আবীর আলমগীর : কিছু কিছু উৎসব শুধু মঞ্চে সীমাবদ্ধ থাকে না, মঞ্চের বাইরেও তার আরেকটি গল্প তৈরি হয়। ঢাকা ড্রামার ৩০ বছর পূর্তির নাট্যোৎসব ‘মাস্কস অ্যান্ড মেটাফোরস’-এ গিয়ে আমার কাছে ঠিক তেমনই মনে হয়েছে। একদিনে ছয়টি নাটক দেখার পাশাপাশি ব্যক্তিগতভাবে আমার বড় ভালোলাগা ছিল নিউইয়র্কের নাট্যকর্মীদের সঙ্গে দীর্ঘ একটা দিন কাটানো। এক নাটকের বিরতিতে আরেক নাটকের অপেক্ষায় জমে উঠেছিল আড্ডা, নাটক নিয়ে কথা, পুরোনো স্মৃতি, হাসি আর গল্প। প্রবাসের ব্যস্ত জীবনে একই শহরে থেকেও এভাবে একসঙ্গে হওয়ার সুযোগ খুব বেশি আসে না। তাই আমার কাছে এটি শুধু নাটক দেখার উৎসব ছিল না, ছিল নাটকের মানুষগুলোর নিজেদের আবার একটু খুঁজে পাওয়ার দিন। সম্ভবত থিয়েটারের সৌন্দর্য এখানেই, মঞ্চে আলো নিভে যায়, নাটক শেষ হয়, কিন্তু মানুষ, সম্পর্ক আর ভালোবাসা থেকে যায়।
নিউইয়র্কের প্রবাসী বাংলা নাট্যচর্চায় তিন দশকের পথচলা উদযাপন করেছে ঢাকা ড্রামা। সংগঠনটির ৩০ বছর পূর্তি উপলক্ষে ১ আগস্ট শনিবার নিউইয়র্কের জ্যামাইকা পারফরমিং আর্টস সেন্টারে অনুষ্ঠিত হয়েছে দিনব্যাপী বিশেষ নাট্যোৎসব ‘মাস্কস অ্যান্ড মেটাফোরস: ঢাকা ড্রামার ৩০ বছর পূর্তির নাট্য উৎসব’। এটি শুধু ঢাকা ড্রামার নিজস্ব প্রযোজনার উৎসব ছিল না। বিভিন্ন নাট্যদল, নাট্যকর্মী এবং ভিন্ন সাংস্কৃতিক পটভূমির শিল্পীদের একই আঙিনায় নিয়ে এসে উৎসবটি হয়ে উঠেছিল নিউইয়র্কের বহুসাংস্কৃতিক নাট্যচর্চার এক মিলনমেলা। দুপুর ১টা থেকে রাত ১০টা পর্যন্ত চলা এই আয়োজনে এক টিকিটে ছয়টি নাট্য পরিবেশনা দেখার সুযোগ পেয়েছেন দর্শকেরা। পাশাপাশি ছিল উদ্বোধনী আয়োজন, গোলটেবিল আলোচনা এবং দিনব্যাপী থিয়েটার পোস্টার প্রদর্শনী।
দুপুর ১টায় জ্যামাইকা পারফর্মিং আর্টস সেন্টারের ফ্রন্ট ইয়ার্ডে মিউজিক্যাল পারফরম্যান্স এর মধ্য দিয়ে শুরু হয় উৎসব। উদ্বোধনী পরিবেশনায় অংশ নেয় বন্ড স্ট্রিট থিয়েটার ও শিনবোন অ্যালি স্টিল্ট ব্যান্ড। দুপুর দেড়টায় মূল মঞ্চে অনুষ্ঠিত হয় আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন। অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করেন ফেস্টিভ্যাল কমিটির চেয়ারপারসন গার্গী মুখার্জি। নাট্যোৎসবের উদ্বোধন করেন নিউইয়র্ক ইউনিভার্সিটির টিশ স্কুল অব দ্য আর্টসের প্রফেসর এমেরিটাস রিচার্ড শেকনার। প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন জ্যামাইকা সেন্টার ফর আর্টস অ্যান্ড লার্নিংয়ের পরিচালক কোর্টনি ফ্রেঞ্চ। সম্মানিত অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশ থিয়েটার আর্কাইভসের ভাইস প্রেসিডেন্ট অধ্যাপক আবদুস সেলিম এবং বাংলাদেশ থিয়েটার আর্কাইভসের প্রতিষ্ঠাতা ড. বাবুল বিশ্বাস।বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন প্রখ্যাত ফাইট ও অ্যাকশন ডিরেক্টর এবং ‘দ্য লায়ন কিং’-এর ফাইট ডিরেক্টর রিক সর্ডেলেট।
উদ্বোধনের পর একে একে মঞ্চে আসে দিনের নাট্য প্রযোজনাগুলো। মহাভারতের চরিত্র থেকে নিউইয়র্কের সাবওয়ে ট্র্যাজেডি, যুদ্ধের স্মৃতি থেকে সাধারণ মানুষের জীবন, জেন্ডার, পরিচয়, বিশ্বাস ও সামাজিক বিভাজন পর্যন্ত বিস্তৃত বিষয় উঠে এসেছে নাটকগুলোর মধ্য দিয়ে।
