সেই রেডিও, সেই মানুষগুলো

প্রকাশ : ১৬ জুলাই ২০২৬, ১৩:৪৪ , অনলাইন ভার্সন
আমাদের গ্রামের পাশেই রঘুনন্দন পাহাড়। গাছগাছালিতে ঘেরা পাহাড় ছিল প্রকৃতির এক মনোরম আশ্রয়। বাতাসে পাতার ঝিরঝির শব্দ আর পাখির কলরব মিলে সৃষ্টি করত এক অপূর্ব সুরের আবহ। অনেক সময় সেই প্রাকৃতিক সুর যেন রেডিও থেকে ভেসে আসা গান, সংবাদ ও অনুষ্ঠানের সঙ্গে মিলেমিশে একাকার হয়ে যেত। যদিও রঘুনন্দন পাহাড়কে কাছ থেকে দেখার সুযোগ আমার খুব বেশি হয়নি। শৈশব থেকেই বিভিন্ন জায়গায় বসবাস করেছি। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে পাহাড়ের অনেক অংশ উজাড় হয়েছে, শুরু হয়েছে রাবার বাগানের চাষ। ফলে একসময়কার সেই পাহাড় তার সৌন্দর্য ও গৌরব অনেকটাই হারিয়েছে।

মানুষ স্বভাবতই শৌখিন, রুচিশীল ও অনুসন্ধিৎসু। প্রতিটি সমাজেই কিছু মানুষ থাকেন, যাঁরা তাঁদের ব্যক্তিত্ব, জ্ঞান ও কর্মের মাধ্যমে অন্যদের চেয়ে আলাদা হয়ে ওঠেন। আমাদের সবুজ-শ্যামল গ্রামেও তেমন কিছু গুণী মানুষ ছিলেন। তাঁদের মধ্যে মতিন স্যার, নূর স্যার, ভাইস চেয়ারম্যান মহারাজ মিয়া, বিনু ভাই এবং ডা. শামীম ভাই বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। আজ আমি কালিকাপুর গ্রামের অন্যতম ব্যক্তিত্ব মতিন স্যার এবং তাঁর রেডিওকে ঘিরে কিছু স্মৃতির কথা তুলে ধরতে চাই।
আশি ও নব্বইয়ের দশকে রেডিও, টেলিভিশন এবং ফোন ছিল অত্যন্ত দুর্লভ। বর্তমান প্রজন্মের কাছে বিষয়টি অবিশ্বাস্য মনে হতে পারে, কিন্তু তখন এটাই ছিল বাস্তবতা। গ্রামে তখন বিদ্যুতের সুবিধাও ছিল সীমিত। রেডিও, টেলিভিশন কিংবা টেপ রেকর্ডার ছিল ব্যাটারিচালিত এবং তুলনামূলক ব্যয়বহুল। তাই এসব যন্ত্র সবার ঘরে দেখা যেত না।

মতিন স্যারের একটি চমৎকার শর্টওয়েভ রেডিও ছিল, যা আমি জন্মের পর থেকেই দেখে আসছি। রেডিওটিতে লম্বা অ্যান্টেনা ছিল, যার সাহায্যে দেশ-বিদেশের নানা বেতার কেন্দ্র ধরা যেত। সংবাদ, গান, নাটক ও নানা অনুষ্ঠান শোনা যেত রেডিওতে। মতিন স্যার যখন সংবাদ শুনতেন, তাঁর চোখে একধরনের গভীর আগ্রহ ও মনোযোগ দেখা যেত। মনে হতো, দূর অজানা কোনো দেশ থেকে খবর ভেসে আসছে আর তিনি তা গভীর মনোযোগে গ্রহণ করছেন।

