
আমাদের দেশ বিক্রমপুর। বিক্রমপুরের বেশির ভাগ মানুষ কলকাতাকেন্দ্রিক। লেখাপড়া ও জীবনযাত্রাÑসবকিছুই কলকাতা-প্রাণ। দেশভাগের পর দাদা চিন্তা করেন, ছেলেদের তো কলকাতায় রেখে পড়াশোনা করা সম্ভব নয়। আমার বাবা-চাচারা সবাই প্রেসিডেন্সি কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করেছেন। এখন কলকাতায় যাওয়া সম্ভব নয়। ঢাকায় ভালো কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয় আছে।
দাদা ঠিক করেন, ঢাকায় বাড়ি কিনবেন। তাই বানিয়ানগরে বাড়ি কেনেন। তখন ঢাকায় জনবসতি কম ছিল। সব বাড়ি ছিল একতলা। দু-একটা বাড়ি দোতলা। আমাদের বাসার সামনে ছিল বিরাট খাল। খালের পাড়ে ছিল বিরাট বটগাছ। গাছে নানা জাতের পাখি, খাল দিয়ে বড় বড় নৌকা চলাচল করত। নৌকায় থাকত অনেক মালপত্র। মাঝি বৈঠা দিয়ে পানি কেটে কেটে নৌকা চালাতেন আর মনের আনন্দে গান গাইতেন : ‘মন মাঝি বৈঠা ধর আমি আর বইতে পারি না।’ গান শুনে মায়ের কাছে বায়না ধরতাম খাল দেখতে যাওয়ার জন্য। মা বারণ করতেনÑওই গাছে ভূত আছে, জানালা দিয়ে দেখ।
জানালার পাশে বসে অনেক কিছু দেখতাম। শুধু তা-ই নয়, ঢাকার রাস্তায় বিজলি বাতি ছিল না। রোজ সন্ধ্যায় একজন লোক মই হাতে একটা তেলের কৌটা নিয়ে রাস্তার মধ্যে একটা খুঁটিতে কুপি বেঁধে তাতে তেল দিয়ে বাতি জ্বালাতেন। সন্ধ্যা হলেই সেটা দেখার জন্য দাঁড়িয়ে থাকতাম। একদিন মা জিজ্ঞেস করলেন, এখানে দাঁড়িয়ে আছ কেন? আমি বলি, ওই লোক কুপি ধরাচ্ছে, তা দেখার জন্য। মা বলেন, কাকু বলবে। আমি তার নাম দিলাম বাতি কাকু। বাতি কাকু খুব খুশি। আমার সঙ্গে বন্ধুত্ব হয়ে গেল। একদিন না দেখলে বাতি কাকু খোকা বাবু বলে ডাকতেন। ঢাকায় তখন মোটরগাড়ি ছিল না, যদিও দু-একটা দেখা যেত। বাহন ছিল রিকশা বা ঘোড়ার গাড়ি। মানুষ বেড়াতে যেত, তাই দেখতাম জানালার ধারে বসে।
ঢাকার বাসাবাড়িতে কুয়া ছিল। রাস্তায় ছিল মিউনিসিপ্যাল করপোরেশনের কল। সকাল হলেই মানুষ লাইন ধরে পানি নিত। আমি বসে বসে দেখতাম। আমাদের পাশের বাসায় এক দাদু থাকতেন। খাওয়ার পানি আনতে তিনি পিতলের কলস নিয়ে লাইনে দাঁড়াতেন। দাদুর বয়স বেশি বলে সবাই তাকে আগে পানি নিতে দিতেন। এক খালা বাসায় বাসায় খাওয়ার পানি দিতেন। ঢাকায় তখন কাজের লোক ছিল না। আমাদের বাসায় ছিল ফুলি খালা, মায়ের দূরসম্পর্কের বোন। খালা ছিল বিধবা, মা কাজের জন্য তাকে নিয়ে আসেন।
