​ফারাক্কা থেকে ফেনী: নদী আগ্রাসন ও সমাধানের পথ

প্রকাশ : ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১৭:২১ , অনলাইন ভার্সন
বাংলাদেশ নদীমাতৃক দেশ। এই ভূখণ্ডের ইতিহাস, অর্থনীতি, কৃষি, সংস্কৃতি এবং পরিবেশ সবকিছুই নদীকেন্দ্রিক। অথচ পরিহাস হলো, যে নদীগুলো বাংলাদেশের জীবনরেখা, তাদের অধিকাংশের উৎস দেশের বাইরে। বাংলাদেশের মোট ৫৭টি আন্তসীমান্ত নদীর মধ্যে ভারতের সঙ্গে ৫৪টি আন্তসীমান্ত নদী রয়েছে, যেগুলোর ওপর বাংলাদেশের কৃষি, পরিবেশ, নৌপরিবহন, মৎস্যসম্পদ এবং কোটি মানুষের জীবন-জীবিকা নির্ভরশীল। ফলে উজানের রাষ্ট্র হিসেবে ভারতের যেকোনো পানি ব্যবস্থাপনার সিদ্ধান্ত সরাসরি বাংলাদেশের কৃ যি, পরিবেশ, অর্থনীতি ও জনজীবনের ওপর প্রভাব ফেলে। কিন্তু স্বাধীনতার পর থেকে, বিশেষ করে উজানে ভারতের বিভিন্ন বাঁধ, ব্যারাজ, পানি প্রত্যাহার প্রকল্প এবং একতরফা নদী ব্যবস্থাপনার কারণে বাংলাদেশ ক্রমাগত পানিবৈষম্যের শিকার হয়েছে। এই বাস্তবতাকে বিশেষজ্ঞরা 'নদী আগ্রাসন' বলে অভিহিত করেন। ফারাক্কা ব্যারাজ থেকে শুরু করে তিস্তা, গোমতী, মনু, খোয়াই, মুহুরী এবং সাম্প্রতিক ফেনী নদীর পানি ব্যবহার নিয়ে বিতর্ক সবকিছুই সেই দীর্ঘ ইতিহাসের অংশ। দেশের জনগণের মধ্যে একটি প্রশ্ন ক্রমেই জোরালো হয়েছে: দুই দেশের মধ্যে প্রতিবেশীসুলভ সহযোগিতা কি সত্যিই বিদ্যমান, নাকি বাংলাদেশ বছরের পর বছর ধরে একটি অসম জল-রাজনীতির শিকার?

বাংলাদেশ-ভারতের মধ্যে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক নিয়ে এত আলোচনা সত্ত্বেও পানি ইস্যুতে দুই দেশের মধ্যে ন্যায়সংগত কোনো সম-াধান আসেনি। ভারত মুখে যতই বন্ধুত্বের কথা বলুক, বাস্তবতা হলো উজানের দেশ ভারত তার ভূরাজনীতি, আঞ্চলিক কৌশলগত নিরাপত্তা ও নিজের দেশের উন্নয়নকে অগ্রাধিকার দিচ্ছে, যেখানে ভাটির দেশ প্রতিবেশী বাংলাদেশের অধিকার ও উদ্বেগ ভারতের কাছে সব সময় গৌণ থেকে যায়। আন্তর্জাতিক নদী আইনের অন্যতম নীতি হলো, অভিন্ন নদীর পানি ন্যায্য ও যৌক্তিকভাবে ব্যবহার করা। কিন্তু বাস্তবে দক্ষিণ এশিয়ায় শক্তির ভারসাম্য এতটাই অসম যে বাংলাদেশের মতো ছোট রাষ্ট্রের পক্ষে নিজের অধিকার আদায় কঠিন হয়ে দাঁড়ায়। ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের পানি নবণ্টন ইস্যুতেও এর প্রতিফলন ঘটে। বাংলাদেশ-ভারত আন্তসীমান্ত নদীর পানি নবণ্টন ও বাংলাদেশের ন্যায্য হিস্যা দেওয়ার ক্ষেত্রে ভারত কখনো আন্তর্জাতিক ন্যায্যতার নীতির তোয়াক্কা করেনি। বাংলাদেশের কাছে বিষয়টি কেবল পানিবণ্টনের সমস্যা নয়: বরং এটি ন্যায্য অধিকার, পরিবেশগত নিরাপত্তা এবং আন্তর্জাতিক আইনের প্রশ্ন। কারণ আন্তর্জাতিক নদীর ক্ষেত্রে একটি উজান রাষ্ট্র যখন ভাটির রাষ্ট্রের স্বার্থ যথাযথভাবে বিবেচনায় না নিয়ে একতরফ-ভাবে পানি ব্যবহার বা প্রবাহ নিয়ন্ত্রণ করে, তখন তার বিরূপ প্রভাব বহন করতে হয় নিম্ন অববাহিকার দেশকে। আন্তর্জাতিক নদী আইনের আলোকে বিচার করলে বাংলাদেশের উদ্বেগ ও দাবির যথেষ্ট আইনি ভিত্তি রয়েছে।

