জীবন আসলে খুবই রহস্যময়। আমি যে রকম মানুষ, আমার সঙ্গে বেশি মানুষের খাপ খায় না। আমার যে বিশ্বাস, সেই বিশ্বাসের সঙ্গে বেশি মানুষের মেলে না। কিন্তু আমি তা কাউকে বুঝতে দিই না। চারদিকের নানা কিছু আয়োজন, নানা ঘটনা থেকে আমি নিজেকে সরিয়ে রাখতে পারি। ওসব কিছু না হলেও আমার অসুবিধা হয় না। কত কিছুই তো জীবনে ঘটবে না, পাওয়া হবে না-তাই বলে জীবন বৃথা হয়ে যাবে না। আমি কোনো কিছুর অংশমাত্র নই। পদ-পদবির প্রতিও আমি আগ্রহী নই। আমি ভালো সংগঠক নই। ওসব না হয়েও জীবন দিব্যি কেটে যাবে।
আমি কখনো ভিড়ের মানুষ হতে পারিনি। প্রতিদিন আমি ছোট্ট একটা কুয়োর মধ্যে নিজেকে জমা করছি। আমি আসলে সব সময় এমনই ছিলাম। কখনো কখনো খোলস ছেড়ে বের হয়েছি বটে, আবার ঘষটানি খেয়ে নিজেকে খোলসে বন্দী করেছি। আমার তো খারাপ লাগছে না! এই নিঃসঙ্গতা, এই নির্জনতা আমি উপভোগ করি।
আমরা প্রায়ই বলি, আজকাল ভালোবাসা, সহমর্মিতা বা সহযোগিতার মনোভাব কমে গেছে। অন্যকে বিপদে ফেলতে বা অন্যের সরলতার সুযোগ নিয়ে তাকে পথে বসাতে দ্বিধা করি না। আমরা স্বার্থপর হয়ে গেছি। নিজের স্বার্থটাই আগে দেখি। পরস্পরের প্রতি আস্থা বা বিশ্বাসের সংকটের কথাও বলি। আমরা কেউ কারও ভালো দেখতে পারি না। কেউ ভালো করলে তার প্রতি জেলাস হই। কেউ একটা কিছু করছে-আর কিছু না পারি, পেছনে বদনাম করি বা বলি, দেখছ লোকটা ধান্ধা শুরু করছে! কিছু একটা নেগেটিভ বলতে না পারলে অশান্তিতে ভুগি। আর যদি কেউ তার কাজটায় ব্যর্থ হয়, তাহলে আমরা দুঃখিত হওয়ার চেয়ে উৎফুল্ল হই বেশি। অনেক সময় যাতে সে কাজটায় সফল হতে না পারে, সে চেষ্টাও করি।
এটা মানব-মনের একটা সহজাত ধর্ম। খুব কম মানুষই আছে, যে অন্যের সাফল্যে খুশি হয় বা তাকে মন থেকে অভিনন্দিত করে। মুখে যদিও প্রশংসার বন্যা বইয়ে দিই, কিন্তু মনের মধ্যে কাজ করে উল্টোটা। কেউ হয়তো একটা দামি গাড়ি কিনেছে বা দামি বাড়িÑএতে আনন্দিত হওয়ার পরিবর্তে মনে মনে ভাবি, ওই লোক কেন দামি গাড়িতে চড়বে! ওর কি যোগ্যতা আছে! যেন দামি গাড়ি বা দামি বাড়ি কেনা অপরাধ।
কেউ হয়তো জিজ্ঞেস করল, আচ্ছা লোকটা কেমন! উত্তরে পরিচিতজনই বলবে, আছে, তেমন সুবিধার না। সমস্যা আছে। বা কেউ হয়তো বলল, আচ্ছা ওর লেখা পড়েছ! কেমন লেখে? বলবে, ধুর কী সব লেখে, কিচ্ছু হয় না।
তাহলে কি ভালো বলার লোকের সংখ্যা কমে গেছে! উত্তর হচ্ছেÑনা। ভালো বলার লোকের সংখ্যা কমেনি। আগে যেমন ছিল, এখনো তেমন আছে। জীবনে চলার পথে খারাপ যেমন থাকবে, ভালোও থাকবে।
যত যা-ই হোক, যা-ই ঘটুক-সবকিছুর পরও জীবন অনেক সুন্দর। এসব না থাকলে জীবন হতো পানসে। পৃথিবীতে নিরবচ্ছিন্ন ভালোও নাই, মন্দও নাই। জীবন এ দুটির মিশ্রণ। তবে আমার মতে পৃথিবীতে ভালোর সংখ্যাই বেশি। পৃথিবীজুড়ে ভালোবাসারই জয়জয়কার। ভালোবাসার কাছে ঘৃণা হার মানতে বাধ্য। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ভালোবাসার প্রকৃতি বদলায়, কিন্তু তার আবেদন ফুরোয় না। ভালোবাসা চিরন্তন।
