বুধবার, ২৮ অক্টোবর ২০২৬
সর্বশেষ :
• ৬৩০ কোটি ডলার জাপানি বিনিয়োগ নিয়ে আলোচনা, ২ লাখ কর্মসংস্থানের সম্ভাবনা : প্রধানমন্ত্রী • ভোটে পিছিয়ে যাওয়ার শঙ্কায় নেতানিয়াহু, কী হতে যাচ্ছে ইসরায়েলে? • বাংলাদেশ-স্পেন বাণিজ্য ও বিনিয়োগ জোরদারে গুরুত্বারোপ পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রীর • মস্তিষ্ককে সচল রাখতে প্রতিদিন সকালে যে ৫ কাজ করবেন • যাত্রাবাড়ীতে গুলিতে যুবক নিহত • আপত্তিকর ভিডিও ভাইরাল হওয়া সেই জামায়াত নেতাকে অব্যাহতি • লাল কার্ডকাণ্ডের পর ৬ ম্যাচের নিষেধাজ্ঞার মুখে নেইমার • আইজিপি সহজ-সরল মানুষ, ক্রসফায়ার নিয়ে বক্তব্য ঠিক হয়নি : স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী • জাপানে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় বৈঠক ফলপ্রসূ হয়েছে : হুমায়ূন কবির • ‘ডিজিটাল খাতে ১০ লাখ কর্মসংস্থান সৃষ্টির লক্ষ্য সরকারের’

বুধবার, ২৮ অক্টোবর ২০২৬

বিজ্ঞাপন

​নজরুলের আধ্যাত্মবাদ ও তাঁর দর্শন

​নজরুলের আধ্যাত্মবাদ ও তাঁর দর্শন

বিজ্ঞাপন
নজরুল ছিলেন স্রষ্টার এক বিস্ময়কর সৃষ্টি। তাঁর অসাধারণ মেধা ও সৃজনশীলতা, অবিচলিত নৈতিকতা, অপরিসীম আত্মবিশ্বাস ও অদম্য সাহস তাকে সমাসীন করেছে মানবতার সুউচ্চ আসনে। তাঁর জীবনের পরিণত বয়সের মাত্র ২২ বছর (২০ থেকে ৪২ বছর) তিনি লেখার সময় পেয়েছিলেন। তবু এই স্বল্প সময়ের মধ্যেই তিনি বাংলা সাহিত্যের ও সংগীতের অঙ্গনে যে গভীর পদচিহ্ন রেখে গেছেন; কথায়, ছন্দে ও সুরে যে অভিনব দিক উন্মোচন করে গেছেন এবং সর্বোপরি যে বিশাল রত্নভান্ডার সৃষ্টি করে গেছেন, আমার বিশ্বাস ও আমার জানামতে তার তুলনা বিশ্বসাহিত্যের অঙ্গনে আজও বিরল।

আজ তিনি নীরব হয়ে যাওয়ার একশত বছর পরও তাঁর উপস্থিতি সমগ্র বিশ্বে বিরাজমান। তিনি আজ বিশ্বমঞ্চে অত্যন্ত উচ্চ আসনে সমাসীন। ভাষা, কাল ও ভৌগোলিক সীমা পেরিয়ে আজ নজরুল বিশ্বব্যাপী পরিচিত ও সমাদৃত।

দুর্দান্ত প্রতিকূল আবহাওয়ার মাঝে থেকেও, অনেক ঝঞ্ঝাবহুল পরিবেশের সঙ্গে যুদ্ধ করেও নজরুল সৃষ্টি করেছেন অতুলনীয় সাহিত্যসম্ভার; যার বিস্তার ও গভীরতা অপরিসীম, হয়তো-বা সেটা সম্ভব হয়েছিল। কারণ তাঁর মেধা, কর্মক্ষমতা ও সৃজনশীলতা ছিল ঈশ্বর-প্রদত্ত। নজরুল হয়তো নিজেও সেটা উপলব্ধি করতে পারতেন। তাই জীবনে চলার পথে এবং তাঁর ভাষণ, সাহিত্য ও সংগীতের মাধ্যমে তিনি বারবার স্মরণ করেছেন সৃষ্টিকর্তাকে, তাঁর অন্তর্যামীকে।