ফারাক্কা নদী আগ্রাসনের সূচনা

বাংলাদেশের পানি সংকটের আলোচনায় সর্বপ্রথম যে নামটি আসে, তা হলো ফারাক্কা ব্যারেজ। ১৯৭৫ সালে ভারত গঙ্গার পানি হুগলি নদীতে প্রবাহিত করার উদ্দেশ্যে ফারাক্কা ব্যারাজ চালু করে। ভারতের যুক্তি ছিল, গঙ্গার পানি হুগলি নদীতে প্রত্যাহারের মাধ্যমে কলকাতা বন্দরের নাব্যতা রক্ষা করা সম্ভব হবে। কিন্তু এই প্রকল্পের প্রভাব সবচেয়ে বেশি পড়ে নিম্ন অববাহিকার দেশ বাংলাদেশে। শুষ্ক মৌসুমে গঙ্গার প্রবাহ উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যায়। এর ফলে বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে নদীর নাব্যতা হ্রাস, কৃষি উৎপাদন ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া, ভূগর্ভস্থ পানির স্তর নিচে নেমে যাওয়া, মৎস্যসম্পদের ক্ষতি এবং বাগেরহাট, খুলনা, সাতক্ষীরার বিস্তীর্ণ অঞ্চলে লবণাক্ততা বৃদ্ধি প্রায়। বিশেষ করে, সুন্দরবন অঞ্চলের পরিবেশগত ভারসাম্য মারাত্মকভাবে ঝুঁকির মুখে পড়েছে। মিঠাপানির প্রবাহ কমে যাওয়ার কারণে সুন্দরবন দীর্ঘমেয়াদি ঝুঁকির মুখে পড়েছে। নদীভাঙন, পলি জমার ধরন পরিবর্তন এবং জীববৈচিত্র্যের ক্ষয়ও এ সংকটের সঙ্গে সম্পৃক্ত। বাংলাদেশ বহুবার দাবি করেছে, আন্তর্জাতিক নদীর পানি ব্যবস্থাপনায় উজান ও ভাটির দেশগুলোর স্বার্থ সমানভাবে বিবেচনা করা উচিত। বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে ১৯৯৬ সালে গঙ্গা পানিচুক্তি স্বাক্ষরিত হলেও মূল সমস্যার স্থায়ী সমাধান হয়নি। কারণ চুক্তিটি গঙ্গার নির্দিষ্ট অংশের পানিবণ্টন নিয়ে হলেও আন্তসীমান্ত নদীগুলোর সমন্বিত ব্যবস্থাপনার প্রশ্নে কোনো কার্যকর কাঠামো গড়ে ওঠেনি। ফারাক্কা প্রকল্পের পরিকল্পনা ও বাস্তবায়নের সময় ভাটির দেশ হিসেবে বাংলাদেশের স্বার্থকে পর্যাপ্ত গুরুত্ব দেওয়া হয়নি, যা আন্তর্জাতিক নদী আইনের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। ফারাক্কার এই তিক্ত অভিজ্ঞতা বাংলাদেশের মানুষের মনে গভীর অবিশ্বাসের জন্ম দিয়েছে। এদেশের মানুষের কাছে এটি কেবল একটি ব্যারাজ নয়, বরং প্রতিবেশী রাষ্ট্রের একতরফা পানি নিয়ন্ত্রণের প্রতীক। বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যকার গঙ্গা পানি নবণ্টন চুক্তির মেয়াদ এই বছরের ডিসেম্বরেই শেষ হচ্ছে। এই চুক্তির মেয়াদ নবায়ন করা হবে নাকি দুই দেশের মধ্যে নতুন করে চুক্তি হবে, তা নিয়ে আনুষ্ঠানিক কোনো ঘোষণা না এলেও দুই দেশ প্রাথমিক প্রস্তুতির কাজ শুরু করেছে। এই প্রস্তুতির মধ্যেই অনানুষ্ঠানিকভাবে ভারতের দিক থেকে নতুন চুক্তির ক্ষেত্রে নতুন ফর্মুলার কথা বলা হচ্ছে। ভারতের দিক থেকে নতুন করে যেসব বক্তব্য আসছে, তাতে চুক্তি নবায়নের বিষয়টি সংকটের মুখে পড়তে পারে। ভারত চাইছে ফারাক্কা পয়েন্টের পানির প্রবাহের আলোকে চুক্তির ফ্রেমওয়ার্ক দাঁড় করাতে, যেটি ভারতের দিক থেকে অন্যায্য দাবি। কারণ গঙ্গা তো শুধু ফারাক্কা পয়েন্টে সীমাবদ্ধ নয়। তা ছাড়া ফারাক্কা পয়েন্টে বাঁধের কারণে পানির প্রবাহ কম থাকে। পানি নবণ্টন চুক্তিতে রয়েছে বাংলাদেশ ও ভারত কী পরিমাণ পানি পাবে, সেটা নির্ভর করবে উজানে বৃষ্টিপাতের পরিমাণ, পানির প্রবাহ ও গতিবেগের ওপর। এখন গঙ্গার পানিবণ্টন চুক্তির মেয়াদ শেষ হয়ে আসার প্রেক্ষাপটে কয়েক বছর ধরেই চুক্তির নবায়ন কিংবা নতুন চুক্তির ক্ষেত্রে নতুন প্রস্তাবের বিষয়টি আলোচনায় আসছে। 