তিনি ছিলেন একজন শৌখিন, রুচিশীল ও শিক্ষানুরাগী মানুষ-প্রকৃত অর্থেই মানুষ গড়ার কারিগর। পাকিস্তান আমলে তিনি সরকারি বৃন্দাবন কলেজ থেকে বি.কম ডিগ্রি অর্জন করেন। সে সময়ে বাণিজ্যে স্নাতক ডিগ্রিধারীর সংখ্যা ছিল খুবই কম। তাঁর কাছ থেকে শুনেছি, বি.কম পাস করার পর আশপাশের বিভিন্ন গ্রাম থেকে মানুষ তাঁকে দেখতে আসত। তখন শিক্ষিত মানুষের প্রতি সমাজে ছিল গভীর শ্রদ্ধা ও সম্মান।

ইরাক কর্তৃক কুয়েত আক্রমণের মাধ্যমে উপসাগরীয় যুদ্ধ ১৯৯০ সালে শুরু হয়ে তা ১৯৯১ সাল পর্যন্ত চলে। ফলে সে সময় দেশ-বিদেশের সংবাদ জানার প্রয়োজনীয়তা অনেক বেড়ে যায়। বিশেষ করে, ভয়েস অব আমেরিকা, বিবিসি, রেডিও বেইজিং, রেডিও মস্কো ও আকাশবাণীর মতো আন্তর্জাতিক বেতার মাধ্যমগুলো হয়ে ওঠে তথ্যের নির্ভরযোগ্য উৎস। দিনের কর্মব্যস্ততার কারণে সব সময় সংবাদ শোনা সম্ভব না হলেও মতিন স্যার রাতে নিয়মিত সংবাদ শুনতেন। কখনো কখনো সম্প্রচার স্পষ্ট শোনা যেত না। তখন তিনি অ্যান্টেনা এদিক-সেদিক ঘুরিয়ে চ্যানেল ঠিক করতেন। পরে সেই সংবাদ পরিবার ও গ্রামের মানুষের সঙ্গে ভাগ করে নিতেন।

আসরের নামাজের পর থেকেই শুরু হতো আড্ডা, যা গভীর রাত পর্যন্ত চলত। নূর স্যার, ভাইস চেয়ারম্যানসহ গ্রামের অনেক গণ্যমান্য ব্যক্তি সেই আড্ডায় অংশ নিতেন। আবার অনেকেই শুধু সংবাদ শোনার জন্য তাঁর বাড়িতে ভিড় জমাতেন। বিনু ভাই প্রায়ই বলতেন, ‘স্যারের সঙ্গে রেডিওতে সংবাদ না শুনলে ভালো লাগে না। মনে হয় গ্রামটাই যেন নীরব হয়ে গেছে।’ আর সঙ্গে চলত চা-নাশতার নিয়মিত আয়োজন।

তখন মানুষের মধ্যে পারস্পরিক সম্মানবোধ ছিল গভীর ও আন্তরিক। জীবন ছিল সহজ, সরল ও আনন্দময়। সত্যিই এক অসাধারণ সময় ছিল। মতিন স্যার যেখানেই যেতেন, সেখানেই রেডিওটিকে সঙ্গে নিতেন এবং এটিকে কেন্দ্র করে এক ছোট্ট সামাজিক পরিসর তৈরি হতো। রেডিওর সুইচ ঘুরিয়ে চ্যানেল পরিবর্তন করা কিংবা শব্দ কমানো-বাড়ানোতেও একধরনের মুগ্ধতা ছিল।

ছোটবেলায় আমি প্রায়ই ভাবতাম, এত ছোট একটি রেডিওর ভেতর মানুষ কীভাবে ঢুকে কথা বলে! সুযোগ পেলেই রেডিওটি হাতে নিয়ে নানা ছিদ্র দিয়ে ভেতরে তাকাতাম। এমনকি এক-দুবার নাট-বল্টুও খুলে দেখার চেষ্টা করেছি। কিন্তু কোথাও কোনো মানুষ খুঁজে পাইনি। বিষয়টি আমাকে ভীষণ বিস্মিত করত।