নজরুল কে ছিলেন? কী ছিল তাঁর জীবন-দর্শন? কী ছিল তাঁর আধ্যাত্মিক চিন্তাধারা, কী ছিল তাঁর বিশ্বাস? এসব বিশ্লেষণ করা সত্যিকার অর্থে অনেক গবেষণাভিত্তিক। তবু নজরুলের বিভিন্ন রচনা, ভাষণ ও সংগীতের মাঝে তাঁকে আমরা কেবল বুঝতে চেষ্টা করতে পারি। তিনি লিখেছেন :
এ কোন মায়ায় ফেলিলে আমায় চির জনমের স্বামী,
তোমার কারণে এ তিন ভুবনে শান্তি না পাই আমি
অন্তরে যদি লুকাইতে চাই অন্তর জ্বলে-পুড়ে হয় ছাই
এ আগুন আমি কেমনে লুকাই ওগো অন্তর্যামী।
যে দেখেছে প্রিয় বারেক তোমায় বর্ণিতে রূপ ভাষা নাহি পায়,
পাগলিনী সম ছুটিয়া বেড়ায় অসহায় দিবা জামি
এ কোন মায়ায় ফেলিলে আমায় চির জনমের স্বামী।

‘জীবনের শেষ ভাষণ, যদি আর বাঁশী না বাজে’-তে তিনি বলেছেন, ‘যদি আপনাদের প্রেমের প্রবল টানে আমাকে আমার একাকিত্বের পরম শূন্য থেকে অসময়ই নামতে হয়, তাহলে সেদিন আমায় মনে করবেন না আমি সেই নজরুল। সে নজরুল অনেক দিন আগে মৃত্যুর খিড়কি দুয়ার দিয়ে পালিয়ে গেছে। সেদিন আমাকে কেবল মুসলমানের বলে দেখবেন না, আমি যদি আসি আসবো হিন্দু মুসলমানের সকল জাতির উর্দ্ধে যিনি একমেবাদ্বিতীয়ম তারই দাশ হয়ে।’
কে তাঁর একমেবাদ্বিতীয়ম, কে তাঁর অন্তর্যামী? এসব বিশ্লেষণ করবার জন্য দীর্ঘদিনের সারগর্ভ গবেষণার প্রয়োজন।

‘রাজবন্দীর জবানবন্দি’তে নজরুল বলেন, ‘আমি কবি, অপ্রকাশ সত্যকে প্রকাশ করবার জন্য, অমূর্ত সৃৃষ্টিকে মূর্তিদানের জন্য ভগবান কর্তৃক প্রেরিত। কবির কণ্ঠে ভগবান সাড়া দেন। সে বাণী রাজ দারে দণ্ডিত হতে পারে, কিন্তু ধর্মের আলোকে নায়ের দুয়ারে তাহা নিরপরাধ, নিষ্কলুষ, অমøান, অনির্বাণ সত্য স্বরূপ।’

‘রাজবন্দীর জবানবন্দি’তে তিনি আরও বলেছেন, ‘আমি শুধু রাজার অন্যায়ের বিরুদ্ধেই বিদ্রোহ করি নাই, সমাজের, জাতির, দেশের বিরুদ্ধে আমার সত্য তরবারির তীব্র আক্রমণ সমান বিদ্রোহ ঘোষণা করেছে। তার জন্য ঘরে বাইরে বিদ্রু, অপমান, লাঞ্চনা, আঘাত আমার ওপর অপ্রজাপ্ত পরিমাণে বর্ষিত হয়েছে, কিন্তু কোনো কিছুর ভয়ে নিজের সত্যকে, আপন ভগবানকে হীন করি নাই, লোভের বশবর্তী হয়ে আত্ম উপলব্ধিকে বিক্রয় করি নাই, নিজের সাধনালব্ধ বিপুল আত্মপ্রসাদকে খাটো করি নাই, কেননা আমি যে ভগবানের প্রিয়, সত্যের হাতের বিনা/ আমি যে কবি, আমার আত্মা যে সত্যদ্রষ্টা হৃশির আত্মা। আমি অজানা অসীম পূর্ণতা নিয়ে জন্ম গ্রহণ করেছি। এ আমার অহংকার নয়, আত্ম উপলব্ধির আত্ম বিশ্বাসের চেতনালব্ধ সহজ সত্যের সরল স্বীকারোক্তি।’