আমার মা সেলাই করতেন। ছুটির দিনে নাশতা খাওয়ার পর খাটে বসে বাবার গল্প শুনি। বাবা মাকে বলেন, তুমি তাড়াতাড়ি রান্না শেষ করবে। বিকেলে বেড়াতে যাব। মায়ের প্রশ্ন, কোথায়? বলা যাবে না, সারপ্রাইজ। আমরা খুব খুশি। কোথাও যাই না, শুধু শুক্রবার বাবার সঙ্গে মসজিদে যাই। মসজিদটা খুব সুন্দর, ছোট একটা চৌবাচ্চা ছিল। চৌবাচ্চায় অনেক লাল মাছ খেলা করত। সেই চৌবাচ্চায় ফোয়ারা ছিল, ফোয়ারার পানি বেশ আকর্ষণীয়। আমরা ফোয়ার আর মাছ দেখতাম। বাবা যখন বেড়ানোর কথা বলেন, মনে হলো স্বর্গ ভুবন যাব। বোন দুটি এসে বলে, দাদা, বেড়াতে যাস? হেসে বলি, দূর বোকা, আমি তো নামাজ পড়তে যাই। আমরা আজ সবাই যাব। মনে মনে চিন্তা করি, কোথায় যেতে পারি! যাওয়ার আনন্দে দুষ্টুমি করতে থাকি। মা বকা দিয়ে বলেন, লেখাপড়া সব বন্ধ, পড়তে বস। বাবা বলেন, আজ থাক।
মা ফুলি খালাকে রান্না চাপাতে বলেন। কী কী রান্না হবে, তা-ও বলে দিয়ে খাটে বসেন। কোনো কথা বলেন না। বাবা জিজ্ঞেস করেন, চুপ আছ কেন? কোনো কিছু নিয়ে চিন্তা করছ? মা বলেন, চিন্তা না, বুকটা ব্যথা করে উঠল। বাবা ডাক্তার আনতে গেলেন। মা আমাকে ইশারা দিয়ে ডেকে বললেন, বাবাকে দেখিস, বাবার অবাধ্য হোস না, বাবার কথামতো চলিস, বোনদের ভালোবাসিস, আমার আদর দিস। খালাকে বলেন, তোর কাছে এদের রেখে গেলাম। খালা বলল, দাদাবাবু কোথায় গেলেন, বুবুর খুব কষ্ট হচ্ছে। আমার বয়স ১২ বছর, বড় বোনের ৯ আর ছোট বোনের বয়স ৪। বাবা ডাক্তার আনলেন কিন্তু মা আর নেই। ছোট বোনটা মা-মা করে কেঁদে চলছে, আমি বোকার মতো তাকিয়ে আছি। বড় বোনটা বলে, মা কেন কথা বলে না। ওকে আমার বলার ভাষা নেই। পাড়ার সবাই মুহূর্তে এসে দোয়া-দরুদ পড়া আরম্ভ করেন। হুজুর কোরআন পড়তে থাকেন। গোসল শেষ করে মাকে সাদা কাপড়ে জড়িয়ে দেওয়া হলো। আমাদের মা চিরতরে চলে গেলেন না ফেরার দেশে। রেখে গেলেন ছোট তিন সন্তানকে।
বাবা সহযাত্রীদের সঙ্গে নিয়ে মাকে রেখে এলেন। বাবা আমাদের কাছে নিয়ে বসেন, একদৃষ্টে মায়ের ফটোর দিকে তাকিয়ে বিড়বিড় করে কী যেন বলেন। ফুলি খালারও মন খারাপ। আর কোনো দিন বেড়াতে যাওয়ার কথা বলিনি। এভাবে বছর কেটে গেল। বোন দুটিকে বাংলাবাজার স্কুলে ভর্তি করে দিলেন বাবা। আমি মা থাকতেই সেন্ট যোসেফ স্কুলে পড়তাম। এখান থেকেই পড়া শেষ করি। বোনেরা বাংলাবাজার স্কুল থেকে পাস করে ইডেনে ভর্তি হয়। বড় বোনের এমএ রেজাল্ট খুব ভালো হয়। বাবা ডাক্তার ছেলের সঙ্গে তাকে বিয়ে দেন। ছোট বোন বিএ পড়ত, রেজাল্ট খুব একটা ভালো হয়নি। বাবা ডেকে বলেন, তোর রেজাল্ট খারাপ হলো কেন, তুই কি পড়তে চাস না? সে বলল, পড়াশোনা আমার ভালো লাগে না। বাবা হেসে বলেন, তাহলে বিয়ে দিয়ে দিই। বিয়ের কথা শুনে ও হাসি দিল। বাবা বলেন, আর বলতে হবে না।
