শহীদ কাদরী ও তাঁর দুর্লভ সাক্ষাৎকার

প্রকাশ : ২৭ অগাস্ট ২০২৬, ১০:৫১ , অনলাইন ভার্সন
আধুনিক বাংলা কবিতার স্বরূপ বিনির্মাণ ও স্বতন্ত্র ধারার অন্যতম কবি শহীদ কাদরী (১৯৪২-২০১৬) পঞ্চাশের দশকের শক্তিমান কবি। সাতচল্লিশোত্তর কাব‍্যধারায় শহীদ কাদরী ছিলেন আধুনিক মনন ও জীবনবোধের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে আধুনিক কবিতার বৈশিষ্ট‍্যকে বদলে দেওয়ার অন্যতম কারিগর।

তাঁর কবিতায় নাগরিক জীবন ও প্রেমভাবনা, প্রকৃতিচেতনা, সমাজ ও সমকাল-মনস্কতা ছাড়াও কোনো কোনো বিষয়ে হতাশা, ক্লান্তি, নৈরাশ্য, বিষাদ, বিচ্ছিন্নতা ও নিঃসঙ্গতার প্রকাশ ঘটেছে।

দীর্ঘ তিন দশকের অধিক সময় (৩৫ বছর) স্বদেশ থেকে বহুদূরে অবস্থান করেও তিনি সাহিত্যের ভুবনে সরব ও প্রাসঙ্গিক ছিলেন। ব্যক্তিজীবনের সমস্যা-সংকট এবং সমকালীন যুগ-জীবনের জটিলতায় তিনি বিচ্ছিন্নতা ও নৈঃসঙ্গ্যবোধে আক্রান্ত হয়েছিলেন। কিডনিজনিত রোগ বহন করে, নিয়মিত ডায়ালাইসিস তাঁর পিছু ছাড়েনি। কিন্তু দৈহিক বৈকল্যের মধ্যেও কবিতার বিষয় এবং সাহিত্যের সঙ্গে তাঁর নিবিড় সম্পর্ক সুদৃঢ় ছিল।

এবার সাক্ষাৎকার প্রসঙ্গে আসা যাক। যেকোনো প্রশ্নের জবাব দিতে শহীদ কাদরী প্রস্তুত থাকলেও তাঁর সান্নিধ্য পাওয়া ছিল কঠিন ব্যাপার। অনেকে চেষ্টা করেও তাঁর সাক্ষাৎকার নিতে পারেননি। এ ক্ষেত্রে কবিপত্নী ‘নীরা কাদরী’র প্রচেষ্টায় সকল নীরবতা ভেঙে শহীদ কাদরী আবারও সচেষ্ট হয়ে ওঠেন।

উত্তর আধুনিক কবিতার রূপকল্প এবং কাব্যচর্চার জীবনবোধের ওপর শহীদ কাদরীর রয়েছে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা। সংগত কারণেই শিল্প-সাহিত্যে কবির ভাবনার গভীরতা এবং সর্বোপরি মননশীলতা সাহিত্য সৃষ্টির ক্ষেত্রে বাংলা কবিতার গতি-প্রকৃতি ও বিশ্বসাহিত্য নিয়ে বিশদ আলোচনা অপরিহার্য। শহীদ কাদরী বিভিন্ন সময় তাঁর মতামত, বক্তব্য ও সাক্ষাৎকার প্রদান করেছেন।

কালের পরিক্রমায় আধুনিক কবিতার দর্শন নতুনত্বের মিশ্রণে আকীর্ণ, দুর্লভ সেসব সাক্ষাৎকার নিয়ে ‘সাক্ষাৎকার গ্রহণ’ নামে একটি সমৃদ্ধ সংকলন-গ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছে। ২০২৪ সালের ডিসেম্বর মাসে প্রকাশিত গ্রন্থটি প্রকাশ করেছে ঢাকার ‘কবি প্রকাশনী’। সব‍্যসাচী হাজরার প্রচ্ছদে সৌকর্যময় গ্রন্থটির সম্পাদনা করেছেন লেখক ও গবেষক ‘মুহিত হাসান’।

আমরা জানি, কবি, সাহিত্যিক ও বুদ্ধিজীবীর সৃজনশীলতা, কবিতা ও সাহিত্যের ওপর সাক্ষাৎকার (Interview) কেবল কথোপকথন নয়, এটি মুক্তবুদ্ধিসম্পন্ন সাহিত্যচর্চা ও শিল্প-সংস্কৃতির বিকাশ সাধনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। কোনো লেখক, কবি অথবা সাহিত্যিকের মনস্তত্ত্ব ও তার সৃষ্টিশীল কর্মকাণ্ডের নেপথ্যের গল্প সম্পর্কে জানার কৌতূহল থাকে। সেই সব কৌতূহলের উন্মোচিত উপাদান নিয়ে আলোচনা ও সাক্ষাৎকারসমূহ পরবর্তীতে ইতিহাসের অংশ হয়ে দাঁড়ায়।

