সত্তরের দশকে শহীদ কাদরী পত্রিকার পাতায় ধারাবাহিকভাবে সাহিত্যিক কলাম লিখতেন, লিখতেন টুকটাক নানা রকম গদ্য। সেই সব গদ্যরচনার কথা পরে তিনি কখনো উচ্চারণ করেননি। তিনি যে গদ্য লিখেছেন, সে-কথা কাউকে মনে করিয়ে দিতে চাননি। ফলে উইলিয়াম ফকনারের মতো ঔপন্যাসিকের উপন্যাস, ইউজিন ও নীলের মতো নাট্যকারের নাটক যে অনুবাদ করেছেন, সে খবর তো সাহিত্যসমাজে ছিল প্রায় অজ্ঞাতই। কারণ, কবি ছাড়া নিজেকে অন্য কোনো পরিচয়ে পরিচিত করতে চাইতেন না শহীদ কাদরী! আবার কবিত্ব নিয়েও ছিলেন খুবই বিনীত। তিনটি কবিতার বইয়ের একটি সংগ্রহ প্রকাশের অনুমোদন প্রসঙ্গে মফিদুল হককে এক চিঠিতে তিনি লিখেছিলেন, ‘মাত্র তিনখানা অপুষ্ট ক্ষীণ কলেবরের বই নিয়ে মহাকালের দ্বারে কড়া নাড়ার যে আগ্রহ আমি প্রকাশ করলাম তা আকাট মূর্খতা ছাড়া আর কিছু নয়।’ (গদ্যসংগ্রহে এই চিঠিটিও সংকলিত হয়েছে।)
উদ্ধৃত বাক্যে তাঁর এই বিনয়ের মধ্যেও কবি হিসেবেই নিজের পরিচয় সংরক্ষণ করার আকুতি প্রকাশ পায়! তাঁর মৃত্যুত্তর কালে সত্তরের দশকের স্মৃতিচারণা সূত্রে কেউ কেউ পত্রিকার পাতায় তাঁর গদ্য রচনা পড়ার স্মৃতিচারণা করলে সেগুলো ফিরে পড়ার আকুতি জন্মায় অনেকের মনে! সেই আকুতি থেকেই প্রাবন্ধিক-গবেষক ইতিহাস-বিষয়ক-লেখক ও সম্পাদক মুহিত হাসান শহীদ কাদরীর অনাবিষ্কৃত সব ধরনের রচনা খুঁজে বের করার ব্যাপারে নাছোড় উদ্যোগ নেন। তাঁর কয়েক বছরের সনিষ্ঠ অনুসন্ধানে সাফল্য আসে। শহীদ কাদরীর ‘গদ্যসংগ্রহ’ও তারই ফল। ‘গদ্যসংগ্রহে’র এই লেখাগুলোর সমগ্রটা যদি আমরা পড়ি, তাহলে একটা বিষয় খুব স্পষ্ট ধরা পড়েÑযদি এক কথায় বলি, তাঁর নিজস্ব ব্যক্তিত্বের একটা ছাপ সব লেখার মধ্যেই আছে। পত্রিকার পাতার সীমিত পরিসরে ছোট ছোট লেখা তাঁকে লিখতে হয়েছে। বোঝা যাচ্ছে, লেখার যে আয়োজন তার জন্য জায়গা কমÑকিছুদূর লিখে হয়তো মনে করছেন যে আর বেশি লম্বা করা যাবে না, শেষ করতে হবে, অর্থাৎ লেখাগুলোর সম্পূর্ণতা দেওয়ার জন্য যতটা দরকার ততটা জায়গা নেই, তাই শেষ করতে হয়েছে! কিন্তু সব জায়গাতেই তাঁর ব্যক্তিত্বের ছাপ পাওয়া যায়। আমরা যেটাকে এসে (বংংধু) বলি বা পার্সোনাল এসে বলি, যেটার একটা বাংলা নাম আছে ‘রচনাসাহিত্য’, তাঁর প্রবন্ধগুলোর যদি ঘরানা (genre) চিহ্নিত করতে চাই, তাহলে বলব সেগুলো ‘রচনাসাহিত্য’ অর্থাৎ ইংরেজিতে ‘পার্সোনাল এসে’ যেটাকে বলে কিংবা ফরাসিতে যেটাকে ‘বেল্স লেত্র্’ (belles-lettres) বলে, তাঁর গদ্য রচনায় এই গুণটা বেশি। এককথায় বলা যায়, প্রায় সব লেখার মধ্যেই তাঁর ব্যক্তিসত্তার উপস্থিতি অনুভব করা যায়।
