আজ চতুর্থ জুলাই। আমেরিকার আড়াইশ বছর পূর্তির উৎসব। নগরীর বুকজুড়ে আজ আলোর উচ্ছ্বাস, পতাকার রঙে রঙিন চারদিক। ব্রডওয়ে-জুড়ে মানুষের ঢল-বিজয়ের উল্লাসে, স্বাধীনতার গৌরবে, আনন্দের জোয়ারে ভেসে চলেছে একের পর এক মিছিল।
সেই অগণিত মানুষের ভিড়ের দিকে চেয়ে থাকে জর্জ। ডান হাত ও ডান পা প্যারালাইসিসে অবশ; তবু টেনে টেনে এগিয়ে যায় সে; যেন শরীরের নয়, তাকে টেনে নিয়ে চলেছে হৃদয়ের অদম্য আকাক্সক্ষা। একসময় সেও দাঁড়িয়ে পড়ে সেই জনসমুদ্রে। ভিড়ের আর দশজন মানুষের মতো সেও হয়ে ওঠে একজন সাধারণ মানুষ-একটি মুখ, একটি প্রাণ, একটি নিঃশ্বাস। সে এসেছে শুধু উৎসব দেখতে নয়। সে এসেছে মানুষের গন্ধ শুঁকতে। আপনজনের উষ্ণতা অনুভব করতে। বহুদিন হারিয়ে ফেলা ভালোবাসার স্পর্শ খুঁজে পেতে।
মানুষের ভিড়ের ভেতর দাঁড়িয়ে জর্জ যেন খুঁজে ফেরে তার হারিয়ে যাওয়া পৃথিবী-একটি পরিচিত মুখ, একটি আপন ডাক, কিংবা এমন একটি হৃদয়, যেখানে এখনো তার জন্য একটুখানি জায়গা রয়ে গেছে।
স্বাধীনতার এই মহা উৎসবে চারদিকে যখন বিজয়ের উল্লাস, তখন জর্জের অন্তরে জেগে ওঠে আরেকটি নীরব আকাক্সক্ষা-মানুষের ভিড়ে হারিয়ে নয়, মানুষের হৃদয়ে ফিরে পাওয়ার আকাক্সক্ষা।
বরাবরই গণমানুষের ভিড় দেখলেই কেমন যেন উদ্বেলিত হয়ে ওঠে জর্জ। ভিড়ের ভেতর নিজেকে হারিয়ে ফেলতে তার কী যে ভালো লাগে। অন্যরা যেখানে মানুষের ভিড় এড়িয়ে চলে, সেখানে সে উল্টো মানুষের স্রোতের মধ্যে ডুব দেয়। ভিড়ের মধ্যে ঘাপটি মেরে সে মানুষের গন্ধ শুঁকে, আপনজনের গন্ধ শুঁকে। বহুদিন হারিয়ে ফেলা সম্পর্কের গন্ধ শুঁকে। অচেনা মানুষের ভিড়ে পরিচিত কণ্ঠস্বরের প্রতিধ্বনি খোঁজে। তখন নিজেকে আর নিঃসঙ্গ মনে হয় না।
সন্ধ্যার পর সাবওয়ের সিঁড়িগুলো যখন কর্মব্যস্ত মানুষের পদচারণে মুখর হয়ে ওঠে, জর্জ তখন ধীর পায়ে সেই স্রোতে মিশে যায়। অফিসফেরত ক্লান্ত মানুষ, স্কুলব্যাগ কাঁধে তরুণ-তরুণী, হাতে বাজারের ব্যাগ নিয়ে ঘরে ফেরা নারীÑসবাই যার যার মতো ফিরে যাচ্ছে নির্দিষ্ট গন্তব্যে। তাদের জন্য কোনো না কোনো দরজা অপেক্ষা করছে। কোনো জানালায় আলো জ্বলছে তাদের প্রতীক্ষায়।
জর্জও তখন এমন ভান করে=সেও যেন তাদেরই একজন। সেও ফিরছে কোনো নির্দিষ্ট গন্তব্যে। সেও ফিরছে স্নেহ, মায়া, মমতায় ঘেরা কোনো এক উষ্ণ ঘরে। যে ঘরের দরজার ওপাশে অপেক্ষা করছে তার প্রিয় মানুষ। স্টেশনের ভিড় ধীরে ধীরে পাতলা হয়ে আসে। একসময় সিঁড়িগুলো ফাঁকা হয়ে যায়। ট্রেন আসে, ট্রেন চলে যায়। মানুষগুলোও হারিয়ে যায় নিজ নিজ ঠিকানায়।