‘শিখণ্ডী’: মহাভারতের আখ্যানে জেন্ডার, ক্ষমতা ও পরিচয়ের প্রশ্ন
দুপুর ২টা ১৫ মিনিটে মূল মঞ্চে পরিবেশিত হয় ‘শিখণ্ডী’। সুদীপ্ত ভৌমিকের রচিত নাটকটি পরিবেশন করে একতা অব নিউ জার্সি। নির্দেশনায় ছিলেন সুমন মুখোপাধ্যায়।মহাভারতের বিস্তৃত আখ্যান থেকে উঠে আসা শিখণ্ডী ভারতীয় পুরাণের অন্যতম জটিল চরিত্র। নাটকটিতে একজন সাহসী নারীর চোখ দিয়ে জেন্ডার, ক্ষমতা এবং আত্মপরিচয়ের বিভিন্ন প্রশ্ন অনুসন্ধানের চেষ্টা করা হয়েছে।হাজার বছরের পুরোনো মহাকাব্যের একটি চরিত্রকে সমকালীন দৃষ্টিভঙ্গিতে উপস্থাপনের মধ্য দিয়ে নাটকটি দর্শকের সামনে গুরুত্বপূর্ণ কিছু প্রশ্নও তুলে ধরে। সমাজ একজন মানুষকে কোন পরিচয়ে দেখতে চায়, আর একজন মানুষ নিজেকে কীভাবে আবিষ্কার কিংবা সংজ্ঞায়িত করেন, সেই দ্বন্দ্বও উঠে আসে নাটকের বিষয়বস্তুতে।
‘ভুল রাস্তা’: ইতিহাসের বাইরে থেকে যাওয়া সাধারণ মানুষের গল্প
বিকেল সাড়ে ৩টায় জ্যামাইকা পারফর্মিং আর্টস সেন্টারের ফ্রন্ট ইয়ার্ডে পরিবেশিত হয় ‘ভুল রাস্তা: দ্য রং রুট’। বাদল সরকারের রচিত নাটকটি পরিবেশন করে এপিক অ্যাক্টরস ওয়ার্কশপ অ্যান্ড থিয়েটার ইন লাইফ। নির্দেশনায় ছিলেন সুভাষিস দাস ও তন্দ্রা দাস। সাধারণ মানুষের গল্প নিয়ে নির্মিত এই নাটক। যার জীবন বারবার ইতিহাসের পাতায় নিজের জায়গা খুঁজে পেতে ব্যর্থ হয়। নাটকটির এই সাধারণ গল্পের মধ্যেই রয়েছে একটি বড় প্রশ্ন। ইতিহাস আসলে কাদের মনে রাখে ? রাষ্ট্র, সমাজ কিংবা সময়ের বড় বড় ঘটনার আড়ালে কত সাধারণ মানুষের জীবন, সংগ্রাম এবং স্বপ্ন অদৃশ্য থেকে যায় ? ‘ভুল রাস্তা’ মাস্কস অ্যান্ড মেটাফোরস’
(৪৩-এর পাতার পর)
সেই সাধারণ মানুষের গল্পকেই সামনে নিয়ে এসেছে।
নাটকের ফাঁকে নাটক নিয়েই কথোপকথন:
বিকেল সাড়ে ৪টা থেকে সাড়ে ৫টা পর্যন্ত মূল মঞ্চে অনুষ্ঠিত হয় একটি গোলটেবিল আলোচনা। আলোচনা সঞ্চালনা করেন গোলাম সারওয়ার হারুন। দিনব্যাপী নাট্য প্রদর্শনীর মাঝখানে এই আয়োজন উৎসবকে শুধু মঞ্চের পরিবেশনার মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখেনি। নাটক, নাট্যচর্চা এবং এর ভবিষ্যৎ নিয়ে আলোচনা ও মতবিনিময়ের একটি ক্ষেত্রও তৈরি করেছে।
‘যমুনা’: যুদ্ধের স্মৃতি, শিল্পীর ক্ষত এবং মানবতার অনুসন্ধান
বিকেল ৫টা ৪৫ মিনিটে মূল মঞ্চে পরিবেশিত হয় ‘যমুনা’। সেলিনা শেলীর রচিত নাটকটি পরিবেশন করে অন ডায়ালগ। নির্দেশনায় ছিলেন শামসুল আলম বকুল। যুদ্ধের স্মৃতিতে তাড়িত একজন শিল্পীকে কেন্দ্র করে এগিয়েছে নাটকের গল্প। নিজের ভেতরে বহন করে চলা ক্ষত ও অতীতের মুখোমুখি হতে হয় তাকে। সেই ব্যক্তিগত যন্ত্রণার মধ্য দিয়েই নাটকটি সমাজ, রাজনীতি এবং মানুষের ভেতরের মানবিকতার বিভিন্ন দিক অনুসন্ধান করেছে। যুদ্ধ শেষ হলেই কি যুদ্ধের প্রভাব শেষ হয়ে যায় ? নাকি মানুষের স্মৃতি, শিল্প ও ব্যক্তিগত জীবনে তার ক্ষত থেকে যায় বছরের পর বছর? ‘যমুনা’ সেই স্মৃতি এবং ক্ষতের মধ্য দিয়ে দর্শককে মানবিকতার বৃহত্তর প্রশ্নের সামনে দাঁড় করিয়েছে।
‘লুক বিফোর ইউ লিপ’: সাবওয়ে স্টেশনের ভিন্ন স্বাদের পরিবেশনা
