খুব কড়া রোদ। আমাদের সারা উঠোন দাপিয়ে এসে কাঁঠালগাছের তলায় থমকে দাঁড়িয়েছে। উঠোনের দক্ষিণ দিকে নুইয়ে পড়া জবাগাছে বেশ কয়েকটি লাল টুকটুকে জবা ফুটেছে। বড় আমগাছের নিচে ঘাসের ওপর পাটি বিছিয়ে কুতুবউদ্দিন দাদা শুয়ে আকাশ দেখছেন, দেখছেন আকাশের নীল সমুদ্রে অলস ডানামেলা চিলের খেলা। বয়স বেড়ে গেলেও ডায়াবেটিস, ব্লাড প্রেশার তার পরিশ্রমী শরীরে বাসা বাঁধতে পারেনি। ‘আমার-তোমার’, ‘আমাদের-তোমাদের’ বলে পড়শিদের দরজায় হুড়কো লাগানোর প্রচলন তখনো শুরু হয়নি।
বাচ্চাদের স্কুলের লম্বা ছুটিতে গ্রামের বিবাহিত মেয়েরা বাপের বাড়ি নাইওর আসত। সেই সব দিন বিনা উৎসবেই আনন্দমুখর হয়ে উঠত। প্রতিবেশী প্রায় প্রতিটি বাড়িতে নাইওরিদের দাওয়াত করে খাওয়াতে এক অদ্ভুত আনন্দ লেপ্টে থাকত। তখন সময়টা ছিল মায়া-মমতাঘেরা। আত্মীয়-কুটুম আপ্যায়নের জন্য নির্দিষ্ট কোনো দিন বা উৎসব-পার্বণের দরকার পড়ত না। সবাই মিলেমিশে থাকত-সবাই যেন সবার আত্মীয়।
আমাদের বাড়িতেও প্রতিবেশী নাইওরিদের দাওয়াতের আয়োজন। নাইওরিদের আগমনী আনন্দে আমাদের গৃহবাসীদের অন্তরের হাসি যেন রোদের সঙ্গে মিতালি করে ঝলমল করে ঘুরে বেড়াচ্ছে বাড়িময়।
পায়রার বাকুম-বাকুম, মুরগির কু-উক কু-উক ডাকের সঙ্গে পুকুর থেকে উঠে আসা হাঁসগুলোও গলা ছেড়ে প্যাক প্যাক ডাক দিয়ে আম্মার দৃষ্টি আকর্ষণের চেষ্টা করছে-
‘ও খুদির মা-আঁসর থালায় দুইটা চিঠা ধান দিয়া আয়।’
ব্যস্ত আম্মা নিজের পোষা আজান দেওয়া বড় মুরগার সঙ্গে আরও একটি মোরগ জবাইয়ের জন্য চুনু ও হালিমাকে দায়িত্ব দিয়ে পুবের ঘরের বারান্দার মেঝেতে ঢেলে দিচ্ছেন এক টুকরি কাঁঠাল বিচি। ছোট-বড় অনেকগুলো হাত মিলে কাঁঠাল বিচি ছিলা শুরু হলো। পান-সুপারি, চুন-জর্দায় ঠোঁট লাল করে হাসিমাখা মানুষগুলোর আনন্দ আমার খুব আপন মনে হতো। গল্পগুজব, হাসি-তামাশায় সব মুখেই যেন বিন্নি ধানের খই ফুটছে।
এখন কাঁঠালের সিজন নয়। সারা বছর বিচি সংরক্ষণের জন্য আম্মা তার নিজস্ব পদ্ধতি ব্যবহার করতেন। পদ্ধতিটা হলো ধানের গোলাঘরের মাটির মেঝেতে গর্ত করে, মাটির কলস গলা পর্যন্ত বসিয়ে, শুকনো ও ভালো কাঁঠাল বিচি বালির সঙ্গে মিশিয়ে কলসে ভরে, মুখ নারিকেলের মালা দিয়ে ঢেকে রাখলে সারা বছর বিচি টাটকা থাকে।
যে সময়ের কথা বলছি, তখন গ্রামে বিদ্যুৎ ছিল না। মৌমাছির মতো একত্রিত হাতে বিচির ওপরের খোলস ছাড়িয়ে, পানিতে ভিজিয়ে রেখে, খসখসে বাঁশের ডালায় ঘষে ঘষে বিচিগুলো সাদা দাঁতের মতো করা হয়।