ভালোবাসা, সহমর্মিতা বা সহযোগিতা-কোনো কিছুই কমে যায়নি। আমি নিজেই উজান ঠেলে চলা মানুষ। কিন্তু ভালোবাসাই আমাকে সব সময় অনুপ্রাণিত করেছে, সাহস জুগিয়েছে, বেঁচে থাকার প্রেরণা দিয়েছে। পৃথিবীতে প্রকৃত ভালোবাসা সব সময়ই থাকবে। ভালোবাসা আছে বলেই পৃথিবী এত সুন্দর। বেঁচে থাকা এবং মানুষ হয়ে জন্মানো এত আনন্দের।
নিঃস্বার্থ ভালোবাসা সব দিতে পারে-আশ্বাস, প্রেরণা, বিশ্বাস-সব। আমি সৌভাগ্যবান যে এমন ভালোবাসা পেয়েছি। মানুষের প্রতি তাই কখনো আস্থা হারাতে নেই। প্রতিবার যখন জন্মদিন আসে, এই অনুভূতি আমার তীব্র হয়। জন্মদিনের শুভেচ্ছাই বড় কথা নয়-এর পেছনে লুকিয়ে আছে গভীর ব্যঞ্জনা, গভীর অনুরাগ। আপনি তখনই ভালোবাসা পাবেন, যখন আপনি অন্যকে ভালোবাসবেন।
সবাই বন্ধু হয় না। সব বন্ধুত্বই বন্ধুত্ব নয়। সবাই ভালোবাসতে পারে না। অনেকের সঙ্গেই আমাদের পরিচয় হয়, সখ্য হয়, একসঙ্গে চলি, ফিরি, খাই, গল্প করি। কারও কারও সঙ্গে ভালোবাসায় জড়িয়ে যাই। বলি, তোমার মতো ভালো আর কেউ বাসেনি। তুমি আমার দেখা শ্রেষ্ঠ মানুষ, আমার দেখা সবচেয়ে সুন্দর মনের মানুষ-স্বার্থহীন, বিশ্বস্ত মানুষ। কিন্তু সব পরিচয়ই বন্ধুত্ব নয়। এত বিশ্বাস আর প্রতিশ্রুতির পরও সব ভালোবাসা টিকে থাকে না।
ভালো বন্ধুত্ব বা প্রকৃত ভালোবাসার একটা রূপ আছে, গন্ধ আছে। ভালো বন্ধুত্ব এবং বন্ধুত্ব থেকে যে ভালোবাসার সৃষ্টি হয়, তার একটা সুবাস অনুভব করা যায়। ভালোবাসা মানেই পাওয়ার আকাক্সক্ষা নয়, বন্ধুত্ব মানেই চাওয়া-পাওয়া নয়। এসবের বাইরেও একটা বন্ধুত্ব আছে, ভালোবাসা আছে-যা শক্তি দেয়, বেঁচে থাকার প্রেরণা জোগায়। যেখানে হাঁসফাঁস অবস্থা নেই, হারানোর ভয় নেই, সন্দেহ নেই, ঈর্ষা নেই, প্রতিযোগিতা নেই, নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা নেই। মুক্ত সম্পর্ক সব সময় সৃজনশীলতাকে বিকশিত হতে সাহায্য করে।
আমার সঙ্গে অনেকেরই সখ্য হয়, বন্ধুত্ব হয়। বন্ধুত্ব থেকে একধরনের ভালোবাসা অনুভব করি আমি। পথ চলতে চলতেও হয়, আবার সোশ্যাল মিডিয়ার মাধ্যমেও হয়। সোশ্যাল মিডিয়া মানুষের মনের দরজা খুলে দিয়েছে। যাকে দেখিনি, যাকে কখনো দেখব না বা যাকে দেখেছি-সবার প্রতিই আমি একধরনের নৈকট্য অনুভব করি। ছোট-বড়, ধনী-গরিবÑকখনো কাউকে আমি উপেক্ষার চোখে দেখি না। আমাকেও কেউ উপেক্ষা করুক, তা চাই না।
আমার অনেক চেনা মানুষ আছে, যারা সব সময় আমার ব্যাপারে নির্বিকার। কিন্তু আমি তাদের যেকোনো ভালো কাজে প্রতিক্রিয়া দেখাই। তাদের অগোচরে বলি, সে ভালো কাজ করছে, তার প্রশংসা করি। প্রশংসা করতে আমার ভালো লাগে। নিজেকে বড় মনে হয়।
কেউ আমার ব্যাপারে নির্বিকার থাকলেও আমি কিছু মনে করি না। অন্তত সে আমাকে তার বন্ধু তালিকা থেকে বাদ দেয়নিÑএটাও কম বড় ব্যাপার নয়। সে হয়তো প্রতিক্রিয়া দেখায় না, কিন্তু আমি বুঝি, সে আমাকে অনুসরণ করে। এটাও কম পাওয়া নয়। আবার অনেকে আমার বন্ধু তালিকায় নেই বা আমাকে চেনে না, তারাও আমাকে পছন্দ করে। এটা আরও বড় পাওয়া আমার কাছে।
