স্মৃতির আলপনায় আঁকা

প্রকাশ : ১৪ অগাস্ট ২০২৫, ১৩:৪২ , অনলাইন ভার্সন
আমার বয়স তখন দশ-এগারো বছর। সে সময় আমি প্রতিবছর মায়ের সঙ্গে ঢাপরকাঠি যেতাম। বরিশাল থেকে লঞ্চে যেতে হতো। আমার বোন সাজু, আমি আর মা যেতাম। বরিশাল থেকে দুপুর বারোটায় লঞ্চটা ছাড়ত। ঠিক চারটায় লঞ্চটা ঢাপরকাঠি ঘাটে ভিড়ত। আবার পটুয়াখালী থেকে ছেড়ে এসে ঢাপরকাঠি ঘাটে ভিড়ত দুপুর বারোটায়। আমি সব সময় লঞ্চের সামনে দাঁড়িয়ে থাকতাম। হেল্পার আমাকে বারবার পেছনে চলে যেতে বলত। সেফটির জন্য হয়তো-বা। যদি আমি নদীতে পড়ে যাই! মাও বারবার বলতেন, জসিম, ভেতরে আয়। আমি তাও যেতে চাইতাম না। ছোট ছোট ঢেউ ভেঙে কীভাবে লঞ্চটা যায়, সেটা আমি মুগ্ধ হয়ে দেখতাম। তারপর ঢেউটা বড় হয়ে পাড়ে গিয়ে আছড়ে পড়ে। ছোট ছোট নৌকাগুলো কেমন দোল খেতে থাকে, নদীতে নাইতে নামা ছোট ছোট বাচ্চারা কেমন উচ্ছ্বসিত হয়, গ্রামের বধূরা তাদের কাঁখের কলসি কীভাবে সামাল দেয়Ñসেসব চোখভরে দেখি আমি। সারেং লঞ্চটাকে কেমন নিখুঁতভাবে কন্ট্রোল করে অবাক লাগে। লঞ্চের ককপিট থেকে দড়িতে টান দিলে নিচে ইঞ্জিনরুমে ঘণ্টি বেজে ওঠে। কোন ঘণ্টায় কী সংকেত, তা ইঞ্জিনরুমের মাস্টার বুঝতে পারে। কখন স্পিড দিতে হবে, কখন ব্যাকে যেতে হবে, সব বোঝা যায়। সাধারণত শীতের সময় যেতাম আমরা। ধানপান যা হতো, সেগুলো তদারকির জন্যই মাকে যেতে হতো। নানা-নানিকে আমি দেখিনি। আমি আমার দাদা-দাদিকেও দেখিনি। আমি কি একটু ভাগ্যহত! কে জানে তখন এসব নিয়ে মাথা ঘামাইনি। লঞ্চটা যখন ঘাটে ভিড়ত, তখন প্রায় বিকেল। লঞ্চের সুকানি সিঁড়ি ফেলত এবং একটা লগি দিত ধরে ধরে নামার জন্য। লঞ্চ থেকে নেমে এমন ভালো লাগত। চার ঘণ্টার জার্নি হলেও মনে হতো কত দূর দেশে এসে পড়েছি। সামনেই সবুজ ক্ষেত। কলাই আর সরষে ফুল। কয়েক দিন আগেই আমন ধান উঠে গেছে। সেখানে সরষে বোনা হয়েছে। আমরা এক মাইল দেড় মাইল ধানি জমির ভেতর দিয়ে আইল ধরে হেঁটে মামাবাড়ি চলে যেতাম। আমার তিন মামা ছিলেন। মামারা তালুকদার বংশ বলে একটু দাপুটে ছিল তল্লাটে। আমরা শহর থেকে এসেছি, আমাদের অন্য রকম খাতির ছিল। তিন মামার অগুনিত ছেলেমেয়ে। বিশাল বাড়ির মধ্যে আমি ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকি। সব বয়সী মামাতো ভাইদের সঙ্গে খেলা করি। কারও কারও সঙ্গে মারামরি লাগে ছোটখাটো ব্যাপার নিয়ে। কেউ কেউ আমাকে ঈর্ষা করে। তার কারণ সববয়সী মামাতো বোনরা আমাকে ঘিরে থাকে। একটু বড়রা আমার গাল টেনে দেয় অকারণে। আমি দেখতে নাদুসনুদুস ছিলাম বলে এই অত্যাচার সহ্য করি। শীতের রাতে খেজুরগাছের হাঁড়ি থেকে রস পেড়ে খাই। ফ্রেশ কাঁচা রস। তালগাছে একধরনের পাতা হতো, তা দিয়ে ঘুড়ি ওড়াই। আর শীতের রাতে সেদ্ধ ধানের যে পালা করা হতো, তার মধ্যে টং বানিয়ে ওম ওম গরমে ঘুমাই। আহা ওরকম সুন্দর বিছানায় আর কোনো দিন ঘুমাইনি।