তিস্তা অপূর্ণ প্রতিশ্রুতির ইতিহাস

বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলের জীবনরেখা বলা হয় তিস্তা নদীকে। বাংলাদেশ-ভারত পানি বিরোধের সবচেয়ে আলোচিত বিষয় হলো তিস্তা নদী। উত্তরবঙ্গের কৃষি ও অর্থনীতির জন্য তিস্তা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু শুষ্ক মৌসুমে তিস্তায় পানির প্রবাহ এতটাই কমে যায় যে নদীর অনেক অংশ প্রায় মরুভূমির রূপ ধারণ করে। ভারত উজানে গজলডোবা ব্যারেজ নির্মাণের মাধ্যমে তিস্তার পানি ব্যাপকভাবে নিয়ন্ত্রণ করছে। ফলে বাংলাদেশ অংশে শুকনো মৌসুমে পানির প্রবাহ অনেক সময় ন্যূনতম পর্যায়ে নেমে আসে।

দীর্ঘ আলোচনার পর ২০১১ সালে তিস্তার পানিবণ্টন চুক্তি স্বাক্ষরের সব প্রস্তুতি সম্পন্ন হলেও পশ্চিমবঙ্গের সাবেক মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধায়ের বিরোধিতার অজুহাতে শেষ পর্যন্ত তা বাস্তবায়িত হয়নি। ভারতের সঙ্গে আওয়ামী লীগ সরকারের বিশেষ বন্ধুত্ব সত্ত্বেও দীর্ঘ ১৫ বছরের বেশি সময় পার হলেও চুক্তিটি আলোর মুখ দেখেনি। বিভিন্ন সময়ে দুই দেশের মধ্যে সমঝোতার কথা শোনা গেলেও তা শেষ পর্যন্ত রাজনৈতিক জটিলতায় আটকে গেছে। এটি শুধু একটি কূটনৈতিক ব্যর্থতা নয়; বরং আস্থার সংকটের প্রতীক।

তিস্তার পানির অভাবে উত্তরাঞ্চলের কৃষকেরা প্রতিবছর সেচ সংকটে ভোগেন। ফলে ফসল উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে, জীববৈচিত্র্য ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে এবং নদীকেন্দ্রিক অর্থনীতি ধীরে ধীরে সংকুচিত হচ্ছে। অথচ আন্তর্জাতিক নদী আইনের অন্যতম মূলনীতি হলো 'সমতা ও যুক্তিসংগত ব্যবহার'। এই নীতির আলোকে ভাটির দেশের ন্যায্য হিস্যা নিশ্চিত হওয়া উচিত। তিস্তার ক্ষেত্রে বাংলাদেশের দাবি কোনো অতিরিক্ত সুবিধা নয়; বরং নদীর স্বাভাবিক প্রবাহের ন্যায্য অংশ নিশ্চিত করা। 

