​বাঙালি ও বাঙালির ভাষা (তিন)

প্রকাশ : ০৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১১:২৫ , অনলাইন ভার্সন
(পূর্ব প্রকাশের পর)
১৯৫১ সালের ১৬ অক্টোবর লিয়াকত আলী খান রাওয়ালপিন্ডিতে আততায়ীর গুলিতে নিহত হন। তারপর পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী নিযুক্ত হন খাজা নাজিমুদ্দিন। প্রধানমন্ত্রী হিসেবে খাজা নাজিমুদ্দিন ১৯৫২ সালের জানুয়ারি মাসের শেষ দিকে ঢাকায় আসেন এবং ২৭ জানুয়ারি পল্টন ময়দানে এক বিরাট জনসভায় বক্তৃতা দেন। সেই বক্তৃতায় প্রাদেশিকতা সম্পর্কে কিছু বক্তব্য প্রদানের পর তিনি বলেন, পূর্ব বাংলার ভাষা কী হবে, সেটা পূর্ব বাংলার জনগণই নির্ধারণ করবে। কিন্তু পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা হবে উর্দু, অন্য কোনো ভাষা নয়।

খাজা নাজিমুদ্দিনের এই বক্তৃতার পরই ‘ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ’ বিশ্ববিদ্যালয় এলাকার দেয়ালে পোস্টার লাগায় এবং ৩০ জানুয়ারি প্রতীকী ধর্মঘট ও সভা আহ্বান করে। সে অনুযায়ী বিশ্ববিদ্যালয়ের আমতলায় ৩০ জানুয়ারি যে ছাত্রসভা অনুষ্ঠিত হয়, সেখানে তারা ১৯৪৮ সালে সংগ্রাম পরিষদের সঙ্গে খাজা নাজিমুদ্দিনের স্বাক্ষরিত চুক্তি বাস্তবায়নের জোর দাবি জানানো হয়। সভায় বক্তারা রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনকে নতুনভাবে সংগঠিত করে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার সংকল্প ঘোষণা করাসহ ৪ ফেব্রুয়ারি ভাষার দাবিতে ঢাকার সকল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ধর্মঘট পালনের সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। সভা শেষে ছাত্ররা মিছিল করে ঢাকা শহরের বিভিন্ন এলাকা প্রদক্ষিণ করে।

বিশ্ববিদ্যালয়ের আমতলায় এই সভা অনুষ্ঠানের পরদিনই পূর্ব পাকিস্তান মুসলিম ছাত্রলীগের পক্ষ থেকে কাজী গোলাম মাহবুব ৩১ জানুয়ারি ঢাকার বার লাইব্রেরি হলে একটি সর্বদলীয় সভা আহ্বান করেন। আওয়ামী মুসলিম লীগের সভাপতি মওলানা ভাসানীর সভাপতিত্বে ৩১ জানুয়ারি অনুষ্ঠিত এই সভায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদসহ অপরাপর রাজনৈতিক এবং ছাত্রসংগঠনও যোগদান করে। এ সভায় একটি প্রস্তাবে পল্টন ময়দানের বক্তৃতায় খাজা নাজিমুদ্দিনের রাষ্ট্রভাষা বিষয়ক বক্তব্যের বিরুদ্ধে নিন্দা ও প্রতিবাদ জ্ঞাপনসহ অবিলম্বে তার সেই বক্তব্য প্রত্যাহার করার দাবি জানানো হয়। অপর একটি প্রস্তাবে বাংলা ভাষায় আরবি হরফ প্রচলনের সরকারি চক্রান্তের বিরোধিতা করে সে চক্রান্ত বন্ধ করার দাবি জানানো হয়। ৪ ফেব্রুয়ারি বিশ্ববিদ্যালয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ যে ধর্মঘট আহ্বান করে, তার প্রতি সমর্থন জানিয়েও একটি প্রস্তাব গৃহীত হয়। ঢাকা বার লাইব্রেরির এই সভায় কাজী গোলাম মাহবুবকে আহ্বায়ক করে ৪০ সদস্যবিশিষ্ট একটি সর্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ গঠন করা হয় এবং এই কমিটির সদস্যদের মধ্যে থাকেন মওলানা ভাসানী, আবুল হাশিম, আতাউর রহমান খান, কামরুদ্দীন আহমদ, শামসুল হক, মোহাম্মদ তোয়াহা, অলি আহাদ, আবদুল মতিন ও খালেক নেওয়াজ খান।

