ফের বার্মা ইস্যুতে শঙ্কায় বাংলাদেশ

প্রকাশ : ০৮ জুলাই ২০২৬, ১২:২৪ , অনলাইন ভার্সন
দীর্ঘ বিরতির পর কদিন ধরে আবারও উত্তপ্ত বাংলাদেশ-মিয়ানমার সীমান্ত। আরাকান আর্মির প্রধান আহত হয়ে বাংলাদেশে চিকিৎসা নিচ্ছেন বলে ছড়ানো গুজবের বেশ ব্যাপকতা। পররাষ্ট্রমন্ত্রী এ তথ্য নাকচ করলেও ঘোর কাটছে না। গুঞ্জন আরও ডালপালা ছড়াচ্ছে। আরাকান আর্মির নিয়ন্ত্রণে থাকা রাখাইন রাজ্যে বিমান হামলা জোরদার করেছে দেশটির জান্তা বাহিনী। বোমার শব্দ আর কম্পন সীমানা পেরিয়ে টেকনাফের বাসিন্দাদের মাঝেও। পরিস্থিতি সামাল দিতে টহল জোরদার করেছে বিজিবি। নাফ নদীর ওপারের রক্তাক্ত সংঘাত বাংলাদেশসহ আশপাশের জন্য উদ্বেগের। এখন পর্যন্ত রাখাইনে শক্ত অবস্থানে থাকা আরাকান আর্মির বিরুদ্ধে জান্তা বাহিনীর সফলতার সম্ভাবনা কম। আরাকান আর্মি এমন এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে, যা মিয়ানমারের ইতিহাসের মোড় ঘুরিয়ে দিতে পারে। জাতিগত স্বায়ত্তশাসনের দাবিতে গড়ে ওঠা একটি সশস্ত্র বিদ্রোহী সংগঠন থেকে তারা এখন রাষ্ট্র গঠনের লক্ষ্যে অগ্রসর একটি রাজনৈতিক-সামরিক শক্তিতে রূপ নিয়েছে। বাংলাদেশের সঙ্গে মিয়ানমারের সীমান্তবর্তী অঞ্চলটি ২০২৪ সালের শেষ নাগাদ নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নেয় আরাকান আর্মি। এর পর থেকে কার্যকর আরাকান পিপলস রেভল্যুশনারি গভর্নমেন্ট (এপিআরজি) প্রতিষ্ঠা এবং চিন ও কাচিন রাজ্য ছাড়াও মাগওয়ে, সাগাইং, আয়েয়ারওয়াদি ও বাগো অঞ্চলে সামরিক অভিযান সম্প্রসারণের মাধ্যমে আরাকান আর্মি আর কেবল একটি বিদ্রোহী সংগঠন নয়; বরং কার্যত একটি সার্বভৌম রাজনৈতিক শক্তিতে পরিণত হয়েছে। এ সময়ে চীন, বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যকার ভূরাজনৈতিক প্রতিযোগিতা কোন পর্যায়ে যাবে, আরাকান আর্মিরই-বা কী ভবিষ্যৎ, তা প্রশ্ন হয়ে থাকছে। আন্তর্জাতিকভাবে স্পর্শকাতর এই অঞ্চলে চলমান সংঘাতে তাই বাংলাদেশকে কৌশলী হতে হচ্ছে। পরাশক্তিগুলোর সাথে কৌশলগত সম্পর্কের কারণে পরিস্থিতি মোকাবিলায় বাংলাদেশ কিছুটা সুবিধাজনক অবস্থানে থাকলেও সামনের দিনগুলোতে এ কৌশল কতটা ফল দেবে, সংশয় থেকেই যাচ্ছে। তখন নতুন করে আরও রোহিঙ্গার অনুপ্রবেশও ঘটতে পারে। আশপাশে যোগ হচ্ছে আরও নানা যন্ত্রণা। ভারত সীমান্তে পুশইন, পার্বত্য চট্টগ্রামের রেতলাংয়ে সংঘর্ষ, মিয়ানমার সীমান্তে উত্তপ্ত পরিস্থিতি।
