​৯/১১-এর ২৫ বছর

সন্ত্রাসীর ধর্ম আছে কিন্তু অপরাধের দায় কোনো ধর্মের নয়

প্রকাশ : ০৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ২০:৩২ , অনলাইন ভার্সন
২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বরের সকালটি কি শুধুই আমেরিকার ইতিহাসের একটি রক্তাক্ত দিন? না, সেই দিনটি আমেরিকান সমাজে একটি গভীর বিভাজনরেখাও টেনে দিয়েছিল। এক পাশে ছিল ৯/১১-এর আগের আমেরিকা; অন্য পাশে জন্ম নিয়েছিল নিরাপত্তা, সন্দেহ, পরিচয় ও নাগরিক স্বাধীনতা নিয়ে এক নতুন বাস্তবতা। বিশেষ করে, মুসলিম আমেরিকানদের জীবনে এর অভিঘাত ছিল সুদূরপ্রসারী।

সেদিন নিউইয়র্কের গর্ব ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টারের টুইন টাওয়ার যখন আগুনে জ্বলছিল, তখন শুধু দুটি সুউচ্চ ভবনই ভেঙে পড়েনি; এর সঙ্গে নিভে গিয়েছিল প্রায় তিন হাজার মানুষের জীবনপ্রদীপ আর ধূলিসাৎ হয়েছিল অসংখ্য পরিবারের স্বপ্ন। সেই ধ্বংসস্তূপের ধুলো ছড়িয়ে পড়েছিল আমেরিকার রাজনীতি, পররাষ্ট্রনীতি, নিরাপত্তাব্যবস্থা ও সামাজিক সম্পর্কের ওপর। একই সঙ্গে তার দীর্ঘ ছায়া এসে পড়েছিল লাখ লাখ মুসলিম আমেরিকানের জীবনেও, যাদের সঙ্গে ওই সন্ত্রাসী হামলার কোনোই সম্পর্ক ছিল না।

আমরা খুব কাছ থেকে দেখেছি, ভয় কীভাবে মানুষের স্বাভাবিক জীবন বদলে দিয়েছিল। মুসলমানরা এতটাই ভীতসন্ত্রস্ত হয়ে পড়েছিলেন যে, জানমালের নিরাপত্তায় অনেকে আদালতে গিয়ে নিজ নাম থেকে ‘মোহাম্মদ’ শব্দটি বাদ দিতে বাধ্য হয়েছিলেন। মসজিদগুলোতে মুসল্লিদের উপস্থিতি নেমে এসেছিল সর্বকালের সর্বনিম্ন পর্যায়ে। কঠোর নিরাপত্তা, নজরদারি ও চারপাশের সন্দেহ মানুষের চলাফেরা ও সামাজিক জীবনকে সংকুচিত করে তুলেছিল। কর্মক্ষেত্র, বাজার ও জনসমাগমে অনেক পরিচিত মুখ হঠাৎ কমে গিয়েছিল। নিরীহ মুসলিম পরিবারের সদস্যদের মনে বাসা বেঁধেছিল এক অদৃশ্য ভয়— শুধু মুসলিম পরিচয়ের কারণে কখন জানি কী হয়!

প্রবাসী বাংলাদেশিদের কাছে ৯/১১-এর দুঃসহ স্মৃতি অন্যদের তুলনায় কোনো অংশে কম নয়, বরং ক্ষেত্রবিশেষে আরও বেশি বেদনাবিধুর। জ্যাকসন হাইটস, জ্যামাইকা, অ্যাস্টোরিয়া, ব্রুকলিন, ওজন পার্ক কিংবা ব্রঙ্কসের বাংলাদেশি পরিবারগুলোর কাছে এটি দূরের কোনো আন্তর্জাতিক ঘটনা ছিল না। নিউইয়র্ক তাঁদেরও শহর, টুইন টাওয়ার ছিল তাঁদের পরিচিত দিগন্তেরই অংশ। নিহতদের জন্য তাঁরাও ছিলেন শোকে মূহ্যমান। সেদিন আমেরিকা যেমন কেঁদেছিল, বাংলাদেশি আমেরিকানরাও তেমনি কেঁদেছিলেন। আমিও সেই সন্ত্রাসী হামলায় অনেক বন্ধু ও পরিচিতজন হারিয়েছি।

