করা হবে। যারা সব নিয়ম মেনে বৈধভাবে অবস্থান করছেন এবং যথাযথ নথিপত্র দিতে পারবেন, তাদের ক্ষেত্রে প্রক্রিয়া তুলনামূলক সহজ হতে পারে। তবে যাদের অতীতে স্ট্যাটাস লঙ্ঘন, ওভারস্টে বা অন্যান্য জটিলতা রয়েছে, তাদের জন্য প্রক্রিয়া কঠিন হয়ে উঠতে পারে।
নতুন নির্দেশনায় আরও বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থানরত অভিবাসীরা আবেদন করলেও সরাসরি গ্রিনকার্ড অনুমোদনের নিশ্চয়তা নেই। যদি ‘এক্সট্রা অর্ডিনারি সারকামস্ট্যান্স’ প্রমাণিত না হয়, তাহলে আবেদনকারীকে নিজ দেশে ফিরে গিয়ে কনস্যুলার প্রসেসিংয়ের মাধ্যমে ইন্টারভিউ দিতে হবে। এরপর ভিসা অনুমোদন পেলে আবার যুক্তরাষ্ট্রে ফেরার সুযোগ মিলবে। কিন্তু ভিসা প্রত্যাখ্যান হলে দীর্ঘ আপিল প্রক্রিয়া শুরু হবে, যা সময়সাপেক্ষ এবং মানসিকভাবে কষ্টদায়ক।
এ বিষয়ে আইনজীবীদের মতে, নতুন নীতি এখনো পুরোপুরি কার্যকর হওয়ার নির্দিষ্ট সময় ঘোষণা করা হয়নি, তবে নির্দেশনার প্রভাব ইতিমধ্যে দৃশ্যমান। অ্যাটর্নি খায়রুল বাশার বলেন, আবেদনকারীদের উচিত বাস্তব পরিস্থিতি বিবেচনা করে সিদ্ধান্ত নেওয়া এবং ভুল তথ্য বা প্রতারণামূলক বিয়ের প্রচেষ্টা থেকে দূরে থাকা। কারণ যুক্তরাষ্ট্রে ইমিগ্রেশন ফ্রড একটি গুরুতর অপরাধ হিসেবে বিবেচিত হয় এবং এতে স্থায়ী নিষেধাজ্ঞার ঝুঁকি থাকে। তিনি আরও বলেন, যারা বৈধভাবে বিবাহিত এবং প্রয়োজনীয় শর্ত পূরণ করেছেন, তারা আবেদন করতে পারেন। তবে সিদ্ধান্ত সব সময় ‘কেস বাই কেস’ ভিত্তিতে নির্ধারিত হবে। হার্ডশিপ বা মানসিক-পারিবারিক কষ্ট প্রমাণ করতে পারলে কিছু ক্ষেত্রে অনুমোদনের সম্ভাবনা থাকে। তবে এটি নিশ্চিত নয়।
নতুন নীতির কারণে প্রবাসী বাংলাদেশি পরিবারগুলোর মধ্যে বিয়ে ও অভিবাসন পরিকল্পনা নিয়ে একধরনের সতর্কতা তৈরি হয়েছে। কেউ কেউ মনে করছেন, ভবিষ্যতে এই প্রক্রিয়া আরও কঠিন হতে পারে, আবার কেউ মনে করছেন নিয়ম মেনে চললে সুযোগ এখনো বিদ্যমান। তবে নিশ্চিতভাবে বলা যায়, আগের মতো সহজ ও দ্রুত প্রক্রিয়ার দিন এখন আর নেই। ফলে অভিভাবক ও তরুণ-তরুণীরা এখন বিয়ের সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে অভিবাসন জটিলতা, দীর্ঘ অপেক্ষা এবং মানসিক চাপ- সবকিছু বিবেচনায় নিয়ে আরও সতর্ক হচ্ছেন।

নিউজটি শেয়ার করুন


© 2026 All Rights Reserved by Thikana Group Of Media
Maintained by SolveEz