কেবল জর্জের গন্তব্যে পৌঁছানো হয় না কোনো দিনও। সে নির্দিষ্ট গন্তব্যে কোথাও যায় না। যেখানে সুযোগ পায় ঘুমিয়ে পড়ে। কিংবা কোনো এক সাবওয়েতে নেমে প্ল্যাটফর্মের এক কোণে একাকী বসে থাকে। তার সামনে অগণিত ট্রেন আসে-যায়, অথচ তার নিজের কোনো গন্তব্য নেই। নেই কোনো স্থায়ী ঠিকানা।
কিন্তু তারও তো সব সময় এমন ছিল না। একসময় সেও ছিল একটি পরিবারের সন্তানÑপিতা-মাতার স্নেহ, মায়া আর ভালোবাসায় ঘেরা এক উষ্ণ শৈশবের বাসিন্দা।
বাবার মুখে জর্জ শুনেছে তাদের পূর্বপুরুষদের ইতিহাস। আমেরিকার আদিবাসী গোত্র থেকে উত্থান তাদের বংশ কালক্রমে এই বিশ শতকে এসে ঠেকেছে। জর্জই তার শেষ প্রজন্ম। তারা ছিল এই মহাদেশের আদি সন্তান, যাদের পদচিহ্ন ইউরোপীয়দের আগমনের হাজার হাজার বছর আগেই আমেরিকার মাটি, নদী, অরণ্য ও পর্বতমালায় অঙ্কিত হয়েছিল। প্রকৃতিকে জয় করার নয়, বরং তার সঙ্গে সহাবস্থানের দর্শনে বিশ্বাসী ছিল তারা। বনভূমি, নদী, বন্য প্রাণী ও ঋতুচক্রের সঙ্গে তাদের সম্পর্ক ছিল আত্মীয়তার মতো গভীর।
বাবা বলতেন, ইতিহাসের বইয়ে তাদের নাম যতটা লেখা আছে, বাস্তবে আমেরিকা গঠনে তাদের অবদান তার চেয়েও অনেক বেশি। কৃষিকাজ, ভুট্টা, আলু, টমেটো, স্কোয়াশ, শিমসহ অসংখ্য খাদ্যশস্যের জ্ঞান পৃথিবীর কাছে পৌঁছেছে এই আদিবাসী জনগোষ্ঠীর হাত ধরে। প্রকৃতির সম্পদ সংরক্ষণ, ভূমি ব্যবস্থাপনা এবং পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষার যে জ্ঞান আজ আধুনিক বিশ্ব নতুন করে মূল্যায়ন করছে, তার অনেকটাই শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে চর্চা করে এসেছে জর্জের আদি পুরুষেরা।
নতুন আগন্তুকদের আগমনের পর যুদ্ধ, উচ্ছেদ, রোগব্যাধি এবং বৈষম্যের দীর্ঘ অধ্যায়ে অসংখ্য আদিবাসী সম্প্রদায় বিলীন হয়ে গেলেও তাদের সংস্কৃতি, ভাষা, শিল্প, সংগীত, আধ্যাত্মিকতা এবং সংগ্রামের ইতিহাস আজও আমেরিকার আত্মার এক অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে আছে।
বাবা প্রায়ই গর্বভরে বলতেন, এই দেশের সুউচ্চ অট্টালিকা, প্রশস্ত মহাসড়ক কিংবা আধুনিক নগরসভ্যতার অনেক আগেই আমাদের পূর্বপুরুষেরা এই ভূমিকে নিজেদের ঘর বলে চিনত। তাদের রক্ত, ঘাম, শ্রম, জ্ঞান এবং বেঁচে থাকার সংগ্রামের ওপরই দাঁড়িয়ে আছে আজকের আমেরিকার ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি।