সেই শোকের মধ্যেই মুসলিম অভিবাসীদের সামনে আরেক বাস্তবতা এসে দাঁড়ায়। অমুসলিম প্রতিবেশীরা আমাকে এখন কী চোখে দেখবে? কর্মস্থলে আমার নামটি কি সন্দেহের কারণ হবে? বিমানবন্দরে আমার দাড়ি কিংবা পোশাক কি আমাকে আলাদা নজরদারির মুখে ফেলবে? আমার সন্তানের মুসলিম নামটি কি স্কুলে তাকে অন্যদের থেকে আলাদা করে দেবে? নিজের দেশ আক্রান্ত হওয়ার বেদনার পাশাপাশি এসব প্রশ্নের ভারও বহন করতে হয়েছে অসংখ্য মানুষকে।

ঠিকানা পরিবারও সেই উত্তাল সময়ের বাইরে ছিল না। আমাদের পাঠকদের অনেকের হয়তো মনে আছে, ঠিকানা এবং এর সাংবাদিক-কর্মীদেরও সেদিনগুলোতে নানা বিড়ম্বনা ও হয়রানির মুখোমুখি হতে হয়েছিল। আমাদের ভবনও আক্রান্ত হয়েছিল। আরও নির্মম সত্য হলো, আমাদের নিজেদের কমিউনিটিরই কিছু অসভ্য মানুষ গোপনে প্রশাসনের কাছে মিথ্যা ও বিভ্রান্তিকর তথ্য পৌঁছে দেওয়ায় পুরো ঠিকানা টিমকে অপ্রত্যাশিত হয়রানির মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছিল। ব্যক্তিগত বিদ্বেষ ও সন্দেহ কত দ্রুত একজন নিরপরাধ মানুষকে কতটা ভয়ঙ্কর বিপদের মুখে ঠেলে দিতে পারে, সেদিন আমরা তা খুব কাছ থেকে উপলব্ধি করেছি।

এই অভিজ্ঞতা অবশ্য শুধু বাংলাদেশি মুসলমানদেরই ছিল না। আরব, পাকিস্তানি, ভারতীয়, আফ্রিকানসহ মধ্যপ্রাচ্য ও দক্ষিণ এশীয় বংশোদ্ভূত বহু আমেরিকান মুসলমানের জীবনে ৯/১১-পরবর্তী সময়ে নেমে এসেছিল একই ধরনের ভয় ও অনিশ্চয়তা।

পঁচিশ বছর পরও তাই প্রশ্নটি এখনো প্রাসঙ্গিক— কয়েকজন সন্ত্রাসীর অপরাধের দায় কেনো একটি ধর্মের কোটি কোটি অনুসারী বহন করবে? প্রায় প্রতিটি ধর্মেই উল্লেখ আছে, এক ভাইয়ের অপরাধে অন্য ভাইকে শাস্তি দেওয়া যাবে না, অথবা একই সম্প্রদায়ের গুটিকয় ব্যক্তির অপরাধ পুরো সম্প্রদায়ের ওপর চাপিয়ে দেওয়া যাবে না। যেমন ইসলাম ধর্মাবলম্বীদের পবিত্র গ্রন্থ কোরআনে স্পষ্ট বলা হয়েছে, ‘কেউ অপরের বোঝা বহন করবে না। (সুরা আল-আনআম : ১৬৪)। অর্থাৎ একজনের পাপ বা অপরাধের জন্য অন্য কেউ দায়ী হবে না। খ্রিষ্ট ও ইহুদি ধর্মাবলম্বীদের গ্রন্থ পবিত্র বাইবেলে (ওল্ড টেস্টামেন্ট) বলা আছে, ‘পিতার অপরাধের জন্য সন্তানকে এবং সন্তানের অপরাধের জন্য পিতাকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া যাবে না; প্রত্যেক মানুষকে তার নিজস্ব পাপের জন্যই মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হবে।’ (দ্বিতীয় বিবরণ ২৪:১৬)। সনাতন (হিন্দু) ধর্মেও ‘কর্মফল’ একটি ব্যক্তিগত বিষয়। মহাভারত এবং বিভিন্ন সংহিতায় উল্লেখ আছে, প্রত্যেক মানুষ তার নিজস্ব কর্মের ফল ভোগ করে। একজনের পাপের ফল অন্য কোনো নিরপরাধ ব্যক্তির ওপর বর্তায় না। বৌদ্ধ ধর্মেও ‘কর্ম’ সম্পূর্ণ ব্যক্তিগত। ত্রিপিটক অনুযায়ী, মানুষ তার নিজের কর্মেরই উত্তরাধিকারী। গুটিকয় মানুষের ভুল বা অপরাধের দায় পুরো সমাজ বা সম্প্রদায়ের ওপর চাপানো কর্মবাদের নিয়মের পরিপন্থী।