অনেক বন্ধুত্বই সময়ের বিবর্তনে ফিকে হয়ে যায়। অনেক ভালোবাসায় পলি পড়ে। যদি পেছন ফিরে চাই, অবাক হই, মন ব্যথায় ভরে যায়। কতজনের সঙ্গে বন্ধুত্ব হয়েছিল, কত কিছু শেয়ার করেছিলাম, মুখোমুখি বসেছিলাম, পরম মমতায় বন্ধুর হাত ধরেছিলাম, নিঃশ্বাসের শব্দ শুনেছিলাম। বিশ্বাস দিয়েছিলাম, বিশ্বাস করেছিলাম, নির্ভরতা দিয়েছিলাম, নির্ভর করেছিলাম। কখনো ভুল করেছি, কখনো কাউকে আঘাত দিয়েছি। আবার অনেকেই ভুল বুঝেছে, ভুল বুঝে দূরে সরে গেছে। আমিও ভুল বুঝে দূরে সরিয়ে দিয়েছি। এসব নানা কিছু আমাকে সারাক্ষণ ভাবায়, খুব ভাবায়। অতীত সব সময় আমাকে টানে, খুব টানে।
মানুষ হিসেবে আমার রয়েছে অনেক সীমাবদ্ধতা, অজ্ঞতা। আমার নিজের ভুলের জন্য অনেকের ক্ষতি হয়েছে, কষ্ট পেয়েছে। সেই সব অজানা ক্ষতি কখনো পূরণ করতে পারব না। অজানা কষ্ট দূর করে দিতে পারব না। যদি জানতাম নিশ্চিতভাবে, সেই সব ভুলের জন্য ক্ষমা চেয়ে নিতাম। বলতাম-আমার জন্য কারও এতটুকু ক্ষতি হোক, কেউ কষ্ট পাকÑআমি তা চাইনি।
আমি যখন অসুস্থ হই, তখন একধরনের নির্জনতা পেয়ে বসে আমাকে। সবাইকেই নিজের কষ্ট নিজেকে বহন করতে হয়। প্রতিটা মানুষ আসলে খুব একা। মানুষ নিজেকে প্রকাশ করতে চায়। শেয়ার করতে চায় অন্যের সঙ্গে তার আনন্দ, দুঃখ, কষ্টকে।
খুব কাছের কেউ জানতে চাইলে বলি-আমি ব্যাক পেইনে ভুগছি। শরীর আছে বলেই ব্যথা থাকবে। কিছু ভালো হবে, কিছু কখনো ভালো হবে না। আকস্মিক সব এলোমেলো করে দেবে। সবকিছু আকস্মিক ঘটবে। এমনকি অমোঘ মৃত্যুও।
আমি আমার জীবনের অর্ধেকেরও বেশি সময় ব্যাক পেইন নিয়ে বেঁচে আছি। আমৃত্যু এটা আমি বহন করব। তাতে কী! এটাই জীবন। কোনো কিছু দিয়েই একজনের কষ্ট আরেকজন দূর করতে পারে না। একজনের শরীরের কষ্ট অন্যের শরীরে ধারণ করার কোনো পদ্ধতি আবিষ্কৃত হয়নি। একজনের কষ্টে আমরা বড়জোর একটু পাশে বসতে পারি, কপালে রাখতে পারি হাত বা দুটো সান্ত্বনার কথা শোনাতে পারি। এর বেশি কিছু নয়।
আমি হয়তো আমার লেখা দিয়ে, আমার কথা দিয়ে বা আমার উপস্থিতি দিয়ে কাউকে আনন্দ দিতে পারি। কিন্তু আমি আমার মনের ব্যথা দিয়ে, শরীরের কষ্ট দিয়ে, অভাব দিয়ে বা আমার অসুস্থতা দিয়ে কাউকে ব্যথাতুর করে তুলতে পারি না। মানুষ আনন্দের অংশীদার হতে পছন্দ করে, কষ্টের নয়।
পৃথিবীতে অনেক মানুষই কষ্ট পেয়ে, রোগে-শোকে বেঁচে আছে। মানুষের জীবনের গল্প উপন্যাস বা সিনেমার চরিত্রের মতো সাজানো-গোছানো নয়। আপাতত বাইরে থেকে যাকে সুখী, সুন্দর আর সুস্থ মনে হয়, তারও রয়েছে নানা কষ্ট, নানা ব্যথা। যখনই আমার শরীর খারাপ হয়, তখন আমার পৃথিবীটা শূন্য হয়ে যায়। শৈশবে ফিরে যাই-যখন অসুখ হলে মা একাকী বসিয়ে রাখত। আমি কাঙালের মতো বসে বাচ্চাদের খেলা দেখতাম।
শরীর মনের ওপর ভীষণ প্রভাব ফেলে। আমার লেখার সুযোগ আছে বলে, ভাষা আছে বলে, অক্ষর আবিষ্কৃত হয়েছে বলে, সোশ্যাল মিডিয়া আছে বলে এসব শেয়ার করতে পারছি। যদি এসব কিছু না থাকত, তাহলে একাকী নীরবে এসব কষ্ট বয়ে বেড়াতাম। যার এসব নেই, যে লিখতে পারে না, যার সোশ্যাল মিডিয়া নেই, অক্ষরজ্ঞান নেই, সে তো কখনো কারও কাছে তার কষ্ট শেয়ার করতে পারে না। নীরবে-নিভৃতে সে বয়ে বেড়ায় তার যাবতীয় দুঃখ।