আরেকটা দিক হচ্ছে, এই লেখাগুলোর মধ্য থেকে তাঁর একটা চৈতন্যের জীবনী পাওয়া যাবে। আগ্রহোদ্দীপক ব্যাপার হলো, সাক্ষাৎকার, তাঁর কবিতা, এই গদ্য-সংকলন-সব মিলিয়ে যদি পড়া হয় এবং তাঁর জীবনীকার আদনান সৈয়দের ‘চেনা অচেনা শহীদ কাদরী’-যেটা আমি পড়েছি-তার সঙ্গে আমার নিজের শ্রুতি-অভিজ্ঞতা যোগ করলে, এখান থেকে সময়ক্রম বের করা সম্ভব। আমার ধারণা, তাঁর চৈতন্যের একটা ধারাবাহিক জীবনী রচনা করা যাবে-হয়তো চার-পাঁচ পৃষ্ঠার মতো হবে-যেখানে একই ঘটনার নানান মাত্রা, যেগুলো তিনি বিভিন্ন সময়ে বলেছেন, সেগুলো মিলিয়ে তাঁর ভাষ্যের যে রহস্যময়তা থাকে-যেটা সরল অর্থে ঠিক নিরসন করা যায় না তিনি কোন জায়গায় অবস্থান করেন-সেটা অনেকটাই পরিষ্কার হয়ে যাবে। সব মিলিয়ে এই গদ্যগুলো পড়ে আমি বলতে পারি, এটাই সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি।
সাহিত্য অনেকে পাঠ করেন কিন্তু সাহিত্যবোধ সবার থাকে না। শহীদ কাদরীর ছিল নিজস্ব, গভীর সাহিত্যবোধ। ছোটবেলা থেকেই বিচিত্র বিষয়ে তাঁর বিস্তৃত ও গভীর পাঠ থেকে এই বোধ স্বতঃস্ফূর্তভাবে গড়ে উঠেছে। ইংরেজি ভাষার মাধ্যমে তাঁর কিছুটা দূরবর্তী পূর্বসূরিদের কাছ থেকে পাওয়া অভিজ্ঞতা, আর নিকট পূর্বসূরি-তিরিশোত্তর কালের বাঙালি সাহিত্যধারা, বিশেষ করে বুদ্ধদেব বসুর নেতৃত্বে যে ধারা বিকশিত হয়েছে-সেই ধারার উপকরণগুলোকে তিনি নিজের বোধের জন্য গ্রহণীয় বলে বিবেচনা করেছেন। এর সমান্তরালে তখন তাঁর চারপাশে বাম রাজনীতির উত্থান ঘটছিল, সেটাকেও তিনি বাদ দিতে পারছিলেন না। মানে তাঁর সাহিত্যবোধের মধ্যে বাম রাজনীতির মানবিক মূল্যবোধও অন্তর্ভুক্ত ছিল। কিন্তু তিনি আবার মতাদর্শিক মূল্যবোধের দাস হতে চাননি। সবচেয়ে বড় দিক-যেটা কিছু প্রবন্ধে স্পষ্ট করেই বলা আছেÑকবি কোনো রাজনীতি বা মতাদর্শের দাস হবে না। বামপন্থী চিন্তার যে মূল বিষয়-বৈষম্য, মানুষের বেদনা, ঔপনিবেশিক অত্যাচারের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর মানসিক প্রস্তুতি-এই মনও তিনি অর্জন করেছিলেন এবং এই দৃষ্টিভঙ্গি তাঁর পাঠ-অভিজ্ঞতার মধ্যেও স্পষ্টভাবে উপস্থিত। অর্থাৎ তাঁর সাহিত্যবোধ ছিল একদিকে ক্লাসিক্যাল মানদণ্ডে প্রতিষ্ঠিত, অন্যদিকে আধুনিকতার সূক্ষ্ম জীবনবোধে সমৃদ্ধ এবং একই সঙ্গে মানবিক-রাজনৈতিক সংবেদনশীলতায় উজ্জ্বল।
আরেকটা ব্যাপার হচ্ছে, যেমন বাংলা সাহিত্য সম্পর্কে তাঁর একটা মমতার জায়গা আছে। তিনি বাংলা সাহিত্যকে বিশ্বসাহিত্যের পরিপ্রেক্ষিতেই দেখতে চান। কিন্তু অন্যরা যেরকমভাবে নির্বোধের মতন বলে, তিনি যে সেরকমভাবে দেখতে চান না, সে পরিচয় তাঁর এই লেখাগুলোর মধ্যে আছে। অনুবাদ প্রসঙ্গে যে লেখা, তাতে উনি বলেছেন, বাংলা কবিতা যে বৈশ্বিক কবিতার সঙ্গে সংস্পর্শ পেতে পারেনি, তার একটা বড় কারণ, বাংলা ভাষায় যে জীবনবোধ রয়েছে, তার মধ্য দিয়ে বিদেশি সাহিত্যের অনুবাদ করা হয়নি। অর্থাৎ বিদেশি সাহিত্যকে, বিশেষ করে কবিতার কথা উনি বলেছেন, বিদেশি কবিতাকে বাংলার জীবনবোধ দিয়ে দেখার যে অনুশীলন, সেটা অনুবাদের মাধ্যমে হওয়া সম্ভব