শহীদ কাদরীর বেলায়ও তা-ই ঘটেছে। এসব সাক্ষাৎকারের মাধ্যমে কবিতা ও শিল্প-সাহিত্যের বিষয়ে দুর্লভ ও দুষ্প্রাপ‍্য তথ‍্য-উপমার অবতারণা ঘটানো হয়েছে। তিনি তাঁর সাহিত্যভাবনা, জীবনদর্শন ও সৃজনশীল ভাবনার কথা নানাজনকে দেওয়া সাক্ষাৎকারের মাধ্যমে তুলে ধরেন। এসব সাক্ষাৎকার নিয়ে উল্লিখিত গ্রন্থটিতে শহীদ কাদরীকে আরও স্পষ্ট ও বিশদভাবে জানার সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে। এখানে সবচেয়ে পুরোনো সাক্ষাৎকারটি নেওয়া হয়েছিল ১৯৭৪ সালে। আর সর্বশেষ সাক্ষাৎকারটি ছিল ২০১৪ সালের। চল্লিশ বছরের দীর্ঘ কথা-পরিক্রমায় শিল্প-সাহিত্যের অনেক অজানা বিষয় বিস্তারিতভাবে উঠে এসেছে। এই দুর্লভ গ্রন্থটির প্রকাশের ক্ষেত্রেও কবিপত্নী ‘নীরা কাদরী’র ভূমিকা রয়েছে।

একইভাবে নিউইয়র্কে দীর্ঘদিন অবস্থানকালীন ‘একটি কবিতা সন্ধ্যা’ মাসিক অনুষ্ঠান পরিচালনা এবং ‘শহীদ কাদরী’র সাক্ষাৎকার গ্রহণের ক্ষেত্রেও ‘নীরা কাদরী’ মুখ্য ভূমিকা রেখেছেন। কবি শহীদ কাদরীর সাহিত্যকর্মকে অবিস্মরণীয় করে রাখার লক্ষ্যে কবিপত্নীর এ ধরনের উদ্যোগ প্রশংসনীয় এবং অভিনন্দনযোগ‍্য। উল্লিখিত সংকলন-গ্রন্থের সম্পাদক ‘মুহিত হাসান’ নিজেও স্বীকার করেছেন, ‘শহীদ কাদরীর সাক্ষাৎকার সংগ্রহের প্রকাশ-প্রতিক্রিয়ায় ওতপ্রোতভাবে যুক্ত ছিলেন তাঁর সহধর্মিণী ‘নীরা কাদরী’। সুদূর নিউইয়র্ক থেকে তিনি সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিয়েছেন, প্রতিনিয়ত কাজের অগ্রগতি সম্পর্কে খোঁজখবর নিয়েছেন, আমাদের নানান প্রশ্নের চটজলদি জবাবও দিয়েছেন।’

যা-ই হোক, গ্রন্থটিতে যাদের সাক্ষাৎকার নেওয়া হয়েছে, তাঁদের মধ্যে অর্থনীতিবিদ সাহিত্যিক ও গবেষক ড. বিনায়ক সেন এবং কথাসাহিত্যিক ড. জে‍্যাতিপ্রকাশ দত্তের সাক্ষাৎকার নিয়ে আজকের আলোকপাত 
করব।
‘বিনায়ক সেন’  কর্তৃক গ্রহণকৃত 
সাক্ষাৎকারে শিল্প-সাহিত্যের 
বিষয়গুলোতে বাংলার পাশাপাশি ইংরেজিতে অনেক কোটেশন ও উদ্ধৃতি যোগ হয়েছে। এখানেও কবির প্রখর মেধা ও মননশীলতার পরিচয় ফুটে উঠেছে।

১৯৬৭ সালে যৌবনকালে প্রকাশিত প্রথম কবিতার বইতেই বাজিমাত!
‘উত্তরাধিকার’ কাব‍্যগ্রন্থ প্রসঙ্গে বিনায়ক সেনের প্রশ্নের জবাবে শহীদ কাদরী বলেন, ‘উত্তরাধিকার কবিতায় বলতে চেয়েছিলাম যে আমাদের উত্তরাধিকারটা কী? ...আমাদের চোখ ফুটতে না ফুটতেই দেশ ভাগ হলো। ...বিয়াল্লিশে যখন জন্মালাম, আমার জন্মের দুদিন পর কলকাতায় বোমা পড়ল, জাপানি বোমা পড়ল, খিদিরপুর ডকইয়ার্ডে বোমা পড়ল, নিউমার্কেটে বোমা পড়ল। ...দ্বিতীয় মহাযুদ্ধ, আমাদের একটু চোখ ফুটতে না ফুটতেই লাগল দাঙ্গা।’ (সা. সংগ্রহ-১৩১)।
“বিনায়ক সেন : Militarisatioon দেখেছেন আপনারা; একধরনের পোস্টকলোনিয়াল সংকটকে দেখেছেন ...শহীদ কাদরী : এখানে যেমন আমি, in fact refer করেছি। ভিয়েতনামের দিকে, ‘সূর্যাস্তের নির্ভার মনে যেন শোনেনি বোমারু শিস্/ হঠাৎ কৃষক, দাউ দাউ অন্তিম আগুন তার পড়শির গ্রামে...। এখানে ভিয়েতনাম  was in my mind...” সাক্ষাৎকারের ফাঁকে ফাঁকে যুদ্ধের ভয়াবহতায় কীভাবে পৃথিবীকে প্রতিনিয়ত ধ্বংস করছে। সেই সব বীভৎসতার কথা নিয়ে ব্যাপক আলোচনা করা হয়েছে। উদাহরণস্বরূপ বলা যেতে পারে, ‘তোমাকে অভিবাদন প্রিয়তমা’, যা ১৯৭৪ সালে প্রকাশিত কাব্যগ্রন্থের কবিতায় মানববিধ্বংসী যুদ্ধের ধ্বংসস্তূপ ও উর্দিপরা সামরিক বাহিনীর কঠোর পরিবেশের মাঝেও কবিতার সুরময় ব‍্যঞ্জনকে ধারণ করা এবং প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের লীলাভূমি পৃথিবীর সুন্দরতম দিকের আলোকে কবি তাঁর স্বপ্নকে অঙ্কিত করেছেন। যেখানে সুনির্দিষ্ট গবেষণা-পদ্ধতির আলোকে শহীদ কাদরীর কবিসত্তায় বিধৃত বিচ্ছিন্নতা ও নৈঃসঙ্গ্যবোধ সম্পর্কে বিশ্লেষণ করা হয়েছে।