দুই মাসের মধ্যে ইঞ্জিনিয়ার ছেলের সঙ্গে ছোট বোনকে বিয়ে দিয়ে দিলেন বাবা। আমার ও বাবার মনটা খারাপ। বাড়িটা ফাঁকা। ফুলি খালা কেবল চোখ মোছে, ছটু ছিল প্রাণ, বাড়ির সবাইকে হাসাত, নিজেও হাসত। অনেক সময় বকা দিতে গিয়ে নিজে বকা খেতাম, সেই ছটু তুই কবে বড় হয়ে গেলি। তোকে বুকছাড়া করে দিলাম। বাবা ফুলি খালাকে বলেন, তুমি ওদের বড় করেছ, দোয়া করো, যেন ভালোমতো সংসার গুছিয়ে করতে পারে। আমার মনটা খারাপ, আমি তো ওদের ভাই ছিলাম না, ছিলাম বন্ধু। পায়ে পায়ে বাবার কাছে যাই, আমাকে বলেন, এখন মনে হয় তোদের মা নাই। আমি বলি, তুমি তো আমাদের মায়ের আদর ও ভালোবাসা দিয়ে বড় করেছ। বুঝতে দাওনি মায়ের অভাব। এখন তুমি মন খারাপ করলে আমি কীভাবে থাকব।
বাবা উঠে এসে আমাকে বুকে নিয়ে বলেন, মন খারাপ করিস না, তুই আর আমি মনের আনন্দে ঘুরেফিরে দিন কাটিয়ে দেব, বোনেরা বড় হয়েছে, বিয়ে তো দিতেই হতো। সময় সবকিছু বদলে দেয়। কয়েক বছর হলো, বাবা বলেন, আবির, বিয়ে কর। হেসে বলি, তুমি-আমি বেশ আছি। এভাবেই কাটতে থাকে আমাদের সময়। একদিন এমন রিঅ্যাক্ট করলেন বাবা, কিছুই বুঝতে পারলাম না-ফুলির হাতের রান্না ভালো লাগে না। খালা তো অবাক, বাবাকে কিছু বলি না।
এক সপ্তাহ পর বাইরে থেকে ফিরছি, হাত-মুখ ধুয়ে বিছানায় শুয়ে পড়ি। বাবা আমার দরজায় টোকা দেন। দরজা খুলি, বাবা কিছু বলবেন? বাবা বলেন, আমি বিয়ে করব। অবাক হই। বাবার মুখের দিকে চেয়ে বলি, কী বলেন! তিনি বলেন, ঠিকই বলছি, মানুষ কী বলবে, মানুষের কথায় কী-বা যায় আসে। আমাদের কেউ খোঁজখবর নেয়, কে কী বলবে তা নিয়ে ভাবি না। বাবা চলে গেলেন। রাতে আর ঘুম এল না। সকালে বোনদের ফোন করি, ওরা এসে বাবাকে বলে, মা তো অনেক দিন আগে চলে গেছেন, তুমি মায়ের আদর দিয়ে আমাদের বড় করেছ। ফুলি খালা, এসব কী শুনি? বাবা বলেন, যা শুনেছ ঠিকই শুনেছ। এভাবে আর থাকতে পারব না। আমাকে জ্ঞান দিতে এসো না। বোনেরা মুখ মলিন করে চলে গেল। কয়েক দিন আবার দুই চাচাকে নিয়ে বাবা কোথায় যেন যান। আমাকে দেখে বলেন, শোন, আমি মেয়ে দেখতে যাই, যদি পছন্দ হয় তবে বিয়ে করে চলে আসব। আমি ভাবতে পারি না, বাবা কী বলছেন! চুপ করে থাকি। বাবা মিটিমিটি হাসেন। বাবার সঙ্গে কথা বন্ধ।
আজ আবার ঘরে এসে বলেন, আবির, তুমি আমার সাথে যাবে, কাল আমরা মেয়ে দেখতে যাব। মেয়ের বাবা তোমাকে দেখতে চায়। আমি বলি, তোমার মেয়েদের বলো। বোনদের ফোন করে বলি, ওরা বলে, তুই যা। তুই বাবার বন্ধু হিসেবে সব কথা শুনিস, মার কথা রাখ। অগত্যা বাবার সাথে গেলাম। আমাকে দেখে মেয়ের বাবা বলেন, এই বুঝি আপনার ছেলে, বেশ। চাচারা বলেন, মেয়ে নিয়ে আসেন। ভদ্রলোক মেয়ে নিয়ে এলেন। দেখে আমি তো অবাক। এত সুন্দর মেয়েকে বয়স্ক লোকের কাছে বিয়ে