কলোরাডোর দোকানে একটুকরো স্বদেশ

প্রকাশ : ০৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১৮:৩২ , অনলাইন ভার্সন
এবারের গ্রীষ্মের ছুটিতে কোথাও বেড়াতে যাওয়ার সুযোগ মিলছিল না। আমার ছেলেরা অনলাইন ক্লাস ও তাদের কাজ নিয়ে ব্যস্ত ছিল, তাই ভাবছিলাম কোথাও আর যাওয়া হবে কি না। আগস্টের শেষ দিকে ওদের কলেজ শুরুর আগ দিয়ে সপ্তাহখানেক সময় পাওয়া গেল। আমরা সবাই ঠিক করলাম এবার কলোরাডো স্প্রিংসে বেড়াতে যাব। কলোরাডো স্প্রিংস আমেরিকার কলোরাডো অঙ্গরাজ্যে অবস্থিত একটি বৃহত্তম জনবহুল শহর।
 
পনেরো বছর আগে ২০১১ সালে প্রথম কলোরাডো স্প্রিংসে আমাদের যাওয়া হয়েছিল। আমার বাচ্চারা তখন অনেক ছোট। এ জায়গার প্রধান আকর্ষণ ‘গার্ডেন অব দ্য গডস’ পার্কে গিয়েছিলাম এবং এটির অপূর্ব সুন্দর প্রাকৃতিক সৌন্দর্য দেখেছিলাম, যা ভুলতে পারিনি। সেই বিখ্যাত ও ঐতিহাসিক পাবলিক পার্কটি বিশ্বজুড়ে ‘ন্যাশনাল ন্যাচারাল ল্যান্ডমার্ক’ হিসেবে পরিচিত। পনেরো বছর পরে ওই পার্কটিতে ফেরত এসে দেখলাম, এর অভাবনীয় সৌন্দর্য একটুও কমেনি।
 
পার্কজুড়ে ছড়িয়ে আছে লাল বেলেপাথর দিয়ে তৈরি বিভিন্ন আকৃতি ও গঠনের বিচিত্র সব শিলাস্তূপ। এই শিলাস্তূপগুলো ৩০০ মিলিয়ন বছরেরও বেশি পুরোনো। ভৌগোলিক পরিবর্তনের কারণে মাটির নিচে টেকটনিক প্লেটের নড়াচড়া ও উত্থানের কারণে পর্বত গঠিত হয়। তারই  ফলে মাটির নিচ থেকে এই পাথুরে পাহাড়গুলো বেরিয়ে এসেছে এবং মিলিয়ন মিলিয়ন বছর ধরে খাড়া দাঁড়িয়ে আছে। একেকটি পাথর একেক আকৃতির এবং প্রতিটির বিশেষ নামও আছে। এদের মধ্যে সবচেয়ে জনপ্রিয় পাথরটির নাম ‘ব্যালেন্সড রক’। এই রকটি দেখলে মনে হবে খুব বড় একটি পাথরের চাঁই, একটি সরু ভিত্তির ওপর কোনো এক অলৌকিক উপায়ে বসে আছে এবং একটুও নড়ে যাচ্ছে না।
পার্কের মধ্য দিয়ে ঘুরিয়ে-ফিরিয়ে প্রায় একুশ মাইল দীর্ঘ হাঁটার রাস্তা আছে। আমার ছেলেরা আর ছোট নেই, তাই এবার আর গাড়ি দিয়ে নয়, বরং হেঁটে হেঁটে ওই লাল পাহাড়গুলো উপভোগ করলাম। হাঁটার পাশাপাশি অ্যাডভেঞ্চার-প্রিয় দর্শনার্থীদের জন্য আছে হাইকিং, বাইকিং, রক ক্লাইম্বিংয়ের সুযোগ। পার্কে দাঁড়িয়ে দূরে দেখা যায় তুষারাবৃত পাইকস পিক পর্বতের চূড়া, যা কিনা ১৪,১১২ ফুট উচ্চতাবিশিষ্ট এবং কলোরাডোসহ পশ্চিম আমেরিকার সবচেয়ে উঁচু পাহাড়।
 