শহীদ কাদরী আধুনিক বাংলা কবিতার এক উজ্জ্বল নক্ষত্র। তাঁর কবিতায় নগরজীবন, প্রেম, দ্রোহ ও প্রবাসের অনুভূতি যেমন ফুটে উঠেছে; তেমনি শহীদ কাদরীর বহুমাত্রিক জীবনবোধ ও সাহিত‍্য নিয়ে সাক্ষাৎকারসমূহ নিঃসন্দেহে বাংলা সাহিত্যের বিকাশে সহায়ক ভূমিকা পালন করবে।

বিনায়ক সেন কর্তৃক এবং জে‍্যাতিপ্রকাশ দত্তের নেওয়া সাক্ষাৎকার দুটি নাতিদীর্ঘ এবং বিশ্লেষণযোগ্য। যেখানে সাক্ষাৎকার সংগ্রহের মূল বিষয়বস্তুকে উপজীব্য করে সম্পাদক মুহিত হাসান নিজেই স্বীকার করেছেন এভাবে, “সাহিত্যের নিবিড় বিশ্লেষক ‘বিনায়ক সেন’ শহীদ কাদরীর এক অকপট অথচ গভীর সাক্ষাৎকার গ্রহণ করেন। নিছক সাহিত্যালাপের সীমা ছাড়িয়ে প্রথাগত বিন্যাসের বাইরের এই আলাপচারিতা পৌঁছে গিয়েছে যেন এক উচ্চতর দার্শনিক স্তরে। বাংলাদেশের তো বটেই, এমনকি সমগ্র বাংলা ভাষার সাক্ষাৎকার-সাহিত্যে এ এক নিপুণ সংযোজন। প্রায় বিশ হাজার শব্দের এই সুদীর্ঘ কথোপকথন সম্ভবত শহীদ কাদরীর দেওয়া সবচেয়ে বিশ্লেষণমুখর সাক্ষাৎকার।”এখানে কবি শহীদ কাদরীর কাব্যদর্শন, সমাজনীতি, রাষ্ট্রনীতি ও রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গির বিশদভাবে আলোকপাত করা হয়েছে। একইভাবে তাঁর রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি ও সমাজ সম্পর্কে ওই গ্রন্থে বিস্তারিত বিবরণ রয়েছে।

বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধ ও রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট বিবেচনায় তাঁর ধারণা পরিষ্কার ও স্পষ্ট ছিল। শিল্প-সাহিত্যের নীতিতে তিনি ছিলেন অটল ও সঠিক অবস্থানে। তেমনি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবকে নিয়ে তাঁর রাজনৈতিক দর্শন ও দৃষ্টিভঙ্গির কথা তিনি অকপটে স্বীকার করেছেন। সাক্ষাৎকারের একপর্যায়ে ‘বঙ্গবন্ধু’ শব্দটির ব্যবহারের ক্ষেত্রে তাঁর মতামত ব্যক্ত করেছেন এবং তাতে কোনো দ্বিধা ছিল না। এখানে কাদরী বলেন, “মার্কসের ‘পয়েন্ট অব ভিউ’ দিয়েই আমরা বুঝেছি, বঙ্গবন্ধু কী জিনিস।” (সা. সংগ্রহ-১৫০)।

আলোচ‍্য গ্রন্থে মোট পনেরোটি সাক্ষাৎকার স্থান পেয়েছে। প্রতিটি সাক্ষাৎকারে শহীদ কাদরীর জীবনবোধ ও শিল্পসাহিত্য-সংক্রান্তে বিশদভাবে তথ্য-উপাত্তসহ বর্ণিত হয়েছে। এঁদের মধ্যে সাহিত্যিক ও বিশ্লেষক ‘বিনায়ক সেন’-এর দীর্ঘ সাক্ষাৎকারের মধ্য দিয়ে শহীদ কাদরীর জীবনবোধের অনেক অজানা তথ্য উঠে আসে। তেমনি কবিতার ক্ষেত্রে দেশ-বিদেশের বিখ্যাত কবি-সাহিত্যিক ও দার্শনিকের কাব্যদর্শনের ওপর আলোকপাত করা হয়েছে।