ছিল, তা যথেষ্টভাবে হয়নি। এই অভাববোধ কিছুটা তাঁর নিজেরও মনে ছিল, যে কারণে তিনি অনুবাদে কিছুটা গুরুত্ব দিয়ে দেখাতে চেয়েছিলেন। মানে একটা সময় দেখা গেছে, যদিও তাঁর যে বইয়েরÑযেমন ইউজিন ও নীলের ‘অল গডস চিলড্রেন গট উইংস’ নাটকের অনুবাদ ‘অমৃতের সন্তান’ কিংবা ‘দি ওল্ড ম্যান’ বইয়ের যে অনুবাদেরর নামকরণ করেছেন ‘আবর্ত’-এগুলো ছিল আসলে তাঁর অর্থ উপার্জন সংক্রান্ত কাজ। মানে এগুলো দিয়ে উনি টাকা আয় করতেন। কারণ তখনকার দিনে আমেরিকা ফ্র্যাঙ্কলিন বুক প্রোগ্রামস নামে যে কর্মসূচি নিয়েছিল, তার একটা ব্যাপারটা ছিল, যেহেতু রুশ বা সোভিয়েতরা বইয়ের মধ্য দিয়ে তাদের হেজেমোনি তৈরি করার চেষ্টা করছিল, তার একটা কাউন্টার এসব দেশে-যেসব দেশে সোভিয়েত ধরনের প্রভাব বেশি পড়তে যাচ্ছে, বৌদ্ধিক মানুষদের ওপর দুভাবে তারা হেজেমোনি করতে চেয়েছিল। একটা হচ্ছে তাদেরকে অর্থ পাইয়ে দেওয়া, নানা রকম অনুবাদ কাজের মাধ্যমে-এ জন্য বলা হতো যে যারা আমেরিকান বইয়ের অনুবাদ করে তারা হচ্ছে সিআইএর দালাল। এটা কিন্তু একটা স্রোতোধারা ছিল। কিন্তু শহীদ কাদরী নিছকই অর্থোপার্জনের জন্য অনুবাদ করলেও নিজের সৃজনশীলতার সঙ্গে প্রতারণা করেননি। অনূদিত বইয়ের নামকরণের মধ্যেই তার পরিচয় পাওয়া যাচ্ছে। আমেরিকা-বিরোধী আরেকটা ফল্গুধারা ছিল আমাদের সমাজের মধ্যে। সম্ভবত সে কারণেও এই কাজগুলোকে তাঁর সাহিত্যিক অনুশীলন হিসেবে দেখতে চাইতেন না। কারণ মতাদর্শিক বদ্ধতা থেকে মুক্ত থাকলেও তাঁর সামগ্রিক দৃষ্টিভঙ্গির দিক থেকে তিনি ছিলেন বাম অনুকূল।
এই যে তিনি অনুবাদ সম্মানীর টাকাটা নিচ্ছেন-সে টাকাটা যে তাঁকে কোনো হেজেমোনির অংশ করে ফেলবে না, মানে তিনি তা হবেন না-এই সচেতনতা তাঁর খুব স্পষ্ট ছিল। একইভাবে বামপন্থী মতাদর্শেরও যে দাস হওয়া যাবে না একজন কবি বা শিল্পী হিসেবে, সেটা নিয়েও তাঁর সচেতনতা ছিল টনটনে। শহীদ কাদরীর কলাকৈবল্যবাদের প্রতি যে পক্ষপাতের কথা বলা হয়, আর আধুনিকতার প্রতি তাঁর যে পক্ষপাত ছিল, সেটা আসলে অনেকটাই মতাদর্শ থেকে নিজেকে মুক্ত রাখার প্রবণতা থেকেই এসেছে। মানুষের প্রতি মানবিক বোধ, মমতা-এই জিনিসগুলোকে তিনি সাহিত্য বিচারের চিরন্তন মানদণ্ডগুলোর সঙ্গে মিলিয়ে দেখতেন; মানে যেগুলো ক্লাসিক্যাল মানদণ্ড, সেগুলোর সঙ্গে পৃথিবীতে নতুন যে সূক্ষ্ম জীবনবোধ যোগ হচ্ছে-বিশেষ করে বিজ্ঞানের মধ্য দিয়ে-সেগুলোকেও তিনি গুরুত্ব দিতেন। একটা প্রবন্ধে তিনি স্পষ্টই বলেছেন, বিজ্ঞানের মধ্য দিয়ে যে নির্মোহ জীবনদৃষ্টি তৈরি হচ্ছে-হতাশা, অপ্রাপ্তির বেদনা, অস্তিত্বের ক্ষত-এইগুলো তাঁদের কবিতার বিষয় হয়ে উঠতে শুরু করেছে। এই অনুভবটা শহীদ কাদরীর মধ্যে এসেছে শুধু তাঁর ব্যক্তিগত চোখ দিয়ে নয়; বরং ওই সময়ের সামগ্রিক অভিজ্ঞতা, ওই সময়ের মানসিক ও জ্ঞানগত পরিবর্তনের জায়গা থেকেই এসেছে। আমি এককভাবে শহীদ কাদরীর চোখ দিয়ে দেখতে চাইছি না; বরং ওই সময়ের একটা বৈশিষ্ট্য হিসেবেই বিষয়টাকে দেখতে পাচ্ছি।