আমি খুব ঘুড়িপাগল ছিলাম। যখন ঘুড়িগুলো আকাশে ছোটাছুটি করত, তখন আমার মধ্যে অদ্ভুত একটা শিহরন হতো। ওই মুক্ত নীলাকাশে ঘুড়ি উড়ছে! আহা মানুষের জীবন যদি ওরকম হতো! শুধু উড়ত! একবার একটা ঘুড়ি ছিল আমার, ঘুড়িটা আমি কিনিনি। কোথা থেকে ঘুড়িটা বোকাট্টা হয়ে বাঁক খেতে খেতে আমাদের ঘরের চালের ওপর আছড়ে পড়ল। আমি সব সময় নজর রাখতাম কখন কোথা থেকে কেটে যাওয়া ঘুড়ি আসবে। ঘুড়িটাকে আমি লুফে নিলাম, সঙ্গে পেলাম মাঞ্জা দেওয়া সুতো। এরপর আমি ওই ঘুড়িটা নিয়ে মেতে উঠলাম। স্কুল থেকে এসেই ছুটে যাই মাঠে ঘুড়ি নিয়ে। মায়ের বকা খাই, বাড়ির মুরব্বিরা বলে বখে গেছি কিন্তু কে শোনে কার কথা! একবার কী হলো, আমি ঘুড়িটার সুতো ছিঁড়ে দিলাম, মুক্তি দিয়ে দিলাম। দেখলাম ঘুড়িটা মুক্তির আনন্দে আকাশে কয়েকটা ডিগবাজি খেল, তারপর হেলেদুলে রাজকীয় ভঙ্গিতে আরও দূর আকাশে হারিয়ে যেতে থাকল। একসময় ওটা দৃষ্টির আড়ালে চলে গেল। ঘুড়িটার জন্য এখনো আমার মন খারাপ লাগে! আমি নিজেও একটা ঘুড়ি।