সন্ধ্যা ৭টায় ফ্রন্ট ইয়ার্ডে পরিবেশিত হয় ২০ মিনিটের ভিন্নধর্মী প্রযোজনা ‘লুক বিফোর ইউ লিপ’। নাটকটি পরিবেশন করে রেডিক্যাল ইভোলিউশন। একজন স্যান্ডউইচ আর্টিস্ট, একজন পুলিশ কর্মকর্তা এবং একটি পপ মিউজিক্যালের ঘটনাপ্রবাহ নিউইয়র্কের একটি সাবওয়ে স্টেশনে এসে মিলিত হয়। ছোট্ট এই প্রযোজনা দিনের অন্যান্য অপেক্ষাকৃত ভারী বিষয়নির্ভর নাটকের পাশে দর্শকদের দিয়েছে ভিন্ন স্বাদের নাট্য অভিজ্ঞতা।
‘নিরাকার’: প্রবাস, পরিচয় ও সৃষ্টিকর্তার প্রতি অস্তিত্বের প্রশ্ন
সন্ধ্যা সাড়ে ৭টায় মূল মঞ্চে পরিবেশিত হয় উৎসবের মূল প্রযোজনা এবং ঢাকা ড্রামার নিজস্ব নাটক ‘নিরাকার’। নাটকটি রচনা করেছেন গোলাম সারওয়ার হারুন। নির্দেশনায় ছিলেন গার্গী মুখার্জি ও গোলাম সারওয়ার হারুন। ‘নিরাকার’ মূলত প্রবাসে বসবাস করা কিছু মানুষের গল্প। ভিন্ন ধর্ম, সংস্কৃতি, সামাজিক অবস্থান ও এথনিক পরিচয় নিয়ে একই শহরে বসবাস করা মানুষের জীবন, তাদের পারস্পরিক সম্পর্ক এবং একে অন্যের সঙ্গে মিশে যাওয়ার অভিজ্ঞতা নাটকটির গল্পে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। নিউইয়র্কের মতো বহুজাতিক ও বহুসাংস্কৃতিক একটি শহরে নিজস্ব শিকড়, বিশ্বাস ও সংস্কৃতিকে সঙ্গে নিয়ে চলা মানুষগুলো কীভাবে একে অন্যের জীবনের অংশ হয়ে ওঠে, সেই সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংমিশ্রণের একটি চিত্র উঠে আসে ‘নিরাকার’-এ। নাটকটির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ জায়গা মানুষের ধর্মীয় বিশ্বাস এবং সৃষ্টিকর্তাকে ঘিরে তার অন্তহীন প্রশ্ন। মানুষ কেন বিশ্বাস করে, বিশ্বাসের সঙ্গে তার ব্যক্তিগত জীবনের সম্পর্ক কোথায়, জীবনের নানা ঘটনা ও অনিশ্চয়তার সামনে দাঁড়িয়ে সৃষ্টিকর্তার কাছে মানুষের এত প্রশ্ন কেন, আবার সব প্রশ্নের উত্তর না মিললেও কেন মানুষ শেষ পর্যন্ত সেই সৃষ্টিকর্তার কাছেই ফিরে যায়, ‘নিরাকার’ এসব প্রশ্ন দর্শকের সামনে রেখে যায়। গল্প এগিয়ে যেতে যেতে প্রবাসজীবনের এই মানুষগুলোর ব্যক্তিগত সম্পর্ক, বিশ্বাস, পরিচয় ও জীবনবোধ একসময় এসে মুখোমুখি হয় এক মর্মান্তিক বাস্তবতার। নিউইয়র্কে হেইটক্রাইমের শিকার হয়ে সাবওয়ে ট্র্যাজেডির মধ্য দিয়ে নাটকের গল্প পৌঁছে যায় তার চূড়ান্ত পরিণতিতে। আর সেই পরিণতি যেন নাটকজুড়ে উঠে আসা বিশ্বাস, আত্ম পরিচয়, জীবন, মৃত্যু এবং সৃষ্টিকর্তাকে ঘিরে মানুষের প্রশ্নগুলোকে আরও গভীর করে তোলে।
উৎসবের ছয় নাটক ছয়টি গল্প, কিন্তু অনুসন্ধান যেন একই মানুষের। ‘মাস্কস অ্যান্ড মেটাফোরস’-এর নাটকগুলোর বিষয়বস্তুর দিকে তাকালে একটি বিষয় বিশেষভাবে চোখে পড়ে। উৎসবের নাটক নির্বাচনে শুধু বিনোদন নয়, বিষয়ের বৈচিত্র্য এবং সমকালীন সামাজিক প্রশ্নকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। মহাভারতের শিখণ্ডী থেকে জেন্ডার ও আত্মপরিচয়ের প্রশ্ন, ইতিহাসে হারিয়ে যাওয়া সাধারণ মানুষ, যুদ্ধের স্মৃতি ও মানবতা, নিউইয়র্কের সাবওয়ে জীবন এবং প্রবাস জীবন, বিশ্বাস, পরিচয় ও সৃষ্টিকর্তার অনুসন্ধান, সব মিলিয়ে ছয়টি পরিবেশনা যেন ভিন্ন ভিন্ন গল্পের মধ্য দিয়ে শেষ পর্যন্ত মানুষকেই খুঁজেছে। এখানেই সম্ভবত ‘মাস্কস অ্যান্ড মেটাফোরস’, অর্থাৎ মুখোশ ও রূপকের তাৎপর্য। মঞ্চে মুখোশ থাকে, চরিত্র থাকে, রূপক থাকে। কিন্তু সেই মুখোশের আড়াল থেকে শেষ পর্যন্ত বেরিয়ে আসে বাস্তব মানুষ, বাস্তব সমাজ এবং আমাদের সময়ের গল্প।