তাই গুটিকয় ব্যক্তির অপরাধের জন্য পুরো সম্প্রদায়কে দোষারোপ করা কেবল ধর্মীয় বা নৈতিকভাবেই অন্যায় নয়, এটি সামাজিক বিশৃঙ্খলারও জন্ম দেয়।
তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট জর্জ ডব্লিউ বুশ অবশ্য এই বিপদ দ্রুত উপলব্ধি করতে পেরেছিলেন। হামলার মাত্র ছয় দিন পর তিনি ওয়াশিংটনের ইসলামিক সেন্টারে উপস্থিত হয়ে মুসলিম আমেরিকানদের বিরুদ্ধে প্রতিশোধমূলক আচরণ না করার প্রতিশ্রুতি দেন এবং ইসলামকে সন্ত্রাসবাদের সঙ্গে এক করে না দেখার জন্য সবার প্রতি আহ্বান জানান। জাতীয় শোক ও ক্রোধের সেই ভয়ঙ্কর মুহূর্তে তাঁর বার্তাটি ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ— গুটিকয় অপরাধীর অপরাধ দিয়ে একটি ধর্মকে বিচার করা যায় না।

কিন্তু প্রেসিডেন্ট বুশের সেই আহ্বান সমাজের সর্বত্র সমানভাবে প্রতিফলিত হয়নি। এফবিআইয়ের তথ্যের ভিত্তিতে পিউ রিচার্স সেন্টারের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, ২০০০ সালে যুক্তরাষ্ট্রে ২৮টি ইসলামবিরোধী ঘৃণাজনিত অপরাধ নথিভুক্ত হয়েছিল। ২০০১ সালে সংখ্যাটি ১৭ গুণ বেড়ে দাঁড়ায় ৪৮১টিতে। ২০২৫ সালেও ২০৫টি এমন ঘটনা নথিভুক্ত হয়েছে। অর্থাৎ ৯/১১-পরবর্তী তাৎক্ষণিক বিস্ফোরণ কমলেও সমস্যাটি একেবারে বিলীন হয়ে যায়নি।

এর নির্মম উদাহরণগুলোর একটি বলবীর সিং সোধির হত্যাকাণ্ড। ৯/১১-এর মাত্র কয়েক দিনের মধ্যে অ্যারিজোনায় এই শিখ আমেরিকানকে হত্যা করা হয়। পাগড়ি দেখে হত্যাকারী তাঁকে মুসলিম মনে করেছিল। বিদ্বেষের অন্ধত্ব এখানেই—সে মানুষকে জানার আগে তার পরিচয় খোঁজে, কখনো সেই পরিচয়টিও ঠিকমতো জানে না। পঁচিশ বছর পরও মুসলিমদের সম্পর্কে নেতিবাচক ধারণা মার্কিন জনমতের একটি অংশে রয়ে গেছে। পিউ রিচার্স সেন্টারের ২০২৬ সালের জরিপে ৪৩ শতাংশ প্রাপ্তবয়স্ক মার্কিনি বলেছেন, তাঁদের ধারণায় মুসলিমরা অন্য আমেরিকানদের তুলনায় কম দেশপ্রেমিক। ৪২ শতাংশ মনে করেন, দেশের ওপর মুসলিম আমেরিকানদের নেতিবাচক প্রভাব রয়েছে। ২০০২ সালে ২৫ শতাংশ প্রাপ্তবয়স্ক মার্কিন মনে করতেন, ইসলাম অন্য ধর্মের তুলনায় সহিংসতাকে বেশি উৎসাহিত করে; ২০২৬ সালে সেই হার দাঁড়িয়েছে ৫১ শতাংশে।