তখনো আমি রবীন্দ্রনাথ, নজরুল বা জীবনানন্দ পড়তে শুরু করিনি। হয়তো নামও শুনিনি। গল্প-উপন্যাসের চরিত্র কেমন করে তৈরি করে, তাও জানি না। গল্পের চরিত্ররা কীভাবে এত জীবন্ত হয়, হাসে কাঁদে ভেবে বিস্মিত হতাম! বরিশালের নৈঃশব্দ্য আর সবুজে ঘেরা প্রকৃতির মধ্যে আমার বেড়ে ওঠা। সবাই যখন খেলাধুলা নিয়ে ব্যস্ত থাকত, আমি তখন দলছুট হয়ে একা একা বনেবাদাড়ে ঘুরে বেড়াই। নির্জন দুপুরে ঘুঘু বা ঝিঁঝি পোকার একটানা ডাক শুনি। লাইব্রেরি থেকে দু-একটি বই এনে পড়ি। বই পড়ে অবচেতনে নিজেকে নিয়ে নিজের প্রশ্ন জাগে। নিজেকে চিনতে ইচ্ছে করে। কে আমি, কেন এই জীবন, কেন জন্ম, আবার কেনই-বা মৃত্যু-এসব নানা আত্মজিজ্ঞসা আমাকে ব্যাকুল করে তুলতে লাগল। বস্তুত, বালক বয়সটা পেরোনোর পরই মানবমনের নানা রহস্য আমাকে উন্মাতাল করে তোলে। তখন থেকেই বুঝেছি, মানুষ সব সময় একা। বারো-তেরো বছর বয়সে আমি বিস্মিত হয়ে অনেক কিছু লক্ষ করতাম। নারী-পুরুষের মধ্যকার বিভাজনগুলো আমাকে ভাবিয়ে তুলত। নারীদের লক্ষ করতাম। মনে হতো কী যেন এক অপার রহস্য আছে নারীর মধ্যে। কী সেই রহস্য! কেন চুম্বকের মতো শুধু টানে! খুব জানতে ইচ্ছে করত আমার। শরীর ও মনে অদ্ভুত এক অনুভূতি হতো। এক আলো-আঁধারি রহস্য খেলা করত। একদিন সমবয়সী একটি মেয়ে বলল, এই তুমি কী দেখো হাঁ করে, অসভ্য! তার কপট অসভ্য কথাটার মধ্যে তেমন গুরুতর কোনো অসভ্যতা ছিল না। তার চোখেও ছিল এক রহস্যময়তা। ঠিক বুঝতে পারতাম না, কী সেটা। কৈশোরে দেখা নারীর সেই রহস্য আজও ভেদ করা সম্ভব হয়নি। আজও তা রহস্যই রয়ে গেছে। একজন নারীর সঙ্গে দীর্ঘ বছর একসঙ্গে থেকেও কি রহস্য ভেদ করতে পেরেছি! পারিনি। সে কি আমার মনের রহস্য জানে! জানে না। কেউ কাউকে বোঝে না। একমাত্র মা-ই আমাকে বুঝতে চেষ্টা করতেন কিন্তু বুঝতে পারতেন না। আজ এতটা বয়স পেরিয়ে এসেও একাই রয়ে গেছি। এক আশ্চর্য কৈশোর পেরিয়ে আসার পরও আমার একাকিত্ব ঘোচেনি। যত দিন যাচ্ছে ততই একাকিত্ব ঘিরে ধরছে আরও। ভাইবোন, আত্মীয়-পরিজন এসব প্রকৃতপক্ষে স্বার্থের সম্পর্ক। স্বার্থের ব্যত্যয় ঘটলেই বোঝা যায় সম্পর্কের গভীরতা কতটুকু। আমি কখনো কারও কাছে কিছু চাইনি। তার পরও আমি অনেক কিছু ধরে রাখতে পারিনি, অনেক হারিয়েছি, দূরের হয়ে গেছি। আমি অন্যদের মতো হতে পারিনি। সেই বালক বয়স থেকেই আমি একাকী, দলছুট, ছন্নছাড়া, অভিমানী, জেদি। আমি তখন থেকেই বুঝতে পেরেছিলাম আমার জীবন হবে একাকী পথ চলার। এমনকি স্ত্রী-সন্তান-সংসার এসবও হচ্ছে একটা আশ্চর্য খেলাঘর, একটা মায়া। শেষ পর্যন্ত মানুষ একাই। মানুষ অনেক স্বপ্ন দেখে, স্বপ্ন দেখায়, প্রেম-ভালোবাসা বা বন্ধুত্বের কথা বলে কিন্তু তার পরও কোথায় যেন সেই শূন্যতা রয়েই গেছে। একদিন শূন্য মন নিয়ে ঘর ছেড়েছিলাম, আজও পথ চলছি একা একা। যেখান থেকে শুরু হয়েছিল আশ্চর্য কৈশোর, সেখানেই শেষ হবে একদিন।