সাবওয়ের প্ল্যাটফর্মে বসে জর্জ যখন মানুষের ভিড়ের দিকে তাকিয়ে থাকে, তখন তার মনে হয়Ñএই ব্যস্ত নগরীর অসংখ্য মুখের মাঝে তার পূর্বপুরুষদের মুখের সাদৃশ্য বুঝি লুকিয়ে আছে। তাদের কথা, ভাষা, স্বরে তাদের গল্প বুঝি এখনো বয়ে বেড়ায়। তার আদিপুরুষদের রক্তের কোনো এক কণা বিন্দু এখনো বুঝি কারও রক্তে বেঁচে আছে, নীরব অথচ অমর এক উত্তরাধিকারের মতো। জর্জ ফ্যালফ্যাল দৃষ্টিতে তার সাদৃশ্য খোঁজে।
মাথার ওপর দিয়ে বাতাসের ঝাপটা তুলে ট্রেন চলে যায়। তার কোটের ভাঁজে জমে থাকা ঘাম আরও গন্ধ ছড়ায়। সে পকেটে হাত ঢুকিয়ে বসে থাকে। কারণ সুযোগ পেলে সে সাবওয়ের এসি ট্রেনে খানিকটা ঘুমিয়ে নেবে এই লক্ষ্যে সব সময় প্রস্তুত থাকে।
এবার প্ল্যাটফর্মের সিটে গুটি মেরে বসে থাকে, যেন অপেক্ষা করছে কারও জন্য। অথচ সে জানে, কেউ আসবে না কোনো দিন তার খোঁজে। কোনো ঘরের বাতি জ্বালিয়ে কেউ অপেক্ষা করছে না তার জন্য। তার কোনো ঘর নেই, তার নির্দিষ্ট কোনো ঠিকানা নেই। কয়েক বছর আগে তার ঠিকানা হারিয়ে গেছে।
একটি ঠিকানা তারও ছিল। পিতা-মাতার স্নেহময় বৃক্ষছায়ায় তার একটা শৈশব ছিল। শৈশব থেকে কৈশোর, তারপর যৌবনের প্রারম্ভে ছিল এক হৃদয়াঙ্গম ভালোবাসা। আর ছিল পরম প্রিয় এক আপনজন।
নাম ছিল তার মারিয়া। আফ্রিকান কালো। চোখ দুটো ছিল টানা টানা। ডানকিনে কাজের জায়গায় তাদের প্রথম পরিচয়।
মারিয়ার বাবা-মা, ভাইবোনদের সাথে ভরা সংসার কিন্তু অর্থনৈতিক স্বচ্ছতা ততটা ছিল না। এফরটেবল হাউসে গাদাগাদি করে বাস ছিল তাদের।
অন্যদিকে জর্জের ছিল নিজের বাড়ি। ডুপ্লেক্স বাড়ি বেশ চাকচিক্যময়। সামনে টানা বাগান। দোরের সামনে বিএমডব্লিও গাড়ি। বেশ জৌলুশময় সংসার জর্জদের। বাবা-মা আর জর্জ একা একমাত্র সন্তান।
জর্জের জন্মদিনে জর্জদের বাড়ি এসে মারিয়া অবাক। সেদিনই জর্জ অ্যাপ্রোচ করে বসে মারিয়াকে। মারিয়া মহা ভাগ্যবতী মনে করে নিজেকে।
জর্জ এর পরের সপ্তাহেই একটি ডায়মন্ডের রিং পরিয়ে নিজের করে নেয় মারিয়াকে। আর সামারের ছুটিতে দুজনে মিলিত হয় লাসভেগাসে।
আলোকিত শহরের আলোকধারায় ভেতরের আলোতে দুজনের ভালোবাসার উন্মাদনায় এক দীঘল আনন্দময় জীবন উপভোগ করে যখন ফিরে আসে নিউইয়র্কে, তখন জর্জের জীবন মোড় নেয় এক অন্য প্রান্তিকে।