পার্কের দক্ষিণ-পশ্চিম প্রান্তে অবস্থিত এ শহরের সবচেয়ে পুরোনো ও বৃহত্তম গিফট শপ, গার্ডেন অব দ্য গডস ট্রেডিং পোস্ট। প্রায় ২৫,০০০ বর্গফুটের এই বিশাল দোকানটিতে ৯০,০০০ এর বেশি উপহারসামগ্রী পাওয়া যায়। এখানে আদিবাসী আমেরিকানদের তৈরি বিভিন্ন হস্তশিল্প, গহনা, শিকারের হাতিয়ার, নাভাহো কার্পেট, পুয়েবলো আদিবাসীদের রন্ধনশিল্প এবং এই অঞ্চলের শিল্পীদের আঁকা চিত্রকর্ম পাওয়া যায়। তা ছাড়া কলোরাডো থিমের বিভিন্ন টি-শার্ট, মগ, টুপি, পোস্ট কার্ড, বই, হোমডেকোর পাওয়া যায়। ওই বিশাল গিফট শপের এক প্রান্তে আছে একটি খাওয়ার ক্যাফে। বাইসন মিটের তৈরি ওই ক্যাফের বার্গার ট্যুরিস্টদের মধ্যে খুবই পপুলার। দোকানের দুই-তৃতীয়াংশজুড়ে আছে কাপড়, হরেক রকমের স্যুভেনির, রান্নাঘর ও ঘর সাজানোর জিনিস। আমি যে জায়গায় বেড়াতে যাই, সাধারণত সেই জায়গার স্থানীয় শিল্পকর্ম বা হাতের তৈরি জিনিস সংগ্রহ করার চেষ্টা করি। বিভিন্ন জায়গার স্যুভেনির বা স্মারক আমাকে ওই জায়গার সমাজ, সংস্কৃতি বা ইতিহাসের সঙ্গে পরিচিত করে। আমি ঘুরে ঘুরে জিনিসগুলো দেখছি আর ভাবছি কলোরাডো থিমের কী কিনলে ভালো হয়। হঠাৎ চোখে পড়ল, বেশ কিছু সুন্দর টেবিল ম্যাট, সম্পূর্ণ পাটের তৈরি। গোল, ওভাল, চারকোনা আকৃতির। জুটের বোনা প্লেইস ম্যাটগুলোর ওপর শোভা পাচ্ছে কলোরাডো স্টেটের স্থানীয় পশু, পাখি, গাছ ও ফুলের রঙিন প্রতিকৃতি। টেবিল ম্যাটগুলো আমার খুব পছন্দ হলো। পাট বা জুটের সামগ্রী আমার খুব প্রিয়।
 
ম্যাটগুলো উল্টিয়ে কোথাকার তৈরি বা মেইড ইন দেখতে ইচ্ছুক হলাম। ট্যাগ পড়ে আমি একেবারে হতবাক, মেইড ইন বাংলাদেশ। গর্বে আমার বুক ভরে গেল। বাংলাদেশের পাটশিল্পের কথা আগেও শুনেছি। পাটকে বাংলাদেশের সোনালি আঁশ বলা হয়। বিশ্ববাজারে পাট ও পাটজাত পণ্য রপ্তানিতে বাংলাদেশ শীর্ষস্থানে আছে। এই শিল্পের সঙ্গে লাখ লাখ মানুষের জীবন, জীবিকা ও কর্মসংস্থান জড়িত। বাংলাদেশের প্রধান পাঁচ রপ্তানি পণ্যের মধ্যে তৈরি পোশাকের পরপরই দ্বিতীয় অবস্থানে আছে পাট ও পাটজাত পণ্য। যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান রপ্তানি বাজার। কাঁচা পাট, পাটের সুতা, পাটের ব্যাগ, বস্তা, কার্পেট এবং পরিবেশবান্ধব বহুমুখী পাটজাত পণ্যের চাহিদা যুক্তরাষ্ট্রসহ সারা বিশ্বে বাড়ছে। বাংলাদেশ থেকে পাট ও পাটজাত পণ্য রপ্তানি করে বছরে প্রায় এক বিলিয়ন বা একশ কোটি মার্কিন ডলার বা সমপরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা আয় হয়।
 
