চীনা জে-১০সিই যুদ্ধবিমান কিনছে বাংলাদেশ: কেন উদ্বিগ্ন ভারত?

প্রকাশ : ২০ জুন ২০২৬, ১০:৪৩ , অনলাইন ভার্সন
বাংলাদেশ বিমান বাহিনীর ইতিহাসে অন্যতম বড় সামরিক আধুনিকায়ন কর্মসূচির অংশ হিসেবে চীনের তৈরি ২০টি ‘জে-১০সিই’ মাল্টিরোল যুদ্ধবিমান কেনার উদ্যোগ দক্ষিণ এশিয়ার ভূরাজনীতিতে নতুন আলোচনার জন্ম দিয়েছে। প্রায় ২ দশমিক ২ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের এই সম্ভাব্য চুক্তিকে শুধু একটি প্রতিরক্ষা ক্রয় হিসেবে দেখছে না আঞ্চলিক শক্তিগুলো; বরং এটি বঙ্গোপসাগর ও দক্ষিণ এশিয়ার নিরাপত্তা সমীকরণে একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনের ইঙ্গিত হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

আন্তর্জাতিক প্রতিরক্ষা বিষয়ক সাময়িকী ডিফেন্স সিকিউরিটি এশিয়া সম্প্রতি প্রকাশিত এক বিশ্লেষণে বলেছে, বাংলাদেশের এই সিদ্ধান্ত ভারতের নিরাপত্তা পরিকল্পনাকারীদের মধ্যে নতুন উদ্বেগ তৈরি করেছে। বিশেষ করে চীনের সঙ্গে বাংলাদেশের ক্রমবর্ধমান সামরিক সহযোগিতাকে নয়াদিল্লি কৌশলগত দৃষ্টিকোণ থেকে পর্যবেক্ষণ করছে।

বিমান বাহিনীর আধুনিকায়নের নতুন ধাপ
বাংলাদেশ বিমান বাহিনীর দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়ন পরিকল্পনা ‘ফোর্সেস গোল ২০৩০’-এর অন্যতম লক্ষ্য হলো পুরোনো যুদ্ধবিমান প্রতিস্থাপন করে আধুনিক আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তোলা। বর্তমানে বিমান বাহিনীর বহরে থাকা এফ-৭ সিরিজের যুদ্ধবিমান ধীরে ধীরে অবসরে যাচ্ছে এবং সীমিত সংখ্যক মিগ-২৯ দিয়ে আধুনিক যুদ্ধক্ষেত্রের চাহিদা পূরণ করা কঠিন হয়ে পড়েছে।

এই বাস্তবতায় জে-১০সিই যুদ্ধবিমানকে একটি যুগান্তকারী সংযোজন হিসেবে দেখা হচ্ছে। চুক্তির আওতায় যুদ্ধবিমানের পাশাপাশি প্রশিক্ষণ, অস্ত্র ব্যবস্থা, রক্ষণাবেক্ষণ, খুচরা যন্ত্রাংশ এবং প্রযুক্তিগত সহায়তাও অন্তর্ভুক্ত থাকবে বলে জানা গেছে।

প্রতিরক্ষা বিশ্লেষকদের মতে, সহজ কিস্তিতে দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়নের সুযোগ পাওয়ায় বাংলাদেশের জন্য এই প্রকল্প বাস্তবায়ন তুলনামূলক সহজ হবে। ফলে জাতীয় অর্থনীতির ওপর তাৎক্ষণিক বড় চাপ ছাড়াই বিমান বাহিনীর সক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ানো সম্ভব হবে।

কেন বিশেষ জে-১০সিই?
চীনের চেংদু এয়ারক্রাফট করপোরেশন নির্মিত জে-১০সিইকে ৪.৫ প্রজন্মের উন্নত মাল্টিরোল যুদ্ধবিমান হিসেবে বিবেচনা করা হয়। এটি আকাশ থেকে আকাশে এবং আকাশ থেকে ভূমিতে হামলা পরিচালনায় সমানভাবে সক্ষম।
বিমানটিতে রয়েছে অত্যাধুনিক অ্যাকটিভ ইলেকট্রনিক্যালি স্ক্যানড অ্যারে (এইএসএ) রাডার, উন্নত ইলেকট্রনিক যুদ্ধ ব্যবস্থা এবং নেটওয়ার্ক-কেন্দ্রিক যুদ্ধ পরিচালনার সক্ষমতা। সবচেয়ে আলোচিত বিষয় হলো এর সঙ্গে যুক্ত পিএল-১৫ (পিএল-১৫) দূরপাল্লার এয়ার-টু-এয়ার ক্ষেপণাস্ত্র, যা বর্তমানে বিশ্বের অন্যতম শক্তিশালী বিয়ন্ড-ভিজ্যুয়াল-রেঞ্জ অস্ত্র হিসেবে বিবেচিত।
২০২৫ সালে ভারত-পাকিস্তানের সীমিত আকাশযুদ্ধ ‘অপারেশন সিন্দুর’-এ পাকিস্তান বিমান বাহিনীর জে-১০সি ব্যবহারের পর আন্তর্জাতিক মহলে বিমানটির কার্যকারিতা নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়। সেই প্রেক্ষাপটেও বাংলাদেশের আগ্রহ বেড়েছে বলে মনে করছেন পর্যবেক্ষকরা।

