সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদ : ভ্রান্তি ও বাস্তবতা

প্রকাশ : ২০ অগাস্ট ২০২৬, ১৫:৫৯ , অনলাইন ভার্সন
তায়েব মিল্লাত হোসেন: বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি নির্বাচন ঘিরে সংবিধানে থাকা ৭০ অনুচ্ছেদ আবার আলোচনায় এসেছে। কারণ এতে সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদ সরকারি দল বিএনপির বিজয় ভোটের আগেই নিশ্চিত হয়ে আছে। স্বভাবতই বিরোধী দল তথা জামায়াত-এনসিপি জোট এমন নির্বাচন হজম করলেও ৭০ অনুচ্ছেদ নিয়ে দুটো খোঁচা দিতে ছাড়ছে না। আবার এই অনুচ্ছেদের আপাতত সুবিধাভোগী যে বিএনপি, সেটাতেও কোনো রাখঢাক নেই। কারণ রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের আগেই সংসদের প্রধান হুইপ নুরুল ইসলাম মণি নিজ দলের সংসদ সদস্যদের মনে করিয়ে দিয়েছেন, দলের কেউ বিপক্ষে ভোট দিলে তার সংসদ সদস্য পদই থাকবে না।
সংসদে নিজ দলের বাইরে অবস্থান নেওয়া যায় না- এমপিদের এই পরাধীনতা না-পছন্দ অনেকেরই। বিশেষ করে, সুশীল সমাজ থেকে বরাবরই এর সমালোচনা হয়ে থাকে। অন্তর্বর্তী সরকারের সময় তাই সংস্কার উদ্যোগের সুযোগে সংবিধান থেকে ৭০ অনুচ্ছেদ ছেঁটে ফেলার প্রস্তাব রেখেছিলেন অনেকে। কিন্তু বিগত সময়ে এর সুবিধা ভোগ করেছে যেসব দল, তাদের অন্যতম বিএনপি এটির মূল শক্তি ধরে রাখার পক্ষে জোর অবস্থান নেয়। তবু জুলাই সনদে সংস্কারের কিছু পদক্ষেপ তাদেরও মেনে নিতে হয়েছিল। যেখানে ৭০ অনুচ্ছেদ নিয়ে বলা হয়েছে : জাতীয় সংসদের সদস্যরা কেবল অর্থ বিল এবং আস্থা ভোট প্রদানের ক্ষেত্রে নিজ দলের প্রতি অনুগত থাকবেন। অন্য যেকোনো বিষয়ে তারা স্বাধীনভাবে ভোট দিতে পারবেন।
এভাবে ৭০ অনুচ্ছেদ যদি কিছুটা পরিমার্জনের মুখে পড়ে, তবু এর মূল শক্তিটি ঠিকই রয়ে যাবে। যা মূলত এমপি সাহেবদের নিজ নিজ দলের প্রতি অনুগত থাকা। বিষয় হচ্ছে : তাদের প্রতি এই সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতা আরোপের কারণ আসলে কী? এর জন্য আমাদের ফিরতে হবে বাহাত্তরে। যখন বাংলাদেশের সংবিধান রচনায় হাত দেওয়া হয়, তখন খোদ সংবিধান প্রণেতা দল ৭০ অনুচ্ছেদ নিয়ে দ্বিধায় ছিল। এর যৌক্তিকতা সম্পর্কে তখন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান তাদের বলেছিলেন, ‘পাকিস্তান আমলে সরকার অস্থিতিশীল হয়েছিল মূলত পরিষদ-সদস্যদের দলবদলের ফলে কিংবা দলীয় শৃঙ্খলা ভঙ্গ করে দলের বিপক্ষে ভোটদানের ফলে। এটা বন্ধ হওয়া দরকার।’ বাহাত্তরের সংবিধানের বাংলা খসড়া প্রণয়ন ও পর্যালোচনা কমিটির প্রধান অধ্যাপক আনিসুজ্জামান রচিত ‘বিপুলা পৃথিবী’ বইতে পাওয়া যায় এই বিবরণ।
এ ক্ষেত্রে ব্রিটিশ আমলে মুসলিম লীগ সরকারের পতনও যে বঙ্গবন্ধুর মাথায় ছিল, সেটা নিশ্চিত করেই বলা যায়। যা ১৯৪৫ সালের ২৮ মার্চের ঘটনা। ব্রিটিশ ভারতের অখণ্ড বাংলায় মুসলিম লীগ সরকার সেদিন পড়ে যায়। এর পেছনে ছিল অতি মুনাফাপ্রবণ মাড়োয়ারিদের কারসাজি। ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’ পুস্তকে তাদের ষড়যন্ত্রের বিস্তারী জাল সুনিপুণভাবে তুলে ধরেছেন শেখ মুজিব। ‘কয়েক লক্ষ টাকা তুলে লীগ মন্ত্রিসভাকে খতম করার জন্য কয়েকজন এমএলএকে কিনে ফেলল। ফলে এক ভোটে লীগ মন্ত্রিত্বকে পরাজয়বরণ করতে হলো।’ সেই সময়ের ছাত্রনেতা শেখ মুজিব ঠিক এভাবেই লিখেছেন।