সাহিত্যে উত্তর-আধুনিকতাবাদ বা Postmodernism-এর অনেক বিস্তৃত ও গতিশীল ধারণা রয়েছে। এ ক্ষেত্রে শহীদ কাদরীর বক্তব্য হলো, ‘প্রথমে সেটির (উত্তর আধুনিকতা) উদ্ভব হয়েছিল ইউরোপ-আমেরিকায়। কিন্তু প্রাচ্যে তথা বাংলাদেশ ও ভারতীয় সাহিত্যে, উত্তর আধুনিকতার চর্চা এবং তার প্রয়োগ ঘটেছে এতদঞ্চলের সুশীলদের নিজস্ব সামাজিক ও সাংস্কৃতিক বাস্তবতার ওপর ভিত্তি করে।’ এখানে ‘বিনায়ক সেন’-এর প্রশ্নের জবাবে শহীদ কাদরী অনেকের ধারণার কথা উল্লেখ করেন, ‘সবাই বলতেছে, আমরা দেশের সব কবিরা সব Western world (পাশ্চাত্য) থেকে নিয়ে আসছে। কেননা তারা বিশ্বাস হারিয়েছে।’ (সাক্ষাৎকার সংগ্রহ-১৪২)।
‘বিনায়ক সেন’-এর পক্ষ থেকে প্রত‍্যাশার আলোকে ক্রমাগতভাবে শুভ পরিণতির ভাবনার কথা ওঠালে উত্তরে শহীদ কাদরী বলেন, ‘হ্যাঁ, আমরা ভাবতাম আমাদের যা কিছু শোকব‍্যাধি আছে, তা থেকে আমরা একদিন মুক্ত অবস্থায় পৌঁছাব। ...কিন্তু সবকিছু একটা বিচ্ছিন্নভাবে এগোচ্ছে। কোনো Pattern পাচ্ছি না আমরা।’

...Western modern literature-এ এটাই প্রধান ধারা-এরা এমন কিছু বিশ্বাস করে না, যেটা rationally not explainable... কিন্তু আমাদের বাংলা কবিতায় রবীন্দ্রনাথ যে রোমান্টিজমটা আনলেন তার মধ্যে প্লাটনিক দিকটা চলে এল।
এ প্রসঙ্গে শহীদ কাদরী আরও স্পষ্ট করে বলেন, ‘আমাদের দেশের কবিরা রোমান্টিজমের চর্চা করতে গিয়ে ঈশ্বরে বিশ্বাসের ওই প্লাটনিক দিকের প্রতিই জোর দিয়েছেন। আমরা, ভারতীয়রাও, মুসলমানরাও, ইহুদিরাও, খ্রিষ্টানরাও যেটাকে অবিশ্বাস ও হেয় করতে শিখেছি, সেটা হচ্ছে আমাদের দেহ, সেটা হচ্ছে বস্তুবাদ।’ রবীন্দ্রনাথ যে মহিমা দেখেছেন নিসর্গে-প্রকৃতিতে, সেই মহিমা আধুনিকেরা দেখে না। কারণ প্রকৃতি হচ্ছে ঈশ্বরের-God’s way to talk us.

একটা কবিতা আছে, ‘প্রত্যেকটা Brooks ঈশ্বরের কলধ্বনি করছে। আসলে বাইবেল পড়ছে তারা। রবীন্দ্রনাথও এভাবেই কিন্তু নিসর্গকে দেখেছেন।’ ( সা. সং-১৪২, ১৪৩)।
প্রেম ও দ্রোহের অমলিন আখ্যান আধুনিক কবিতার আরেকটি অলংকার। শহীদ কাদরীর কবিতায় তির্যক ভঙ্গি অথবা স‍্যাটায়ের মিশ্রণ এবং প্রেমের কবিতা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন ‘বিনায়ক সেন’। যেমন ‘তুমি’ কবিতায়, ‘সভয়ে আমি বললুম, তোমার উদ্দেশ্যে’। অতঃপর নিজের লেখা ‘প্রেম’ কবিতার শেষ কটি লাইন উচ্চারণ করলেন, ‘মাঝে মাঝে মনে হয় শীতরাতের শুধু কম্বলের জন্যে,/ দুটো চাপাতি এবং সামান্য শব্জীর জন্যে/ কিংবা একটু শান্তির আকাক্সক্ষায়, কেবল স্বস্তির জন্যে/ বেদনার অবসান চেয়ে তোমাকে হয়তো কিছু বর্বরের কাছে/ অনায়াসে বিক্রি করে দিতে পারি-অবশ্যই পারি।’

নিজের জীবনের উৎসারিত অভিজ্ঞতা ও অনুভূতির এমন অনেক উদাহরণ প্রকাশ পেয়েছে, এইসব দুর্লভ সাক্ষাৎকারে। একইভাবে ‘বিনায়ক সেন’-এর নেওয়া দীর্ঘ সাক্ষাৎকারে ‘বোদলেয়ার’-এর কবিতা ও তাঁর জীবনবোধ সম্পর্কে অনেক অজানা তথ্য উঠে এসেছে। আমরা জানি, ফরাসি কবি ‘শার্ল বোদলেয়ারকে’ আধুনিক কবিতার জনক বলা হয়, যিনি কবিতার আঙ্গিক ও ভাবধারায় বিপ্লব এনেছিলেন।
এখানে শহীদ কাদরী বোদলেয়ারের ‘অ‍্যালবাট্রস’ কবিতার কিয়দংশ হুবহু পাঠ করেন। একই সঙ্গে বিশাল পাখি অ‍্যালবাট্রসের, যার বিশাল ডানা। ...এই সাবলীল কবিতাটির মাধ্যমে বোদলেয়ারের চিন্তার গভীরতা সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যায়।

