​একুশের কথা একুশের চেতনা

ওবায়েদুল্লাহ মামুন সম্পাদিত ঐতিহাসিক গবেষণাধর্মী দালিলিক গ্রন্থ

প্রকাশ : ০৯ জুলাই ২০২৬, ১৩:১০ , অনলাইন ভার্সন
‘একুশের চেতনা’ বলতে ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারির ভাষাশহীদদের আত্মত্যাগ থেকে পাওয়া আদর্শ ও অনুপ্রেরণাকে বোঝায়।

ভারত ও পাকিস্তানের স্বাধীনতা লাভের পরবর্তীকালে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের বাংলা ভাষাভাষীদের অধিকার ক্ষুণ্ন করার ষড়যন্ত্র উন্মোচিত হয়। রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ফিরে আসতে না আসতেই বাংলা ভাষার ওপর পাকিস্তানি শাসকদের আক্রমণের মুখে মাতৃভাষা আন্দোলনের সূত্রপাত। তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের প্রতি কেন্দ্রীয় সরকারের বৈষম্যমূলক নিপীড়ন ও নির্যাতনের সবচেয়ে বড় আঘাত ছিল মাতৃভাষার অধিকার ক্ষুণ্ন করা। বাংলাদেশের মানুষের মাতৃভাষা ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের ওপর আঘাত করা।

তৎকালীন পাকিস্তান সরকারের বৈষম্যমূলক আচরণ ও প্রাসাদ ষড়যন্ত্রের ফলে ভাষা আন্দোলন তীব্র রূপ ধারণ করে। ১৯৫২ সালের একুশে ফেব্রুয়ারি ভাষা আন্দোলনকারীদের ওপর বর্বরোচিত হামলা করা হয়। এতে কয়েকজন ভাষাসৈনিক ছাত্র শাহাদাত বরণ করেন এবং অনেকে আহত হন। একইভাবে সরকারি নিপীড়নের শিকার ভাষাসৈনিকদের ওপর ঢালাওভাবে জেল-জুলুম ও নির্যাতন চালানো হয়।

ভাষা আন্দোলনের সূত্রপাত এবং আন্দোলনের ক্রমবর্ধমান ঘটনাবলির সঙ্গে সম্পৃক্ত ভাষাসৈনিকদের অভিজ্ঞতা, অভিব্যক্তি ও মতামত সর্বস্ব রচনার মিলিত প্রয়াসে সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব ও লেখক ওবায়েদুল্লাহ মামুনের গবেষণার ফসল হলো ‘একুশের কথা একুশের চেতনা’ নামক মূল্যবান গ্রন্থ।

একুশের চেতনা হলো বাঙালির আত্মপরিচয়, স্বাধিকার আন্দোলন এবং অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করার এক চিরন্তন প্রেরণা। ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি (৮ ফাল্গুন ১৩৫৮ বঙ্গাব্দ) রাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবিতে ঢাকার বুকে ঘটে যাওয়া ভাষা আন্দোলনের ঐতিহাসিক ঘটনাকে কেন্দ্র করেই মূলত একুশের চেতনার বীজ বপন করা হয়।

সহজ কথায়, একুশের চেতনা বোঝায় দেশ, মাটি, গণমানুষের মাতৃভাষার প্রতি গভীর প্রেম ও সম্মান প্রদর্শন করা। সে সময় মাতৃভাষা বাংলার অধিকার রক্ষা করার জন্য তরুণ ছাত্রদের বুকের তাজা রক্ত দেওয়ার ঘটনাও পৃথিবীর ইতিহাসে বিরল। একুশের চেতনা আমাদের শেখায় নিজের ভাষা, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যকে ভালোবাসতে এবং তার মর্যাদা রক্ষা করতে।
উল্লিখিত গ্রন্থে মোট ২১টি প্রবন্ধ রয়েছে। ভাষা আন্দোলনের পক্ষে আন্দোলনকারী ভাষাসৈনিক, রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ, বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক এবং বহুভাষাবিদ ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহর গুরুত্বপূর্ণ প্রবন্ধসমূহ স্থান পেয়েছে।