শহীদ কাদরীর মধ্যে একটা উন্নাসিকতা ছিল কিন্তু সেটা অহংকারের উন্নাসিকতা নয়, বরং তাঁর নন্দনবোধ থেকে জন্ম নেওয়া উন্নাসিকতা। তিনি যেভাবে পৃথিবীকে দেখতে চাইতেন, তার বাইরে যে জিনিসগুলো পড়ত, সেগুলোকে তিনি একটু উন্নাসিক চোখেই দেখতেন। আরেকটা বড় দিক হচ্ছে তাঁর উইট-অত্যন্ত সূক্ষ্ম, প্রায় ধারালো ছুরির মতো। যাদের সাধারণ সাহিত্যবোধ নেই, তারা তাঁর সেই উইট ধরতেই পারবে না। তিনি কখনো সাংঘাতিক প্রশংসা করতেন, আর সেই প্রশংসাটাই আসলে তীক্ষ সমালোচনা। যাদের অন্তর্দৃষ্টি নেই, তারা সেটা বুঝবে না-প্রশংসা ভেবে বসে থাকবে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো তাঁর বিকাশমানতা-সাহিত্য-দর্শন, বিশ্বদৃষ্টি, আধুনিকতার সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক। ব্রিটিশ কাউন্সিল, আমেরিকান সেন্টার-এই সব জায়গায় তাঁর পড়াশোনা তাঁকে শুধু আমেরিকান জ্ঞানভুবনের সঙ্গে পরিচয় করায়নি, বরং সেই সূত্রে তিনি বিশ্বকে দেখার একটা দৃষ্টিও অর্জন করেছিলেন। হয়তো তাঁর বিশ্বদৃষ্টি অনেকটাই এই আমেরিকান জ্ঞান-উৎস থেকেই গড়ে উঠেছিল। তবে মতাদর্শের ব্যাপারে তাঁর নিজের একটা বোধ ছিল-এটাই তাঁকে মার্কিন হেজেমোনি বা সোভিয়েত-বাম হেজেমোনির দাস হয়ে পড়তে দেয়নি। হেজেমোনি থেকে তিনি সম্পূর্ণ মুক্ত ছিলেন, এটা আমি বলব না; কিন্তু তাঁর মধ্যে একটা দ্বন্দ্ব ছিল। আর সেই দ্বন্দ্বটাই তাঁর আধুনিকতার পরিচায়ক। তিনি হেজেমোনির টান অনুভব করতেন, আবার তার বিরুদ্ধে নিজের স্বাধীন বোধও বজায় রাখতেন। তাঁর গদ্য সংগ্রহ পড়লে এই সমগ্র মানুষটাকে দেখা যায়-দ্বন্দ্বময়, আধুনিক, নির্মোহ, নৈরাশ্যবাদী, মুক্ত, বিজ্ঞানবোধসম্পন্ন এক লেখক তিনি। এই জটিলতা, এই দ্বন্দ্ব, এই নির্মোহতা-সব মিলিয়ে শহীদ কাদরীর পরিচয়টা স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
সংকলনের সম্পাদনা নিয়ে দুয়েক কথা না বলা অন্যায় হবে। রচনাগুলো কালানুক্রমিকভাবে সাজানো হয়েছে! সেসবের উৎসই কেবল নির্দেশ করা হয়নি, একাধিক পাঠ থাকলে তা থেকে যৌক্তিক পাঠও নির্দেশ করা হয়েছে। রচনাগুলো যে ব্যক্তিসূত্রে পাওয়া উল্লিখিত হয়েছে তাঁদের সকলের নামও। বাংলাদেশে এই নিষ্ঠা বিরল, যা সম্পাদনা করতে গিয়ে মুহিত হাসান দেখিয়েছেন। সম্পাদকীয়তে রচনা সংগ্রহ, পাঠ প্রামাণ্যকরণ-সংক্রান্ত জিজ্ঞাসার অবতারণা ও উত্তর সন্ধান করা হয়েছে। মোটকথা এ ধরনের একটি সংকলন সম্পাদনার জন্য যতটা সম্ভব সম্পাদকীয় যত্ন করা হয়েছে মুহিত হাসানের পক্ষ থেকে। শহীদ কাদরীর সমস্ত রচনার সম্পাদনা করতে গিয়ে তাঁর অনুপুঙ্খ শ্রম ও মেধায় শহীদ কাদরী আগের চেয়ে অনেক বেশি প্রামাণ্য ও ভাস্বর হয়ে উঠেছেন!