একের পর এক বাঁধ ও নদী নিয়ন্ত্রণ প্রকল্প 

গঙ্গা ও তিস্তা ছাড়াও বহু আন্তসীমান্ত নদীতে ভারতের বাঁধ, ব্যারেজসহ বিভিন্ন প্রকল্প বাংলাদেশের জন্য উদ্বেগের কারণ হয়ে উঠেছে। উজানে নদীর প্রবাহ নিয়ন্ত্রণের ফলে ভাটিতে নদী শুকিয়ে যাওয়া, চর জেগে ওঠা, নৌপথ সংকুচিত হওয়া এবং জীববৈচিত্র্য হ্রাস পাওয়ার ঘটনা ক্রমবর্ধমান।

বরাক নদীর ওপর প্রস্তাবিত টিপাইমুখ বাঁধ নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশে উদ্বেগ রয়েছে। কারণ বাংলাদেশের সুরমা ও কুশিয়ারা নদীর উৎপত্তি বরাক নদী থেকেই, যা বাংলাদেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের পরিবেশ ও কৃষির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। একইভাবে গোমতী, ধরলা, দুধকুমার, খোয়াই, মুহুরী, মনুসহ অনেক নদীতে মৌসুমি পানিপ্রবাহের পরিবর্তন বাংলাদেশের পরিবেশগত ভারসাম্যকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে। কোথাও অতিরিক্ত পানি ছেড়ে আকস্মিক বন্যা সৃষ্টি হচ্ছে, আবার কোথাও শুষ্ক মৌসুমে নদী শুকিয়ে যাচ্ছে। এ পরিস্থিতি দেখায় যে সমস্যাটি কোনো একক নদীর নয়; বরং সমগ্র গঙ্গা-ব্রহ্মপুত্র-মেঘনা অববাহিকার সমন্বিত ব্যবস্থাপনার অভাবের ফল।

নদীকে কেবল পানির উৎস হিসেবে দেখলে চলবে না। একটি নদী হলো একটি পূর্ণাঙ্গ বাস্তুতন্ত্র। নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ ব্যাহত হলে কৃষি, মৎস্য, বন, জীববৈচিত্র্য এবং মানুষের জীবনযাত্রা সবকিছুই ক্ষতিগ্রস্ত হয়। উজানে পানি আটকে রাখা যেমন ক্ষতিকর, তেমনি বর্ষাকালে হঠাৎ অতিরিক্ত পানি ছেড়ে দেওয়াও ভাটির দেশকে বিপদের মুখে ঠেলে দেয়। ফলে বাংলাদেশ কখনো খরার, কখনো বন্যার শিকার হয়।

ফেনী নদী: ছোট নদী, বড় বিতর্ক

সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ফেনী নদী নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়। ফেনী নদী বাংলাদেশের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চল এবং ভারতের ত্রিপুরা রাজ্যের সীমান্তবর্তী একটি গুরুত্বপূর্ণ নদী। আয়তনে ছোট হলেও এর রাজনৈতিক তাৎপর্য অনেক বড়। ভারতের ত্রিপুরা অঞ্চলে পানীয় জলের চাহিদা মেটানোর জন্য ফেনী নদীর পানি ব্যবহারের সিদ্ধান্ত নিয়ে বাংলাদেশে ব্যাপক বিতর্ক সৃষ্টি হয়। নদীটির প্রবাহ তুলনামূলকভাবে সীমিত হওয়ায় অতিরিক্ত পানি প্রত্যাহার ভবিষ্যতে পরিবেশগত ও অর্থনৈতিক সমস্যার সৃষ্টি করতে পারে। ফেনী নদীর পানি ব্যবহারের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ ভারতের প্রতি যে নমনীয়তা দেখিয়েছে, তার প্রতিদানে তিস্তার মতো গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুতে কোনো অগ্রগতি হয়নি। অথচ একটি রাষ্ট্র তার প্রতিবেশীর স্বার্থ বিবেচনা করে নমনীয়তা প্রদর্শন করলে বিপরীত পক্ষ থেকেও সমপর্যায়ের সদিচ্ছা প্রত্যাশিত। অন্যথায় সম্পর্কের মধ্যে ভারসাম্যহীনতা তৈরি হয় এবং জনগণের মধ্যে অসন্তোষ বাড়ে। ফেনী ইস্যু দেশের জনগণকে আবারও স্মরণ করিয়ে দিয়েছে, আন্তসীমান্ত নদী ব্যবস্থাপনায়

দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা এবং বৈজ্ঞানিক মূল্যায়ন অপরিহার্য। একটি ছোট নদীর ক্ষেত্রেও যদি স্বচ্ছতা ও সমতা নিশ্চিত না হয়, তাহলে বড় নদীগুলোর ক্ষেত্রে সংকট আরও তীব্র হবে।