এদিকে পোকায় কাটা মটর ডাল বেছে, ভেজে গরম পানিতে ভিজিয়ে রেখেছেন আম্মা। দুই চুলার একটিতে রাতা ধানের সুবাসিত চাল ফুটছে, আর তার গন্ধ রান্নাঘর ছেড়ে বাইরে ছড়িয়ে পড়ছে। আরেকটি চুলায় বড় হাঁড়িতে লবণ দিয়ে পানি বসানো হয়েছে।
পানি ফুটে উঠলে তাতে ভেজানো মটরশুঁটি, ধোয়া কাঁঠাল বিচি এবং এক চিমটি হলুদ দিয়ে দেওয়া হলো। বিচি-মটরশুঁটি প্রায় সিদ্ধ। এদিকে খুদির মায়ের মসলা বাটা শেষ। কাঁচা সাতকরা শিকে গেঁথে ঝাঁজ পুড়িয়ে টুকরো করে রাখা হয়েছে।
সিদ্ধ বিচি-মটরশুঁটি একটি বড় চালুনিতে তুলে রেখে, অন্য একটি বড় অ্যালুমিনিয়ামের হাঁড়িতে তেল, রসুন, পাঁচফোড়ন, তেজপাতা, আদা-পেঁয়াজ, হলুদ-মরিচের ফোড়ন দেওয়া হলো; যার গন্ধে পুরো পাড়া বুঝে গেল অপূর্ব কিছু রান্না হচ্ছে।
হাঁড়িতে বিচি, তারপর সাতকরার টুকরো। শেষে কাঁচামরিচ, ধনেপাতা, জিরা গুঁড়া ছিটিয়ে মাখা মাখা ঝোল রেখে শেষ হলো জিভে জল আনা ‘বিচি-মটর’ তরকারি।
আমরা সমবয়সীরা উঠোনে দাগ কেটে এক্কা-দোক্কা খেলছি। বাতাসে তরকারির ঘ্রাণ ভেসে আসছে, সঙ্গে মায়ের ডাক-
‘সুমি, পুকুর থাকি হাত-মুখ ধইয়া, হক্কলরে লইয়া খাওয়াত আয়।’
রান্নাঘরের মেঝেতে পাটি বিছিয়ে সারি সারি প্লেট সাজানো। চারদিকে নানান স্বাদের তরকারির ঘ্রাণ। ঝাল থাকলেও বড়রা বোম্বে মরিচ ডলে চোখে-নাকে জল এনে তৃপ্তিভরে খাচ্ছে, আর পাশে রাখা পানির গ্লাসে হাত বাড়াচ্ছে।
আহ্, কী তৃপ্তিভরে খাওয়া চলত-সেই অমৃত স্বাদের তরকারি!
বাচ্চাদের স্কুলের লম্বা ছুটিতে গ্রামের বিবাহিত মেয়েরা বাপের বাড়ি নাইওর আসত। সেই সব দিন বিনা উৎসবেই আনন্দমুখর হয়ে উঠত। প্রতিবেশী প্রায় প্রতিটি বাড়িতে নাইওরিদের দাওয়াত করে খাওয়াতে এক অদ্ভুত আনন্দ লেপ্টে থাকত। তখন সময়টা ছিল মায়া-মমতাঘেরা। আত্মীয়-কুটুম আপ্যায়নের জন্য নির্দিষ্ট কোনো দিন বা উৎসব-পার্বণের দরকার পড়ত না। সবাই মিলেমিশে থাকত-সবাই যেন সবার আত্মীয়।
আমাদের বাড়িতেও প্রতিবেশী নাইওরিদের দাওয়াতের আয়োজন। নাইওরিদের আগমনী আনন্দে আমাদের গৃহবাসীদের অন্তরের হাসি যেন রোদের সঙ্গে মিতালি করে ঝলমল করে ঘুরে বেড়াচ্ছে বাড়িময়।
পায়রার বাকুম-বাকুম, মুরগির কু-উক কু-উক ডাকের সঙ্গে পুকুর থেকে উঠে আসা হাঁসগুলোও গলা ছেড়ে প্যাক প্যাক ডাক দিয়ে আম্মার দৃষ্টি আকর্ষণের চেষ্টা করছে-
‘ও খুদির মা-আঁসর থালায় দুইটা চিঠা ধান দিয়া আয়।’