দেবে! ওদের মাথা খারাপ! চাচাদের বললেন, কিছু বলো। তারা বললেন, আমরা একবার বলেছি, এবার আবির বলুক। আমি বললাম, সব সময় তোমার কাছে থাকবে বাবা, আমার মেয়ে পছন্দ হয়েছে। জি, তবে দিনক্ষণ দেখেন। আমি চুপ করে আছি। বাবা গিয়ে মেয়ের গলায় একটা চেইন পরিয়ে দিয়ে বললেন, আপনার ইচ্ছা ছিল ছেলেমেয়ে দেখবে। আল্লাহর হুকুমে সব হয়। ভদ্রলোক বলেন, মেয়েরা এলেই পারত। বাবা বলেন, পরে আসতে পারবে, আমরা উঠি তাহলে। ভদ্রলোক বললেন, ছেলে, ছেলের বাবা ও আপনারা এসেছেন, একটু মিষ্টিমুখ করেন। এই বলে অনেক খাবার এনে দিলেন।
বাসায় এসে ভাবছি, এত সুন্দর মেয়েটাকে একটা বয়স্ক লোকের সাথে বিয়ে দেবে! বোনেরা ফোন করে বলে, দাদা, কেমন দেখলে? আমি বলি, তোরা কেন এলি না, আমাকে সমুদ্রে ফেলে দিলে। ফোন রেখে দিয়ে ভাবি, আমার কেউ নাই। চুনিকে বিয়ে করলে এই দিনটা আমায় দেখতে হতো না। চুনি আমাকে ধোঁকা দিল, তাই বিয়ের কথা ভাবিনি। এখন আমার কেউ নাই, মনের দুঃখে গেয়ে উঠি, ‘যদি ডাক শুনে কেউ না আসে, তবে একলা চলো রে।’ রাতে মায়ের কথা খুব মনে পড়ে। সকালে নাশতা খেতে যাইনি। বাবা ডেকে বলেন, আবির, একটু এসো। বাবার ঘরে যাই। তিনি বলেন, বসো। মেয়ের বাবা ফোন করেছিলেন, তারা ১৫ তারিখ বিয়েটা সারতে চান। আমি তোমার বোনদের বাড়ি যাব। তুমি আমার সাথে চলো, বিয়ের বাজার করতে হবে। আমি বললাম, তোমার মেয়েরাই পারবে, আমার কাজ আছে।
বাসায় এসে দেখি বোনেরা এসেছে, ওদের কিছু বলি না। বোনেরা বলে, ভাই, মন খারাপ করিস না। বাবা আমাদের জন্য সুখ-আহ্লাদ বিসর্জন দিয়েছেন। ভাই, বাবাকে কিছু বলিস না। মনে মনে বলিস, মা, তুমি হারিয়ে যাবে, তা কী করে সম্ভব। বাবা তার মেয়েদের হাতে টাকা দিলেন, লিস্ট করে নাও। মেয়ের হলুদ ও বিয়ের শাড়ি, তোমাদের জামাইদের আর যাদের দরকার কিনিও। ফুলির জন্যও কিনবা। আমার ও আবিরের জন্য একরকম পাঞ্জাবি কিনবা। গয়না কেনার সময় আমি যাব। কাল বাড়িতে রংমিস্ত্রি আসবে। আবিরকে বলি তোমাদের সাথে যেতে। নতুন বউ আসবে, সেই মেয়েটার অনেক স্বপ্ন আছে, বিয়ের গাড়িটা আবির পছন্দ করলে ভালো হয়। জামাইরা সম্মতি দেয়। তারা আমাকে জোর করে নিয়ে যায়। আমি মনে মনে জিদ করি, এমন গাড়ি পছন্দ করব, বাবার মাথা ঘুরবে। কেনাকাটা শেষ।