এখানেই কয়েকটি প্রশ্ন জরুরি। একজন মুসলিম চিকিৎসক যখন রাতভর হাসপাতালে চিকিৎসা দিয়ে একজন আমেরিকানের জীবন বাঁচান, তখন তাঁর দেশপ্রেম কি কম বলা যাবে? একজন বাংলাদেশি অভিবাসী ট্যাক্সি চালিয়ে, ব্যবসা গড়ে, কর দিয়ে এবং সন্তানকে বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়িয়ে এই দেশের অর্থনীতি ও সমাজে অবদান রাখলে তাঁকে আর কতবার নিজের আমেরিকান পরিচয় প্রমাণ করতে হবে? একজন মুসলিম সেনাসদস্য, পুলিশ কর্মকর্তা, শিক্ষক, প্রকৌশলী কিংবা জনপ্রতিনিধিকে শুধু নাম বা ধর্মের কারণে কেন আলাদা করে আনুগত্যের পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে হবে?

আমেরিকার সংবিধান এ প্রশ্নের নীতিগত উত্তর বহু আগেই দিয়েছে। প্রথম সংশোধনী ধর্ম পালনের স্বাধীনতা সুরক্ষিত করে এবং রাষ্ট্রকে কোনো ধর্ম প্রতিষ্ঠা করা থেকে বিরত রাখে। অর্থাৎ নাগরিকের অধিকার তাঁর ধর্মীয় পরিচয়ের ওপর নির্ভরশীল নয়। এখানেই আমেরিকার অন্যতম শক্তি—এই দেশ কোনো একক বর্ণ, ভাষা কিংবা ধর্মের মানুষের নয়। বিশ্বাস, ভাষা ও সংস্কৃতি আলাদা হলেও নাগরিক অধিকারের ভিত্তি সবার জন্য সমান।

বাংলাদেশি অভিবাসীদের ইতিহাসও সেই আমেরিকান গল্পেরই অংশ। কয়েক দশক আগে সীমিত সুযোগ নিয়ে নিউইয়র্কে জীবন শুরু করা বাংলাদেশিদের পরবর্তী প্রজন্ম আজ চিকিৎসা, আইন, শিক্ষা, প্রকৌশল, ব্যবসা, সাংবাদিকতা, সরকারি চাকরি ও জনজীবনের নানা ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠিত। নিউইয়র্কের বহু এলাকায় বাংলা এখন সুপরিচিত ভাষা। বাংলাদেশি ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান, মসজিদ এবং সামাজিক-সাংস্কৃতিক সংগঠন এই মহানগরের বহুজাতিক চরিত্রের অবিচ্ছেদ্য অংশ। এই জনগোষ্ঠী আমেরিকার বাইরে দাঁড়িয়ে নেই—তারাও আমেরিকান। তাঁদের সন্তানদের বড় একটি অংশ এ দেশেই জন্মেছে ও বেড়ে উঠেছে। তারা একই সঙ্গে মুসলিম, বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত এবং আমেরিকান। একটি পরিচয়ের জন্য অন্যটি বিসর্জন দেওয়ার প্রয়োজন নেই। নামাজ কিংবা মুসলিম নাম ধর্মীয় পরিচয়ের বহিঃপ্রকাশ, আইন মেনে নিজের বিশ্বাস ধারণ ও পালনের অধিকার সাংবিধানিক স্বাধীনতারই অংশ। জাতীয় নিরাপত্তার প্রশ্নে অবশ্যই কোনো আপস হতে পারে না। সন্ত্রাসবাদ যে পরিচয়েই আসুক, রাষ্ট্রকে এর বিরুদ্ধে কঠোর হতে হবে। একইভাবে মুসলিম সম্প্রদায়েরও দায়িত্ব ধর্মের নামে উগ্রবাদ, সহিংসতা ও অসহিষ্ণুতাকে দ্ব্যর্থহীনভাবে প্রত্যাখ্যান করা। কিন্তু অপরাধীর বিরুদ্ধে কঠোরতা আর একটি ধর্মীয় জনগোষ্ঠীকে সামষ্টিকভাবে সন্দেহ করা এক বিষয় নয়। অপরাধীর বিচার যেমন নিশ্চিত করতে হবে, নিরপরাধ ব্যক্তির অধিকার রক্ষাও তেমনি রাষ্ট্রের দায়িত্ব। এ দুটির সমন্বয়ই আইনের শাসন।