বস্তুত, এই দুই ধরনের মানুষের মধ্যে পার্থক্য তেমন নেই। কারও কষ্টই অন্যকে ট্রান্সফার করা যায় না, যারটা তার। নিজের কথা যখন ভাবি, অবাক হই।
প্রতিটা মানুষের জীবনেই কিছু গল্প থাকে। আমার জীবনেও গল্প আছে। সবাই তার গল্প বলে না, বা বলতে চায় না, বা বলার প্রয়োজন মনে করে না। অর্থহীন গল্প কে-ইবা করতে চায়Ñযেটা সব সময় আমি করি। যখন যা মনে আসে লিখি। আমার তো কথা বলার কেউ নেই, কেউ আমার কথা শুনবেও না। আমি ভালো বক্তাও নই। চায়ের টেবিলে বা ফোনে বা যেকোনো আড্ডায় আমি প্রায়ই ভোম্বল দাশ হয়ে থাকি। এক-দু কথার পরই আমার কথা হারিয়ে যায়। ভেবেই পাই না এরপর কী বলতে হবে। কেউ একটা বিষয় নিয়ে আলোচনা করছে-আমি শুধু বুঝদারের মতো মাথা নাড়ি।
আমার নিজের কোনো মতামত থাকে না, কারণ তাৎক্ষণিক আমি কোনো কিছু খুঁজে পাই না। মানুষ সাধারণত অভিমত দেয়, আমার কোনো অভিমত থাকে না। মানুষ সাফল্যের গল্প শুনতে চায়, বলতেও ভালোবাসে। সাকসেস স্টোরি মানুষের প্রিয়। সে কারণেও হয়তো আমার বেশি গল্প থাকে না। কেউ তো কষ্টের গল্প শুনতে চাইবে না। ব্যর্থতার গল্প কে-ইবা পছন্দ করবে! এত সময়ও কারও নেই।
ছোটবেলা থেকেই আমি দলছুট মানুষ। একা একা ঘুরে বেড়াতাম। বেশি কারও সঙ্গে কথা বলতে ইচ্ছে করত না। মনে হতো, আমার খেলার সাথিরাও বোধ হয় দূরের কেউ। এমনকি স্কুলেও আমি চুপচাপ স্বভাবেরই ছিলাম। মনে হতো ওরা আমার কেউ না।
একজন বন্ধু আমাকে বলেছে, তুমি এসব কী লেখো! বেশি ব্যক্তিগত কথা লেখো তুমি। এসব লিখে তুমি কী বোঝাতে চাও! অন্যদের সঙ্গে আলাপচারিতায়ও আমার প্রসঙ্গ এলে সে এটা বলে। আরেক বন্ধু বলেছে-ভাবনায় বৈচিত্র্য আনো, এক জায়গায় ঘুরপাক খাচ্ছো।
আমি যেহেতু অন্যদের মতো আসর মাতাতে পারি না বা কথার জাদু দিয়ে অন্যকে মুগ্ধ করতে পারি না, তাই আমি নিজের সঙ্গে নিজে কথা বলি। জেসমিন প্রায়ই বলে, তুমি একা একা কী বলো! অরিত্রিও বলে, মা দেখো, বাবা একা একা কথা বলছে।
আমি তখন লজ্জা পাই, হাসি। এমনও হয়-কেউ ফোন করছে, আমি তখন অন্য কিছু ভাবছি। সে কী বলছে শুনিনি। তাই আমার মতো মানুষকে সঠিক বুঝে ওঠা অনেকের জন্য একটু কঠিন। আমি যখন কাউকে পছন্দ করে ফেলি বা একধরনের নৈকট্য তৈরি হয়, তখন বেশ খোলামেলা কথা বলি। হয়তো তাকে দেখিনি বা কখনো দেখবও না, তবু করি।
আমি ফান করতে পছন্দ করি। কিন্তু অনেকেই এটা ঠিক বুঝতে পারে না। ভুলভাবে নেয়। তখন একটু দূরত্ব তৈরি হয়। আমি নিজেই দূরে সরে আসি তখন।
কদিন আগে আমার একজন বন্ধু হলো। পঁয়ত্রিশ বছর আগে আমাদের পরিচয় হয়েছিল। ফেসবুক আবার কাছে টেনে নিয়ে এসেছে। সে বলল, তুমি আমাদের বাসায়ও এসেছ। স্মৃতির পাতা থেকে কেমন বিস্মৃত হয়ে গিয়েছিল সেসব। আবার ফিরে এল ঝড়ের গতিতে। অল্প সময়ে আমরা পরস্পরের প্রতি একটা প্রবল নৈকট্য অনুভব করছি। মনে হয় না যে মাঝখানে দীর্ঘ গ্যাপ তৈরি হয়েছিল। তার পরও ভাবি-িএর মধ্যে বাস্তবতা কতটুকু আছে! আমরা যা বলি সবই কি মন থেকে! তা যদি হয়, তাহলে তার চেয়ে আনন্দের আর কিছু হতে পারে না।