জর্জের বাবা জর্জের মাকে ডিভোর্স দিয়ে ঘরে নতুন আরেক মা নিয়ে আসে। জর্জ পরে জানতে পারে, পুরো বাড়িটা তখন ট্রান্সফার হয়ে গেছে জর্জের নতুন মা ভায়োলেটের নামে।
তিন মাস পর হঠাৎ জর্জের বাবা রোড এক্সিডেন্টে মারা যায়। জর্জ পুরোপুরি আলাদা হয়ে যায় সংসারজীবন থেকে।
দুর্যোগের এই চরম সন্ধিক্ষণে একমাত্র আঁকড়ে ধরেছিল মারিয়াকে। মারিয়ার প্রেম, মারিয়ার দৈহিক উষ্ণতা, তার সান্নিধ্য ছাড়া জর্জের সবকিছু বুঝি শূন্য। মারিয়া প্রায়ই এসে সান্নিধ্য দিত জর্জকে, জর্জদের বাড়িতে। কিন্তু তা বুঝি একদিন চক্ষুশূলে পরিণত হয় জর্জের বিমাতা ভায়োলেটের। সে সাফ সাফ জানিয়ে দেয়, এ বাড়ি ভায়োলেটের। তবে সে দয়া করতে পারে, যদি জর্জ নিচতলার ব্যাকইয়ার্ডে এক্সটেশন রুমটায় ট্রান্সফার হয়ে যায়।
জর্জের জীবনে তখন অলটারনেটিভ আর কিছু নেই। সে মেনে নেয় এই সীমিত আশ্রয়টুকু। সেখানে সে ছোট বিছানায় একটি টেবিল, কয়েকটি চেয়ার, দেয়ালে টাঙানো কিছু ছবি আর ওয়ার্ডরোবে ময়লা কাপড়চোপড় ভরে জীবন সাজায়।
কিন্তু বাধ সাধে মারিয়া। প্রথম দিন মারিয়া ঘরে ঢুকেই কেমন স্তিমিত হয়ে যায়। নিভে যায় যেন মারিয়া এক ফুঁ দেওয়া প্রদীপের মতো। জর্জের আলিঙ্গনে কেমন নিষ্ক্রিয় হয়ে থাকে।
জর্জ লক্ষ করে ব্যাপারটা। তারপর কী মনে করে জর্জ এক নিভৃত অভিমানে আর কোনো দিন মারিয়াকে আমন্ত্রণ করে না। মারিয়াও আর জর্জের প্রতি কোনো হৃদ্যতা দেখায় না। তাদের এই আড়ম্বরপূর্ণ ভালোবাসাটায় অদৃশ্য এক ফাটল দুজনের মধ্যে এক অদৃশ্য দেয়াল তুলে দেয়। ক্রমে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায় তাদের হৃদ্যতা।
মারিয়া নতুন কাজ নিয়ে চলে যায় অন্য শহরে।
জর্জ ঘরে ফিরে দেয়ালে টানানো মারিয়ার সাথে ঘনিষ্ঠ ছবি দেখে আর এক অন্তহীন যন্ত্রণায় ছটফট করে। সারা রাত জেগে জেগে স্মৃতির দহনে পোড়ে মরে আর একের পর এক হুইস্কির বোতল খালি করে মেঝে ভরে ফেলে।
প্রায়ই দিনভর ঘুমায়। ডানকিনের চাকরিটাও হারায়।
একদিন জর্জের বিমাতা ভায়োলেট এসে আবিষ্কার করে, সারা ঘর হুইস্কির বোতল আর ম্যাগডোনানসের প্যাকেট দিয়ে জর্জের বিছানার আশপাশ ভরা। কিচেনের স্টোভে জং ধরা। সাদা বেসিনে লালচে দাগ। এলোমেলো কাপড়চোপড় চেয়ার, সোফা, যত্রতত্র বিছানো। বিছানায় এলোমেলো চিত হয়ে শুয়ে আছে বিশাল দেহের সেই চেনা হ্যাংলা-পাতলা জর্জ ছেলেটা। অনেকটা বেঁহুশ।