মাঝেমধ্যে গান, নাটক ও অন্যান্য অনুষ্ঠান শোনার জন্য রেডিওটি নিয়ে বসতাম। গভীর রাতে গানের আসর, নাটক ও নানা চমৎকার অনুষ্ঠান প্রচার হতো, যা ছিল অত্যন্ত উপভোগ্য। অনেক সময় অঙ্কের সমস্যা সমাধান কিংবা টেস্ট পেপারের সমস্যার সমাধান করতেও রেডিও শুনতাম। রাতের নিস্তব্ধতা আর রেডিওর সুর আমাকে অন্য এক জগতে নিয়ে যেত।

আজ সেই দিনগুলোর কথা ভাবলে মনে হয়, রেডিও শুধু একটি যন্ত্র ছিল না; ছিল আমাদের জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ, আনন্দ ও অনুভূতির এক অনন্য জগৎ। চোখের সামনে আজও ভেসে ওঠে সেই সব দৃশ্যÑমতিন স্যারের সংবাদ শোনা, শামীম ভাই, ফরিদা আপু, রোজী আপু, রেজি আপু, সামাদ ভাই, মাসুক মামা, শাহীন মামা, সুরাইয়া ও হাবিবসহ অনেকের হাসিমাখা মুখ, আর দীর্ঘ আড্ডার প্রাণবন্ত মুহূর্তগুলো। আজও তাঁদের হাসিমাখা মুখগুলো চোখের সামনে ভেসে ওঠে। তাঁদের স্মৃতিগুলো আজও আমাকে অনুপ্রাণিত করে। এগুলো আমার জীবনের মূল্যবান সম্পদ।

বর্তমানে অত্যাধুনিক প্রযুক্তি ও স্মার্টফোন মানুষের যোগাযোগব্যবস্থাকে সহজ করে দিয়েছে। বাংলাদেশসহ বিশ্বের প্রায় সব দেশেই মানুষ প্রযুক্তির সুফল ভোগ করছে। কিন্তু সেই রেডিও, টেপ রেকর্ডার, সাদা-কালো টেলিভিশন, ভিসিআর কিংবা বড় আকারের মোবাইল ফোন আজও স্মৃতির মণিকোঠায় অমলিন হয়ে আছে। এগুলোর কথা মনে পড়লেই শৈশবের দিনগুলোতে ফিরে যাই। আজ মানুষের জীবনে অনেক কিছুই আছে, কিন্তু মনের শান্তি যেন ক্রমেই দুর্লভ হয়ে উঠছে। তবু আমাদের সময়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলতে হয়, নতুনকে গ্রহণ করতে হয় এবং নিজেকে মানিয়ে নিতে হয়। প্রযুক্তির স্রোতে রেডিওর জনপ্রিয়তা অনেকটাই কমে গেছে। পুরোনো অনেক কিছুই হারিয়ে গেছে, নতুন এসে তাদের জায়গা দখল করেছে। তবু সেই রেডিওর শব্দ, সন্ধ্যার আড্ডা আর মতিন স্যারের সংবাদ শোনার আগ্রহ আজও স্মৃতির আকাশে ভেসে বেড়ায়। সময় বদলেছে, মাধ্যম বদলেছে কিন্তু সেই দিনগুলোর উষ্ণতা, আন্তরিকতা ও মানবিক বন্ধন আজও অমলিন। এটি শুধু স্মৃতিই নয়, বরং হারিয়ে যাওয়া অতীতের জীবন্ত প্রতিচ্ছবি, যা আজও হৃদয়ের গভীরে অনুরণিত হয়। লেখক : কবি ও সাবেক ব্যাংকার।
Thikana
M M Shahin, Chairman, Board of Editors, Thikana
Corporate Headquarter
THIKANA : 7409 37th Ave suite 403 Jackson Heights, NY 11372
Phone : 718-472-0700/2428, 718-729-6000
Fax: + 1(866) 805-8806
Bangladesh Bureau
THIKANA : 70/B, Green Road, (Panthapath), 5th Floor, Dhaka, BD.
E-Mail : [email protected]
For Advertisement : [email protected]