আজ ১৫ তারিখ। সকালে বোনের শাশুড়ি বলেন, বেয়াই, আজ বিকেলে বিয়ে, তাই এখন হলুদ দিতে হবে। আমি বলি, বাবাকে হলুদ দেন। তিনি বলেন, না, তোমাদের বাড়ির নিয়ম হলো, বাবা যদি দ্বিতীয় বিয়ে করেন, তবে বাবা ছেলেকে আগে হলুদ দেবে, পরে ছেলে বাবাকে হলুদ দেবে। আমি বলি, এটা কোনো নিয়ম হতে পারে না। বোনের শাশুড়ি বলেন, এটাই তোমাদের বাড়ির নিয়ম। আমি রেগে গিয়ে দুই বোনকে বলি, বাবার সব কথাই শুনেছি। কিন্তু এই নিয়ম মানতে পারব না। তারা বলে, এটা কর, আজকের পর আর তোকে কেউ বিরক্ত করবে না। বোনদের কথামতো হলুদের পিঁড়িতে বসি। বাবা হাসেন আর আমাকে হলুদ মেখে দেন। বাবার হলুদ দেওয়ার পর জামাইরা আমাকে হলুদ দেয়। তারপর সবাই হলুদ খেলা নিয়ে আনন্দ-উল্লাস করে। হলুদ খেলা শেষে বাবা সবাইকে বলেন, তোমরা গোসল সেরে খেয়ে তৈরি হও। গেটে ঝুড়িভরা ফুল। বাবা জামাইদের বলেন, বাসর সাজানো হবে। আমার মনে খুব কষ্ট হচ্ছে, এই বয়সে আবার বাসর, আমার মাকে কত ছোট করা হলো। বাবা নিজে বরযাত্রী নিয়ে তৈরি হন, আমাকে তৈরি করে দেন। আমার মন খারাপ দেখে বোনেরা বলে, ভাই, মন খারাপ করিস না। বাবা বলেন, আবির, তুমি মায়ের কাছে যাও, দোয়া চাও, বলো যে কাজে যাই দোয়া করিয়ো, যেন ভালোমতো করে আসতে পারি। বোনদেরও বলেন, তোমরা যাও, মায়ের কাছে দোয়া চাও। বোনেরা মায়ের ফটোর কাছে গিয়ে কাঁদল, মা, তুমি ভাইকে দোয়া করো, ও নতুন জীবনে পা দিতে যাচ্ছে, ওর জীবন যেন শান্তিময় ও সুখময় হয়, তুমি সহায় হও। বাবাও মায়ের ফটোর কাছে কাঁদেন, অনু, দোয়া করিয়ো, যেন আমি সব কাজ সুন্দরমতো করে আসতে পারি।
এবার দই মঙ্গলের পালা। বোনের শাশুড়ি বলেন, বেয়াই, প্রথমে আপনি একটু দই খাওয়ান, পরে আবির জামাইদের নিয়ে আপনাকে খাওয়াবে। আবির, ফুলি খালা ও মুরব্বিদের সালাম করো। গাড়িতে উঠতে যাব, এমন সময় ফুলি খালা এক গ্লাস দই দিল খাওয়ার জন্য। সব বরযাত্রী গাড়িতে, সাথে আমিও দুই জামাইসহ গাড়িতে উঠি।
মেয়ের বাড়ির গেটে সবাই বরকে দেখার জন্য হইচই করছে। মেয়ের বাবা সবাইকে বলেন, বরকে সময়মতো দেখতে পাবে। দুই জামাই এবং আরও একজন আমাকে নিয়ে একটা রুমে যায়। আমি বাবাকে খুঁজি। জামাইরা আমাকে বিয়ের পোশাক পরাতে আসে। আমি অবাক! জামাইদের বলি, এসব কী হচ্ছে? ওরা বলে, দাদা, সারপ্রাইজ। কিসের সারপ্রাইজ? আমাকে কাপড় পরিয়ে বিয়ের মণ্ডপে নিয়ে গেল। গিয়ে দেখি কাজী সাহেব, বাবা ও মেয়ে বসে আছে। বিয়ে হয়ে গেল। বাবার সঙ্গে কোনো কথা নেই। বিয়ের নিয়মকানুন শেষে আমার হাতে রত্নাকে তুলে দেওয়া হলো। রত্নার কান্নায় যেন আকাশ ভারী হয়ে উঠল। বউ নিয়ে বাড়ি আসি।
বাড়িতে আসার পর ফুলি খালা আর দুই খালা সব নিয়মকানুন শেষ করেন। বোনেরা রত্নাকে ঘরে বসিয়ে দিল। মনে মনে ভাবি, আমার জীবনে কী ঘটে গেল। গোলাপ ও রজনীর গন্ধে ঘর ছেয়ে গেছে। আমি রত্নাকে বলি, যাও, ফ্রেশ হয়ে এসো। রত্না ফ্রেশ হয়ে এসে আমাকে সালাম করে। এ কী, সালাম করছ কেন? আপনি আমার স্বামী, যেদিন দেখতে গেলেন, আপনাকে দেখে আল্লাহর কাছে বলেছি, হে