স্বপ্ন আর বাস্তবের বড় বেশি দূরত্ব। তবে জীবনের সবটুকুই ব্যর্থতার নয়, এর মধ্যে সফলতাও আছে। অন্ধকারের পরই সূর্য। (চলবে)
আমি কখনো ভিড়ের মানুষ হতে পারিনি। প্রতিদিন আমি ছোট্ট একটা কুয়োর মধ্যে নিজেকে জমা করছি। আমি আসলে সব সময় এমনই ছিলাম। কখনো কখনো খোলস ছেড়ে বের হয়েছি বটে, আবার ঘষটানি খেয়ে নিজেকে খোলসে বন্দী করেছি। আমার তো খারাপ লাগছে না! এই নিঃসঙ্গতা, এই নির্জনতা আমি উপভোগ করি।
আমরা প্রায়ই বলি, আজকাল ভালোবাসা, সহমর্মিতা বা সহযোগিতার মনোভাব কমে গেছে। অন্যকে বিপদে ফেলতে বা অন্যের সরলতার সুযোগ নিয়ে তাকে পথে বসাতে দ্বিধা করি না। আমরা স্বার্থপর হয়ে গেছি। নিজের স্বার্থটাই আগে দেখি। পরস্পরের প্রতি আস্থা বা বিশ্বাসের সংকটের কথাও বলি। আমরা কেউ কারও ভালো দেখতে পারি না। কেউ ভালো করলে তার প্রতি জেলাস হই। কেউ একটা কিছু করছে-আর কিছু না পারি, পেছনে বদনাম করি বা বলি, দেখছ লোকটা ধান্ধা শুরু করছে! কিছু একটা নেগেটিভ বলতে না পারলে অশান্তিতে ভুগি। আর যদি কেউ তার কাজটায় ব্যর্থ হয়, তাহলে আমরা দুঃখিত হওয়ার চেয়ে উৎফুল্ল হই বেশি। অনেক সময় যাতে সে কাজটায় সফল হতে না পারে, সে চেষ্টাও করি।
এটা মানব-মনের একটা সহজাত ধর্ম। খুব কম মানুষই আছে, যে অন্যের সাফল্যে খুশি হয় বা তাকে মন থেকে অভিনন্দিত করে। মুখে যদিও প্রশংসার বন্যা বইয়ে দিই, কিন্তু মনের মধ্যে কাজ করে উল্টোটা। কেউ হয়তো একটা দামি গাড়ি কিনেছে বা দামি বাড়িÑএতে আনন্দিত হওয়ার পরিবর্তে মনে মনে ভাবি, ওই লোক কেন দামি গাড়িতে চড়বে! ওর কি যোগ্যতা আছে! যেন দামি গাড়ি বা দামি বাড়ি কেনা অপরাধ।
কেউ হয়তো জিজ্ঞেস করল, আচ্ছা লোকটা কেমন! উত্তরে পরিচিতজনই বলবে, আছে, তেমন সুবিধার না। সমস্যা আছে। বা কেউ হয়তো বলল, আচ্ছা ওর লেখা পড়েছ! কেমন লেখে? বলবে, ধুর কী সব লেখে, কিচ্ছু হয় না।
তাহলে কি ভালো বলার লোকের সংখ্যা কমে গেছে! উত্তর হচ্ছেÑনা। ভালো বলার লোকের সংখ্যা কমেনি। আগে যেমন ছিল, এখনো তেমন আছে। জীবনে চলার পথে খারাপ যেমন থাকবে, ভালোও থাকবে।
যত যা-ই হোক, যা-ই ঘটুক-সবকিছুর পরও জীবন অনেক সুন্দর। এসব না থাকলে জীবন হতো পানসে। পৃথিবীতে নিরবচ্ছিন্ন ভালোও নাই, মন্দও নাই। জীবন এ দুটির মিশ্রণ। তবে আমার মতে পৃথিবীতে ভালোর সংখ্যাই বেশি। পৃথিবীজুড়ে ভালোবাসারই জয়জয়কার। ভালোবাসার কাছে ঘৃণা হার মানতে বাধ্য। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ভালোবাসার প্রকৃতি বদলায়, কিন্তু তার আবেদন ফুরোয় না। ভালোবাসা চিরন্তন।
ভালোবাসা, সহমর্মিতা বা সহযোগিতা-কোনো কিছুই কমে যায়নি। আমি নিজেই উজান ঠেলে চলা মানুষ। কিন্তু ভালোবাসাই আমাকে সব সময় অনুপ্রাণিত করেছে, সাহস জুগিয়েছে, বেঁচে থাকার প্রেরণা দিয়েছে। পৃথিবীতে প্রকৃত ভালোবাসা সব সময়ই থাকবে। ভালোবাসা আছে বলেই পৃথিবী এত সুন্দর। বেঁচে থাকা এবং মানুষ হয়ে জন্মানো এত আনন্দের।