ভায়োলেট বিস্মিত হয়েছিল বুঝি এই কমাসে জর্জ এত মোটা হয়ে গেছে। সে নাইন ওয়ান ওয়ান কল করে জর্জকে হাসপাতালে পাঠায়। ব্রেন স্ট্রোক করে জর্জের সাময়িক আশ্রয় হয় হাসপাতালের বিছানায়।
মাস তিনেক পরে জর্জ হাসপাতাল থেকে ছাড়া পেয়ে বাড়ি ফিরে দেখে তার থাকার বাড়িটি আর আগের মতো নেই। নতুন করে রেনোভেটেট হয়ে এখানে এক নতুন মানুষ। তারা কিনে নিয়েছে পুরো বাড়িটা। নিরুপায় জর্জ এক অবশ হাত আর এক অবশ পা নিয়ে খোঁড়াতে খোঁড়াতে পথে এসে আশ্রয় নেয় খোলা আকাশের নিচে।
তারপর জীবন ধীরে ধীরে এই জীবনেই অভ্যস্ত হয়ে যায়। হারিয়ে যায় তার চাকরি। হারিয়ে যায় মারিয়ার প্রেম, উষ্ণতা। অপরাপর সম্পর্কও ভেঙে যায়। বন্ধুরাও যায় দূরে সরে।
হাজার মানুষের ভিড়ে-মানুষশূন্য এই পৃথিবীতে জর্জ শত মানুষের ভিড়ে আলগা হয়ে একাকী কেবল হাঁটে। কখনো বিড়বিড় করে একা একা কথা বলে নিজের সাথে। একা একাই হাসে। কখনো বুক ভেঙে হাহাকার করে কাঁদে।
প্রথম প্রথম খুব লজ্জা লাগত তার। পার্কের বেঞ্চে ঘুমাতে। মানুষের কাছে হাত পেতে খাবার চাইতে। সাবওয়ের ভেতর রাত কাটাতে। মানুষের করুণার দৃষ্টি সহ্য করতে।
কিন্তু সময় মানুষকে অনেক কিছু শিখিয়ে দেয়। এখন আর লজ্জা লাগে না। পার্কের বেঞ্চে ঘুমায়। রাতভর মারিয়াকে স্বপ্ন দেখে। বাবাকে স্বপ্ন দেখে। মাকেও মাঝেমধ্যে দেখে।
তবে তার খুব ইচ্ছে করে, কেউ তাকে নাম ধরে ডেকে উঠুক-হেই জর্জ!
রাত গভীর হয়। প্ল্যাটফর্ম প্রায় ফাঁকা। জর্জ চারপাশে তাকিয়ে দেখে নেয় পুলিশের কোনো টহল আছে কি না। কখনো কখনো তারা এসে ঘুমিয়ে থাকা হোমলেসদের সরিয়ে দেয়। যেন শহরের সৌন্দর্যের সঙ্গে তাদের অস্তিত্ব বেমানান।
জর্জ স্থান ত্যাগ করে অন্য কোনো মানুষের ভিড়ে হাঁটে। অন্য কোনো স্থানে। তার অনন্ত পিপাসা মানুষের গন্ধ শোঁকা। কোনো মায়ের, বাবার গন্ধ, মারিয়ার শরীরের পাগল করা গন্ধ, পুরোনো দিনের স্মৃতির গন্ধ। এসব গন্ধ তার কাছে জীবনের গন্ধ, মানুষের গন্ধ। এক অকৃত্রিম ভালো লাগার গন্ধ। এই গন্ধ শুঁকে শুঁকেই সে এ-যাবৎকাল বেঁচে আছে।
কিন্তু সে ভালো করে অনুধাবন করে, মানুষ তার কাছে এলে কেমন এক নিমেষেই মুখ ফিরিয়ে নেয়। কেউ নাক কুঁচকে দূরে সরে যায়। কেউ পাশ কাটিয়ে দ্রুত হাঁটে।
দীর্ঘদিনের অনাহার, রাস্তায় কাটানো রাত, না-ধোয়া কাপড় আর অবহেলার স্তর জমে তার শরীর থেকে বের হয় এক তীব্র দুর্গন্ধ। মানুষ সেই গন্ধ সহ্য করতে পারে না।