পোস্টারে ফিরে দেখা নাটকের ইতিহাস:
উৎসবের আরেকটি বিশেষ আকর্ষণ ছিল দিনব্যাপী থিয়েটার পোস্টার প্রদর্শনী। বাংলাদেশ থিয়েটার আর্কাইভসের তত্ত্বাবধানে আয়োজিত এই প্রদর্শনী মঞ্চের জীবন্ত পরিবেশনার পাশাপাশি দর্শকদের সামনে নাটকের দৃশ্যমান ইতিহাসেরও একটি দরজা খুলে দিয়েছিল। একটি নাটকের প্রদর্শনী শেষ হয়ে যায়, মঞ্চসজ্জা সরিয়ে নেওয়া হয়, অভিনেতারা ফিরে যান নিজেদের জীবনে। কিন্তু থেকে যায় কিছু ছবি, পোস্টার, প্রচারপত্র আর স্মৃতি। সময়ের সঙ্গে এগুলোই হয়ে ওঠে নাট্য ইতিহাসের দলিল। সেই অর্থে এই পোস্টার প্রদর্শনীটি আমার কাছে বিশেষভাবে ভালো লেগেছে। এমন একটি উদ্যোগের জন্য বাংলাদেশ থিয়েটার আর্কাইভস এবং বিশেষ করে বাবুল বিশ্বাসকে আন্তরিক ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা জানাই। বাংলাদেশের নাট্যচর্চার ইতিহাস, স্মৃতি ও দলিল সংরক্ষণের এই প্রচেষ্টা সত্যিই গুরুত্বপূর্ণ। কারণ আজ আমরা যে নাটক করছি, যে পোস্টার ছাপছি কিংবা যে ছবি তুলে রাখছি, কয়েক দশক পরে সেগুলোই হয়তো একটি সময়ের নাট্য আন্দোলনের গল্প বলবে।
তিন দশকের নাট্যযাত্রা:
৩০ বছর একটি নাট্যদলের জন্য কেবল ক্যালেন্ডারের হিসাব নয়। বিশেষ করে প্রবাসে তিন দশক ধরে নাট্যচর্চার ধারাবাহিকতা ধরে রাখা একটি উল্লেখযোগ্য সাংস্কৃতিক অর্জন। নিউইয়র্কের মতো বহুভাষিক ও বহুসাংস্কৃতিক শহরে বাংলা ও দক্ষিণ এশীয় নাট্যচর্চার একটি পরিসর তৈরি করা, নতুন দর্শকের কাছে নাটক পৌঁছে দেওয়া এবং বিভিন্ন সাংস্কৃতিক পটভূমির নাট্যদল ও শিল্পীদের একই মঞ্চের সঙ্গে যুক্ত করার মধ্য দিয়ে ঢাকা ড্রামার এই দীর্ঘ যাত্রা একটি ভিন্ন তাৎপর্য বহন করে। ৩০ বছর পূর্তির উৎসবেও সেই বহুসাংস্কৃতিক চরিত্রটি স্পষ্ট ছিল। ঢাকা ড্রামার পাশাপাশি একতা অব নিউ জার্সি, অন ডায়ালগ, রেডিক্যাল ইভোলিউশন, বন্ড স্ট্রিট থিয়েটার এবং এপিক অ্যাক্টরস ওয়ার্কশপ অ্যান্ড থিয়েটার ইন লাইফসহ বিভিন্ন দল ও শিল্পী এতে অংশ নিয়েছেন। সব মিলিয়ে ঢাকা ড্রামার ৩০ বছর পূর্তির ‘মাস্কস অ্যান্ড মেটাফোরস’ শুধু একটি প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর আনুষ্ঠানিকতা ছিল না। ছয়টি নাটক, আলোচনা, প্রদর্শনী এবং বিভিন্ন সংস্কৃতির নাট্যকর্মীদের অংশগ্রহণে এটি হয়ে উঠেছিল নিউইয়র্কের প্রবাসী নাট্যচর্চার একটি দিনব্যাপী মিলনমেলা।
তবে ব্যক্তিগতভাবে দিনটি আমার কাছে আরেকটু বেশি কিছু। নাটক দেখেছি, নাটক নিয়ে কথা বলেছি, পরিচিত মুখগুলোর সঙ্গে আড্ডা দিয়েছি, অনেকের সঙ্গে দীর্ঘদিন পর দেখা হয়েছে। একই শহরে ছড়িয়ে থাকা নাটকের মানুষগুলো কয়েক ঘণ্টার জন্য যেন আবার একই উঠোনে এসে জড়ো হয়েছিলাম। তাই দিনের শেষে মনে হয়েছে, মঞ্চে ছয়টি নাটক হয়েছে ঠিকই, কিন্তু মঞ্চের বাইরে চলেছে আরেকটি অলিখিত নাটক। সেই নাটকের কোনো লিখিত সংলাপ ছিল না, কোনো নির্দেশক ছিলেন না, কোনো আলোক পরিকল্পনাও ছিল না। ছিল শুধু কিছু নাটকপাগল মানুষ, তাদের স্মৃতি, হাসি, আড্ডা আর থিয়েটারের প্রতি বহু বছরের ভালোবাসা। ঢাকা ড্রামার তিন দশকের অর্জনের দিকে ফিরে তাকানোর পাশাপাশি এই উৎসব সামনে এগিয়ে যাওয়ার কথাও বলেছে। কারণ একটি নাট্যদলের ৩০ বছর পূর্তি শুধু অতীতকে উদযাপনের উপলক্ষ নয়, আগামী প্রজন্মের হাতে মঞ্চের আলো পৌঁছে দেওয়ারও একটি গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্ত।