সাম্প্রতিক বছরগুলোতে যুক্তরাষ্ট্রে মুসলিমবিরোধী বক্তব্য ও তৎপরতাও নতুন করে আলোচনায় এসেছে। সাউদার্ন পোভার্টি ল’ সেন্টারের হিসাবে, ২০২৪ সালে দেশটিতে ৩১টি সংগঠনকে মুসলিমবিরোধী হেট গ্রুপ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছিল। কংগ্রেসে ‘Sharia-Free America Caucus’ গঠনও নতুন বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। এই বাস্তবতায় মুসলিম সম্প্রদায়েরও দায়িত্ব রয়েছে ধর্মীয় স্বাধীনতা চর্চার পাশাপাশি দেশের আইন, নাগরিক শৃঙ্খলা ও সামাজিক সংবেদনশীলতার প্রতি শ্রদ্ধাশীল থাকা। যুক্তরাষ্ট্রের ধর্মনিরপেক্ষ সাংবিধানিক কাঠামোর পরিবর্তে কোনো ধর্মভিত্তিক রাষ্ট্রব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার ধারণা গ্রহণযোগ্য নয়। ধর্মীয় স্বাধীনতা যেমন সাংবিধানিক অধিকার, তেমনি জনপরিসরে অন্য নাগরিকের অধিকার ও স্বাচ্ছন্দ্যের প্রতি সম্মান দেখানোও নাগরিক দায়িত্ব।

তবে ইসলাম বা শরিয়াহর সমালোচনা এবং ধর্মীয় পরিচয়ের কারণে মুসলিমদের সামগ্রিকভাবে সন্দেহ, বিদ্বেষ বা বৈষম্যের লক্ষ্যবস্তু করা এক বিষয় নয়। গণতান্ত্রিক সমাজে এই পার্থক্যটি স্পষ্ট রাখা জরুরি।

আশার জায়গাও আছে। ৯/১১-এর পর সন্দেহ, বৈষম্য ও ইসলামোফোবিয়ার মধ্য দিয়েই মুসলিম আমেরিকানদের নাগরিক ও রাজনৈতিক অংশগ্রহণ উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। ২০০১ সালে মার্কিন কংগ্রেসে একজনও মুসলিম সদস্য ছিলেন না; আজ প্রতিনিধি পরিষদে আছেন চারজন—ইন্ডিয়ানার আন্দ্রে কারসন, মিনেসোটার সোমালি বংশোদ্ভূত ইলহান ওমর, মিশিগানের ফিলিস্তিনি বংশোদ্ভূত রাশিদা তালিব এবং ক্যালিফোর্নিয়ার লতিফাহ সাইমন। মিশিগানে মিসরীয় বংশোদ্ভূত চিকিৎসক ও জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ আবদুল এল-সাইয়েদ ইউএস সিনেটের ডেমোক্র্যাটিক প্রাইমারিতে জয়ী হয়েছেন; নভেম্বরে নির্বাচিত হলে তিনি হবেন আমেরিকার ইতিহাসে প্রথম মুসলিম ইউএস সিনেটর। আর ৯/১১-এর ক্ষত বহনকারী নিউইয়র্কেই ভারতীয় বংশোদ্ভূত জোহরান মামদানি হয়েছেন সিটির প্রথম মুসলিম মেয়র।