বাংলাদেশের ক্ষতির বহুমাত্রিক চিত্র
আন্তসীমান্ত নদীর পানিবণ্টনে বৈষম্যের প্রভাব কেবল নদীর মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এর বহুমুখী নেতিবাচক প্রভাবও রয়েছে, যা ভাটির দেশের অপূরণীয় ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
কৃষিতে প্রভাব
বাংলাদেশের কৃষি এখনো অনেকাংশে নদীর পানির ওপর নির্ভরশীল। শুষ্ক মৌসুমে নদীতে পানি কমে গেলে সেচব্যবস্থা ব্যাহত হয়। ফলে খাদ্য উৎপাদন কমে যাওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়।
পরিবেশগত ক্ষতি
নদীর প্রবাহ কমে গেলে জলজ প্রাণীর আবাসস্থল নষ্ট হয়। অনেক দেশীয় মাছ বিলুপ্তির ঝুঁকিতে পড়ে। জলাভূমি সংকুচিত হয় এবং পরিবেশগত ভারসাম্য নষ্ট হয়।
লবণাক্ততার বিস্তার
দক্ষিণাঞ্চলে মিঠা পানির প্রবাহ কমে গেলে সমুদ্রের লবণাক্ত পানি ভেতরে প্রবেশ করে। এর ফলে কৃষিজমি, পানীয় জল এবং জীববৈচিত্র্য ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
নৌপথ ও অর্থনীতি
বাংলাদেশের ঐতিহ্যগত নৌপথগুলো নদীর নাব্যতার ওপর নির্ভরশীল। নদীতে পানি কমে গেলে নৌপরিবহন ব্যয়বহুল হয়ে ওঠে এবং অর্থনৈতিক কার্যক্রম
বাধাগ্রস্ত হয়।
সামাজিক প্রভাব
নদীভিত্তিক জীবিকা হারিয়ে বহু মানুষ অভ্যন্তরীণ অভিবাসনে বাধ্য হয়। এতে শহরমুখী জনসংখ্যার চাপ বৃদ্ধি পায় এবং নতুন সামাজিক সমস্যা সৃষ্টি হয়।
আন্তর্জাতিক আইনের আলোকে বাংলাদেশের অবস্থান
বাংলাদেশের দাবি আন্তর্জাতিকভাবে গ্রহণযোগ্য নীতির ওপর ভিত্তি করে দাঁড়িয়ে আছে। আন্তর্জাতিক নদী ব্যবস্থাপনায় কয়েকটি মৌলিক নীতি ব্যাপকভাবে স্বীকৃ ত। United Nations Watercourses Convention (১৯৯৭) এর কয়েকটি মৌলিক নীতি রয়েছে:
প্রথমত, আন্তসীমান্ত নদীর পানি 'ন্যায্য ও যুক্তিসংগতভাবে' ব্যবহার করতে হবে।
দ্বিতীয়ত, উজানের রাষ্ট্র এমন কোনো পদক্ষেপ নিতে পারে না, যা ভাটির রাষ্ট্রের জন্য 'উল্লেখযোগ্য ক্ষতি' সৃষ্টি করে।

তৃতীয়ত, নদী ব্যবস্থাপনায় তথ্য বিনিময়, পূর্ব অবহিতকরণ এবং যৌথ সিদ্ধান্ত গ্রহণ গুরুত্বপূর্ণ।
চতুর্থ, শান্তিপূর্ণ বিরোধ নিষ্পত্তির জন্য যৌথ নদী ব্যবস্থাপনা প্রতিষ্ঠা করা।
পঞ্চম, পরিবেশগত ভারসাম্য রক্ষা করা।
হেলসিঙ্কি রুলস ১৯৬৬ এ ঘোষণা করে যে-
আন্তর্জাতিক নদী কোনো একক রাষ্ট্রের সম্পত্তি নয়।
প্রতিটি নদীতীরবর্তী রাষ্ট্রের ন্যায্য অংশীদারিত্ব রয়েছে।
উজান ও ভাটি রাষ্ট্রের অধিকার সমানভাবে বিবেচনা করতে হবে।
এটি বাধ্যতামূলক চুক্তি নয়, তবে আন্তর্জাতিক নদী আইনের বিকাশে অত্যন্ত প্রভাবশালী।
International Law Association Berlin Rules (২০০৪) কে হেলসিঙ্কি রুলসের আধুনিক সংস্করণ হিসেবে বিবেচনা করা হয়ে থাকে। এতে যুক্ত হয়েছে মানবাধিকারের অংশ হিসেবে পানির অধিকার, পরিবেশগত প্রবাহ (Environmental Flow), টেকসই উন্নয়ন, জলবায়ু পরিবর্তনজনিত প্রভাব, জনসাধারণের অংশগ্রহণ।