গভীর রাত। একে একে মানুষ ঘরে ফিরে গেছে হয়তো। দানবের মতো শব্দ করে ট্রেন আসে থামে। দু-একজন মানুষ এই স্টেশনে থামে, তারপর এক্সিট ধরে বেরিয়ে যায় গন্তব্যে।
জর্জের কোনো গন্তব্য নেই। তাই তার ফেরা হয় না। তার অপেক্ষায় কেউ নেই। আমেরিকার তেত্রিশ কোটি মানুষের মধ্যে একজন মানুষও তার অপেক্ষায় নেই। মা নেই, বাবা নেই। মারিয়াও নেই।
মারিয়া হয়তো এখন অন্য কোনো পুরুষের আলিঙ্গনে। ভেতরটা তোলপাড় করে ওঠে। আর তখন বেসুরে চিৎকার করে ওঠে সে।
সাবওয়ের প্ল্যাটফর্মে বসে থেকে স্মৃতির দহনে হঠাৎ ভেঙে পড়ে। দুই হাতে মুখ ঢেকে শিশুর মতো কাঁদতে থাকে। তারপর মাথা তুলে শূন্যের দিকে তাকিয়ে চিৎকার করে বলে, ‘হে ভাগ্য! আমার ঘর কেড়ে নিয়েছ, আমার মানুষগুলো কেড়ে নিয়েছ, আমার ঠিকানা কেড়ে নিয়েছ-কিন্তু আমার শরীর থেকে মানুষের গন্ধটুকুও কেন কেড়ে নিলে? কেন আমাকে এমন করে দিলে, যাতে মানুষ আমার কাছে আসতে ভয় পায়?’
তার কণ্ঠ প্ল্যাটফর্মের দেয়ালে দেয়ালে প্রতিধ্বনিত হয়। কেউ শোনে না। কেউ থামে না। ট্রেন আসে, ট্রেন চলে যায়। মানুষ আসে, মানুষ চলে যায়। শুধু জর্জ বসে থাকে।
হয়তো সে কারণেই সে প্রতিদিন মানুষের ভিড়ে মিশে যায়। মানুষের গন্ধ খোঁজে। আপনজনের গন্ধ খোঁজে। নিজের হারিয়ে যাওয়া মানুষগুলোর স্মৃতির উষ্ণতা খোঁজে।
পাপাইয়া, ম্যাগডোনালসের দরজার সামনে ঠায় দাঁড়িয়ে থাকে প্রতিবেলায় খাবারের আশায়। যদি ভাগ্যে জুটে। কখনো জুটে কখনো পশুর মতো দূর দূর করে তাড়িয়ে দেয়।
তার কাঁধে জীর্ণ অথচ ভারী ব্যাগ। সেখানে তার বেঁচে থাকার সঞ্চিত ভাঙাচোরা জিনিসপত্র। শীতের কম্বল। গায়ের পুরোনো ময়লা গেঞ্জি। মগ, ওষুধের শিশি। পথে কুড়িয়ে পাওয়া কোনো জিনিস। আকস্মিক কারও দান করা কোনো জিনিস। আরও হরেক রকমের। জর্জের মনেও নেই কখন কোন কাজের কথা মনে করে কোনো একটা কিছু তুলে রেখেছে কাঁধের ব্যাগে।
এই ভারী ব্যাগ তার নিত্যসঙ্গী। একটাই দায়িত্ব তার এই ব্যাগটাকে যত্নে রাখা। কাঁধের একটা ব্যাগই তার পরিচিতি দেয়, সে একজন মানুষ। অন্যথায় সে সর্বত্র অবাধ বিচরণের একটি পশুজাত হিসেবে পরিচিত হতো।
জর্জ এবার উঠে দাঁড়ায়। তারপর ধীরে ধীরে সিঁড়ি বেয়ে ওপরে ওঠে।
শহর তখনো জেগে আছে। আকাশচুম্বী ভবনের জানালায় আলো জ্বলছে। হাজার হাজার মানুষের ঘরে রাতের খাবার পরিবেশন হচ্ছে। কেউ গল্প করছে, কেউ টেলিভিশন দেখছে, কেউ সন্তানের কপালে চুমু খেয়ে ঘুম পাড়িয়ে দিচ্ছে।