শহীদ কাদরীর ‘সাক্ষাৎকার সংগ্রহ’ সংকলনটি পাঠ করলে উত্তর-আধুনিক চিন্তার দর্শনগত এবং আধুনিক কবিতার প্রধান দিকগুলোর একটি সহজ ও সুস্পষ্ট ধারণা পাওয়া যাবে। কেননা সাহিত্য বিষয়ে কবিতার সঞ্চারণকে প্রাধান্য দিয়ে প্রতিটি সাক্ষাৎকারের মাধ্যমে কবি শহীদ কাদরী শিল্প-সাহিত্যে তাঁর মননশীল চিন্তাধারার প্রকৃত রূপ ও ব‍্যতিক্রমী স্বরূপ উন্মোচন করেছেন। এখানে যেমন তাঁর সময়কাল, ষাটের দশকের কবিতার গতিপ্রকৃতি এবং কবিতার চিরন্তন রূপরেখা দেওয়ার চেষ্টা করেছেন, একইভাবে পাশ্চাত্যের আধুনিক কবিদের জীবনবোধ ও চিন্তা-দর্শন সম্পর্কে তাঁর নিজস্ব স্পষ্ট ধারণা প্রদান করেন।
একইভাবে গ্রন্থটিতে উপস্থাপিত হয়েছে লেখক ও কথাসাহিত্যিক ‘জ্যোতিপ্রকাশ দত্ত’র নেওয়া ‘শহীদ কাদরী’র সঙ্গে কথোপকথন ও আরেকটি দীর্ঘ সাক্ষাৎকার। যেখানে স্মৃতিচারণা ও শিল্প-সাহিত্যের অনেক অজানা গল্প রয়েছে, যা সাহিত্যের ইতিহাসে অবিস্মরণীয় হয়ে থাকবে।
ব‍্যক্তিগতভাবে ‘শহীদ কাদরী’র সঙ্গে জ্যোতিপ্রকাশের বন্ধুত্ব সুদীর্ঘকালের। জীবনে বহু আড্ডা’র নীরব সাক্ষী দুজনই। সম্পাদক মুহিত হাসান উল্লেখ করেন, “কাদরীর দীর্ঘদিনের বন্ধু কথাসাহিত্যিক জ্যোতিপ্রকাশ দত্ত পাক্ষিক ‘অন‍্যদিন’-এর উদ্যোগে সাক্ষাৎকার নেন ২০১২ সালে। কাদরীর দেওয়া সেরা সাক্ষাৎকারগুলোর একটি এটি। নিজের জীবনের বহু অজানা বিবরণ, সাহিত্যদর্শন ও ব‍্যক্তিগত নানা উপলব্ধি তিনি বন্ধুর সামনে অকপটে বলেছেন। জ্যোতিপ্রকাশ দত্ত তাঁর স্মৃতি থেকে লাগসই খেই ধরিয়ে দিয়েছেন।”

আসলে স্মৃতি মানুষকে সর্বদাই আগলে রাখে। স্মৃতিকে সঙ্গে নিয়েই মানুষের বসবাস। যেমন সাক্ষাৎকারের শুরুতেই জ্যোতিপ্রকাশ দত্ত প্রশ্ন করেন এভাবে, ‘শহীদ, পুরোনো দিনের কথা মনে পড়ে?’

উত্তরে শহীদ কাদরী বলেন, ‘হ্যাঁ, অনেক কিছু মনে পড়ে, একটু এলোমেলোভাবে মনে পড়ে, ধারাবাহিকতা কিছুটা নষ্ট হয়ে গেছে।’
তারপর স্মৃতিচারণা শুরু হয় ‘পর্ব থেকে পর্বান্তরে’ অত্যন্ত খোলামেলাভাবে। প্রশ্ন করা হয় আর তৎক্ষণাৎ, উত্তরও আসে অকপটে। যেমন কবিকে প্রশ্ন করা হয়, “মনে পড়ে, আমি কাজের শেষে বেলা ৩টা-৪টা-৫টার দিকে তোমার বাসায় যেতাম? গিয়ে ডাক দিতাম, ‘শহীদ’। কোনো কোনো দিন তোমার বড় ভাই বলতেন, ‘শহীদ তো বাড়ি নেই’-যেটা আল মাহমুদের কবিতায় চলে গেছে, ‘শহীদ তো বাড়ি নেই’।”
শহীদ কাদরী : হ্যাঁ, আমার মনে আছে। কিন্তু আমার বেশি মনে আছে, আমি প্রায়শই তোমাদের ব্রিটিশ কাউন্সিলের উল্টোদিকের বাসায় চলে যেতাম, আড্ডা দিতাম। আর বেশি মনে পড়ে দেবব্রত এবং সেবাব্রতের ওখানে প্রায়ই যেতাম, আল মাহমুদই আমাকে প্রথম সেখানে নিয়ে যান। আর তোমরা একটা পত্রিকা বের করলে ‘সপ্তক’ নামে, যেটা বের করার সময় আমি আবার নতুন করে লেখা শুরু করি। শহীদ কাদরীর সেই স্মৃতিচারণায় আরও উঠে আসে অভয়দাস লেনে ‘সমকালের’ অফিস ছিল। পাশেই (বাড়িতে) সিকান্দার আবু জাফর উপরের তলায় থাকতেন, আর নিচের তলায় ছিল শহীদ কাদরীদের বাসা। মানুষের স্মৃতির আড়ালেও স্মৃতি থাকে। জ্যোতি’দা প্রশ্ন করছেন, আর শহীদ ভাই স্মৃতির ডালি থেকে বিশেষ কিছু স্মৃতিকথা ব‍্যক্ত করে চলেছেন। বায়ান্নর ভাষা আন্দোলনের সময়কার কথা। তার কিছুদিন আগে শহীদ কাদরীর পরিবার ভারত থেকে ঢাকায় একেবারে চলে এসেছে। জে‍্যাতিপ্রকাশের এক প্রশ্নের উত্তরে বললেন, ‘আমার মনে আছে, আমি পাকিস্তান অবজারভার-এর ওখানে দাঁড়িয়ে ছিলাম, ওখানে গুলি হলো। তখন দৌড়ে এসে বাড়ির ছাদে উঠলাম এ জন্য যে, ছাদ থেকে কিছু দেখা যায় কি না।’ এবার প্রথম কবিতা ছাপানোর কথা। শহীদ কাদরী যখন ঢাকায়, তখন তাঁর বয়স ১১-১২ হবে। জে‍্যাতি’দার প্রশ্নের জবাবে নিজেই বলা শুরু করলেন, “মহিউদ্দিন ভাইয়ের পত্রিকায় আমার প্রথম কবিতা প্রকাশিত হয়। কবিতার নাম ‘পরিক্রমা’। পুরোপুরি তখনকার মার্কসিস্ট কবিতার নকল। তারপর ওখানেই দ্বিতীয় কবিতা ছাপা হয় ‘জলকন্যার জন্যে’।”