ঢাকা ড্রামাকে ৩০ বছরের এই দীর্ঘ নাট্যযাত্রার জন্য অভিনন্দন। মঞ্চের আলো জ্বলতে থাকুক, গল্প চলতে থাকুক, আর নাটকের মানুষগুলোর এমন আড্ডা বারবার ফিরে আসুক নিউইয়র্কে।
নিউইয়র্কের প্রবাসী বাংলা নাট্যচর্চায় তিন দশকের পথচলা উদযাপন করেছে ঢাকা ড্রামা। সংগঠনটির ৩০ বছর পূর্তি উপলক্ষে ১ আগস্ট শনিবার নিউইয়র্কের জ্যামাইকা পারফরমিং আর্টস সেন্টারে অনুষ্ঠিত হয়েছে দিনব্যাপী বিশেষ নাট্যোৎসব ‘মাস্কস অ্যান্ড মেটাফোরস: ঢাকা ড্রামার ৩০ বছর পূর্তির নাট্য উৎসব’। এটি শুধু ঢাকা ড্রামার নিজস্ব প্রযোজনার উৎসব ছিল না। বিভিন্ন নাট্যদল, নাট্যকর্মী এবং ভিন্ন সাংস্কৃতিক পটভূমির শিল্পীদের একই আঙিনায় নিয়ে এসে উৎসবটি হয়ে উঠেছিল নিউইয়র্কের বহুসাংস্কৃতিক নাট্যচর্চার এক মিলনমেলা। দুপুর ১টা থেকে রাত ১০টা পর্যন্ত চলা এই আয়োজনে এক টিকিটে ছয়টি নাট্য পরিবেশনা দেখার সুযোগ পেয়েছেন দর্শকেরা। পাশাপাশি ছিল উদ্বোধনী আয়োজন, গোলটেবিল আলোচনা এবং দিনব্যাপী থিয়েটার পোস্টার প্রদর্শনী।
দুপুর ১টায় জ্যামাইকা পারফর্মিং আর্টস সেন্টারের ফ্রন্ট ইয়ার্ডে মিউজিক্যাল পারফরম্যান্স এর মধ্য দিয়ে শুরু হয় উৎসব। উদ্বোধনী পরিবেশনায় অংশ নেয় বন্ড স্ট্রিট থিয়েটার ও শিনবোন অ্যালি স্টিল্ট ব্যান্ড। দুপুর দেড়টায় মূল মঞ্চে অনুষ্ঠিত হয় আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন। অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করেন ফেস্টিভ্যাল কমিটির চেয়ারপারসন গার্গী মুখার্জি। নাট্যোৎসবের উদ্বোধন করেন নিউইয়র্ক ইউনিভার্সিটির টিশ স্কুল অব দ্য আর্টসের প্রফেসর এমেরিটাস রিচার্ড শেকনার। প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন জ্যামাইকা সেন্টার ফর আর্টস অ্যান্ড লার্নিংয়ের পরিচালক কোর্টনি ফ্রেঞ্চ। সম্মানিত অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশ থিয়েটার আর্কাইভসের ভাইস প্রেসিডেন্ট অধ্যাপক আবদুস সেলিম এবং বাংলাদেশ থিয়েটার আর্কাইভসের প্রতিষ্ঠাতা ড. বাবুল বিশ্বাস।বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন প্রখ্যাত ফাইট ও অ্যাকশন ডিরেক্টর এবং ‘দ্য লায়ন কিং’-এর ফাইট ডিরেক্টর রিক সর্ডেলেট।
উদ্বোধনের পর একে একে মঞ্চে আসে দিনের নাট্য প্রযোজনাগুলো। মহাভারতের চরিত্র থেকে নিউইয়র্কের সাবওয়ে ট্র্যাজেডি, যুদ্ধের স্মৃতি থেকে সাধারণ মানুষের জীবন, জেন্ডার, পরিচয়, বিশ্বাস ও সামাজিক বিভাজন পর্যন্ত বিস্তৃত বিষয় উঠে এসেছে নাটকগুলোর মধ্য দিয়ে।
‘শিখণ্ডী’: মহাভারতের আখ্যানে জেন্ডার, ক্ষমতা ও পরিচয়ের প্রশ্ন