উদ্ধৃত বাক্যে তাঁর এই বিনয়ের মধ্যেও কবি হিসেবেই নিজের পরিচয় সংরক্ষণ করার আকুতি প্রকাশ পায়! তাঁর মৃত্যুত্তর কালে সত্তরের দশকের স্মৃতিচারণা সূত্রে কেউ কেউ পত্রিকার পাতায় তাঁর গদ্য রচনা পড়ার স্মৃতিচারণা করলে সেগুলো ফিরে পড়ার আকুতি জন্মায় অনেকের মনে! সেই আকুতি থেকেই প্রাবন্ধিক-গবেষক ইতিহাস-বিষয়ক-লেখক ও সম্পাদক মুহিত হাসান শহীদ কাদরীর অনাবিষ্কৃত সব ধরনের রচনা খুঁজে বের করার ব্যাপারে নাছোড় উদ্যোগ নেন। তাঁর কয়েক বছরের সনিষ্ঠ অনুসন্ধানে সাফল্য আসে। শহীদ কাদরীর ‘গদ্যসংগ্রহ’ও তারই ফল। ‘গদ্যসংগ্রহে’র এই লেখাগুলোর সমগ্রটা যদি আমরা পড়ি, তাহলে একটা বিষয় খুব স্পষ্ট ধরা পড়েÑযদি এক কথায় বলি, তাঁর নিজস্ব ব্যক্তিত্বের একটা ছাপ সব লেখার মধ্যেই আছে। পত্রিকার পাতার সীমিত পরিসরে ছোট ছোট লেখা তাঁকে লিখতে হয়েছে। বোঝা যাচ্ছে, লেখার যে আয়োজন তার জন্য জায়গা কমÑকিছুদূর লিখে হয়তো মনে করছেন যে আর বেশি লম্বা করা যাবে না, শেষ করতে হবে, অর্থাৎ লেখাগুলোর সম্পূর্ণতা দেওয়ার জন্য যতটা দরকার ততটা জায়গা নেই, তাই শেষ করতে হয়েছে! কিন্তু সব জায়গাতেই তাঁর ব্যক্তিত্বের ছাপ পাওয়া যায়। আমরা যেটাকে এসে (বংংধু) বলি বা পার্সোনাল এসে বলি, যেটার একটা বাংলা নাম আছে ‘রচনাসাহিত্য’, তাঁর প্রবন্ধগুলোর যদি ঘরানা (genre) চিহ্নিত করতে চাই, তাহলে বলব সেগুলো ‘রচনাসাহিত্য’ অর্থাৎ ইংরেজিতে ‘পার্সোনাল এসে’ যেটাকে বলে কিংবা ফরাসিতে যেটাকে ‘বেল্স লেত্র্’ (belles-lettres) বলে, তাঁর গদ্য রচনায় এই গুণটা বেশি। এককথায় বলা যায়, প্রায় সব লেখার মধ্যেই তাঁর ব্যক্তিসত্তার উপস্থিতি অনুভব করা যায়।
আরেকটা দিক হচ্ছে, এই লেখাগুলোর মধ্য থেকে তাঁর একটা চৈতন্যের জীবনী পাওয়া যাবে। আগ্রহোদ্দীপক ব্যাপার হলো, সাক্ষাৎকার, তাঁর কবিতা, এই গদ্য-সংকলন-সব মিলিয়ে যদি পড়া হয় এবং তাঁর জীবনীকার আদনান সৈয়দের ‘চেনা অচেনা শহীদ কাদরী’-যেটা আমি পড়েছি-তার সঙ্গে আমার নিজের শ্রুতি-অভিজ্ঞতা যোগ করলে, এখান থেকে সময়ক্রম বের করা সম্ভব। আমার ধারণা, তাঁর চৈতন্যের একটা ধারাবাহিক জীবনী রচনা করা যাবে-হয়তো চার-পাঁচ পৃষ্ঠার মতো হবে-যেখানে একই ঘটনার নানান মাত্রা, যেগুলো তিনি বিভিন্ন সময়ে বলেছেন, সেগুলো মিলিয়ে তাঁর ভাষ্যের যে রহস্যময়তা থাকে-যেটা সরল অর্থে ঠিক নিরসন করা যায় না তিনি কোন জায়গায় অবস্থান করেন-সেটা অনেকটাই পরিষ্কার হয়ে যাবে। সব মিলিয়ে এই গদ্যগুলো পড়ে আমি বলতে পারি, এটাই সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি।