বাংলাদেশ নিজে কনফ্লিক্ট জন্ম না দিলেও কনফ্লিক্টে পড়ে যাচ্ছে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের চীন সফরটি কেবল ১৫টি সমঝোতা স্মারক, দুটি চুক্তি ও ১৬ দফা যৌথ ইশতেহারে সীমিত নয়। ফেব্রুয়ারিতে দায়িত্ব নেওয়ার পর প্রথম বৃহৎ শক্তি হিসেবে বেইজিংকে বেছে নেওয়া, দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ককে ‘নতুন যুগের চীন-বাংলাদেশ অভিন্ন ভবিষ্যতের অংশীদারত্বে’ উন্নীত করা এবং পররাষ্ট্র-প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় পর্যায়ে ‘টু প্লাস টু’ সংলাপ কাঠামো অনুসন্ধানের সিদ্ধান্ত মিলিয়ে ঢাকার পররাষ্ট্রনীতিতে একটি কাঠামোগত পুনর্বিন্যাস হয়েছে। দক্ষিণ এশিয়ায় পাকিস্তানের পর বাংলাদেশই দ্বিতীয় দেশ, যার সঙ্গে চীন ‘অভিন্ন ভবিষ্যতের’ এই সর্বোচ্চ কূটনৈতিক ফ্রেমে এল। সেখানে চীনা প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের কয়েক কথার ভেতরে লুকানো আছে মারাত্মক বার্তা। তার ‘বিশ্ব যতই বদলাক, চীন-বেইজিং মৈত্রীর মূল অভিমুখে চীন অবিচল থাকবে’-এ বার্তার ফের বড় কঠিন।
একদিকে বাংলাদেশের মানচিত্র নিয়ে কোনো পরাশক্তির পরীক্ষা-নিরীক্ষাকে নিজের কৌশলগত স্বার্থের ওপর আঘাত হিসেবে দেখবে বলে জানিয়েছে চীন। আরেকদিকে ভারতের নতুন সংসদ ভবনে ‘অখণ্ড ভারত’ ম্যুরাল ঘিরে প্রতিবেশী দেশগুলোতে অস্বস্তি। আর বাংলাদেশের ২০ কোটি মানুষের সাথে ভারতের ১৪০ কোটি মানুষ মিলে সুপার পাওয়ার হওয়ার বার্তা দিয়ে ভাইরাল ঢাকায় নিযুক্ত নয়া হাইকমিশনার দীনেশ ত্রিবেদী। এর মাঝেই বিপুল উদ্যমে বিদ্যমান বৈশ্বিক ক্ষমতার ভারসাম্যকে আমূল পরিবর্তনের নিশানা করেছে চীন। গণচীনের প্রতিষ্ঠাতা মাও সে তুংয়ের পর প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং দেশটির সবচেয়ে শক্তিশালী নেতা হিসেবে বিবেচিত হচ্ছেন। মাও-এর মতো তারও চীনের কমিউনিস্ট পার্টির মূল নেতা এবং কোনো উত্তরসূরি বা মেয়াদসীমার বাধ্যবাধকতা ছাড়াই আজীবন ক্ষমতায় থাকার পথ সুগম। এ অভিযাত্রাতেই যোগ হয়েছে বাংলাদেশের সঙ্গে বন্ধুত্বের বিষয়। চীন সব সময় বাংলাদেশে বিদেশি হস্তক্ষেপের বিরুদ্ধে অবস্থান নেবে বলে আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দিয়ে গোটা বিশ্বকে চমকে দিয়েছে। চীনের বাংলাদেশস্থ দূতাবাস তাদের ফেসবুক পেজে পোস্ট দিয়ে জানিয়েছে, ‘বৃহত্তর আঞ্চলিক সংযোগের জন্য চীন-মিয়ানমার-বাংলাদেশ অর্থনৈতিক সংযোগ সড়ক উন্নয়নে বাংলাদেশের সাথে কাজ করতে প্রস্তুত।’ এই সংযোগ সড়ক স্থাপিত হলে গণপ্রজাতন্ত্রী চীন কার্যত বাংলাদেশের প্রতিবেশী হিসেবে আবির্ভূত হবে, যা বাংলাদেশের আরেক প্রতিবেশী ভারতের চরম নাপছন্দ। রোহিঙ্গাসহ আঞ্চলিক কিছু বিষয় এখন আর কেবল বাংলাদেশ-মিয়ানমার নয়, ভারতসহ সবার জন্যই ফ্যাক্টর। একটি আঞ্চলিক দাবার লড়াইয়েও পরিণত হয়েছে, যেখানে রোহিঙ্গা সংকট সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত হাতিয়ার। আরাকান আর্মি স্থানীয়ভাবে ‘লাওং পাও’ নামে পরিচিত লটারি চালু করেছে। এ উদ্যোগকে তাদের অর্থনৈতিক কৌশলের এক যুগান্তকারী পরিবর্তনের সূচনা বলা যায়। এটি কোনো সাধারণ তহবিল সংগ্রহের উদ্যোগ নয়; বরং রাষ্ট্রীয় রাজস্ব আহরণের একটি ব্যবস্থা।
রাখাইনের ঐতিহ্যবাহী সাংস্কৃতিক আচার-অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে অনুষ্ঠিত প্রথম ড্রয়ে কিয়াউকতাউ এলাকার এক বাসিন্দা প্রথম পুরস্কার হিসেবে ৫ কোটি কিয়াত পেয়েছেন। দ্বিতীয় ও তৃতীয় পুরস্কারের অর্থমূল্য ছিল যথাক্রমে ৩ কোটি ও ২ কোটি কিয়াত। এ ছাড়া ৫০ লাখ থেকে শুরু করে ৫ লাখ কিয়াত পর্যন্ত আরও কয়েক ডজন পুরস্কার দেওয়া হয়। পুরস্কারের এ বিপুল অঙ্ক থেকে বোঝা যায়, আরাকান আর্মি স্থানীয় অর্থনীতিতে বিদ্যমান উল্লেখযোগ্য তারল্য নিজেদের নিয়ন্ত্রণে আনতে সক্ষম হয়েছে। লটারির আয় থেকে অর্ধেক অর্থ স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও সামাজিক উন্নয়নে ব্যয় করার ঘোষণা দিয়ে আরাকান আর্মি কার্যত নিজেদের কল্যাণমূলক রাষ্ট্রব্যবস্থার অর্থায়নের ভিত্তি তৈরি করছে। এ ব্যবস্থা বাইরের সহায়তা কিংবা অবৈধ বাণিজ্যের ওপর তাদের নির্ভরতা কমাতে পারে। একই সঙ্গে বৈধ পরিচয়পত্র ও পারিবারিক নিবন্ধন বাধ্যতামূলক করা এবং অপরাধীদের পুরস্কার না দেওয়ার হুঁশিয়ারির মাধ্যমে আরাকান আর্মি বিচারিক কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করছে। লটারি-সংক্রান্ত যেকোনো বিরোধের আদালতেই নিষ্পত্তি হবে-এমন ঘোষণাও রাখাইনে তাদের একক আইনি কর্তৃত্বকে সুদৃঢ় করেছে। এত বড় পরিসরের একটি লটারি আয়োজন আন্তর্জাতিক মহলের কাছেও একটি বার্তা। আরাকান আর্মির উত্থান মিয়ানমারকে ভারত ও চীনের কৌশলগত প্রতিদ্বন্দ্বিতার আরও গভীরে ঠেলে দিয়েছে। বাংলাদেশ এ প্রতিযোগিতায় একটি গুরুত্বপূর্ণ ভারসাম্য নির্ধারক রাষ্ট্র।
Thikana
M M Shahin, Chairman, Board of Editors, Thikana
Corporate Headquarter
THIKANA : 7409 37th Ave suite 403 Jackson Heights, NY 11372
Phone : 718-472-0700/2428, 718-729-6000
Fax: + 1(866) 805-8806
Bangladesh Bureau
THIKANA : 70/B, Green Road, (Panthapath), 5th Floor, Dhaka, BD.
E-Mail : [email protected]
For Advertisement : [email protected]