৪ ফেব্রুয়ারি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ ঢাকা শহরের সকল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ধর্মঘট পালিত হয় এবং ধর্মঘটের পর ছাত্ররা মিছিলসহকারে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রাঙ্গণে সমবেত হয়। এরপর গাজীউল হকের সভাপতিত্বে সেখানে একটি ছাত্রসভা অনুষ্ঠিত হয়। সভায় আবদুল মতিন, কাজী গোলাম মাহবুব এবং অন্য কয়েকজন ছাত্রনেতা বক্তৃতা করেন। সভায় নাজিমুদ্দিনের পল্টন বক্তৃতার তীব্র বিরোধিতা করে ১৯৪৮ সালে স্বাক্ষরিত চুক্তি বাস্তবায়নের দাবি জানানোসহ অপর একটি প্রস্তাবে ‘ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ’কে সর্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদের একটি অঙ্গ হিসেবে ঘোষণা করা হয়। ২০ ফেব্রুয়ারি পূর্ব বাংলা পরিষদের পরবর্তী অধিবেশন শুরু হওয়ার কথা ইতিপূর্বে সরকারিভাবে ঘোষণা করা হয়েছিল। সেদিকে লক্ষ্য রেখেই বিশ্ববিদ্যালয়ের এই সভায় ২১ ফেব্রুয়ারি রাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবিতে সারা পূর্ব বাংলায় এক সাধারণ ধর্মঘটের সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। সভা সমাপ্ত হওয়ার পর হাজার হাজার ছাত্রছাত্রী বিশ্ববিদ্যালয় প্রাঙ্গণ থেকে বের হয়ে সেøাগান দিতে দিতে প্রধানমন্ত্রী নাজিম উদ্দিনের বাসভবন হয়ে হাইকোর্টের সামনে দিয়ে নবাবপুর, পাটুয়াটুলী, আরমানীটোলা, নাজিমুদ্দিন রোড অতিক্রম করে পুনরায় বিশ্ববিদ্যালয় প্রাঙ্গণে ফিরে আসে। ৪ ফেব্রুয়ারি বিকেলেই সর্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদের সভায় একুশে ফেব্রুয়ারি পূর্ব পাকিস্তানে প্রদেশব্যাপী এক সাধারণ ধর্মঘটের সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। এই সভায় মওলানা ভাসানী, আবুল হাশিমসহ সর্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদের অনেক সদস্য উপস্থিত থাকেন এবং ভাষার দাবি সুপ্রতিষ্ঠিত না হওয়া পর্যন্ত সংগ্রাম চালিয়ে যাওয়ার সংকল্প ঘোষণা করেন। ৪ ফেব্রুয়ারি শুধু ঢাকাতেই নয়, পূর্ব বাংলার প্রায় সর্বত্র ছাত্র ধর্মঘট পালিত হয়।

ইতোপূর্বে সংগ্রাম পরিষদের সঙ্গে প্রধানমন্ত্রী নাজিমুদ্দিনের ৮ দফা চুক্তির বিবরণ নিম্নরূপ :
২৯ ফেব্রুয়ারি, ১৯৪৮ হইতে বাংলা ভাষার প্রশ্নে যাঁহাদিগকে গ্রেফতার করা হইয়াছে তাঁহাদিগকে অবিলম্বে মুক্তি দান করা হইবে। পুলিশ কর্তৃক অত্যাচারের অভিযোগ সম্পর্কে প্রধানমন্ত্রী স্বয়ং তদন্ত করিয়া এক মাসের মধ্যে এ বিষয়ে একটি বিবৃতি প্রদান করিবেন।

১৯৪৮-এর এপ্রিলের প্রথম সপ্তাহে পূর্ব বাঙলা সরকারের ব্যবস্থাপক সভায় বেসরকারি আলোচনার জন্যে যে দিন নির্ধারিত হইয়াছে সেই দিন বাংলাকে অন্যতম রাষ্ট্রভাষা করিবার এবং তাহাকে পাকিস্তান গণপরিষদে এবং কেন্দ্রীয় সরকারের পরীক্ষা দিতে উর্দুর সমমর্যাদা দানের জন্যে একটি বিশেষ প্রস্তাব উত্থাপন করা হইবে।

এপ্রিল মাসে ব্যবস্থাপক সভায় এই মর্মে একটি প্রস্তাব উত্থাপন করা হইবে যে প্রদেশের সরকারি ভাষা হিসেবে ইংরেজি উঠিয়া যাওয়ার পরই বাংলা তাহার স্থলে সরকারি ভাষারূপে স্বীকৃত হইবে। ইহা ছাড়া শিক্ষার মাধ্যমও হইবে বাংলা। তবে সাধারণভাবে স্কুল-কলেজগুলিতে অধিকাংশ ছাত্রের মাতৃভাষার মাধ্যমেই শিক্ষাদান করা হইবে।
আন্দোলনে যাঁহারা অংশগ্রহণ করিয়াছেন তাঁহাদের কাহারো বিরুদ্ধে কোন ব্যবস্থা গ্রহণ করা হইবে না।

 সংবাদপত্রের উপর হইতে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করা হইবে।
ফেব্রুয়ারি হইতে পূর্ব বাংলার যেসকল স্থানে ভাষা আন্দোলনের জন্য ১৪৪ ধারা জারি করা হইয়াছে সেখান হইতে তাহা প্রত্যাহার করা হইবে।
সংগ্রাম পরিষদের সাথে আলোচনার পর আমি (প্রধানমন্ত্রী নাজিমউদ্দিন) এ ব্যাপারে নিঃসন্দেহ হইয়াছি যে এই আন্দোলন রাষ্ট্রের দুশমনদের দ্বারা অনুপ্রাণিত হয় নাই। (চলবে)
লেখক : জ্যেষ্ঠ আইনজীবী ও কলামিস্ট।
Thikana
M M Shahin, Chairman, Board of Editors, Thikana
Corporate Headquarter
THIKANA : 7409 37th Ave suite 403 Jackson Heights, NY 11372
Phone : 718-472-0700/2428, 718-729-6000
Fax: + 1(866) 805-8806
Bangladesh Bureau
THIKANA : 70/B, Green Road, (Panthapath), 5th Floor, Dhaka, BD.
E-Mail : [email protected]
For Advertisement : [email protected]