CAIR I CAIR Action-এর ২০২৬ সালের ডিরেক্টরি অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রের ২৬টি অঙ্গরাজ্যে অন্তত ২৫৫ জন মুসলিম নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি বিভিন্ন পর্যায়ে দায়িত্ব পালন করছেন। ধর্মের ভিত্তিতে নির্বাচিত কর্মকর্তাদের কোনো কেন্দ্রীয় সরকারি ডেটাবেস না থাকায় এই হিসাব সংগঠন দুটির নিজস্ব গবেষণা ও প্রকাশ্য তথ্যের ভিত্তিতে তৈরি। তবু পরিবর্তনের ছবিটি স্পষ্ট—যে জনগোষ্ঠী ৯/১১-এর পর সন্দেহ ও বিদ্বেষের মুখে পড়েছিল, পঁচিশ বছর পর সেই জনগোষ্ঠীর প্রতিনিধিরা কংগ্রেস থেকে স্টেট লেজিসলেচার ও সিটি হল পর্যন্ত আমেরিকার গণতান্ত্রিক নেতৃত্বে দৃশ্যমান শক্তি।

এই পরিবর্তনের বার্তাটি গুরুত্বপূর্ণ। ঘৃণার জবাব পাল্টা ঘৃণা নয়—অংশগ্রহণ। বিচ্ছিন্নতার উত্তর আরও বিচ্ছিন্নতা নয়—সম্পৃক্ততা। ভুল ধারণা ভাঙার কার্যকর পথ হলো শিক্ষা, সংলাপ এবং সমাজের প্রতিটি স্তরে দৃশ্যমান নাগরিক উপস্থিতি। বাংলাদেশি মুসলিম সম্প্রদায়ের জন্যও এখানে বড় শিক্ষা রয়েছে। নিজেদের কমিউনিটির ভেতরে প্রতিষ্ঠিত হওয়াই যথেষ্ট নয়; স্কুল বোর্ড, স্থানীয় সরকার, আইন, সাংবাদিকতা, শিক্ষা, জনসেবা ও নাগরিক সংগঠনে আরও সক্রিয় হতে হবে। বৃহত্তর আমেরিকান সমাজের সঙ্গে সম্পর্কের পরিধি বাড়াতে হবে। বিশেষ করে, নতুন প্রজন্মকে নিজেদের শিকড় ও ধর্মীয় পরিচয় ধারণ করেই মূলধারার সমাজে নেতৃত্ব ও জনসেবায় এগিয়ে আসতে উৎসাহিত করা প্রয়োজন।

৯/১১-এর ২৫ বছর তাই শুধু অতীতের ক্ষত স্মরণের উপলক্ষ নয়; এটি আমেরিকার নিজের আদর্শের মুখোমুখি দাঁড়ানোর সময়। সন্ত্রাসীর উদ্দেশ্য শুধু প্রাণহানি নয়, ভয় ছড়িয়ে সমাজকে বিভক্ত করাও তার কৌশল। সেই ভয় যদি প্রতিবেশীর ধর্মকে সন্দেহের কারণ বানায় কিংবা একজন নাগরিককে বারবার নিজের দেশপ্রেম প্রমাণ করতে বাধ্য করে, তাহলে সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে লড়াই করতে গিয়েই গণতন্ত্র তার নৈতিক শক্তি হারাতে পারে।

এখানেই রাষ্ট্র, রাজনৈতিক নেতৃত্ব, সংবাদমাধ্যম ও নাগরিক সমাজের দায়িত্ব। জাতীয় নিরাপত্তায় কঠোরতার পাশাপাশি ঘৃণাজনিত অপরাধের বিরুদ্ধে আইনের কার্যকর প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে। স্কুল, বিশ্ববিদ্যালয়, কর্মক্ষেত্র ও উপাসনালয়ে ধর্মীয় স্বাধীনতা ও নিরাপত্তা রক্ষা করতে হবে। সংবাদমাধ্যমকে পরিচয়ের উত্তেজনার বদলে সত্য ও তথ্যকে প্রাধান্য দিতে হবে। রাজনৈতিক নেতৃত্বেরও মনে রাখা প্রয়োজন—ধর্মীয় পরিচয়কে বিভাজনের অস্ত্রে পরিণত করলে তার সামগ্রিক মূল্য শেষ পর্যন্ত পুরো দেশকেই দিতে হয়।