এই গুরুত্বপূর্ণ বইটির ভূমিকা লিখেছেন ভাষাসংগ্রামী আহমদ রফিক। তিনি বলেন, ‘গ্রন্থটিতে ভাষাসৈনিকদের লেখা ও স্মৃতিচারণের মধ্য দিয়ে একনজরে রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনের প্রকৃত চিত্র প্রতিফলিত হয়েছে।’

বইটির প্রথম প্রবন্ধে জ্ঞানতাপস বহুভাষিক ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ বাংলা ভাষার হাজার বছরের ইতিহাসের শ্রেষ্ঠতম ভাষা হিসেবে বাংলাকে চিহ্নিত করেছেন। বাংলা ভাষার মর্যাদা রক্ষার স্বার্থে তাঁর লেখাটি যুক্তিগ্রাহী। ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ উল্লেখ করেন, ‘(তৎকালীন আলিগড় বিশ্ববিদ্যালয়ের) ড. জিয়াউদ্দীন আহমদ উর্দুকে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষারূপে গ্রহণ করার পক্ষে অভিমত দিয়েছেন। কিন্তু তিনি বোধহয় একথা ভুলিয়া গিয়াছেন যে, পাকিস্তানে মুসলমান ব্যতীত বহুসংখ্যক হিন্দু ও শিখ নাগরিক আছে।’

তিনি আরও স্পষ্টভাবে বলেছেন, ‘উর্দু পাকিস্তানের কোনো অঞ্চলেই মাতৃভাষারূপে চালু নয়। উপরিউক্ত ভাষাসমূহের মধ্যে বাংলা ভাষার সাহিত্য বিশ্বসাহিত্যে একটি বিশিষ্ট স্থান দখল করিয়াছে।’ তিনি দৃঢ়তার সঙ্গে বলেন, ‘ড. জিয়াউদ্দীন আহমদ পাকিস্তানের প্রদেশসমূহের বিদ্যালয় শিক্ষার বাহনরূপে প্রাদেশিক ভাষার পরিবর্তে উর্দু ভাষার পক্ষে অভিমত প্রকাশ করিয়াছেন, আমি একজন শিক্ষাবিদরূপে উহার তীব্র প্রতিবাদ জানাইতেছি। ইহা কেবলমাত্র বৈজ্ঞানিক শিক্ষানীতিবিরোধীই নয়, প্রাদেশিক স্বায়ত্তশাসন ও আত্মনিয়ন্ত্রণ অধিকারের নীতিবিগর্হিতও বটে।’
দ্বিতীয় লেখাটি রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনের রাজনৈতিক সৈনিকদের অন্যতম ‘ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত’, যিনি ছিলেন কুমিল্লা থেকে নির্বাচিত পাকিস্তান গণপরিষদের সদস্য। সংসদে তিনি বাংলা ভাষাকে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা করার জোরালো দাবি তোলেন।

‘একুশের স্মৃতিচারণ’ শীর্ষক একটি দীর্ঘ লেখায় তৎকালীন গণপরিষদের সদস্য মাওলানা আব্দুর রশীদ তর্কবাগীশ ব্যাপক আলোকপাত করেন। এই লেখায় উঠে আসে, বায়ান্নর ভাষা আন্দোলনের তীব্রতায় তিনি সংসদে জোরালো বক্তব্য দিয়েছিলেন। সারা দেশে প্রতিবাদের উত্তাল সময়ে তর্কবাগীশ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। ছাত্রদের ওপর পুলিশি হামলার প্রতিবাদে আইন পরিষদের অধিবেশন বর্জন করে তর্কবাগীশ মেডিক্যাল কলেজে চলে যান। এ প্রসঙ্গে তিনি বলেন :
‘২১ ফেব্রুয়ারি পূর্ববঙ্গ আইন পরিষদের অধিবেশন আহ্বান করা হয়। ওই দিন ছাত্ররা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আমতলায় রাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবিতে সভা করে এবং সভা শেষে ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করে পরিষদ ভবনের দিকে অগ্রসর হয়। সে সময়ে পরিষদ ভবন ছিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জগন্নাথ হলের বর্তমান অডিটোরিয়াম। অধিবেশন বসার পূর্বে পরিষদ ভবনে মুসলিম লীগ পার্লামেন্টারি পার্টির বৈঠক বসে। আমি ওই সভায় যোগদান করি। আমি সভা ত্যাগ করে মেডিকেল কলেজ প্রাঙ্গণে যাই।’ (একুশের কথা : ১১)