আল্লাহ, এই ছেলেটা যেন আমার বর হয়। আল্লাহ আমার কথা কবুল করেছেন। এবার ঘুমাও, শুয়ে পড়ো। কখন যে চোখে নিদ্রাদেবী ভর করেছে, টের পাইনি। সকালে বোনদের ডাকে ঘুম ভাঙে। তারা বলে, ভাই, ভাবিকে নিয়ে নিচে আয়, বাবা ডাকেন। ফ্রেশ হয়ে বাবার ঘরে যাই। বাবা বলেন, আবির, তোমার রাগ কমল? আমি জিজ্ঞেস করি, কেন বাবা? তিনি বলেন, এই যে তোমাকে সারপ্রাইজ দিয়েছি বলে। সারপ্রাইজ না দিলে তুমি বিয়ে করতে চাইতে না। তোমার শ্বশুর আমার কলেজ-জীবনের বন্ধু। এখন চাকরি-জীবনের বন্ধু। তার পরামর্শেই এই কাজটা করতে পেরেছি। আমি আবেগাপ্লুত হয়ে বলি, সন্তানদের জন্য বাবার কী পরিমাণ ভালোবাসা থাকে, তা আমরা বুঝতে পারি না। সর্বোচ্চ ভালোবাসা দিয়ে আপনি তা প্রমাণ করলেন। বাবার ঋণ কখনো শোধ করা যায় না। বাবা বললেন, তোমরা তোমাদের মায়ের কাছে যাও। বৌমাকে বলো, তার শাশুড়ির দোয়া নিতে। জামাই ও মেয়েদেরও বলি, তোমরাও যাও। আরেকটা কথা বলি, তোমরা ফুলিকে সম্মান করিয়ো, ওকে অবহেলা করো না। ও তোমাদের মায়ের মতো করে মানুষ করেছে। বউমা ও জামাইরা ফুলিকে সালাম করো। ফুলি ওদের গলায় চেইন দিয়ে আশীর্বাদ করে। বাবা আরও বলেন, আজ থেকে রত্না আমারই মেয়ে। মায়ের গয়না নিয়ে এসে বাবা বলেন, আবির, এগুলো রত্নাকে পরিয়ে দাও। এরপর মায়ের ফটোর কাছে গিয়ে বলেন, এবার আমাকে তোমার কাছে টেনে নাও। আমরা বলি, বাবা, এটা কী বলো! তুমি না থাকলে আমরা কী করে বাঁচব?
দাদা ঠিক করেন, ঢাকায় বাড়ি কিনবেন। তাই বানিয়ানগরে বাড়ি কেনেন। তখন ঢাকায় জনবসতি কম ছিল। সব বাড়ি ছিল একতলা। দু-একটা বাড়ি দোতলা। আমাদের বাসার সামনে ছিল বিরাট খাল। খালের পাড়ে ছিল বিরাট বটগাছ। গাছে নানা জাতের পাখি, খাল দিয়ে বড় বড় নৌকা চলাচল করত। নৌকায় থাকত অনেক মালপত্র। মাঝি বৈঠা দিয়ে পানি কেটে কেটে নৌকা চালাতেন আর মনের আনন্দে গান গাইতেন : ‘মন মাঝি বৈঠা ধর আমি আর বইতে পারি না।’ গান শুনে মায়ের কাছে বায়না ধরতাম খাল দেখতে যাওয়ার জন্য। মা বারণ করতেনÑওই গাছে ভূত আছে, জানালা দিয়ে দেখ।
জানালার পাশে বসে অনেক কিছু দেখতাম। শুধু তা-ই নয়, ঢাকার রাস্তায় বিজলি বাতি ছিল না। রোজ সন্ধ্যায় একজন লোক মই হাতে একটা তেলের কৌটা নিয়ে রাস্তার মধ্যে একটা খুঁটিতে কুপি বেঁধে তাতে তেল দিয়ে বাতি জ্বালাতেন। সন্ধ্যা হলেই সেটা দেখার জন্য দাঁড়িয়ে থাকতাম। একদিন মা জিজ্ঞেস করলেন, এখানে দাঁড়িয়ে আছ কেন? আমি বলি, ওই লোক কুপি ধরাচ্ছে, তা দেখার জন্য। মা বলেন, কাকু বলবে। আমি তার নাম দিলাম বাতি কাকু। বাতি কাকু খুব খুশি। আমার সঙ্গে বন্ধুত্ব হয়ে গেল। একদিন না দেখলে বাতি কাকু খোকা বাবু বলে ডাকতেন। ঢাকায় তখন মোটরগাড়ি ছিল না, যদিও দু-একটা দেখা যেত। বাহন ছিল রিকশা বা ঘোড়ার গাড়ি। মানুষ বেড়াতে যেত, তাই দেখতাম জানালার ধারে বসে।