সাহিত্য অনেকে পাঠ করেন কিন্তু সাহিত্যবোধ সবার থাকে না। শহীদ কাদরীর ছিল নিজস্ব, গভীর সাহিত্যবোধ। ছোটবেলা থেকেই বিচিত্র বিষয়ে তাঁর বিস্তৃত ও গভীর পাঠ থেকে এই বোধ স্বতঃস্ফূর্তভাবে গড়ে উঠেছে। ইংরেজি ভাষার মাধ্যমে তাঁর কিছুটা দূরবর্তী পূর্বসূরিদের কাছ থেকে পাওয়া অভিজ্ঞতা, আর নিকট পূর্বসূরি-তিরিশোত্তর কালের বাঙালি সাহিত্যধারা, বিশেষ করে বুদ্ধদেব বসুর নেতৃত্বে যে ধারা বিকশিত হয়েছে-সেই ধারার উপকরণগুলোকে তিনি নিজের বোধের জন্য গ্রহণীয় বলে বিবেচনা করেছেন। এর সমান্তরালে তখন তাঁর চারপাশে বাম রাজনীতির উত্থান ঘটছিল, সেটাকেও তিনি বাদ দিতে পারছিলেন না। মানে তাঁর সাহিত্যবোধের মধ্যে বাম রাজনীতির মানবিক মূল্যবোধও অন্তর্ভুক্ত ছিল। কিন্তু তিনি আবার মতাদর্শিক মূল্যবোধের দাস হতে চাননি। সবচেয়ে বড় দিক-যেটা কিছু প্রবন্ধে স্পষ্ট করেই বলা আছেÑকবি কোনো রাজনীতি বা মতাদর্শের দাস হবে না। বামপন্থী চিন্তার যে মূল বিষয়-বৈষম্য, মানুষের বেদনা, ঔপনিবেশিক অত্যাচারের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর মানসিক প্রস্তুতি-এই মনও তিনি অর্জন করেছিলেন এবং এই দৃষ্টিভঙ্গি তাঁর পাঠ-অভিজ্ঞতার মধ্যেও স্পষ্টভাবে উপস্থিত। অর্থাৎ তাঁর সাহিত্যবোধ ছিল একদিকে ক্লাসিক্যাল মানদণ্ডে প্রতিষ্ঠিত, অন্যদিকে আধুনিকতার সূক্ষ্ম জীবনবোধে সমৃদ্ধ এবং একই সঙ্গে মানবিক-রাজনৈতিক সংবেদনশীলতায় উজ্জ্বল।
আরেকটা ব্যাপার হচ্ছে, যেমন বাংলা সাহিত্য সম্পর্কে তাঁর একটা মমতার জায়গা আছে। তিনি বাংলা সাহিত্যকে বিশ্বসাহিত্যের পরিপ্রেক্ষিতেই দেখতে চান। কিন্তু অন্যরা যেরকমভাবে নির্বোধের মতন বলে, তিনি যে সেরকমভাবে দেখতে চান না, সে পরিচয় তাঁর এই লেখাগুলোর মধ্যে আছে। অনুবাদ প্রসঙ্গে যে লেখা, তাতে উনি বলেছেন, বাংলা কবিতা যে বৈশ্বিক কবিতার সঙ্গে সংস্পর্শ পেতে পারেনি, তার একটা বড় কারণ, বাংলা ভাষায় যে জীবনবোধ রয়েছে, তার মধ্য দিয়ে বিদেশি সাহিত্যের অনুবাদ করা হয়নি। অর্থাৎ বিদেশি সাহিত্যকে, বিশেষ করে কবিতার কথা উনি বলেছেন, বিদেশি কবিতাকে বাংলার জীবনবোধ দিয়ে দেখার যে অনুশীলন, সেটা অনুবাদের মাধ্যমে হওয়া সম্ভব ছিল, তা যথেষ্টভাবে হয়নি। এই অভাববোধ কিছুটা তাঁর নিজেরও মনে ছিল, যে কারণে তিনি অনুবাদে কিছুটা গুরুত্ব দিয়ে দেখাতে চেয়েছিলেন। মানে একটা সময় দেখা গেছে, যদিও তাঁর যে বইয়েরÑযেমন ইউজিন ও নীলের ‘অল গডস চিলড্রেন গট উইংস’ নাটকের অনুবাদ ‘অমৃতের সন্তান’ কিংবা ‘দি ওল্ড ম্যান’ বইয়ের যে অনুবাদেরর নামকরণ করেছেন ‘আবর্ত’-এগুলো ছিল আসলে তাঁর অর্থ উপার্জন সংক্রান্ত কাজ। মানে