এই নীতিগুলো জাতিসংঘের আন্তর্জাতিক জলপ্রবাহ-বিষয়ক বিভিন্ন কাঠামো এবং আন্তর্জাতিক বিচারিক রায়ে প্রতিফলিত হয়েছে। বাংলাদেশের যুক্তি হলো, আন্তসীমান্ত নদীগুলোর পানিবণ্টনের ক্ষেত্রে এই নীতিগুলোর পূর্ণ প্রতিফলন ঘটেনি। বিশেষত, উজানে একতরফা অবকাঠামো নির্মাণ কিংবা পানি প্রত্যাহারের সিদ্ধান্ত ভাটির দেশের জন্য দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতির কারণ হতে পারে। বাংলাদেশ কখনো ভারতের পানির অধিকার অস্বীকার করেনি। বরং বাংলাদেশের অবস্থান হলো দুই দেশই নদীর যৌথ মালিকানার অংশীদার, তাই পানিবণ্টনও হতে হবে ন্যায্য ও বৈজ্ঞানিক ভিত্তিতে।

যৌথ নদী কমিশনের সীমাবদ্ধতা
যৌথ নদী কমিশন প্রতিষ্ঠার মূল উদ্দেশ্য ছিল আন্তসীমান্ত নদী সমস্যার সমাধান করা। কিন্তু বাস্তবে কমিশন প্রত্যাশিত কার্যকারিতা দেখাতে পারেনি। বহু ক্ষেত্রে বৈঠকের দীর্ঘ বিরতি, তথ্যের অপ্রতুলতা এবং সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের ধীরগতি সমস্যা সমাধানকে বাধাগ্রস্ত করেছে। ফলে রাজনৈতিক সদিচ্ছা থাকলেও কাঠামোগত দুর্বলতার কারণে অগ্রগতি সীমিত হয়েছে। কমিশনকে আরও শক্তিশালী, তথ্যনির্ভর এবং জবাবদিহিমূলক প্রতিষ্ঠানে পরিণত করা জরুরি হয়ে পড়েছে।
সমাধানের পথ কোথায়?
নদী ভবিষ্যতে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূরাজনৈতিক সম্পদে পরিণত হতে যাচ্ছে। দক্ষিণ এশিয়ায় এই বাস্তবতা আরও তীব্র। ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কের ক্ষেত্রেও নদী কেবল পরিবেশগত ইস্যু নয়, এটি ভূরাজনৈতিক স্বার্থ ও কৌশলগত ক্ষমতার প্রশ্ন। বাংলাদেশ যদি নদীর পানির ন্যায্য হিস্যা আদায়ে শক্ত অবস্থান নিয়ে সময়মতো কার্যকর পানি কূটনীতি গড়ে তুলতে না পারে, তবে ভবিষ্যতে দেশের খাদ্য নিরাপত্তা, পরিবেশ এবং অর্থনীতি আরও বড় ঝুঁকির মুখে পড়বে। অতীতে নদীর পানির হিস্যা পাওয়ার ক্ষেত্রে বাংলাদেশ বরাবরই সমঝোতা ও কূটনৈতিক সংলাপের পথ অনুসরণ করেছে। অথচ বাস্তবে দেখা যায়, সীমান্ত, বাণিজ্য কিংবা নিরাপত্তা সহযোগিতায় বাংলাদেশ ছাড় দিলেও উত্তর-পূর্বাঞ্চলে ভারতের নিরাপত্তা উদ্বেগ প্রশমিত করলেও পানি ইস্যুতে কাঙ্ক্ষিত অগ্রগতি খুবই সীমিত। এটি এখন দিবালোকের ন্যায় স্পষ্ট যে কেবল নমনীয়তা দেখিয়ে জাতীয় স্বার্থ রক্ষা সম্ভব নয়। বাস্তবতা হলো, জল-রাজনীতিতে কূটনৈতিক সৌজন্যের পাশাপাশি প্রয়োজন দক্ষতা ও কৌশলগত দৃঢ়তা। ভারতের উচিত হবে না নদী নিয়ে বিরোধকে জিরো-সম খেলায় পরিণত করা। কারণ নদী কোনো দেশের একার সম্পদ নয়; এটি একটি যৌথ প্রাকৃতিক ব্যবস্থা। তবে সমাধান হতে হবে ন্যায়ভিত্তিক এবং ভাটির দেশের অধিকারকে সম্মান জানিয়ে। বাংলাদেশের উচিত আন্তর্জাতিক ফোরামগুলোতে নদীর পানির ন্যায্য হিস্যার বিষয়টি আরও জোরালোভাবে উত্থাপন করা এবং আন্তসীমান্ত নদী ব্যবস্থাপনায় বাধ্যতামূলক আন্তর্জাতিক নীতিমালার পক্ষে বৈশ্বিক সমর্থন গড়ে তোলা। এ ছাড়া এ সমস্যা সমাধানে আরও কিছু পদক্ষেপ নেওয়া।