বাঙালির মহত্তম নেতা মুজিব আরও লিখেছেন, ‘এর পূর্বে আমার ধারণা ছিল না, এমএলএরা এইভাবে টাকা নিতে পারে। এরাই দেশের ও জনগণের প্রতিনিধি! আমার মনে আছে, আমাদের ওপর ভার পড়ল কয়েকজন এমএলএকে পাহারা দেবার, যাতে তারা দল ত্যাগ করে অন্য দলে না যেতে পারে।’ বাহাত্তরের সংবিধানে ৭০ অনুচ্ছেদ রাখার পেছনে বঙ্গবন্ধুর জীবনের এই তিক্ত অধ্যায় হয়তো প্রচ্ছন্ন প্রভাব রাখতে পারে।
৮১ বছর আগে যেখানে সরকারি দল ছেড়ে অর্থের প্রলোভনে বিরোধী পক্ষে যাওয়ার ঘটনা আছে, সেখানে আজকের চিত্রটা কেমন হতে পারে? সেটা পশ্চিমবঙ্গে হাড়ে হাড়ে টের পাচ্ছেন সদ্য মুখ্যমন্ত্রিত্ব হারানো মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। বিধানসভা নির্বাচনে হেরে তার দল সম্প্রতি রাজ্য সরকার থেকে বিদায় নিয়েছে। ভোট কিন্তু কম পায়নি তারা। সেটা ৪০.৮০ শতাংশ। যেখানে বিজেপির পাওয়া ভোটের হার ৪৫.৮৪ শতাংশ। রাজ্য সরকারে যাওয়া এই দলটির ২০৭ আসনের বিপরীতে তৃণমূলের আসনসংখ্যা ৮০। যেগুলো নিয়ে প্রতাপশালী একটি বিরোধী দল হয়ে রাজনীতিতে সক্রিয় থাকতে পারতেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। কিন্তু কেন্দ্রীয় ও রাজ্য বিজেপি মিলে এমন একটি কূটচাল দেয়, যেখানে তার হাত থেকে দলটাই যেন ছুটে গেছে। সব স্তরেই তৃণমূল কংগ্রেসের বেশির ভাগ জনপ্রতিনিধি বিজেপির পুতুল হয়ে অনেকটা বিদ্রোহী তৃণমূল গঠন করেছেন। বিরোধিতার নামে রাজ্য ও কেন্দ্রÑদুই স্তরেই তারা মূলত প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ও মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর গুণকীর্তনে ব্যস্ত। ঢাকায় আমরা যে আমলে গৃহপালিত বিরোধী দল দেখে আসছি, এখন সেটাই যেন দেখতে পাচ্ছে কলকাতা। কথা হচ্ছে, ভারতে যদি এমন কোনো সাংবিধানিক রক্ষাকবচ থাকত, দলীয় প্রধানের বিরুদ্ধে গেলে নির্বাচিত পদখানি বাতিল হবে, তাহলে কিন্তু পশ্চিম বাংলার হালের সরকার ও রাজনীতিতে একধরনের সমতা রক্ষিত হতো। তা না থাকায় সবই একপেশে, সব ছাতা ধরা হচ্ছে বিজেপির দিকে।
বছর কয়েক আগে ভারতের সংকট তুলে ধরেই ৭০ অনুচ্ছেদের পক্ষে বলেছিলেন সদ্য প্রয়াত প্রাজ্ঞ পার্লামেন্টারিয়ান তোফায়েল আহমেদ। তার সেই ভাষ্যমতে, ‘১৯৯৩ সালে প্রধানমন্ত্রী নরসিমা রাওয়ের বিরুদ্ধে অনাস্থা প্রস্তাব আনা হয়েছিল। আমি সেখানে উপস্থিত ছিলাম। শিখতে গিয়েছিলাম। ক্ষমতাসীন দল কয়েকজন সংসদ সদস্যকে কিনেছিল। পরে এ নিয়ে প্রধানমন্ত্রী রাওয়ের বিরুদ্ধে মামলা এবং বিচারিক আদালতে তিনি দণ্ডিতও হয়েছিলেন। এটা বন্ধ করতেই ৭০ অনুচ্ছেদ রাখা হয়েছে। এর প্রয়োগ শুধু প্রধানমন্ত্রীর অনাস্থা প্রস্তাব মোকাবিলার ক্ষেত্রে।’