নিঃস্বার্থ ভালোবাসা সব দিতে পারে-আশ্বাস, প্রেরণা, বিশ্বাস-সব। আমি সৌভাগ্যবান যে এমন ভালোবাসা পেয়েছি। মানুষের প্রতি তাই কখনো আস্থা হারাতে নেই। প্রতিবার যখন জন্মদিন আসে, এই অনুভূতি আমার তীব্র হয়। জন্মদিনের শুভেচ্ছাই বড় কথা নয়-এর পেছনে লুকিয়ে আছে গভীর ব্যঞ্জনা, গভীর অনুরাগ। আপনি তখনই ভালোবাসা পাবেন, যখন আপনি অন্যকে ভালোবাসবেন।
সবাই বন্ধু হয় না। সব বন্ধুত্বই বন্ধুত্ব নয়। সবাই ভালোবাসতে পারে না। অনেকের সঙ্গেই আমাদের পরিচয় হয়, সখ্য হয়, একসঙ্গে চলি, ফিরি, খাই, গল্প করি। কারও কারও সঙ্গে ভালোবাসায় জড়িয়ে যাই। বলি, তোমার মতো ভালো আর কেউ বাসেনি। তুমি আমার দেখা শ্রেষ্ঠ মানুষ, আমার দেখা সবচেয়ে সুন্দর মনের মানুষ-স্বার্থহীন, বিশ্বস্ত মানুষ। কিন্তু সব পরিচয়ই বন্ধুত্ব নয়। এত বিশ্বাস আর প্রতিশ্রুতির পরও সব ভালোবাসা টিকে থাকে না।
ভালো বন্ধুত্ব বা প্রকৃত ভালোবাসার একটা রূপ আছে, গন্ধ আছে। ভালো বন্ধুত্ব এবং বন্ধুত্ব থেকে যে ভালোবাসার সৃষ্টি হয়, তার একটা সুবাস অনুভব করা যায়। ভালোবাসা মানেই পাওয়ার আকাক্সক্ষা নয়, বন্ধুত্ব মানেই চাওয়া-পাওয়া নয়। এসবের বাইরেও একটা বন্ধুত্ব আছে, ভালোবাসা আছে-যা শক্তি দেয়, বেঁচে থাকার প্রেরণা জোগায়। যেখানে হাঁসফাঁস অবস্থা নেই, হারানোর ভয় নেই, সন্দেহ নেই, ঈর্ষা নেই, প্রতিযোগিতা নেই, নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা নেই। মুক্ত সম্পর্ক সব সময় সৃজনশীলতাকে বিকশিত হতে সাহায্য করে।
আমার সঙ্গে অনেকেরই সখ্য হয়, বন্ধুত্ব হয়। বন্ধুত্ব থেকে একধরনের ভালোবাসা অনুভব করি আমি। পথ চলতে চলতেও হয়, আবার সোশ্যাল মিডিয়ার মাধ্যমেও হয়। সোশ্যাল মিডিয়া মানুষের মনের দরজা খুলে দিয়েছে। যাকে দেখিনি, যাকে কখনো দেখব না বা যাকে দেখেছি-সবার প্রতিই আমি একধরনের নৈকট্য অনুভব করি। ছোট-বড়, ধনী-গরিবÑকখনো কাউকে আমি উপেক্ষার চোখে দেখি না। আমাকেও কেউ উপেক্ষা করুক, তা চাই না।
আমার অনেক চেনা মানুষ আছে, যারা সব সময় আমার ব্যাপারে নির্বিকার। কিন্তু আমি তাদের যেকোনো ভালো কাজে প্রতিক্রিয়া দেখাই। তাদের অগোচরে বলি, সে ভালো কাজ করছে, তার প্রশংসা করি। প্রশংসা করতে আমার ভালো লাগে। নিজেকে বড় মনে হয়।
কেউ আমার ব্যাপারে নির্বিকার থাকলেও আমি কিছু মনে করি না। অন্তত সে আমাকে তার বন্ধু তালিকা থেকে বাদ দেয়নিÑএটাও কম বড় ব্যাপার নয়। সে হয়তো প্রতিক্রিয়া দেখায় না, কিন্তু আমি বুঝি, সে আমাকে অনুসরণ করে। এটাও কম পাওয়া নয়। আবার অনেকে আমার বন্ধু তালিকায় নেই বা আমাকে চেনে না, তারাও আমাকে পছন্দ করে। এটা আরও বড় পাওয়া আমার কাছে।