১. তিস্তা চুক্তির দ্রুত বাস্তবায়ন দীর্ঘদিন ঝুলে থাকা তিস্তা চুক্তি দ্রুত সম্পন্ন করতে হবে। এটি দুই দেশের মধ্যে আস্থার পরিবেশ তৈরির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
২. সব আন্তসীমান্ত নদীর জন্য সমন্বিত চুক্তি: আলাদা আলাদা নদী নয়, পুরো অববাহিকাভিত্তিক ব্যবস্থাপনা প্রয়োজন। ভারত থেকে আসা ৫৪টি নদীকে একটি সমন্বিত কাঠামোর আওতায় আনা যেতে পারে।
৩. যৌথ তথ্যভান্ডার গঠন নদীর প্রবাহ, বৃষ্টিপাত, পানি প্রত্যাহার এবং পরিবেশগত তথ্য উভয় দেশকে উন্মুক্তভাবে বিনিময় করতে হবে। তথ্য গোপন করলে আস্থা তৈরি হয় না।
৪. পরিবেশগত প্রবাহ নিশ্চিত করা: প্রতিটি নদীতে ন্যূনতম পরিবেশগত প্রবাহ
বজায় রাখতে হবে, যাতে নদীর বাস্তুতন্ত্র টিকে থাকে।
৫. আন্তর্জাতিক নীতিমালার অনুসরণ: দুই দেশকে আন্তর্জাতিক নদী ব্যবস্থাপনার স্বীকৃত নীতিমালা অনুসরণ করতে হবে। শক্তির ভিত্তিতে নয়, ন্যায়ের ভিত্তিতে পানিবণ্টন হওয়া উচিত।
৬. জনকূটনীতি ও আঞ্চলিক সহযোগিতা নদী নিয়ে বিরোধকে রাজনৈতিক উত্তেজনার বিষয় না বানিয়ে গবেষক, পরিবেশবিদ, কৃষিবিদ ও নাগরিক সমাজকে সম্পৃক্ত করতে হবে। ফারাক্কা থেকে ফেনী-এই দীর্ঘ পথচলা বাংলাদেশের জন্য শুধু পানিবণ্টনের ইতিহাস নয়; এটি অস্তিত্ব, পরিবেশ ও ন্যায্য অধিকারের প্রশ্ন। আন্তসীমান্ত নদীগুলো বাংলাদেশের জীবনরেখা। উজানে একতরফা পানি নিয়ন্ত্রণের ফলে যে ক্ষতি হয়েছে, তা বাংলাদেশের জনগণ বহু দশক ধরে বহন করে চলেছে। তাই বাংলাদেশের দাবি কোনো দয়া বা অনুগ্রহের আবেদন নয়; এটি একটি বৈধ ও ন্যায্য অধিকার। বাংলাদেশ ও ভারত প্রতিবেশী রাষ্ট্র, উন্নয়নের অংশীদার এবং বহু ঐতিহাসিক সম্পর্কের ধারক। সেই সম্পর্কের প্রকৃত শক্তি তখনই প্রতিষ্ঠিত হবে, যখন নদীকে আধিপত্যের উপকরণ নয়, বরং সহযোগিতার সেতুবন্ধ হিসেবে দেখা হবে। ফারাক্কার ক্ষত, তিস্তার হতাশা এবং ফেনীর বিতর্ক আমাদের একটি শিক্ষা দেয়-নদীকে ভাগ করা যায়, কিন্তু নদীর ভাগ্যকে একতরফাভাবে নিয়ন্ত্রণ করা যায় না। নদী বাঁচলে বাংলাদেশ বাঁচবে। আর বাংলাদেশ বাঁচার এই প্রশ্নে ন্যায্য পানিবণ্টন কোনো কূটনৈতিক সৌজন্য নয়; এটি আন্তর্জাতিক ন্যায়বিচার, পরিবেশগত ভারসাম্য এবং মানবিক অধিকারের অপরিহার্য দাবি। নদী ও পানি এখন ভবিষ্যৎ কৌশলগত স্বার্থ ও নিরাপত্তার প্রশ্নে পরিণত হচ্ছে। নদীর উজানে বিভিন্ন স্থাপনা নির্মাণ করে নদীর পানি প্রত্যাহার ও নদীর গতিপথ পরিবর্তন করা এবং জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে নদীর প্রবাহ কমে যাচ্ছে এবং নদীর গতিপথ বদলে যাচ্ছে। হিমালয় অঞ্চলের হিমবাহ দ্রুত গলন, অপর্যাপ্ত বৃষ্টিপাত এবং নদীর পানি ধরে রাখা বা প্রবাহ পরিবর্তনসহ অতিরিক্ত বাঁধ ও