শহীদ কাদরীর বলেন, শামসুর রাহমানের প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘প্রথম গান দ্বিতীয় মৃত্যুর আগে’ মহিউদ্দিন আহমদ মীর ভাইয়ের প্রকাশনা ‘বার্ডস এন্ড বুকস’ থেকে। এই দীর্ঘ সাক্ষাৎকারের মাধ্যমে উঠে আসে তৎকালীন ঢাকা ও কলকাতার ডাকসাইটে কবি-সাহিত্যিক ও বুদ্ধিজীবীদের সঙ্গে শহীদ কাদরীর স্মৃতি সম্পর্কের বিশদ বিবরণ।

বাংলাদেশে (পাকিস্তান আমলে) ‘শহীদ কাদরী’র আগমনের শুরুতেই আল মাহমুদ ও শামসুর রাহমানসহ তৎকালীন শীর্ষস্থানীয় কবি-সাহিত্যিক ও সাংবাদিকদের সঙ্গে পরিচিত হয়ে ওঠেন। জ্যোতিপ্রকাশের সাক্ষাৎকার-পর্বে বিস্তারিত আলোচনার ফাঁকে ফাঁকে স্মৃতিচারণাই মুখ‍্য হয়ে ওঠে। তিনি নিজেই বয়ান দেন, “ভাইয়া বিষ্ণু দে, জীবনানন্দ দাশ, বুদ্ধদেব বসু, সমর সেন প্রত্যেকের গুচ্ছ গুচ্ছ নিয়ে ঢাকায় ফিরল। তো তারপর কবিতা পড়ছি, কবিতা পড়ছি, দিন-রাত পড়ছি কবিতা। ...এরই মধ্যে সওগাত অফিসে গিয়ে দেখি, ওখানে সব বড় বড় লেখক-বোরহানউদ্দিন খান জাহাঙ্গীর, সৈয়দ শামসুল হক, খালেদ চৌধুরী-সবাই ওখানে। তখন সওগাত পত্রিকা চালাচ্ছিল আবদুল গাফ্‌ফার চৌধুরী। আবদুল গাফ্‌ফার চৌধুরী বললেন, ‘তুমি তো কলকাতার ছেলে, আমি শুনলাম কলকাতার ছেলেরা নাকি ইংরেজিতে ভালো। এই প্রবন্ধটা অনুবাদ করে আইনো তো মিয়া।’ স্টেটসম‍্যান-এ একটা ইংরেজি প্রবন্ধ বেরিয়েছিল লীলা রায়ের ‘Contemporary Bengali Poetry’ এতে শামসুর রাহমানের ওপর অনেকখানি কথা ছিল। অনুবাদ করে দিলাম আর একটা কবিতা দেব। ‘গোধূলির গান’ ছাপা হয়ে গেল।” একই সঙ্গে ‘পূর্বাশা’ পত্রিকায়ও শহীদ কাদরীর কবিতা ছাপা হয়েছিল। ...একদিন সওগাত অফিসে আল মাহমুদের সঙ্গে দেখা। আল মাহমুদ একেবারে সদরঘাটে নেমেই সওগাত অফিসে। এই যে আমি লিখেছি না, ‘আল মাহমুদ এক হাতে তার টিনের সুটকেস...’ (হেসে)।”

জে‍্যাতিপ্রকাশ দত্ত : (হেসে) তখন তো টিনের সুটকেসই ছিল।
শহীদ কাদরী : হ্যাঁ, তো সওগাত অফিসে আল মাহমুদ এল। তখন অলরেডি সওগাত-এ মুনীর চৌধুরীকে নিয়ে ওর কবিতা ছাপা হয়Ñ‘অধ্যাপক তবুও কান্না পায়’। ইট ওয়াজ এ নাইস পোয়েম। ...একদিন আমি শামসুর রাহমানের বাসা থেকেÑআশেক লেন থেকে ফেরার পথে আবার আল মাহমুদের ওখানে (নবাবপুর) ঢুকেছি। দেখি সে লেখালেখি করছে। বললাম, কিরে দোস্ত, কী করিস? বলে, আমি শামসুর রাহমানের কাছ থেকে ঠিকানা নিয়ে এসেছি কবিতা পত্রিকারÑকবিতা পত্রিকায় কবিতা পাঠাচ্ছি।...