মাওলানা তর্কবাগীশ সে সময় সংসদের ভেতরে ও বাইরে ভাষা আন্দোলনের সঙ্গে সংহতি প্রকাশ করেন এবং গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। যেমন সংসদে তিনি প্রতিক্রিয়া জানাতে গিয়ে বলেন, ‘জনাব স্পিকার, আপনার কাছে আমি একটি নিবেদন করছি, যখন আমাদের দেশের ছাত্ররা, যারা আমাদের আশা-ভরসার স্থল, পুলিশের গুলির আঘাতে তাদের জীবনলীলা সাঙ্গ হচ্ছে, সেই সময় আমরা বসে থাকতে চাই না। প্রথমে এই মর্মান্তিক ঘটনার তদন্ত করতে হবে, তারপর হাউস চলবে।’

তারপর অনেক সময় ধরে সংসদের স্পিকারের সঙ্গে বাংলা ভাষার স্বাধিকার রক্ষার দাবি এবং তাঁর সঙ্গে অনেক যুক্তিতর্কের বাদানুবাদ চলতে থাকে। একইভাবে পার্লামেন্টের বাইরেও বাংলা ভাষার স্বাধিকার নিয়ে আন্দোলন ও শহীদদের আত্মত্যাগের পর সমগ্র দেশে শোক র‌্যালি ও প্রতিবাদের ঝড় ওঠে। অনেক নেতৃবৃন্দকে পাকিস্তানি সরকার গ্রেফতার করে। গ্রেফতারকৃত সেসব নেতৃবৃন্দের মধ্যে মাওলানা তর্কবাগীশও ছিলেন।

তিনি স্মৃতিচারণা করে বলেন, ‘২৩ ফেব্রুয়ারি রাত দুইটায় পুলিশ পার্টি হাউস থেকে খয়রাত হোসেন ও আমাকে গ্রেফতার করে কোতোয়ালি থানায় নিয়ে যায়। থানায় দেখি যে সেখানে মনোরঞ্জন ধর ও গোবিন্দ বল্লভ ব্যানার্জি বসে আছেন। কিছুক্ষণ পরেই আবুল হাসিম পুলিশের কাঁধে ভর করে আমাদের কক্ষে প্রবেশ করেন। ওই রাতেই আমাদের পাঁচজনকে একসঙ্গে পুলিশের গাড়িতে করে থানা থেকে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে নিয়ে যাওয়া হয়। জেলখানা সরগরম হয়ে ওঠে। শত শত ছাত্র-শিক্ষক এবং রাজনৈতিক নেতা ও কর্মীকে গ্রেফতার করে এখানে আনা হয়। একটি বড় কামরায় আমাকে থাকতে দেওয়া হয়। এই কামরায় খয়রাত হোসেন, মনোরঞ্জন ধর, গোবিন্দ বল্লভ ব্যানার্জি, খান সাহেব ওসমান আলী, খোন্দকার মোস্তাক আহমদ, মোহাম্মদ তোয়াহা, শামসুল হক, আবদুল আজিজ, কাজী গোলাম মাহবুব, খালেক নেওয়াজ খান, অলি আহাদ, এম এ আউয়াল, আজিজ আহমদ, আবদুল মতিন ও আমি একসঙ্গে ছিলাম। জেলে আমাদের থাকা-খাওয়ার কোনো অসুবিধা হয়নি। জেল কর্তৃপক্ষ আমাদের প্রতি সহানুভূতিশীল ছিলেন। জেলার মাখনুকুর রহমান ও জেল সুপারিনটেনডেন্ট এম এ সরকার দুজনই ছিলেন ভাষা আন্দোলনের একনিষ্ঠ সমর্থক।’
ভাষা আন্দোলনের পক্ষের শক্তি এতটাই শক্তিশালী ছিল যে সমগ্র দেশ ও জাতিকে জাগিয়ে তুলেছিল।