এর মানে দাঁড়ায়, সরকারপ্রধানের প্রতি দলের সাংসদরা যাতে অনাস্থার প্রশ্ন এলে সংসদে আস্থা রাখেন, তার জন্যই ৭০ অনুচ্ছেদ। সেই অনুচ্ছেদ একটু দেখা যাক :
‘কোনো নির্বাচনে কোনো রাজনৈতিক দলের প্রার্থীরূপে মনোনীত হইয়া কোনো ব্যক্তি সংসদ সদস্য নির্বাচিত হইলে তিনি যদি-
(ক) উক্ত দল হইতে পদত্যাগ করেন, অথবা
(খ) সংসদে উক্ত দলের বিপক্ষে ভোটদান করেন,
তাহা হইলে সংসদে তাঁহার আসন শূন্য হইবে, তবে তিনি সেই কারণে পরবর্তী কোনো নির্বাচনে সংসদ সদস্য হইবার অযোগ্য হইবেন না।’
এই বিপক্ষে ভোটদানের সুযোগ না রাখার বিষয়টি নিয়ে সাবেক প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহা নিদারুণ আপত্তির কথা জানিয়েছেন ষোড়শ সংশোধনী নাকচের পুরো রায়ে। সেখানে তিনি যা বলতে চেয়েছেন, তার বঙ্গানুবাদ হচ্ছে :
‘৭০ অনুচ্ছেদের ব্যাখ্যায় হাইকোর্ট বিভাগ যে মর্মার্থ গ্রহণ করেছে আমরা তাতে অযৌক্তিকতা দেখি না এবং সেদিক থেকে দেখতে গেলে বলা যায়, সুপ্রিম কোর্টের বিচারকদের তাদের পদ থেকে অপসারণের ক্ষেত্রে সংসদ সদস্যগণ নিঃসন্দেহে তাদের নিজস্ব রাজনৈতিক দলের হুকুম তামিল করতে বাধ্য থাকবেন।’
অর্ধযুগ আগে কিন্তু আমরা দেখেছিলাম, সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদের বৈধতা প্রশ্নে বিভক্ত আদেশ দেন উচ্চ আদালত। মূলত রাজনৈতিক দল থেকে পদত্যাগ বা দলের বিপক্ষে ভোট দেওয়ার কারণে আসন শূন্য হওয়া সংক্রান্ত সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদের বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে ২০১৭ সালের ১৭ এপ্রিল একটি রিট আবেদন করেন আইনজীবী ইউনুছ আলী আকন্দ। এ প্রসঙ্গেই সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদ কেন সাংঘর্ষিক ও বাতিল ঘোষণা করা হবে না, তা জানতে চেয়ে রুল দেন বিচারপতি মইনুল ইসলাম চৌধুরী। অন্যদিকে বিচারপতি আশরাফুল কামাল এর সঙ্গে ভিন্নমত পোষণ করে রিট আবেদনই খারিজ করে দেন।
হালে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের প্রেক্ষাপট সামনে রেখে আবার আমরা সক্রিয় দেখছি সুপ্রিম কোর্টের সেই আইনজীবী ইউনুছ আলী আকন্দকে। যেখানে তিনি রিট করেছেন এভাবে, ‘৭০ অনুচ্ছেদকে কেন সংবিধানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক ঘোষণা করা হবে না।’ এটা ঠিক যে আদর্শ গণতন্ত্র বিবেচনায় নিলে ৭০ অনুচ্ছেদ একধরনের শেকল। কিন্তু টেমস নদীর তীর, আর বুড়িগঙ্গার তীর এক নয়, এই বাস্তবতাও মাথায় রাখা প্রয়োজন আমাদের। সরকারের ভেতরের অনিশ্চয়তা এড়াতে এমপিদের দলের প্রতি অনুগত রাখার সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতার প্রয়োজনীয়তা এখনো ফুরিয়ে যায়নি।
Thikana
M M Shahin, Chairman, Board of Editors, Thikana
Corporate Headquarter
THIKANA : 7409 37th Ave suite 403 Jackson Heights, NY 11372
Phone : 718-472-0700/2428, 718-729-6000
Fax: + 1(866) 805-8806
Bangladesh Bureau
THIKANA : 70/B, Green Road, (Panthapath), 5th Floor, Dhaka, BD.
E-Mail : [email protected]
For Advertisement : [email protected]