সেবারও কবিতা পত্রিকায় শামসুর রাহমান, আল মাহমুদ ও শহীদ কাদরীর কবিতা একসঙ্গে ছাপা হয়েছিল। এ প্রসঙ্গে কবি আরও বিস্তারিত ব্যাখ্যা দিয়েছেন। পরবর্তীতে ‘নেক্সট ইস্যুতেই। শামসুর রাহমান, সৈয়দ শামসুল হক, আল মাহমুদ, শহীদ কাদরী। অত‍্যন্ত আনন্দের ব‍্যাপার।” (সা. সংগ্রহ-২০৪)। জ্যোতিপ্রকাশ দত্ত : জীবন-পদ্ধতির কোনো ছাপ পড়ে লেখকের লেখার পরিমাণে-গুণে?
শহীদ কাদরী : জীবন-পদ্ধতির ছাপ পড়তে পারে। বিশেষত জীবন-পদ্ধতি যদি বিশৃঙ্খল হয়। এর উল্টো দৃষ্টান্তও আছে। ...জীবন-পদ্ধতি বিশৃঙ্খল হওয়ার একটা কারণ হচ্ছে জীবনের কোনো বিশেষ সময়ে যে ধরনের মনোনিবেশ থাকা দরকার, সেটা না থাকলে, অস্থিরতা থাকলে, লেখার যে শৈল্পিক শৈলী সেখানে ছাপ পড়তে পারে। এটা বাংলাদেশের অনেক কবির মধ্যেও দেখা গেছে। কিন্তু আবার বোদলেয়ারের কাব্যশৈলীতে তাঁর জীবনাচরণের কোনো ছাপ নেই। তিনি পাগলের মতো মাথা কামিয়ে সবুজ রং মেখে প্যারিসের রাস্তায় ঘুরে বেড়াতেন। ছেলেপিলেরা ইট মারত। টাকার অভাব ছিল। (সা. সংগ্রহ : ২০৮-২০৯)।

জে‍্যাতিপ্রকাশ দত্ত : আমরা একটা কথা শুনে থাকি, কবি বা সাহিত্যিকের বিচার তাঁর রচনার পরিমাণ দিয়ে নয়, তাঁর রচনার গুণে।
শহীদ কাদরী : রচনার পরিমাণটা কোন পরিমাণ তা তো বলে দেয়নি কেউ। যেমন জীবনানন্দ দাশ যখন প্রধান কবি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হলেন, তখন তাঁর বনলতা সেন থেকে শুরু করে বেলা অবেলা কালবেলা পর্যন্ত মাত্র একশ ষাটটি কবিতা। সুধীন্দ্রনাথ দত্ত, আমাদের অন‍্যতম প্রধান কবি। আমাকে যদি বলা হয়, সত্যিকার তিন প্রধান কবি কে কে? আমি বলব, বিষ্ণু দে, সুধীন্দ্রনাথ দত্ত এবং জীবনানন্দ দাশ। ...বোদলেয়ারের মাত্র দুটি বই। একদম চটি বই। র্যাঁবোর দুটো বই। দুটিই চটি বই-ইলুমিনেশনস এবং সিজন ইন হেল। (সা- সংগ্রহ-১৯৬)।

পাঠকপ্রিয়তা প্রসঙ্গে এক প্রশ্নের জবাবে শহীদ কাদরী বলেন, “প্রথম দিকে পাঠকপ্রিয়তার চিন্তাই করিনি। ...যেটা সহজ হবে পাঠকের জন্য। যেমন ইমিডিয়েটলি একটা দৃষ্টান্ত দিতে পারি, ‘রাষ্ট্র মানেই লেফট রাইট লেফট’। এখানে বক্তব্যটা হচ্ছে, সব ইভিলের উৎস হলো আধুনিক রাষ্ট্র-অরিজিন অব অল ইভিলস।”

প্রবাসজীবনে কবির ভাবনা কী, সেই বিষয়ে মাযহারুল ইসলাম ও জে‍্যাতিপ্রকাশ দুজনেই জানতে চান।
উত্তরে শহীদ কাদরী বলেন, “আমরা প্রবাসে বাস করি, কবিতায় নিশ্চয়ই তার প্রভাব পড়ে। লোকে অমিয় চক্রবর্তীর দৃষ্টান্ত দেয়। ‘একমুঠো খসড়া’, ‘দূরযানী’-এসব লেখা হয়ে গেছে তাঁর। প্রবাসে উনি ‘পরপার’ আর ‘পালাবদল’ এ দুটি বই লিখেছেন।” (সা. সংগ্রহ-২১১)।

জ্যোতিপ্রকাশ দত্ত : আরেকটি মজার ব‍্যাপার কিন্তু আছে। যাঁরা ছোটবেলা থেকেই বিদেশে আছে, বিদেশেই লেখক হিসেবে যাঁরা প্রতিষ্ঠা পেয়েছে, তাঁদের লেখার বিষয়ও কিন্তু দেশ।
জ্যোতিপ্রকাশ দত্ত ব্রিটিশ পার্লামেন্টের মেম্বার ও ইংল্যান্ডের ডাকসাইটে রাজনীতিবিদ ‘মনিকা আলী’ (বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত) ও তার রচিত ‘ব্রিক লেন’ গ্রন্থের কথা উল্লেখ করেন। সত্যিই তাই, ‘বিদেশে অবস্থানরত লেখককে কোনোভাবেই নিজ দেশ থেকে আলাদা করা যায় না।’