জর্জ কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে সেই আলোভরা জানালাগুলোর দিকে তাকিয়ে থাকে। তারপর নিজের অজান্তেই মৃদু হাসে। হয়তো মানুষ বেঁচে থাকে আশাতেই। হয়তো আগামীকালও সে এই ভিড়ের মধ্যে হাঁটবে। মানুষের গন্ধ শুঁকবে। আপনজনের উষ্ণতা খুঁজবে। জর্জ তার চিরাচরিত অভ্যাসে গন্তব্যহীন পথ হাঁটে।
গত কয়েক দিন আগের এক বিকেলে অনির্দিষ্ট গন্তব্যে হাজির হয় জর্জ, নিউইয়র্ক সিটি কাউন্সিল অফিসের সামনে। হঠাৎ কানে বাজে এক মনোমুগ্ধকর আওয়াজ। পক্ষাঘাতে অবশ হয়ে আসা পায়ের দুর্বলতা যেন তার হৃদয়ের অদম্য শক্তির কাছে হার মেনে যায়। ধীরে ধীরে হাঁটতে হাঁটতে সে এসে দাঁড়ায় সিটি হলের সামনে।
হঠাৎ বাইরে ভেসে আসে তার পূর্বপুরুষের ভাষার ছন্দময় উচ্চারণ। কেউ কবিতা পাঠ করছে। শব্দগুলো যেন মুহূর্তেই তার বুকের গভীরে ঘুমিয়ে থাকা স্মৃতির দরজায় কড়া নাড়ে। এক অদ্ভুত আবেগে সে খোলা দরজার প্রান্তে এসে দাঁড়ায়। সবার মতো সেও কান পেতে শোনে। ভেতরে স্বাধীনতা দিবস উপলক্ষে কবিতাপাঠের আয়োজন চলছে।
সারিবদ্ধ চেয়ারে উপবিষ্ট নানা জাতিগোষ্ঠীর মানুষের সামনে মঞ্চে একের পর এক আবৃত্তি হচ্ছে কবিতা-স্প্যানিশ, ম্যান্ডারিন, ইয়িদ্দিশ, হাইতিয়ান ক্রেওল, রুশসহ অসংখ্য ভাষায়। পটভূমিতে বেজে চলেছে স্বাধীনতা দিবসের মনকাড়া সুর। বিচিত্র জাতিসত্তার মানুষ নিজ নিজ ঐতিহ্যবাহী পোশাকে দাঁড়িয়ে উচ্চারণ করছে স্বাধীনতার কবিতা। মুহূর্তেই জর্জ বুঝে যায়Ñআমেরিকার স্বাধীনতা দিবস আর বেশি দূরে নয়।
সেখান থেকে সে পা বাড়ায় আরেকটি জনসমাগমে। সিটি হলের কাউন্সিল চেম্বারে যেন উৎসবের আরেক রূপ। সারি সারি ব্যানার, নানান দেশের খাবারের স্টল, মানুষের কোলাহল আর সৌহার্দ্যরে উচ্ছ্বাস। একটি স্টলে লেখা, ‘মিউজিয়াম অব ফুড অ্যান্ড ড্রিংক (মোফাডা)’।
ভেসে আসা পরিচিত এক ঘ্রাণে জর্জের বুক হু হু করে ওঠে। এ তো তার বাবার প্রিয় আদিবাসী খাবারের সুবাস! বাবা নিজের হাতে সেই খাবার রান্না করে টেবিলে বসতেন, আর গল্পের পর গল্প বুনতে বুনতে হারিয়ে যেতেন অতীতের স্মৃতিলোকে।
একজন স্বেচ্ছাসেবী সস্নেহে জর্জের হাতে একটি খাবারের প্যাকেট তুলে দেয়। সে নীরবে জনসমাগম ছেড়ে পার্কের এক কোণে গিয়ে বসে। প্যাকেট খুলতেই বহুদিনের চাপা পড়ে থাকা স্মৃতিগুলো খড়খড়ে পাতার মতো ঝরে পড়ে। চোখ বেয়ে নেমে আসে অশ্রুর নীরব ধারা। খাওয়া শেষ করে ক্লান্ত শরীর নিয়ে বেঞ্চে হেলান দিয়ে কখন যে ঘুমিয়ে পড়ে, সে নিজেও জানে না।