ব্যস্ত আম্মা নিজের পোষা আজান দেওয়া বড় মুরগার সঙ্গে আরও একটি মোরগ জবাইয়ের জন্য চুনু ও হালিমাকে দায়িত্ব দিয়ে পুবের ঘরের বারান্দার মেঝেতে ঢেলে দিচ্ছেন এক টুকরি কাঁঠাল বিচি। ছোট-বড় অনেকগুলো হাত মিলে কাঁঠাল বিচি ছিলা শুরু হলো। পান-সুপারি, চুন-জর্দায় ঠোঁট লাল করে হাসিমাখা মানুষগুলোর আনন্দ আমার খুব আপন মনে হতো। গল্পগুজব, হাসি-তামাশায় সব মুখেই যেন বিন্নি ধানের খই ফুটছে।
এখন কাঁঠালের সিজন নয়। সারা বছর বিচি সংরক্ষণের জন্য আম্মা তার নিজস্ব পদ্ধতি ব্যবহার করতেন। পদ্ধতিটা হলো ধানের গোলাঘরের মাটির মেঝেতে গর্ত করে, মাটির কলস গলা পর্যন্ত বসিয়ে, শুকনো ও ভালো কাঁঠাল বিচি বালির সঙ্গে মিশিয়ে কলসে ভরে, মুখ নারিকেলের মালা দিয়ে ঢেকে রাখলে সারা বছর বিচি টাটকা থাকে।
যে সময়ের কথা বলছি, তখন গ্রামে বিদ্যুৎ ছিল না। মৌমাছির মতো একত্রিত হাতে বিচির ওপরের খোলস ছাড়িয়ে, পানিতে ভিজিয়ে রেখে, খসখসে বাঁশের ডালায় ঘষে ঘষে বিচিগুলো সাদা দাঁতের মতো করা হয়।
এদিকে পোকায় কাটা মটর ডাল বেছে, ভেজে গরম পানিতে ভিজিয়ে রেখেছেন আম্মা। দুই চুলার একটিতে রাতা ধানের সুবাসিত চাল ফুটছে, আর তার গন্ধ রান্নাঘর ছেড়ে বাইরে ছড়িয়ে পড়ছে। আরেকটি চুলায় বড় হাঁড়িতে লবণ দিয়ে পানি বসানো হয়েছে।
পানি ফুটে উঠলে তাতে ভেজানো মটরশুঁটি, ধোয়া কাঁঠাল বিচি এবং এক চিমটি হলুদ দিয়ে দেওয়া হলো। বিচি-মটরশুঁটি প্রায় সিদ্ধ। এদিকে খুদির মায়ের মসলা বাটা শেষ। কাঁচা সাতকরা শিকে গেঁথে ঝাঁজ পুড়িয়ে টুকরো করে রাখা হয়েছে।
সিদ্ধ বিচি-মটরশুঁটি একটি বড় চালুনিতে তুলে রেখে, অন্য একটি বড় অ্যালুমিনিয়ামের হাঁড়িতে তেল, রসুন, পাঁচফোড়ন, তেজপাতা, আদা-পেঁয়াজ, হলুদ-মরিচের ফোড়ন দেওয়া হলো; যার গন্ধে পুরো পাড়া বুঝে গেল অপূর্ব কিছু রান্না হচ্ছে।
হাঁড়িতে বিচি, তারপর সাতকরার টুকরো। শেষে কাঁচামরিচ, ধনেপাতা, জিরা গুঁড়া ছিটিয়ে মাখা মাখা ঝোল রেখে শেষ হলো জিভে জল আনা ‘বিচি-মটর’ তরকারি।
আমরা সমবয়সীরা উঠোনে দাগ কেটে এক্কা-দোক্কা খেলছি। বাতাসে তরকারির ঘ্রাণ ভেসে আসছে, সঙ্গে মায়ের ডাক-
‘সুমি, পুকুর থাকি হাত-মুখ ধইয়া, হক্কলরে লইয়া খাওয়াত আয়।’
রান্নাঘরের মেঝেতে পাটি বিছিয়ে সারি সারি প্লেট সাজানো। চারদিকে নানান স্বাদের তরকারির ঘ্রাণ। ঝাল থাকলেও বড়রা বোম্বে মরিচ ডলে চোখে-নাকে জল এনে তৃপ্তিভরে খাচ্ছে, আর পাশে রাখা পানির গ্লাসে হাত বাড়াচ্ছে।
আহ্, কী তৃপ্তিভরে খাওয়া চলত-সেই অমৃত স্বাদের তরকারি!