অনেক বন্ধুত্বই সময়ের বিবর্তনে ফিকে হয়ে যায়। অনেক ভালোবাসায় পলি পড়ে। যদি পেছন ফিরে চাই, অবাক হই, মন ব্যথায় ভরে যায়। কতজনের সঙ্গে বন্ধুত্ব হয়েছিল, কত কিছু শেয়ার করেছিলাম, মুখোমুখি বসেছিলাম, পরম মমতায় বন্ধুর হাত ধরেছিলাম, নিঃশ্বাসের শব্দ শুনেছিলাম। বিশ্বাস দিয়েছিলাম, বিশ্বাস করেছিলাম, নির্ভরতা দিয়েছিলাম, নির্ভর করেছিলাম। কখনো ভুল করেছি, কখনো কাউকে আঘাত দিয়েছি। আবার অনেকেই ভুল বুঝেছে, ভুল বুঝে দূরে সরে গেছে। আমিও ভুল বুঝে দূরে সরিয়ে দিয়েছি। এসব নানা কিছু আমাকে সারাক্ষণ ভাবায়, খুব ভাবায়। অতীত সব সময় আমাকে টানে, খুব টানে।
মানুষ হিসেবে আমার রয়েছে অনেক সীমাবদ্ধতা, অজ্ঞতা। আমার নিজের ভুলের জন্য অনেকের ক্ষতি হয়েছে, কষ্ট পেয়েছে। সেই সব অজানা ক্ষতি কখনো পূরণ করতে পারব না। অজানা কষ্ট দূর করে দিতে পারব না। যদি জানতাম নিশ্চিতভাবে, সেই সব ভুলের জন্য ক্ষমা চেয়ে নিতাম। বলতাম-আমার জন্য কারও এতটুকু ক্ষতি হোক, কেউ কষ্ট পাকÑআমি তা চাইনি।
আমি যখন অসুস্থ হই, তখন একধরনের নির্জনতা পেয়ে বসে আমাকে। সবাইকেই নিজের কষ্ট নিজেকে বহন করতে হয়। প্রতিটা মানুষ আসলে খুব একা। মানুষ নিজেকে প্রকাশ করতে চায়। শেয়ার করতে চায় অন্যের সঙ্গে তার আনন্দ, দুঃখ, কষ্টকে।
খুব কাছের কেউ জানতে চাইলে বলি-আমি ব্যাক পেইনে ভুগছি। শরীর আছে বলেই ব্যথা থাকবে। কিছু ভালো হবে, কিছু কখনো ভালো হবে না। আকস্মিক সব এলোমেলো করে দেবে। সবকিছু আকস্মিক ঘটবে। এমনকি অমোঘ মৃত্যুও।
আমি আমার জীবনের অর্ধেকেরও বেশি সময় ব্যাক পেইন নিয়ে বেঁচে আছি। আমৃত্যু এটা আমি বহন করব। তাতে কী! এটাই জীবন। কোনো কিছু দিয়েই একজনের কষ্ট আরেকজন দূর করতে পারে না। একজনের শরীরের কষ্ট অন্যের শরীরে ধারণ করার কোনো পদ্ধতি আবিষ্কৃত হয়নি। একজনের কষ্টে আমরা বড়জোর একটু পাশে বসতে পারি, কপালে রাখতে পারি হাত বা দুটো সান্ত্বনার কথা শোনাতে পারি। এর বেশি কিছু নয়।
আমি হয়তো আমার লেখা দিয়ে, আমার কথা দিয়ে বা আমার উপস্থিতি দিয়ে কাউকে আনন্দ দিতে পারি। কিন্তু আমি আমার মনের ব্যথা দিয়ে, শরীরের কষ্ট দিয়ে, অভাব দিয়ে বা আমার অসুস্থতা দিয়ে কাউকে ব্যথাতুর করে তুলতে পারি না। মানুষ আনন্দের অংশীদার হতে পছন্দ করে, কষ্টের নয়।
পৃথিবীতে অনেক মানুষই কষ্ট পেয়ে, রোগে-শোকে বেঁচে আছে। মানুষের জীবনের গল্প উপন্যাস বা সিনেমার চরিত্রের মতো সাজানো-গোছানো নয়। আপাতত বাইরে থেকে যাকে সুখী, সুন্দর আর সুস্থ মনে হয়, তারও রয়েছে নানা কষ্ট, নানা ব্যথা। যখনই আমার শরীর খারাপ হয়, তখন আমার পৃথিবীটা শূন্য হয়ে যায়। শৈশবে ফিরে যাই-যখন অসুখ হলে মা একাকী বসিয়ে রাখত। আমি কাঙালের মতো বসে বাচ্চাদের খেলা দেখতাম।
শরীর মনের ওপর ভীষণ প্রভাব ফেলে। আমার লেখার সুযোগ আছে বলে, ভাষা আছে বলে, অক্ষর আবিষ্কৃত হয়েছে বলে, সোশ্যাল মিডিয়া আছে বলে এসব শেয়ার করতে পারছি। যদি এসব কিছু না থাকত, তাহলে একাকী নীরবে এসব কষ্ট বয়ে বেড়াতাম। যার এসব নেই, যে লিখতে পারে না, যার সোশ্যাল মিডিয়া নেই, অক্ষরজ্ঞান নেই, সে তো কখনো কারও কাছে তার কষ্ট শেয়ার করতে পারে না। নীরবে-নিভৃতে সে বয়ে বেড়ায় তার যাবতীয় দুঃখ।
বস্তুত, এই দুই ধরনের মানুষের মধ্যে পার্থক্য তেমন নেই। কারও কষ্টই অন্যকে ট্রান্সফার করা যায় না, যারটা তার। নিজের কথা যখন ভাবি, অবাক হই।