ঢাকার বাসাবাড়িতে কুয়া ছিল। রাস্তায় ছিল মিউনিসিপ্যাল করপোরেশনের কল। সকাল হলেই মানুষ লাইন ধরে পানি নিত। আমি বসে বসে দেখতাম। আমাদের পাশের বাসায় এক দাদু থাকতেন। খাওয়ার পানি আনতে তিনি পিতলের কলস নিয়ে লাইনে দাঁড়াতেন। দাদুর বয়স বেশি বলে সবাই তাকে আগে পানি নিতে দিতেন। এক খালা বাসায় বাসায় খাওয়ার পানি দিতেন। ঢাকায় তখন কাজের লোক ছিল না। আমাদের বাসায় ছিল ফুলি খালা, মায়ের দূরসম্পর্কের বোন। খালা ছিল বিধবা, মা কাজের জন্য তাকে নিয়ে আসেন।
আমার মা সেলাই করতেন। ছুটির দিনে নাশতা খাওয়ার পর খাটে বসে বাবার গল্প শুনি। বাবা মাকে বলেন, তুমি তাড়াতাড়ি রান্না শেষ করবে। বিকেলে বেড়াতে যাব। মায়ের প্রশ্ন, কোথায়? বলা যাবে না, সারপ্রাইজ। আমরা খুব খুশি। কোথাও যাই না, শুধু শুক্রবার বাবার সঙ্গে মসজিদে যাই। মসজিদটা খুব সুন্দর, ছোট একটা চৌবাচ্চা ছিল। চৌবাচ্চায় অনেক লাল মাছ খেলা করত। সেই চৌবাচ্চায় ফোয়ারা ছিল, ফোয়ারার পানি বেশ আকর্ষণীয়। আমরা ফোয়ার আর মাছ দেখতাম। বাবা যখন বেড়ানোর কথা বলেন, মনে হলো স্বর্গ ভুবন যাব। বোন দুটি এসে বলে, দাদা, বেড়াতে যাস? হেসে বলি, দূর বোকা, আমি তো নামাজ পড়তে যাই। আমরা আজ সবাই যাব। মনে মনে চিন্তা করি, কোথায় যেতে পারি! যাওয়ার আনন্দে দুষ্টুমি করতে থাকি। মা বকা দিয়ে বলেন, লেখাপড়া সব বন্ধ, পড়তে বস। বাবা বলেন, আজ থাক।
মা ফুলি খালাকে রান্না চাপাতে বলেন। কী কী রান্না হবে, তা-ও বলে দিয়ে খাটে বসেন। কোনো কথা বলেন না। বাবা জিজ্ঞেস করেন, চুপ আছ কেন? কোনো কিছু নিয়ে চিন্তা করছ? মা বলেন, চিন্তা না, বুকটা ব্যথা করে উঠল। বাবা ডাক্তার আনতে গেলেন। মা আমাকে ইশারা দিয়ে ডেকে বললেন, বাবাকে দেখিস, বাবার অবাধ্য হোস না, বাবার কথামতো চলিস, বোনদের ভালোবাসিস, আমার আদর দিস। খালাকে বলেন, তোর কাছে এদের রেখে গেলাম। খালা বলল, দাদাবাবু কোথায় গেলেন, বুবুর খুব কষ্ট হচ্ছে। আমার বয়স ১২ বছর, বড় বোনের ৯ আর ছোট বোনের বয়স ৪। বাবা ডাক্তার আনলেন কিন্তু মা আর নেই। ছোট বোনটা মা-মা করে কেঁদে চলছে, আমি বোকার মতো তাকিয়ে আছি। বড় বোনটা বলে, মা কেন কথা বলে না। ওকে আমার বলার ভাষা নেই। পাড়ার সবাই মুহূর্তে এসে দোয়া-দরুদ পড়া আরম্ভ করেন। হুজুর কোরআন পড়তে থাকেন। গোসল শেষ করে মাকে সাদা কাপড়ে জড়িয়ে দেওয়া হলো। আমাদের মা চিরতরে চলে গেলেন না ফেরার দেশে। রেখে গেলেন ছোট তিন সন্তানকে।