দুপুর ২টা ১৫ মিনিটে মূল মঞ্চে পরিবেশিত হয় ‘শিখণ্ডী’। সুদীপ্ত ভৌমিকের রচিত নাটকটি পরিবেশন করে একতা অব নিউ জার্সি। নির্দেশনায় ছিলেন সুমন মুখোপাধ্যায়।মহাভারতের বিস্তৃত আখ্যান থেকে উঠে আসা শিখণ্ডী ভারতীয় পুরাণের অন্যতম জটিল চরিত্র। নাটকটিতে একজন সাহসী নারীর চোখ দিয়ে জেন্ডার, ক্ষমতা এবং আত্মপরিচয়ের বিভিন্ন প্রশ্ন অনুসন্ধানের চেষ্টা করা হয়েছে।হাজার বছরের পুরোনো মহাকাব্যের একটি চরিত্রকে সমকালীন দৃষ্টিভঙ্গিতে উপস্থাপনের মধ্য দিয়ে নাটকটি দর্শকের সামনে গুরুত্বপূর্ণ কিছু প্রশ্নও তুলে ধরে। সমাজ একজন মানুষকে কোন পরিচয়ে দেখতে চায়, আর একজন মানুষ নিজেকে কীভাবে আবিষ্কার কিংবা সংজ্ঞায়িত করেন, সেই দ্বন্দ্বও উঠে আসে নাটকের বিষয়বস্তুতে।
‘ভুল রাস্তা’: ইতিহাসের বাইরে থেকে যাওয়া সাধারণ মানুষের গল্প
বিকেল সাড়ে ৩টায় জ্যামাইকা পারফর্মিং আর্টস সেন্টারের ফ্রন্ট ইয়ার্ডে পরিবেশিত হয় ‘ভুল রাস্তা: দ্য রং রুট’। বাদল সরকারের রচিত নাটকটি পরিবেশন করে এপিক অ্যাক্টরস ওয়ার্কশপ অ্যান্ড থিয়েটার ইন লাইফ। নির্দেশনায় ছিলেন সুভাষিস দাস ও তন্দ্রা দাস। সাধারণ মানুষের গল্প নিয়ে নির্মিত এই নাটক। যার জীবন বারবার ইতিহাসের পাতায় নিজের জায়গা খুঁজে পেতে ব্যর্থ হয়। নাটকটির এই সাধারণ গল্পের মধ্যেই রয়েছে একটি বড় প্রশ্ন। ইতিহাস আসলে কাদের মনে রাখে ? রাষ্ট্র, সমাজ কিংবা সময়ের বড় বড় ঘটনার আড়ালে কত সাধারণ মানুষের জীবন, সংগ্রাম এবং স্বপ্ন অদৃশ্য থেকে যায় ? ‘ভুল রাস্তা’ মাস্কস অ্যান্ড মেটাফোরস’
(৪৩-এর পাতার পর)
সেই সাধারণ মানুষের গল্পকেই সামনে নিয়ে এসেছে।
নাটকের ফাঁকে নাটক নিয়েই কথোপকথন:
বিকেল সাড়ে ৪টা থেকে সাড়ে ৫টা পর্যন্ত মূল মঞ্চে অনুষ্ঠিত হয় একটি গোলটেবিল আলোচনা। আলোচনা সঞ্চালনা করেন গোলাম সারওয়ার হারুন। দিনব্যাপী নাট্য প্রদর্শনীর মাঝখানে এই আয়োজন উৎসবকে শুধু মঞ্চের পরিবেশনার মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখেনি। নাটক, নাট্যচর্চা এবং এর ভবিষ্যৎ নিয়ে আলোচনা ও মতবিনিময়ের একটি ক্ষেত্রও তৈরি করেছে।
‘যমুনা’: যুদ্ধের স্মৃতি, শিল্পীর ক্ষত এবং মানবতার অনুসন্ধান
বিকেল ৫টা ৪৫ মিনিটে মূল মঞ্চে পরিবেশিত হয় ‘যমুনা’। সেলিনা শেলীর রচিত নাটকটি পরিবেশন করে অন ডায়ালগ। নির্দেশনায় ছিলেন শামসুল আলম বকুল। যুদ্ধের স্মৃতিতে তাড়িত একজন শিল্পীকে কেন্দ্র করে এগিয়েছে নাটকের গল্প। নিজের ভেতরে বহন করে চলা ক্ষত ও অতীতের মুখোমুখি হতে হয় তাকে। সেই ব্যক্তিগত যন্ত্রণার মধ্য দিয়েই নাটকটি সমাজ, রাজনীতি এবং মানুষের ভেতরের মানবিকতার বিভিন্ন দিক অনুসন্ধান করেছে। যুদ্ধ শেষ হলেই কি যুদ্ধের প্রভাব শেষ হয়ে যায় ? নাকি মানুষের স্মৃতি, শিল্প ও ব্যক্তিগত জীবনে তার ক্ষত থেকে যায় বছরের পর বছর? ‘যমুনা’ সেই স্মৃতি এবং ক্ষতের মধ্য দিয়ে দর্শককে মানবিকতার বৃহত্তর প্রশ্নের সামনে দাঁড় করিয়েছে।
‘লুক বিফোর ইউ লিপ’: সাবওয়ে স্টেশনের ভিন্ন স্বাদের পরিবেশনা
সন্ধ্যা ৭টায় ফ্রন্ট ইয়ার্ডে পরিবেশিত হয় ২০ মিনিটের ভিন্নধর্মী প্রযোজনা ‘লুক বিফোর ইউ লিপ’। নাটকটি পরিবেশন করে রেডিক্যাল ইভোলিউশন। একজন স্যান্ডউইচ আর্টিস্ট, একজন পুলিশ কর্মকর্তা এবং একটি পপ মিউজিক্যালের ঘটনাপ্রবাহ নিউইয়র্কের একটি সাবওয়ে স্টেশনে এসে মিলিত হয়। ছোট্ট এই প্রযোজনা দিনের অন্যান্য অপেক্ষাকৃত ভারী বিষয়নির্ভর নাটকের পাশে দর্শকদের দিয়েছে ভিন্ন স্বাদের নাট্য অভিজ্ঞতা।
‘নিরাকার’: প্রবাস, পরিচয় ও সৃষ্টিকর্তার প্রতি অস্তিত্বের প্রশ্ন