উল্লেখ্য, তারপর ১৯৫৫ সালে মাওলানা আবদুর রশীদ তর্কবাগীশ গণপরিষদের সদস্য নির্বাচিত হন। একই বছর মারীতে অনুষ্ঠিত পরিষদের অধিবেশনে তিনি প্রথম বাংলায় বক্তৃতা করেছিলেন।
ভাষা আন্দোলনের স্মৃতিচারণা করতে গিয়ে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান তাঁর লেখায় উল্লেখ করেন, ‘১৯৪৮ সালের ১১ মার্চ ছাত্রলীগের নেতৃত্বে সর্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা পরিষদ গঠনের মাধ্যমে আমাদের আন্দোলন শুরু হয়। সেদিনই সকাল ৯ ঘটিকায় আমি গ্রেফতার হই। আমার সহকর্মীদেরও গ্রেফতার করা হয়। এরপর ধাপে ধাপে আন্দোলন চলতে থাকে।’ (একুশের কথা : পৃষ্ঠা ১৭)
একইভাবে ঢাকার আরও অনেক নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিবর্গ রক্তাক্ত একুশের পর পার্লামেন্ট এবং রাজপথে সমানভাবে প্রতিবাদ জানিয়েছেন। যেমন পার্লামেন্ট থেকে জোরালো প্রতিবাদ জানিয়ে আবদুল কালাম শামসুদ্দিন পার্লামেন্ট থেকে পদত্যাগ করেন। একইভাবে তখনকার রাজনৈতিক দল, সকল সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠন রাজপথে তীব্র প্রতিবাদ জানিয়েছে।

ভাষা আন্দোলনের স্মৃতি এবং প্রেক্ষাপট নিয়ে দীর্ঘ লেখায় ভাষাসংগ্রামী নেতা আবদুল মতিন বলেন, ‘১৯৪৭-৪৮ সালের জনগণের বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার আন্দোলনে, নেতৃত্বের পূর্ববর্ণিত রাজনীতি, আচরণ ও ভূমিকার কারণে ব্যাহত হলেও এবং নেতৃত্ব কর্তৃক আন্দোলন পরিত্যক্ত হলেও জনগণ, বুদ্ধিজীবী ও ছাত্রদের মধ্যে বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার জাতিগত প্রয়োজন ও আকাক্সক্ষা এত প্রবল হয়ে উঠেছিল।’ (একুশের কথা : ৪৮)।

রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদের আহ্বায়ক কাজী গোলাম মাহবুব লিখেছেন, ‘আমি দেখেছি মানুষের ক্ষোভ আর ক্রোধ কাকে বলে।’ স্মৃতিধর্মী এই লেখায় কাজী গোলাম মাহবুব ভাষা আন্দোলনের অগ্নিঝরা প্রসঙ্গে তিনি অনেক কিছু লিখেছেন। এক স্থানে তিনি উল্লেখ করেন, ‘আমরা সমবেত এ আন্দোলন গোটা দেশে ছড়িয়ে দেওয়ার পদক্ষেপ নিয়েছি। রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদের পক্ষ থেকে সিদ্ধান্ত নেওয়া হলো যে ২১ ফেব্রুয়ারি সমস্ত পূর্ব পাকিস্তানে সাধারণ ধর্মঘট পালন করা হবে। সেদিনই পূর্ব পাকিস্তানের আইন পরিষদের বৈঠক বসার কথা। সকল প্রস্তুতি যখন তুঙ্গে, তখন ২০ ফেব্রুয়ারি ৪ বা সাড়ে ৪টার দিকে সরকার ১৪৪ ধারা জারি করল। নুরুল আমিন সরকারের এই হটকারী সিদ্ধান্তে মানুষের মধ্যে ক্ষোভ ও উত্তেজনার সৃষ্টি হলো। এ পরিপ্রেক্ষিতে সেদিনই নবাবপুরের আওয়ামী লীগ অফিসে সর্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা পরিষদের সভা ডাকি। ভাষা আন্দোলনের সাংগঠনিক ক্ষেত্রে শামসুল হকের বিশেষ অবদান ছিল। সন্ধ্যা ৭টার দিকে বৈঠক শুরু হয়। বাংলার অবিস্মরণীয় নেতা আবুল হাশিম এ সভায় সভাপতিত্ব করেন।’ (একুশের কথা : ৬২)।