শহীদ কাদরী : হ্যাঁ, ঝুম্পা লাহেড়ীও তাই, অরুন্ধতী রায়ও তাই।
এ বিষয়ে আরও বলতে গিয়ে তিনি তাঁর একটি কবিতার লাইন বললেন, “যদি নিবার্সন দাও, আমি ওষ্ঠে অঙ্গুরি ছোঁয়াব আমি বিষপান করে মরে যাব...‘নির্বাসন চিরকালই দণ্ড’।” ( সা. সংগ্রহ-২১২)।

শহীদ কাদরীর কবিতায় ফুটে উঠেছে তাঁর দেশপ্রেম। তৎকালীন রাষ্ট্রযন্ত্রের নানা অনিয়ম, স্বৈরাচার ও যুদ্ধের ভয়াল রূপ তাঁর লেখায় সাহসের সঙ্গে তুলে ধরা হয়েছে। দেশ ও মানুষের প্রতি গভীর ভালোবাসা তাঁর কবিতার অন্যতম শক্তি। আসলে লেখক যেখানেই থাকুন না কেন নিজের দেশ, মাটি ও মানুষের প্রতি তাঁর শ্রদ্ধা, ভালোবাসা ও টান থাকবেই। পৃথিবীতে দেশান্তরী মানুষের মনের মুকুরে তাঁর জন্মভূমি, প্রিয় স্বদেশ তাঁকে ডাকবেই। মোটাদাগে গ্রন্থটির প্রতিপাদ্যই হলো শিল্প-সাহিত্য ও কবিতা। এ জন্য শহীদ কাদরীর মনের ভেতরকার অনুভূতি নিয়ে এত কথা হয়েছে, যা শুনে মনে হবে, এটা যেন জীবনেরই ইতিহাস।কোনো দারিদ্র্য কিংবা সময়ের স্বল্পতার মুখোমুখি হয়েও অনেকের সাহিত্যচর্চা ও কাব‍্যশৈলীতে ছাপ পড়ে না। জ্যোতিপ্রকাশের প্রশ্নের উত্তরে শহীদ কাদরী বলেন, না, কোনো ছাপ পড়ে না। যেমন বোদলেয়ার, ‘তিনি পাগলের মতো মাথা কামিয়ে সবুজ রং মেখে প‍্যারিসের রাস্তায় ঘুরে বেড়াতেন। ছেলেপিলেরা ইট মারত। টাকার অভাব ছিল। কিন্তু তাঁর কবিতাগুলো ফরাসি ধ্রুপদি কাব্যশৈলীর নিখুঁত দৃষ্টান্ত। মাইকেল মধুসূদনেরও তো অত্যন্ত বিশৃঙ্খল জীবনযাপনÑতার পরও তাঁর লেখা খুবই শৃঙ্খলাবদ্ধ।’ (সা. সংগ্রহ-২০৯)।

একইভাবে নজরুলের বিশাল সাহিত্যপ্রতিভা নিয়ে তিনি আলোচনা করেছেন। নজরুল, জীবনানন্দ দাশ ও মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের অর্থকষ্ট ও দারিদ্র্যের মধ্যেও তাঁদের রচনাশৈলীর বৈশিষ্ট্য ক্ষুণ্ন হয়নি। সাক্ষাৎকারের ভেতর থেকেও উঠে এসেছে, শহীদ কাদরীর প্রেমের কবিতায় কোনো গতানুগতিক আবেগ নেই। তাঁর প্রেম অনেক সময় শানানো তলোয়ারের মতো, যা দিয়ে তিনি রাষ্ট্র, রাজনীতি ও সমাজজীবনের বাস্তবতা ফুটিয়ে তুলেছেন। যেমন তাঁর ‘তোমাকে অভিবাদন, প্রিয়তমা’ কবিতাটি বাংলা সাহিত্যের এক অনন্য সৃষ্টি। আজ আমরা যখন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বা কাজী নজরুল ইসলামের কোনো পুরোনো সাক্ষাৎকার বা তাদের সমসাময়িকদের স্মৃতিচারণা পড়ি, তখন সেই সময়ের সাহিত্যিক আবহাওয়াকে আমরা নতুনভাবে অনুভব করতে পারি, যা ভবিষ্যৎ প্রজন্ম, গবেষকদের জন্যও রেফারেন্স হিসেবে কাজে লাগে। শহীদ কাদরীর সাক্ষাৎকারসমূহ তেমনই বাংলা সাহিত্যকে আরও প্রাণবন্ত, সংবেদনশীল এবং দীর্ঘস্থায়ী করে তুলবে। সম্পূর্ণ শিল্প-সাহিত্যনির্ভর উল্লিখিত (সাক্ষাৎকার-বিষয়ক ) গ্রন্থটি সাহিত্যের ইতিহাসে অমূল্য দলিল হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হবে। তা-ই হোক আজকের প্রত্যাশা।
(কুইন্স লাইব্রেরিতে অনুষ্ঠিত, সাহিত্য বিশ্লেষক নীরা কাদরী পরিচালিত লেখকের অঙ্গনের জন্য লেখাটি রচিত)।
লেখক : কবি ও প্রাবন্ধিক।
Thikana
M M Shahin, Chairman, Board of Editors, Thikana
Corporate Headquarter
THIKANA : 7409 37th Ave suite 403 Jackson Heights, NY 11372
Phone : 718-472-0700/2428, 718-729-6000
Fax: + 1(866) 805-8806
Bangladesh Bureau
THIKANA : 70/B, Green Road, (Panthapath), 5th Floor, Dhaka, BD.
E-Mail : [email protected]
For Advertisement : [email protected]