আমি কয়েকটা ম্যাট তুলে নিলাম কিনব বলে। কাউন্টারে গিয়ে মেয়েটাকে জিজ্ঞেস করলাম, ‘তুমি কি জানো, এই ম্যাটগুলো কোথাকার তৈরি।’ মেয়েটা বলল, ‘হতে পারে ইন্ডিয়া।’ আমি হেসে বললাম, ‘ইন্ডিয়া নয়, এটা আমার দেশ বাংলাদেশের তৈরি।’ মেয়েটা বলল, ‘রিয়ালি, হাউ বিউটিফুল।’ আমি সুন্দর করে বুঝিয়ে বললাম, ‘আমার দেশের গ্রামের কর্মজীবী নারীরা তাদের শ্রম, ত্যাগ, ধৈর্য ও ভালোবাসা দিয়ে এসব হস্তশিল্প তৈরি করে। অনেক সময় তারা ঘরে বসে বানায়, আবার অনেক সময় তারা দলবদ্ধভাবে গ্রামের কোনো বড় উঠোনে বা চালাঘরে বসে এসব হাতে তৈরি শৌখিন জিনিস তৈরি করে। এগুলো বানিয়ে ওরা যা উপার্জন করে, সেই অর্থ দিয়ে সন্তানের লেখাপড়ার খরচ চালায়, স্বামীর উপার্জনে সহযোগিতা করে, সংসারের অবস্থার উন্নতি করে। এই কাজের মাধ্যমে তারা অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী হয়।’ মেয়েটা মন দিয়ে শুনছিল। আমি আরও বললাম, ‘তবে এখানে একটা আশ্চর্যের ব্যাপার আছে। ইম্পর্টিং কোম্পানি বা বাইয়ার কোম্পানি বিদেশ থেকে আসা তাদের বড় বড় অর্ডার সুদূর গ্রামেগঞ্জে পাঠায়। বিভিন্ন এনজিও সংস্থার মাধ্যমে সেই অর্ডারগুলো এসব মহিলার হাতে আসে। এই মহিলাগুলো হয়তো কোনো দিন গ্রামের বাইরে ঢাকা শহরেই যায়নি। দেশের বাইরে বা বিদেশ, আমেরিকায় যাওয়ার তো প্রশ্নই ওঠে না। অথচ হাজার হাজার মাইল দূরে বসে এক অজানা, অচেনা, অপরিচিত জায়গা বা অঞ্চলের পরিবেশ, প্রাণী, প্রকৃতি কী সুনিপুণ দক্ষতায় তারা সুন্দরভাবে ফুটিয়ে তুলেছে তাদের হাতে বোনা জিনিসগুলোর মাধ্যমে। দেখে মনে হবে, ওই অঞ্চলেরই কোনো স্থানীয় পেশাদার লোকের কাজ।’ মেয়েটা বলল, ‘কী সাংঘাতিক! দারুণ।’
 
সবশেষে বললাম, ‘আর মহিলাগুলো জানতেও পারছে না, হাজার মাইল দূরে বসে বিদেশের এক দোকানের শেলফে ওদের তৈরি জিনিসগুলো দেখে ওদেরই কোনো এক দেশি বোন আনন্দিত হচ্ছে, গর্বিত হচ্ছে।’ কথাটা শুনে মেয়েটি আমাকে জড়িয়ে ধরে বলল, ‘কী দারুণ ভালোবাসা তোমার, দেশের প্রতি।’
লেখক : ব্লগার ও প্রাবন্ধিক, টেক্সাস।
Thikana
M M Shahin, Chairman, Board of Editors, Thikana
Corporate Headquarter
THIKANA : 7409 37th Ave suite 403 Jackson Heights, NY 11372
Phone : 718-472-0700/2428, 718-729-6000
Fax: + 1(866) 805-8806
Bangladesh Bureau
THIKANA : 70/B, Green Road, (Panthapath), 5th Floor, Dhaka, BD.
E-Mail : [email protected]
For Advertisement : [email protected]