৯/১১-এর ২৫ বছর উপলক্ষে সিএনএনে ফরিদ জাকারিয়ার একটি বিশেষ সাক্ষাৎকার দেখছিলাম। তাঁর সঙ্গে আলোচনায় ছিলেন সিএনএনের জাতীয় নিরাপত্তা বিশ্লেষক পিটার বার্গেন। বার্গেন বলেন, ‘War on Terror’-এ আল-কায়েদাকে দুর্বল করা, ওসামা বিন লাদেনকে হত্যা এবং আইএসের ভূখণ্ডগত নিয়ন্ত্রণ ভেঙে দেওয়ার মতো বড় সামরিক সাফল্য অর্জন করলেও যুক্তরাষ্ট্র সেই বিজয়কে স্থায়ী রাজনৈতিক শান্তিতে রূপ দিতে পারেনি।

বিপরীতে, এসব যুদ্ধে প্রায় ৬ ট্রিলিয়ন ডলার ব্যয় হয়েছে; যুদ্ধফেরত সেনাদের বর্তমান ও ভবিষ্যৎ চিকিৎসা ও অন্যান্য সেবায় আরও প্রায় ২ ট্রিলিয়ন ডলারের দায় তৈরি হয়েছে। সরাসরি যুদ্ধ ও সহিংসতায় প্রাণ হারিয়েছেন লাখো মানুষ। এই অভিজ্ঞতা থেকে আমেরিকার সমাজ ও রাষ্ট্রের প্রতি আমাদের আহ্বান—ভয়, প্রতিশোধ ও সীমাহীন সামরিক হস্তক্ষেপের নীতি থেকে সরে এসে কূটনীতি, জবাবদিহি, মানবাধিকার এবং ন্যায়ভিত্তিক শান্তিকে জাতীয় নীতির কেন্দ্রে স্থান দেওয়া হোক। 

ঠিকানাও তাই মনে করে, ৯/১১-এর ২৫তম বার্ষিকীতে আমেরিকার অঙ্গীকার হওয়া উচিত স্পষ্ট—সন্ত্রাসের বিষয়ে কোনো ছাড় নয়, আবার সন্ত্রাসের অজুহাতে নিরপরাধ নাগরিকের অধিকারেও কোনো হস্তক্ষেপ নয়। ধর্মীয় স্বাধীনতা রাষ্ট্রের দয়া নয়; এটি সাংবিধানিক অধিকার। সেই অধিকার প্রতিটি মুসলিম, খ্রিষ্টান, ইহুদি, হিন্দু কিংবা অন্য যেকোনো ধর্মীয় বিশ্বাসের মানুষের জন্য সমানভাবে কার্যকর রাখাই আমেরিকার গণতান্ত্রিক শক্তির পরীক্ষা।

তাই শান্তিপ্রিয় মানুষের চাওয়া—আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী প্রতিষ্ঠান ঘৃণাজনিত অপরাধের বিরুদ্ধে কঠোর হোক, রাজনৈতিক নেতৃত্ব বিভাজনের ভাষা পরিহার করুক, সংবাদমাধ্যম দায়িত্বশীল হোক এবং নাগরিক সমাজ ধর্ম-বর্ণের সীমা অতিক্রম করে একে অন্যের অধিকারের পাশে দাঁড়াক। একই সঙ্গে মুসলিম আমেরিকানরাও ভোট, শিক্ষা, জনসেবা ও সামাজিক সম্পৃক্ততার মাধ্যমে নিজেদের নাগরিক উপস্থিতিকে আরও শক্তিশালী করুক।

টুইন টাওয়ার ২৫ বছর আগে ভেঙে পড়েছিল। আমেরিকার ন্যায়বিচার, বহুত্ব ও স্বাধীনতার স্তম্ভ যেন কোনো দিন না ভাঙে—৯/১১-এর পঁচিশ বছর পর এটিই হোক আমেরিকার অঙ্গীকার এবং আমাদের সম্মিলিত আহ্বান।
লেখক : সম্পাদকমণ্ডলীর সভাপতি, ঠিকানা এবং সাবেক সংসদ সদস্য।
Thikana
M M Shahin, Chairman, Board of Editors, Thikana
Corporate Headquarter
THIKANA : 7409 37th Ave suite 403 Jackson Heights, NY 11372
Phone : 718-472-0700/2428, 718-729-6000
Fax: + 1(866) 805-8806
Bangladesh Bureau
THIKANA : 70/B, Green Road, (Panthapath), 5th Floor, Dhaka, BD.
E-Mail : [email protected]
For Advertisement : [email protected]