এগুলো দিয়ে উনি টাকা আয় করতেন। কারণ তখনকার দিনে আমেরিকা ফ্র্যাঙ্কলিন বুক প্রোগ্রামস নামে যে কর্মসূচি নিয়েছিল, তার একটা ব্যাপারটা ছিল, যেহেতু রুশ বা সোভিয়েতরা বইয়ের মধ্য দিয়ে তাদের হেজেমোনি তৈরি করার চেষ্টা করছিল, তার একটা কাউন্টার এসব দেশে-যেসব দেশে সোভিয়েত ধরনের প্রভাব বেশি পড়তে যাচ্ছে, বৌদ্ধিক মানুষদের ওপর দুভাবে তারা হেজেমোনি করতে চেয়েছিল। একটা হচ্ছে তাদেরকে অর্থ পাইয়ে দেওয়া, নানা রকম অনুবাদ কাজের মাধ্যমে-এ জন্য বলা হতো যে যারা আমেরিকান বইয়ের অনুবাদ করে তারা হচ্ছে সিআইএর দালাল। এটা কিন্তু একটা স্রোতোধারা ছিল। কিন্তু শহীদ কাদরী নিছকই অর্থোপার্জনের জন্য অনুবাদ করলেও নিজের সৃজনশীলতার সঙ্গে প্রতারণা করেননি। অনূদিত বইয়ের নামকরণের মধ্যেই তার পরিচয় পাওয়া যাচ্ছে। আমেরিকা-বিরোধী আরেকটা ফল্গুধারা ছিল আমাদের সমাজের মধ্যে। সম্ভবত সে কারণেও এই কাজগুলোকে তাঁর সাহিত্যিক অনুশীলন হিসেবে দেখতে চাইতেন না। কারণ মতাদর্শিক বদ্ধতা থেকে মুক্ত থাকলেও তাঁর সামগ্রিক দৃষ্টিভঙ্গির দিক থেকে তিনি ছিলেন বাম অনুকূল।
এই যে তিনি অনুবাদ সম্মানীর টাকাটা নিচ্ছেন-সে টাকাটা যে তাঁকে কোনো হেজেমোনির অংশ করে ফেলবে না, মানে তিনি তা হবেন না-এই সচেতনতা তাঁর খুব স্পষ্ট ছিল। একইভাবে বামপন্থী মতাদর্শেরও যে দাস হওয়া যাবে না একজন কবি বা শিল্পী হিসেবে, সেটা নিয়েও তাঁর সচেতনতা ছিল টনটনে। শহীদ কাদরীর কলাকৈবল্যবাদের প্রতি যে পক্ষপাতের কথা বলা হয়, আর আধুনিকতার প্রতি তাঁর যে পক্ষপাত ছিল, সেটা আসলে অনেকটাই মতাদর্শ থেকে নিজেকে মুক্ত রাখার প্রবণতা থেকেই এসেছে। মানুষের প্রতি মানবিক বোধ, মমতা-এই জিনিসগুলোকে তিনি সাহিত্য বিচারের চিরন্তন মানদণ্ডগুলোর সঙ্গে মিলিয়ে দেখতেন; মানে যেগুলো ক্লাসিক্যাল মানদণ্ড, সেগুলোর সঙ্গে পৃথিবীতে নতুন যে সূক্ষ্ম জীবনবোধ যোগ হচ্ছে-বিশেষ করে বিজ্ঞানের মধ্য দিয়ে-সেগুলোকেও তিনি গুরুত্ব দিতেন। একটা প্রবন্ধে তিনি স্পষ্টই বলেছেন, বিজ্ঞানের মধ্য দিয়ে যে নির্মোহ জীবনদৃষ্টি তৈরি হচ্ছে-হতাশা, অপ্রাপ্তির বেদনা, অস্তিত্বের ক্ষত-এইগুলো তাঁদের কবিতার বিষয় হয়ে উঠতে শুরু করেছে। এই অনুভবটা শহীদ কাদরীর মধ্যে এসেছে শুধু তাঁর ব্যক্তিগত চোখ দিয়ে নয়; বরং ওই সময়ের সামগ্রিক অভিজ্ঞতা, ওই সময়ের মানসিক ও জ্ঞানগত পরিবর্তনের জায়গা থেকেই এসেছে। আমি এককভাবে শহীদ কাদরীর চোখ দিয়ে দেখতে চাইছি না; বরং ওই সময়ের একটা বৈশিষ্ট্য হিসেবেই বিষয়টাকে দেখতে পাচ্ছি।