কেন উদ্বিগ্ন ভারত?
ভারতের দৃষ্টিকোণ থেকে উদ্বেগের মূল কারণ শুধু যুদ্ধবিমান নয়, বরং এর পেছনের কৌশলগত বাস্তবতা।
ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলকে মূল ভূখণ্ডের সঙ্গে সংযুক্ত করেছে মাত্র কয়েক কিলোমিটার প্রশস্ত শিলিগুড়ি করিডোর, যা ‘চিকেনস নেক’ নামে পরিচিত। ভারতীয় সামরিক পরিকল্পনাবিদরা দীর্ঘদিন ধরেই এই করিডোরকে দেশের অন্যতম সংবেদনশীল নিরাপত্তা অঞ্চল হিসেবে বিবেচনা করেন।

বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলে আধুনিক যুদ্ধবিমান মোতায়েন হলে তা সরাসরি সামরিক হুমকি না হলেও ভারতের নিরাপত্তা পরিকল্পনায় নতুন হিসাব-নিকাশ যোগ করবে। বিশেষ করে চীন, পাকিস্তান ও বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্কের পরিবর্তনশীল বাস্তবতা নিয়ে ভারতীয় নিরাপত্তা মহলে আলোচনা ক্রমেই বাড়ছে।
ভারতের প্রতিরক্ষা প্রধান জেনারেল অনিল চৌহান অতীতে দক্ষিণ এশিয়ায় পরিবর্তিত কৌশলগত পরিবেশ নিয়ে সতর্ক মন্তব্য করেছিলেন। যদিও বাংলাদেশ বারবার বলেছে, তার প্রতিরক্ষা আধুনিকায়ন কোনো দেশের বিরুদ্ধে নয় এবং এটি সম্পূর্ণভাবে জাতীয় নিরাপত্তা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষার অংশ।

চীনের প্রভাব আরও বাড়ছে
বর্তমানে বাংলাদেশের সামরিক সরঞ্জামের বড় অংশই চীন থেকে আসে। সাবমেরিন, ট্যাংক, ফ্রিগেট, ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবস্থা এবং বিভিন্ন সামরিক প্রযুক্তি সরবরাহের মাধ্যমে চীন ইতোমধ্যে বাংলাদেশের প্রতিরক্ষা খাতে গুরুত্বপূর্ণ অবস্থান তৈরি করেছে।
জে-১০সিই চুক্তি বাস্তবায়িত হলে দুই দেশের সামরিক সম্পর্ক আরও গভীর হবে। কারণ যুদ্ধবিমান পরিচালনা, প্রশিক্ষণ, সফটওয়্যার আপডেট, অস্ত্র সংযোজন এবং দীর্ঘমেয়াদি রক্ষণাবেক্ষণের জন্য বাংলাদেশকে বহু বছর চীনের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করতে হবে।

ঢাকা-দিল্লি সম্পর্কের নতুন বাস্তবতা
বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে বাণিজ্য, সীমান্ত নিরাপত্তা, বিদ্যুৎ, যোগাযোগ ও আঞ্চলিক সহযোগিতার ক্ষেত্রগুলো এখনও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে তিস্তার পানি বণ্টন, সীমান্ত হত্যা, ট্রানজিট এবং আঞ্চলিক কূটনীতির বিভিন্ন ইস্যুতে দুই দেশের মধ্যে কিছু দূরত্ব তৈরি হয়েছে বলে বিশ্লেষকদের অভিমত।

এই প্রেক্ষাপটে চীনের সঙ্গে বাংলাদেশের বৃহৎ প্রতিরক্ষা চুক্তি নয়াদিল্লির নজর কাড়ছে। যদিও ঢাকা আনুষ্ঠানিকভাবে বলে আসছে যে, বাংলাদেশ ‘সবার সঙ্গে বন্ধুত্ব, কারও সঙ্গে বৈরিতা নয়’ নীতিতেই অটল রয়েছে।

দক্ষিণ এশিয়ার নিরাপত্তা রাজনীতিতে নতুন অধ্যায়
বিশেষজ্ঞদের মতে, জে-১০সিই যুদ্ধবিমান সংগ্রহের উদ্যোগ বাংলাদেশের প্রতিরক্ষা সক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়াবে। একই সঙ্গে এটি বঙ্গোপসাগর অঞ্চলে চীনের উপস্থিতিকে আরও দৃশ্যমান করবে এবং দক্ষিণ এশিয়ার কৌশলগত প্রতিযোগিতাকে নতুন মাত্রা দেবে।
ফলে আগামী কয়েক বছরে দক্ষিণ এশিয়ার নিরাপত্তা পরিবেশ আরও প্রতিযোগিতামূলক হয়ে উঠতে পারে, যেখানে প্রতিটি দেশের সামরিক আধুনিকায়ন এবং কূটনৈতিক অবস্থান আঞ্চলিক শক্তির ভারসাম্য নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে।

ঠিকানা/এসআর
Thikana
M M Shahin, Chairman, Board of Editors, Thikana
Corporate Headquarter
THIKANA : 7409 37th Ave suite 403 Jackson Heights, NY 11372
Phone : 718-472-0700/2428, 718-729-6000
Fax: + 1(866) 805-8806
Bangladesh Bureau
THIKANA : 70/B, Green Road, (Panthapath), 5th Floor, Dhaka, BD.
E-Mail : [email protected]
For Advertisement : [email protected]