গভীর আধ্যাত্মিকতা তাকে নির্ভীকভাবে পথচলার সাহস জুগিয়েছিল।
নজরুল এসেছিলেন তাঁর জীবন-দর্শন দিয়ে মানুষকে সমৃদ্ধ করতে, পৃথিবীকে শান্তিময় ও সুন্দর করে গড়ে তুলতে। তাঁর শেষ ভাষণে তিনি বলেছিলেন, ‘আজ আপনাদের কাছে বলে যাব আবার নিদ্রিতা সমাধিস্থা শক্তি জেগেছেন, তবে তন্দ্রার ঘোরে সমাধির বিউভলতা কাটেনি। আমার সেই আনন্দময়শক্তি যদি আবার সমাধিস্থা না হন, আমায় পরম শূন্যে নিয়ে গিয়ে চিরকালের জন্য লয় না করেন, তাহলে এই পৃথিবীতে যে প্রেমের যে সাম্মের যে আনন্দের গান গেয়ে যাব, সে গান পৃথিবী বহুকাল শোনেনি। আমার চির জনমের প্রিয়া এই প্রেমময়ীর প্রেম যদি না পাই তাহলে বুঝবো আমার এবারের মত খেলা ফুরালো ও আমার বাঁশি বিরহজমুনার তীরে ফেলে চলে যাব। শুষ্ক যমুনার বালুচর থেকে সেই বেনু কুড়িয়ে যদি অন্য কেউ বাজাতে পারেন, আমার ফেলে যাওয়া বাঁশি ধন্য হবে।’

আজ তাঁর সেই ফেলে যাওয়া বাঁশি বেজে চলেছে বিশ্বব্যাপী; আমেরিকার দুটো বিশ্ববিদ্যালয়ে, যেমন ক্যালিফোর্নিয়া স্টেট ইউনিভার্সিটি এবং ইউনিভার্সিটি অব কানেক্টিকাটে undergraduate লেভেলে নজরুলের সাহিত্য ও দর্শনের ওপর কার্যক্রম চলছে এবং আমেরিকায় এবং বিশ্বব্যাপী অনেক গবেষক ব্যক্তিগত উদ্যোগে নজরুলের সাহিত্য ও দর্শনের ওপর কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছেন, সারগর্ভ সেমিনারের আয়োজন করছেন, তাঁর সাহিত্য ও দর্শনের ওপর ভিত্তি করে বই লিখছেন বিভিন্ন ভাষায়। বাংলাদেশে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে, নজরুল ইনস্টিটিউটে, ময়মনসিংহের ত্রিশালে জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়ে এবং ভারতবর্ষে আসানসোল নজরুল বিশ্ববিদ্যালয়, দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয় এবং দার্জিলিং বিশ্ববিদ্যালয়ে নজরুলের ওপর কার্যক্রম চলছে। এককথায় বলা যায়, নজরুল তাঁর অসাধারণ সৃষ্টির জন্য বিশ্বব্যাপী আজ সমাদৃত শুধু তাই নয়, তাঁর বাণী আজ সমগ্র বিশ্বের কাছে সম্প্রীতি, সৌহার্দ্য, সততা, শান্তি ও সাহসের বাণী পৌঁছে দিচ্ছে, বিশ্ব শান্তির পথে দিগ্দর্শনে সহায়ক হচ্ছে।
নজরুল যেন আবার গেয়ে উঠছেন,
হে প্রিয় আমারে দেবো না ভুলিতে
মোর স্মৃতি তাই রেখে যাই শত গীতে।

নিউজটি শেয়ার করুন


সর্বশেষ আপডেট

 
© 2026 All Rights Reserved by Thikana Group Of Media
Developed by SolveEz