‘বাংলা ভাষা আন্দোলনের সমগ্র ইতিহাস’ শিরোনামে ভাষাসৈনিক ও মুক্তিযোদ্ধা এম আর আখতার মুকুলের স্মৃতিকথা উল্লেখ করে বলেন, “পাকিস্তান অর্জিত হবার পর দেখা যায় যে, মোট জনসংখ্যার শতকরা ৫৬ ভাগের আবাসভূমি পূর্ববঙ্গ এবং এদের মাতৃভাষা বাংলা। এর বিপরীতে প্রায় ১২ শ’ মাইল দূরবর্তী পশ্চিম পাকিস্তান বহুভাষাভাষীর এলাকা এবং শতকরা মাত্র ৫ জনের মাতৃভাষা উর্দু। এমতাবস্থায় ১৯৪৭ সালের ১৫ সেপ্টেম্বর তমদ্দুন মজলিস থেকে একটা পুস্তিকা প্রকাশ করা হয়। শিরোনাম ছিল ‘পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা বাংলা না উর্দু’। এতে ২টি মাত্র নিবন্ধ অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছিল। এরা হচ্ছেন বিশিষ্ট সাংবাদিক ও সোহরাওয়ার্দীর সমর্থক আবুল মনসুর আহমেদ এবং মুক্তবুদ্ধিসম্পন্ন বুদ্ধিজীবী ড. কাজী মোতাহার হোসেন।’

৬ ডিসেম্বর ছাত্ররা প্রতিবাদ সভার পর মিছিল করে কৃষিমন্ত্রী সৈয়দ আফজল, সিভিল সাপ্লাই মন্ত্রী নুরুল আমীন এবং মুখ্যমন্ত্রী খাজা নাজিমুদ্দিনের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে। তাঁরা প্রত্যেকেই গণপরিষদে বাংলাকে অন্যতম রাষ্ট্রভাষা করার দাবিকে সমর্থন করবেন বলে প্রতিশ্রুতি দেন। এ সময় ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ বাংলা ভাষার সমর্থনে দৈনিক আজাদ-এ আরও একটি প্রবন্ধ প্রকাশ করেন। তিনি লিখলেন, ‘যাহারা বাংলাদেশে বাংলা ভাষাকে ছাড়িয়া কিংবা বাংলার স্কুল-কলেজে শিক্ষার মাধ্যম (মিডিয়াম) রূপে অথবা বাংলাদেশের আইন-আদালতে ব্যবহার্য ভাষারূপে উর্দুর পক্ষে ওকালতি করিতেছেন, আমি তাঁহাদিগকে কাণ্ডজ্ঞানহীন পণ্ডিতমূর্খ ভিন্ন আর কিছুই মনে করতে পারি না।’ (একুশের কথা : ৭৬-৭৭)