সন্ধ্যা সাড়ে ৭টায় মূল মঞ্চে পরিবেশিত হয় উৎসবের মূল প্রযোজনা এবং ঢাকা ড্রামার নিজস্ব নাটক ‘নিরাকার’। নাটকটি রচনা করেছেন গোলাম সারওয়ার হারুন। নির্দেশনায় ছিলেন গার্গী মুখার্জি ও গোলাম সারওয়ার হারুন। ‘নিরাকার’ মূলত প্রবাসে বসবাস করা কিছু মানুষের গল্প। ভিন্ন ধর্ম, সংস্কৃতি, সামাজিক অবস্থান ও এথনিক পরিচয় নিয়ে একই শহরে বসবাস করা মানুষের জীবন, তাদের পারস্পরিক সম্পর্ক এবং একে অন্যের সঙ্গে মিশে যাওয়ার অভিজ্ঞতা নাটকটির গল্পে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। নিউইয়র্কের মতো বহুজাতিক ও বহুসাংস্কৃতিক একটি শহরে নিজস্ব শিকড়, বিশ্বাস ও সংস্কৃতিকে সঙ্গে নিয়ে চলা মানুষগুলো কীভাবে একে অন্যের জীবনের অংশ হয়ে ওঠে, সেই সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংমিশ্রণের একটি চিত্র উঠে আসে ‘নিরাকার’-এ। নাটকটির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ জায়গা মানুষের ধর্মীয় বিশ্বাস এবং সৃষ্টিকর্তাকে ঘিরে তার অন্তহীন প্রশ্ন। মানুষ কেন বিশ্বাস করে, বিশ্বাসের সঙ্গে তার ব্যক্তিগত জীবনের সম্পর্ক কোথায়, জীবনের নানা ঘটনা ও অনিশ্চয়তার সামনে দাঁড়িয়ে সৃষ্টিকর্তার কাছে মানুষের এত প্রশ্ন কেন, আবার সব প্রশ্নের উত্তর না মিললেও কেন মানুষ শেষ পর্যন্ত সেই সৃষ্টিকর্তার কাছেই ফিরে যায়, ‘নিরাকার’ এসব প্রশ্ন দর্শকের সামনে রেখে যায়। গল্প এগিয়ে যেতে যেতে প্রবাসজীবনের এই মানুষগুলোর ব্যক্তিগত সম্পর্ক, বিশ্বাস, পরিচয় ও জীবনবোধ একসময় এসে মুখোমুখি হয় এক মর্মান্তিক বাস্তবতার। নিউইয়র্কে হেইটক্রাইমের শিকার হয়ে সাবওয়ে ট্র্যাজেডির মধ্য দিয়ে নাটকের গল্প পৌঁছে যায় তার চূড়ান্ত পরিণতিতে। আর সেই পরিণতি যেন নাটকজুড়ে উঠে আসা বিশ্বাস, আত্ম পরিচয়, জীবন, মৃত্যু এবং সৃষ্টিকর্তাকে ঘিরে মানুষের প্রশ্নগুলোকে আরও গভীর করে তোলে।
উৎসবের ছয় নাটক ছয়টি গল্প, কিন্তু অনুসন্ধান যেন একই মানুষের। ‘মাস্কস অ্যান্ড মেটাফোরস’-এর নাটকগুলোর বিষয়বস্তুর দিকে তাকালে একটি বিষয় বিশেষভাবে চোখে পড়ে। উৎসবের নাটক নির্বাচনে শুধু বিনোদন নয়, বিষয়ের বৈচিত্র্য এবং সমকালীন সামাজিক প্রশ্নকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। মহাভারতের শিখণ্ডী থেকে জেন্ডার ও আত্মপরিচয়ের প্রশ্ন, ইতিহাসে হারিয়ে যাওয়া সাধারণ মানুষ, যুদ্ধের স্মৃতি ও মানবতা, নিউইয়র্কের সাবওয়ে জীবন এবং প্রবাস জীবন, বিশ্বাস, পরিচয় ও সৃষ্টিকর্তার অনুসন্ধান, সব মিলিয়ে ছয়টি পরিবেশনা যেন ভিন্ন ভিন্ন গল্পের মধ্য দিয়ে শেষ পর্যন্ত মানুষকেই খুঁজেছে। এখানেই সম্ভবত ‘মাস্কস অ্যান্ড মেটাফোরস’, অর্থাৎ মুখোশ ও রূপকের তাৎপর্য। মঞ্চে মুখোশ থাকে, চরিত্র থাকে, রূপক থাকে। কিন্তু সেই মুখোশের আড়াল থেকে শেষ পর্যন্ত বেরিয়ে আসে বাস্তব মানুষ, বাস্তব সমাজ এবং আমাদের সময়ের গল্প।
পোস্টারে ফিরে দেখা নাটকের ইতিহাস:
উৎসবের আরেকটি বিশেষ আকর্ষণ ছিল দিনব্যাপী থিয়েটার পোস্টার প্রদর্শনী। বাংলাদেশ থিয়েটার আর্কাইভসের তত্ত্বাবধানে আয়োজিত এই প্রদর্শনী মঞ্চের জীবন্ত পরিবেশনার পাশাপাশি দর্শকদের সামনে নাটকের দৃশ্যমান ইতিহাসেরও একটি দরজা খুলে দিয়েছিল। একটি নাটকের প্রদর্শনী শেষ হয়ে যায়, মঞ্চসজ্জা সরিয়ে নেওয়া হয়, অভিনেতারা ফিরে যান নিজেদের জীবনে। কিন্তু থেকে যায় কিছু ছবি, পোস্টার, প্রচারপত্র আর স্মৃতি। সময়ের সঙ্গে এগুলোই হয়ে ওঠে নাট্য ইতিহাসের দলিল। সেই অর্থে এই পোস্টার প্রদর্শনীটি আমার কাছে বিশেষভাবে ভালো লেগেছে। এমন একটি উদ্যোগের জন্য বাংলাদেশ থিয়েটার আর্কাইভস এবং বিশেষ করে বাবুল বিশ্বাসকে আন্তরিক ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা জানাই। বাংলাদেশের নাট্যচর্চার ইতিহাস, স্মৃতি ও দলিল সংরক্ষণের এই প্রচেষ্টা সত্যিই গুরুত্বপূর্ণ। কারণ আজ আমরা যে নাটক করছি, যে পোস্টার ছাপছি কিংবা যে ছবি তুলে রাখছি, কয়েক দশক পরে সেগুলোই হয়তো একটি সময়ের নাট্য আন্দোলনের গল্প বলবে।
তিন দশকের নাট্যযাত্রা:
৩০ বছর একটি নাট্যদলের জন্য কেবল ক্যালেন্ডারের হিসাব নয়। বিশেষ করে প্রবাসে তিন দশক ধরে নাট্যচর্চার ধারাবাহিকতা ধরে রাখা একটি উল্লেখযোগ্য সাংস্কৃতিক অর্জন। নিউইয়র্কের মতো বহুভাষিক ও বহুসাংস্কৃতিক শহরে বাংলা ও দক্ষিণ এশীয় নাট্যচর্চার একটি পরিসর তৈরি করা, নতুন দর্শকের কাছে নাটক পৌঁছে দেওয়া এবং বিভিন্ন সাংস্কৃতিক পটভূমির নাট্যদল ও শিল্পীদের একই মঞ্চের সঙ্গে যুক্ত করার মধ্য দিয়ে ঢাকা ড্রামার এই দীর্ঘ যাত্রা একটি ভিন্ন তাৎপর্য বহন করে। ৩০ বছর পূর্তির উৎসবেও সেই বহুসাংস্কৃতিক চরিত্রটি স্পষ্ট ছিল। ঢাকা ড্রামার পাশাপাশি একতা অব নিউ জার্সি, অন ডায়ালগ, রেডিক্যাল ইভোলিউশন, বন্ড স্ট্রিট থিয়েটার এবং এপিক অ্যাক্টরস ওয়ার্কশপ অ্যান্ড থিয়েটার ইন লাইফসহ বিভিন্ন দল ও শিল্পী এতে অংশ নিয়েছেন। সব মিলিয়ে ঢাকা ড্রামার ৩০ বছর পূর্তির ‘মাস্কস অ্যান্ড মেটাফোরস’ শুধু একটি প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর আনুষ্ঠানিকতা ছিল না। ছয়টি নাটক, আলোচনা, প্রদর্শনী এবং বিভিন্ন সংস্কৃতির নাট্যকর্মীদের অংশগ্রহণে এটি হয়ে উঠেছিল নিউইয়র্কের প্রবাসী নাট্যচর্চার একটি দিনব্যাপী মিলনমেলা।
তবে ব্যক্তিগতভাবে দিনটি আমার কাছে আরেকটু বেশি কিছু। নাটক দেখেছি, নাটক নিয়ে কথা বলেছি, পরিচিত মুখগুলোর সঙ্গে আড্ডা দিয়েছি, অনেকের সঙ্গে দীর্ঘদিন পর দেখা হয়েছে। একই শহরে ছড়িয়ে থাকা নাটকের মানুষগুলো কয়েক ঘণ্টার জন্য যেন আবার একই উঠোনে এসে জড়ো হয়েছিলাম। তাই দিনের শেষে মনে হয়েছে, মঞ্চে ছয়টি নাটক হয়েছে ঠিকই, কিন্তু মঞ্চের বাইরে চলেছে আরেকটি অলিখিত নাটক। সেই নাটকের কোনো লিখিত সংলাপ ছিল না, কোনো নির্দেশক ছিলেন না, কোনো আলোক পরিকল্পনাও ছিল না। ছিল শুধু কিছু নাটকপাগল মানুষ, তাদের স্মৃতি, হাসি, আড্ডা আর থিয়েটারের প্রতি বহু বছরের ভালোবাসা। ঢাকা ড্রামার তিন দশকের অর্জনের দিকে ফিরে তাকানোর পাশাপাশি এই উৎসব সামনে এগিয়ে যাওয়ার কথাও বলেছে। কারণ একটি নাট্যদলের ৩০ বছর পূর্তি শুধু অতীতকে উদযাপনের উপলক্ষ নয়, আগামী প্রজন্মের হাতে মঞ্চের আলো পৌঁছে দেওয়ারও একটি গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্ত।
ঢাকা ড্রামাকে ৩০ বছরের এই দীর্ঘ নাট্যযাত্রার জন্য অভিনন্দন। মঞ্চের আলো জ্বলতে থাকুক, গল্প চলতে থাকুক, আর নাটকের মানুষগুলোর এমন আড্ডা বারবার ফিরে আসুক নিউইয়র্কে।