শহীদ কাদরীর মধ্যে একটা উন্নাসিকতা ছিল কিন্তু সেটা অহংকারের উন্নাসিকতা নয়, বরং তাঁর নন্দনবোধ থেকে জন্ম নেওয়া উন্নাসিকতা। তিনি যেভাবে পৃথিবীকে দেখতে চাইতেন, তার বাইরে যে জিনিসগুলো পড়ত, সেগুলোকে তিনি একটু উন্নাসিক চোখেই দেখতেন। আরেকটা বড় দিক হচ্ছে তাঁর উইট-অত্যন্ত সূক্ষ্ম, প্রায় ধারালো ছুরির মতো। যাদের সাধারণ সাহিত্যবোধ নেই, তারা তাঁর সেই উইট ধরতেই পারবে না। তিনি কখনো সাংঘাতিক প্রশংসা করতেন, আর সেই প্রশংসাটাই আসলে তীক্ষ সমালোচনা। যাদের অন্তর্দৃষ্টি নেই, তারা সেটা বুঝবে না-প্রশংসা ভেবে বসে থাকবে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো তাঁর বিকাশমানতা-সাহিত্য-দর্শন, বিশ্বদৃষ্টি, আধুনিকতার সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক। ব্রিটিশ কাউন্সিল, আমেরিকান সেন্টার-এই সব জায়গায় তাঁর পড়াশোনা তাঁকে শুধু আমেরিকান জ্ঞানভুবনের সঙ্গে পরিচয় করায়নি, বরং সেই সূত্রে তিনি বিশ্বকে দেখার একটা দৃষ্টিও অর্জন করেছিলেন। হয়তো তাঁর বিশ্বদৃষ্টি অনেকটাই এই আমেরিকান জ্ঞান-উৎস থেকেই গড়ে উঠেছিল। তবে মতাদর্শের ব্যাপারে তাঁর নিজের একটা বোধ ছিল-এটাই তাঁকে মার্কিন হেজেমোনি বা সোভিয়েত-বাম হেজেমোনির দাস হয়ে পড়তে দেয়নি। হেজেমোনি থেকে তিনি সম্পূর্ণ মুক্ত ছিলেন, এটা আমি বলব না; কিন্তু তাঁর মধ্যে একটা দ্বন্দ্ব ছিল। আর সেই দ্বন্দ্বটাই তাঁর আধুনিকতার পরিচায়ক। তিনি হেজেমোনির টান অনুভব করতেন, আবার তার বিরুদ্ধে নিজের স্বাধীন বোধও বজায় রাখতেন। তাঁর গদ্য সংগ্রহ পড়লে এই সমগ্র মানুষটাকে দেখা যায়-দ্বন্দ্বময়, আধুনিক, নির্মোহ, নৈরাশ্যবাদী, মুক্ত, বিজ্ঞানবোধসম্পন্ন এক লেখক তিনি। এই জটিলতা, এই দ্বন্দ্ব, এই নির্মোহতা-সব মিলিয়ে শহীদ কাদরীর পরিচয়টা স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
সংকলনের সম্পাদনা নিয়ে দুয়েক কথা না বলা অন্যায় হবে। রচনাগুলো কালানুক্রমিকভাবে সাজানো হয়েছে! সেসবের উৎসই কেবল নির্দেশ করা হয়নি, একাধিক পাঠ থাকলে তা থেকে যৌক্তিক পাঠও নির্দেশ করা হয়েছে। রচনাগুলো যে ব্যক্তিসূত্রে পাওয়া উল্লিখিত হয়েছে তাঁদের সকলের নামও। বাংলাদেশে এই নিষ্ঠা বিরল, যা সম্পাদনা করতে গিয়ে মুহিত হাসান দেখিয়েছেন। সম্পাদকীয়তে রচনা সংগ্রহ, পাঠ প্রামাণ্যকরণ-সংক্রান্ত জিজ্ঞাসার অবতারণা ও উত্তর সন্ধান করা হয়েছে। মোটকথা এ ধরনের একটি সংকলন সম্পাদনার জন্য যতটা সম্ভব সম্পাদকীয় যত্ন করা হয়েছে মুহিত হাসানের পক্ষ থেকে। শহীদ কাদরীর সমস্ত রচনার সম্পাদনা করতে গিয়ে তাঁর অনুপুঙ্খ শ্রম ও মেধায় শহীদ কাদরী আগের চেয়ে অনেক বেশি প্রামাণ্য ও ভাস্বর হয়ে উঠেছেন!