আমাকে মাছের সঙ্গে তুলনা করা যায়। আমাকে কেউ সাঁতার শেখায়নি। জীবনের সবকিছুই আমি নিজে নিজে শিখেছি। আমি হচ্ছি সেলফ মেইড। এ কারণে আমার অনেক ত্রুটি-বিচ্যুতি আছে। অনেক সীমাবদ্ধতা আছে। আমি আমার ত্রুটিগুলোকে মেনে নিয়েছি। মা ছাড়া আমার কোনো মেন্টর ছিল না। সাঁতারও আমি একা একাই শিখেছিলাম। এখনো আমি যখন সুইমিং পুলে নামলে পার হতে পারব এমাথা থেকে ওমাথা। আমাদের চারটি বাড়িতে প্রায় দশটি পুকুর ছিল। পাশেই বয়ে গেছে খাল। একসময় সেই পুকুর আর খালে পানি ছিল ভরভরন্ত। জোয়ারের ঘোলা পানিতে নেমে ঘণ্টার পর ঘণ্টা সাঁতরেছি। কাঠের পুল (মল্লিক বাড়ির পুল হিসেবে শহরে সবাই চিনত) থেকে ডাইভ দিতাম পানিতে। আর বাড়িতে যে বড় পুকুরটা ছিল, সেখানেও স্কুল থেকে এসেই ঝাঁপিয়ে পড়তাম। মা এসে টেনে তুলতেন। চোখ লাল আর চামড়া সাদা হয়ে যেত। এখন সেই পুকুর আর খাল কেমন শীর্ণকায় হয়ে গেছে। মন খারাপ হয়ে যায়। মানুষের সবকিছু বদলে যায়। এখন আর পুকুর বা খালে নাইতে নামার রেওয়াজ নেই। এখন ঘরে ঘরে শাওয়ার করার ব্যবস্থা আছে। বাথটাব আছে। বড় লোকেরা জাকুজিতে গরম পানিতে শুয়ে ওয়াইন খায়। বাথরুমে থরে থরে সাজানো থাকে নানা পদের লোশন, সাবান, শ্যাম্পু, কন্ডিশনার, পেস্ট, ব্রাশ, মাউথ ওয়াশ কি না। দেখলে মাথা খারাপ হয়ে যায়। আমি প্রায়ই বডি লোশনের পরিবর্তে শ্যাম্পু গায়ে মাখি, কারণ তখন চশমা থাকে না যে! ছোটবেলায় কত কাদা পানিতে সাঁতার কেটেছি। যখন নাওয়া শেষে উঠতাম, দেখতাম গায়ে কাদা লেগে আছে। কত দিন পরপর সাবান দিতাম, কে জানে। মনে আছে, তিব্বত ৫৭০ সাবান পেলেই খুশিতে ডগমগ হতাম। জীবনে অনেক কিছুই বদলে যায় কিন্তু স্মৃতিগুলো থেকে যায়। আমি যখন যেটা ফেলে আসি, সেটাই মিস করি। যখন বরিশাল ছেড়ে ঢাকা চলে গিয়েছিলাম, তখন বরিশালের সব মিস করতাম। বাড়িতে আমার শোয়ার চৌকি, পড়ার টেবিল, আমার কাছে লেখা বন্ধুদের চিঠি, আমার সংগৃহীত বিচিত্রা, পূর্বাণী, চিত্রালি, গল্পের বই এগুলো মিস করতাম। সকালে ঘুম থেকে উঠে মায়ের হাতের বানানো চিতই পিঠা বা ছিটা পিঠা মিস করতাম। আমাদের বাড়ির পাশেই খাল, আমাদের পুকুর, খেলার মাঠ, আমাদের নিজস্ব পাঠাগার, বাড়ির সবাইÑযাদের সঙ্গে বেড়ে উঠেছি, ঝগড়া করেছি, খেলেছিÑহান্নান, নিজাম, হাসিব, মনু, মিজানুর, নোমান, হাবলু, রিয়াজ, মিলি, নিনা, রুবি, শেলি ওদের মিস করতাম। আমি আমার বিড়ালটাকেও মিস করি। একটা ছাগলের বাচ্চা ছিল তাকেও। গাছভরা যে লিচু হতো, জাম হতো, চালতা, আমলকী, বরই, বেল, তাল সেসব মিস করি। (চলবে)
 
M M Shahin, Chairman Board of Editors, Thikana

Corporate Headquarter :

THIKANA : 7409 37th Ave suite 403

Jackson Heights, NY 11372

Phone : 718-472-0700/2428, 718-729-6000
Fax: + 1(866) 805-8806



Bangladesh Bureau : THIKANA : 70/B, Green Road, (Panthapath),
5th Floor, Dhaka- 1205, Bangladesh.
Mobile: 01711238078