প্রতিটা মানুষের জীবনেই কিছু গল্প থাকে। আমার জীবনেও গল্প আছে। সবাই তার গল্প বলে না, বা বলতে চায় না, বা বলার প্রয়োজন মনে করে না। অর্থহীন গল্প কে-ইবা করতে চায়Ñযেটা সব সময় আমি করি। যখন যা মনে আসে লিখি। আমার তো কথা বলার কেউ নেই, কেউ আমার কথা শুনবেও না। আমি ভালো বক্তাও নই। চায়ের টেবিলে বা ফোনে বা যেকোনো আড্ডায় আমি প্রায়ই ভোম্বল দাশ হয়ে থাকি। এক-দু কথার পরই আমার কথা হারিয়ে যায়। ভেবেই পাই না এরপর কী বলতে হবে। কেউ একটা বিষয় নিয়ে আলোচনা করছে-আমি শুধু বুঝদারের মতো মাথা নাড়ি।
আমার নিজের কোনো মতামত থাকে না, কারণ তাৎক্ষণিক আমি কোনো কিছু খুঁজে পাই না। মানুষ সাধারণত অভিমত দেয়, আমার কোনো অভিমত থাকে না। মানুষ সাফল্যের গল্প শুনতে চায়, বলতেও ভালোবাসে। সাকসেস স্টোরি মানুষের প্রিয়। সে কারণেও হয়তো আমার বেশি গল্প থাকে না। কেউ তো কষ্টের গল্প শুনতে চাইবে না। ব্যর্থতার গল্প কে-ইবা পছন্দ করবে! এত সময়ও কারও নেই।
ছোটবেলা থেকেই আমি দলছুট মানুষ। একা একা ঘুরে বেড়াতাম। বেশি কারও সঙ্গে কথা বলতে ইচ্ছে করত না। মনে হতো, আমার খেলার সাথিরাও বোধ হয় দূরের কেউ। এমনকি স্কুলেও আমি চুপচাপ স্বভাবেরই ছিলাম। মনে হতো ওরা আমার কেউ না।
একজন বন্ধু আমাকে বলেছে, তুমি এসব কী লেখো! বেশি ব্যক্তিগত কথা লেখো তুমি। এসব লিখে তুমি কী বোঝাতে চাও! অন্যদের সঙ্গে আলাপচারিতায়ও আমার প্রসঙ্গ এলে সে এটা বলে। আরেক বন্ধু বলেছে-ভাবনায় বৈচিত্র্য আনো, এক জায়গায় ঘুরপাক খাচ্ছো।
আমি যেহেতু অন্যদের মতো আসর মাতাতে পারি না বা কথার জাদু দিয়ে অন্যকে মুগ্ধ করতে পারি না, তাই আমি নিজের সঙ্গে নিজে কথা বলি। জেসমিন প্রায়ই বলে, তুমি একা একা কী বলো! অরিত্রিও বলে, মা দেখো, বাবা একা একা কথা বলছে।
আমি তখন লজ্জা পাই, হাসি। এমনও হয়-কেউ ফোন করছে, আমি তখন অন্য কিছু ভাবছি। সে কী বলছে শুনিনি। তাই আমার মতো মানুষকে সঠিক বুঝে ওঠা অনেকের জন্য একটু কঠিন। আমি যখন কাউকে পছন্দ করে ফেলি বা একধরনের নৈকট্য তৈরি হয়, তখন বেশ খোলামেলা কথা বলি। হয়তো তাকে দেখিনি বা কখনো দেখবও না, তবু করি।
আমি ফান করতে পছন্দ করি। কিন্তু অনেকেই এটা ঠিক বুঝতে পারে না। ভুলভাবে নেয়। তখন একটু দূরত্ব তৈরি হয়। আমি নিজেই দূরে সরে আসি তখন।
কদিন আগে আমার একজন বন্ধু হলো। পঁয়ত্রিশ বছর আগে আমাদের পরিচয় হয়েছিল। ফেসবুক আবার কাছে টেনে নিয়ে এসেছে। সে বলল, তুমি আমাদের বাসায়ও এসেছ। স্মৃতির পাতা থেকে কেমন বিস্মৃত হয়ে গিয়েছিল সেসব। আবার ফিরে এল ঝড়ের গতিতে। অল্প সময়ে আমরা পরস্পরের প্রতি একটা প্রবল নৈকট্য অনুভব করছি। মনে হয় না যে মাঝখানে দীর্ঘ গ্যাপ তৈরি হয়েছিল। তার পরও ভাবি-িএর মধ্যে বাস্তবতা কতটুকু আছে! আমরা যা বলি সবই কি মন থেকে! তা যদি হয়, তাহলে তার চেয়ে আনন্দের আর কিছু হতে পারে না।
স্বপ্ন আর বাস্তবের বড় বেশি দূরত্ব। তবে জীবনের সবটুকুই ব্যর্থতার নয়, এর মধ্যে সফলতাও আছে। অন্ধকারের পরই সূর্য। (চলবে)