উল্লিখিত গ্রন্থের একটি রচনায় ‘ভাষা আন্দোলনের গোড়ার কথা এবং আমি’ বিষয়ক প্রবন্ধের শুরুতেই ভাষাসৈনিক অ্যাডভোকেট আব্দুস সামাদ বলেন, “আমার স্কুলজীবনে চল্লিশের দশকটাই পাকিস্তান ও মুসলিম লীগ আন্দোলনের মাঝে ১৯৪৫/৪৬ সালে ‘ক্যাপ্টেন রসিদ আলী দিবসে’ সর্বভারতীয় ব্রিটিশবিরোধী ‘ইনকিলাব’ স্লোগানের সঙ্গে জড়িত হই। ১৯৪৮ সালে আমি দশম শ্রেণিতে অধ্যয়ন করছি। ১৯৪৭ সালের পূর্বাপর সময়ব্যাপী রাষ্ট্রীয় পরিমণ্ডলে বন্দে মাতরম, জয় হিন্দ, মুসলিম লীগ, আজাদ হিন্দ ইত্যাদি শব্দগুলোর ধর্মীয় উন্মাদনা বৃদ্ধিতে সদ্য প্রতিষ্ঠিত পাকিস্তানের পূর্বাঞ্চলে বাঙালিত্ব মুছে যাচ্ছিল। শহীদ সোহরাওয়ার্দী ও শরৎ বসুর অখণ্ড বাংলা সাম্প্রদায়িকতার বিষবাষ্পে জনসমুদ্রে যেন খড়ের মতো অদৃশ্য হয়ে গেল। ঐতিহাসিক লাহোর প্রস্তাবের উত্থাপনকারী শেরেবাংলা এ কে ফজলুল হক ও কলকাতায় অবস্থানকারী গান্ধীর সঙ্গে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা-হাঙ্গামা বন্ধের ‘অপরাধে’ শহীদ সোহরাওয়ার্দীকেও ‘হিন্দু কংগ্রেসের দালাল’ গালি দেওয়া হচ্ছিল।

ব্রাহ্মণবাড়িয়ার যুবনেতা অলি আহাদ ১ম সারিতে ছিলেন। ১৯৪৭-এর ১৫ সেপ্টেম্বর তমদ্দুন মজলিসের পক্ষ থেকে ‘পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা বাংলা না উর্দু’ এ শিরোনামে যুক্তি প্রদর্শন করতে বাংলার পক্ষে তমদ্দুন মজলিস-ই অন্যতম রাষ্ট্রভাষা করার দাবি করেছিলেন সম্পাদক অধ্যাপক আবুল কাশেম, যার সমর্থনে লেখেন আবুল মনসুর আহমেদ ও ডক্টর কাজী মোতাহার হোসেন। (একুশের চেতনা : ১১৩-১১৪)।

ভাষাসৈনিক আবদুস সামাদ তাঁর স্মৃতিকথায় ভাষা আন্দোলনের অগ্রনায়কদের অনেক বিস্তারিত বর্ণনা দিয়েছেন। বইটির এক জায়গায় তিনি উল্লেখ করেন, ‘১৯৪৮ সালের ২৭ ডিসেম্বর করাচিতে আয়োজিত এক শিক্ষা সম্মেলনে উর্দুকেই একমাত্র রাষ্ট্রভাষা করার দাবি জানানো হয়। বাঙালি শিক্ষামন্ত্রী ফজলুর রহমান সম্মেলন উদ্বোধনকালে সংহতির লক্ষ্যে আরবি হরফে বাংলা ভাষা চালু করার আবেদন করেন। ১৯৪৮ সালের ৩১ ডিসেম্বর ঢাকায় সাহিত্য সম্মেলনে জ্ঞানতাপস শহীদুল্লাহ সভাপতির ভাষণে তার তীব্র প্রতিবাদ করেন।’ সভাপতির ভাষণে একপর্যায়ে তিনি বলেন, ‘আমরা হিন্দু বা মুসলমান, তা যেমন সত্য, তার চেয়েও বেশি সত্য আমরা বাঙালি।’