এভাবেই কেটে যায় কয়েকটি দিন। শহরের অলিগলি, পার্ক, রাস্তা-সবখানেই স্বাধীনতা উৎসবের প্রস্তুতি। আর রাতের আকাশজুড়ে রঙিন আতশবাজির ঝলক দেখে সে নিশ্চিত হয়-আগামীকালই চতুর্থ জুলাই, আমেরিকার স্বাধীনতা দিবস। পরদিন দুপুরে সাবওয়ে স্টেশনের এক কোণের বেঞ্চে বসে ছিল জর্জ। হঠাৎ বাইরে থেকে ভেসে আসে স্বাধীনতা দিবসের উচ্ছ্বসিত সুর। সে যেন চমকে ওঠে। ধীরে ধীরে উঠে বাইরে আসে।
ব্রডওয়ে-জুড়ে তখন মানুষের অবারিত ঢল। লাল, সাদা আর নীলের ঢেউ। অসংখ্য পতাকা, উল্লাস, গান আর বিজয়ের সেøাগানে মুখর চারদিক।
জর্জের বুকের ভেতর অদ্ভুত এক আলোড়ন জেগে ওঠে। মানুষের ভিড়ের মধ্যে সে যেন খুঁজতে থাকে আপনজনের গন্ধ, হারিয়ে যাওয়া কোনো পরিচয়ের স্পর্শ।
দীর্ঘ মিছিল সারা পথ উত্তাল আনন্দ উৎসবে মাতিয়ে চলছে। হঠাৎ যেন শহরের ব্যস্ত সড়কজুড়ে নেমে আসে এক বর্ণিল আনন্দ মিছিল।
আদিবাসীদের ঐতিহ্যবাহী উপঢৌকন, রঙিন পোশাক আর উৎসবের উচ্ছ্বাসে মুখরিত হয়ে ওঠে চারপাশ। কারও হাতে উড়ছে আমেরিকার স্বাধীনতা দিবসের পতাকা, কারও হাতে ৪ জুলাইয়ের স্মারক প্ল্যাকার্ড।
আমেরিকার আড়াইশ বছর পূর্তি উদ্যাপনের আনন্দে নানা বর্ণ, ভাষা ও সংস্কৃতির মানুষ এক স্রোতে মিলিত হয়ে এগিয়ে চলেছে আধুনিক সভ্যতার বিজয়গাথা বহন করে।
চারদিকে বিজয়োল্লাসের ঢেউ। আকাশজুড়ে আতশবাজির ঝলকানি, রাস্তাজুড়ে উৎসবমুখর মানুষের ঢল। সেই উচ্ছ্বসিত জনসমুদ্রের মাঝখানে দাঁড়িয়ে জর্জের হঠাৎ বুক ফাটিয়ে চিৎকার করে উঠতে ইচ্ছে করে, ‘এই আমেরিকা আমার! এই মাটির প্রতিটি ধূলিকণা আমার পূর্বপুরুষদের পদচিহ্ন বহন করে। এই অরণ্য, এই পাহাড়, এই নদী, এই প্রান্তর-সবই আমার আদি পুরুষদের উত্তরাধিকার। তাদের শ্রম, ত্যাগ, সংগ্রাম আর সভ্যতার ভিত্তির ওপরই দাঁড়িয়ে আজকের এই আধুনিক আমেরিকা। তাই এই দেশের প্রতিটি অর্জনে আমারও অংশ আছে। এই আমেরিকা আমার-আমার আত্মপরিচয়, আমার ইতিহাস, আমার গর্ব।’ কথাগুলো উচ্চারণ করতে গিয়ে বেসুরো গলায় প্রতিধ্বনি জনসমুদ্রের উল্লাসের মধ্যে তার সেই আর্ত উচ্চারণ বাতাসে প্রতিধ্বনিত হতে হতে ঠিক যেন তা একাকার হয়ে পড়ে সমগ্র আমেরিকার পথে-ঘাটে ছড়িয়ে থাকা সাত লক্ষ গৃহহীনের অদৃশ্য, অব্যক্ত যন্ত্রণাময় আর্তচিৎকারের সঙ্গে।
‘আমার একটা ঘর চাই,
নিত্যদিনের খাবার চাই।’