স্থাপনা নির্মাণ ভবিষ্যতে বাংলাদেশসহ দক্ষিণ এশিয়াকে এক ভয়াবহ পানি সংকটের দিকে ঠেলে দিতে পারে। সেই প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে আন্তসীমান্ত নদী ব্যবস্থাপনায় পারস্পরিক সহযোগিতার বিকল্প নেই। এ ছাড়া নিজস্ব সক্ষমতা বাড়িয়ে বাংলাদেশের পানি কূটনীতিকে পররাষ্ট্রনীতির কেন্দ্রীয় অগ্রাধিকার দিতে হবে। নদী গবেষণা, তথ্য সংগ্রহ ও পানি ব্যবস্থাপনায় আধুনিক প্রযুক্তির ব্যাবহার করে নিজস্ব সক্ষমতা বাড়াতে হবে। জাতিসংঘ, সার্ক এবং অন্যান্য আন্তর্জাতিক ও আঞ্চলিক ফোরামে বৈজ্ঞানিক তথ্য ও মানবিক প্রভাব তুলে ধরে আন্তর্জাতিক জনমত তৈরি করতে হবে। একই সঙ্গে বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ পানি ব্যবস্থাপনাও শক্তিশালী করতে হবে। শুধু ভারতের সমালোচনা করলেই সমাধান আসবে না; বরং নদী, খাল, বিল ও হাওর দখল, দূষণ এবং অব্যবস্থাপনার মতো অভ্যন্তরীণ সমস্যাগুলোও সমাধান করতে হবে। কারণ, দুর্বল অভ্যন্তরীণ ব্যবস্থাপনা আন্তর্জাতিক সংস্থা ও সম্প্রদায়ের সঙ্গে নদী ও পানি নিয়ে আলোচনায় বাংলাদেশের অবস্থানকে দুর্বল করে দেবে। বাংলাদেশের জন্য এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো-বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রেখেও কীভাবে নিজের ন্যায্য অধিকার আদায় করা যায়। কারণ আন্তর্জাতিক সম্পর্কের নীতিতে স্থায়ী মিত্র বা শত্রু বলে কিছু নেই; স্থায়ী হলো জাতীয় স্বার্থ। আর বাংলাদেশের জাতীয় স্বার্থ রক্ষায় আন্তসীমান্ত নদীর ন্যায্য হিস্যা নিশ্চিত করা আজ সময়ের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দাবি। ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কের প্রকৃত পরীক্ষার জায়গা হলো আন্তসীমান্ত নদী ব্যবস্থাপনা। কারণ বন্ধুত্বের প্রকৃত মূল্য বোঝা যায় তখনই, যখন শক্তিশালী পক্ষ দুর্বল পক্ষের ন্যায্য অধিকারকে সম্মান করে। পানি কোনো একক রাষ্ট্রের সম্পত্তি নয়; এটি যৌথ প্রাকৃতিক উত্তরাধিকার। সেই বাস্তবতা যত দিন পর্যন্ত দক্ষিণ এশিয়ার জল-রাজনীতিতে প্রতিফলিত না হবে, তত দিন অভিন্ন নদীগুলো সহযোগিতার সেতু না হয়ে বিরোধের উৎস হিসেবেই থেকে যাবে।

লেখক: এক্সিকিউটিভ ডিরেক্টর, সেন্টার ফর অ্যাডভান্সড স্টাডিজ অ্যান্ড থটস (কাস্ট)
Thikana
M M Shahin, Chairman, Board of Editors, Thikana
Corporate Headquarter
THIKANA : 7409 37th Ave suite 403 Jackson Heights, NY 11372
Phone : 718-472-0700/2428, 718-729-6000
Fax: + 1(866) 805-8806
Bangladesh Bureau
THIKANA : 70/B, Green Road, (Panthapath), 5th Floor, Dhaka, BD.
E-Mail : [email protected]
For Advertisement : [email protected]