বাংলা সাহিত্যের অন্যতম কবি ও ভাষাসৈনিক আলাউদ্দিন আল আজাদ ‘কবিতার জন্ম স্মৃতিস্তম্ভ’ নামে সাহিত্যসমৃদ্ধ একটি স্মৃতিধর্মী লেখার সঙ্গে তাঁর ‘স্মৃতিস্তম্ভ’ বিখ্যাত কবিতার অংশবিশেষ উল্লেখ করেছেন :
‘স্মৃতির মিনার ভেঙেছে তোমার? ভয় কি বন্ধু, আমরা এখনো
চার কোটি পরিবার
খাড়া রয়েছি তো।
রামধনুকের গভীর চোখের তারায় তারায়
দ্বীপ হয়ে ভাসে যাদের জীবন, যুগে যুগে সেই
শহীদের নাম।
এঁকেছি প্রেমের ফেনিল শিলায়,
তোমাদের নামে।
তাই আমাদের
হাজার মুঠির বজ্র শিখরে সূর্যের মতো
জ্বলে শুধু এক
শপথের ভাস্কর ॥’ (একুশের কথা : ১৩২-১৩৩)।
বইটিতে ভাষাসংগ্রামী আহমদ রফিকের মূল্যবান মন্তব্য উল্লেখ করা হয়েছে। তিনি ওবায়েদুল্লাহ মামুন সম্পাদিত গ্রন্থটির গুরুত্ব নিয়ে লিখেছেন, ‘গ্রন্থটিতে ভাষাসৈনিকদের লেখা ও স্মৃতিচারণের মধ্য দিয়ে একনজরে রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনের প্রকৃত চিত্র প্রতিফলিত হয়েছে। ২১ জন ভাষাসৈনিকের জীবনী গ্রন্থটিকে তাৎপর্যময় করে তুলেছে।’

একই সঙ্গে ভাষা আন্দোলনের ইতিহাস গবেষক এম আর মাহবুবের ‘রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনের দুর্লভ তথ্য ও ইতিহাস অজানা কথা’ শীর্ষক প্রবন্ধটিতেও নতুন মাত্রা যোগ করেছে।
প্রকৃত অর্থে একুশের চেতনা বিষয়ক গ্রন্থটিতে জোরালোভাবে অন্যায় ও শোষণের বিরুদ্ধে আপসহীন আন্দোলন ও প্রতিবাদে বাংলাদেশের ভাষা আন্দোলনের সৈনিকদের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকার স্বীকৃতি প্রদান করা হয়েছে। লেখার মূল উদ্দেশ্য ছিল, ‘তৎকালীন পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর চাপিয়ে দেওয়া অন্যায্য সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে একুশে ফেব্রুয়ারি ছিল একটি তীব্র গণপ্রতিরোধ। যেকোনো ধরনের অন্যায়, বৈষম্য এবং নিপীড়নের বিরুদ্ধে মাথা নত না করে সোচ্চার হওয়াই একুশের মূলমন্ত্র।’

একইভাবে এই আন্দোলনের মাধ্যমে জাতীয়তাবোধ ও স্বাধীনতার বীজ বপন করা হয়েছে।
মূলত একুশের ভাষা আন্দোলনই ছিল বাঙালি জাতীয়তাবোধের প্রথম বলিষ্ঠ বহিঃপ্রকাশ। এই আন্দোলনের মধ্য দিয়েই বাঙালিরা বুঝতে পেরেছিল, তাদের সংস্কৃতি ও জাতিসত্তা হুমকির মুখে। এই চেতনাই পরবর্তীতে ১৯৬৯-এর গণঅভ্যুত্থান এবং ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে স্বাধীন বাংলাদেশ অর্জনের মূল ভিত্তি তৈরি করেছিল।

অসাম্প্রদায়িকতা ও সাম্য-মৈত্রীর ভাষা আন্দোলনে ধর্মের ভেদাভেদ ভুলে (ছাত্র, জনতা, কৃষক, শ্রমিক) সর্বস্তরের জনতা ঐক্যবদ্ধ হয়ে রাজপথে নেমেছিল। একুশের চেতনা হলো বহু দলের ও মতের মানুষের একসঙ্গে বসবাস করার প্রগতিশীল মনোভাবপুষ্ট বৈষম্যহীন সমাজ গড়ার অনুপ্রেরণা।
একুশের চেতনা আমাদের শেখায়-নিজের ভাষা, সংস্কৃতি ও মানবিক মূল্যবোধের বিকাশ এবং গণমানুষের অধিকার রক্ষায় সর্বদা সচেতন থাকার পাশাপাশি আত্মসংগ্রামী থাকা। একুশের চেতনা আমাদের মনে করিয়ে দেয়-মাতৃভাষা শুধু যোগাযোগের মাধ্যম নয়, এটি একটি জাতির পরিচয়, সংস্কৃতি ও আত্মমর্যাদার প্রতীক।

ওবায়েদুল্লাহ মামুন সম্পাদিত ‘একুশের কথা একুশের চেতনা’ গ্রন্থে ভাষা আন্দোলনের ইতিহাসকে যেমন বর্ণনা করা হয়েছে, একইভাবে মননশীল চৈতন্য ও সৃষ্টিশীলতার মাধ্যমে মানুষকে চেনার অভিজ্ঞান ও অন্বেষণস্পৃহায় শিল্প-সাহিত্যের পরিসরকে সমৃদ্ধ করেছে। সমকালীন সমাজ এবং ঐতিহ্যবিসারী সাহিত্যবোধের নিরিখে বৈশিষ্ট্যপূর্ণ উন্নত মানের ছাপা ২২৪ পৃষ্ঠার গ্রন্থটির প্রকাশ ঘটেছে ‘বনসাই প্রকাশনী’ থেকে। বইটির প্রচ্ছদ এঁকেছেন মাহতাব শফি। ২০১৬-এর অমর একুশে ফেব্রুয়ারিতে প্রকাশিত বইটির মূল্য : ৪৫০ টাকা (১২ ডলার)।

মহান ভাষা আন্দোলনের সত্যিকার ইতিহাসকে স্মরণ, ধারণ ও সংরক্ষণ করার দৃপ্ত প্রয়াসে ওবায়েদুল্লাহ মামুন দীর্ঘদিন যাবৎ গবেষণা করে আসছেন। বর্তমান গ্রন্থটি সেই প্রয়াসের ফসল।
একুশের চেতনার অর্থ শুধু একটি বিশেষ দিনকে স্মরণ করা নয়; বরং এটি হলো অন্যায়ের কাছে মাথা নত না করার শিক্ষা গ্রহণ করা। মাতৃভাষার মর্যাদা রক্ষা, নিজের অধিকার সম্পর্কে সচেতন থাকা এবং যেকোনো অন্যায়ের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানোর জন্য দীক্ষিত হয়ে চিরন্তন চেতনায় দৃঢ়ভাবে অবস্থান করা। বইটির মূল প্রতিপাদ্য হলো ভাষা আন্দোলনের সত্যিকার ইতিহাসকে তুলে ধরা। এটি আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা হিসেবে সারা বিশ্বের মানুষের সকল বিপন্ন ভাষার অস্তিত্বের পুনরুদ্ধার করার দীক্ষা নেওয়া, একই সঙ্গে নিজস্ব অধিকার রক্ষার প্রতীক।
(নিউইয়র্কের কুইন্স লাইব্রেরিতে অনুষ্ঠিত সাহিত্য বিশ্লেষক ‘নীরা কাদরী’ পরিচালিত লেখকের অঙ্গন অনুষ্ঠান উপলক্ষে লেখাটি রচিত।)
লেখক : কবি ও প্রাবন্ধিক।
Thikana
M M Shahin, Chairman, Board of Editors, Thikana
Corporate Headquarter
THIKANA : 7409 37th Ave suite 403 Jackson Heights, NY 11372
Phone : 718-472-0700/2428, 718-729-6000
Fax: + 1(866) 805-8806
Bangladesh Bureau
THIKANA : 70/B, Green Road, (Panthapath), 5th Floor, Dhaka, BD.
E-Mail : [email protected]
For Advertisement : [email protected]