বাবা সহযাত্রীদের সঙ্গে নিয়ে মাকে রেখে এলেন। বাবা আমাদের কাছে নিয়ে বসেন, একদৃষ্টে মায়ের ফটোর দিকে তাকিয়ে বিড়বিড় করে কী যেন বলেন। ফুলি খালারও মন খারাপ। আর কোনো দিন বেড়াতে যাওয়ার কথা বলিনি। এভাবে বছর কেটে গেল। বোন দুটিকে বাংলাবাজার স্কুলে ভর্তি করে দিলেন বাবা। আমি মা থাকতেই সেন্ট যোসেফ স্কুলে পড়তাম। এখান থেকেই পড়া শেষ করি। বোনেরা বাংলাবাজার স্কুল থেকে পাস করে ইডেনে ভর্তি হয়। বড় বোনের এমএ রেজাল্ট খুব ভালো হয়। বাবা ডাক্তার ছেলের সঙ্গে তাকে বিয়ে দেন। ছোট বোন বিএ পড়ত, রেজাল্ট খুব একটা ভালো হয়নি। বাবা ডেকে বলেন, তোর রেজাল্ট খারাপ হলো কেন, তুই কি পড়তে চাস না? সে বলল, পড়াশোনা আমার ভালো লাগে না। বাবা হেসে বলেন, তাহলে বিয়ে দিয়ে দিই। বিয়ের কথা শুনে ও হাসি দিল। বাবা বলেন, আর বলতে হবে না।
দুই মাসের মধ্যে ইঞ্জিনিয়ার ছেলের সঙ্গে ছোট বোনকে বিয়ে দিয়ে দিলেন বাবা। আমার ও বাবার মনটা খারাপ। বাড়িটা ফাঁকা। ফুলি খালা কেবল চোখ মোছে, ছটু ছিল প্রাণ, বাড়ির সবাইকে হাসাত, নিজেও হাসত। অনেক সময় বকা দিতে গিয়ে নিজে বকা খেতাম, সেই ছটু তুই কবে বড় হয়ে গেলি। তোকে বুকছাড়া করে দিলাম। বাবা ফুলি খালাকে বলেন, তুমি ওদের বড় করেছ, দোয়া করো, যেন ভালোমতো সংসার গুছিয়ে করতে পারে। আমার মনটা খারাপ, আমি তো ওদের ভাই ছিলাম না, ছিলাম বন্ধু। পায়ে পায়ে বাবার কাছে যাই, আমাকে বলেন, এখন মনে হয় তোদের মা নাই। আমি বলি, তুমি তো আমাদের মায়ের আদর ও ভালোবাসা দিয়ে বড় করেছ। বুঝতে দাওনি মায়ের অভাব। এখন তুমি মন খারাপ করলে আমি কীভাবে থাকব।
বাবা উঠে এসে আমাকে বুকে নিয়ে বলেন, মন খারাপ করিস না, তুই আর আমি মনের আনন্দে ঘুরেফিরে দিন কাটিয়ে দেব, বোনেরা বড় হয়েছে, বিয়ে তো দিতেই হতো। সময় সবকিছু বদলে দেয়। কয়েক বছর হলো, বাবা বলেন, আবির, বিয়ে কর। হেসে বলি, তুমি-আমি বেশ আছি। এভাবেই কাটতে থাকে আমাদের সময়। একদিন এমন রিঅ্যাক্ট করলেন বাবা, কিছুই বুঝতে পারলাম না-ফুলির হাতের রান্না ভালো লাগে না। খালা তো অবাক, বাবাকে কিছু বলি না।
এক সপ্তাহ পর বাইরে থেকে ফিরছি, হাত-মুখ ধুয়ে বিছানায় শুয়ে পড়ি। বাবা আমার দরজায় টোকা দেন। দরজা খুলি, বাবা কিছু বলবেন? বাবা বলেন, আমি বিয়ে করব। অবাক হই। বাবার মুখের দিকে চেয়ে বলি, কী বলেন! তিনি বলেন, ঠিকই বলছি, মানুষ কী বলবে, মানুষের কথায় কী-বা যায় আসে। আমাদের কেউ খোঁজখবর নেয়, কে কী বলবে তা নিয়ে ভাবি না। বাবা চলে গেলেন। রাতে আর ঘুম এল না। সকালে বোনদের ফোন করি, ওরা এসে বাবাকে বলে, মা তো অনেক দিন আগে চলে গেছেন, তুমি মায়ের আদর দিয়ে আমাদের বড় করেছ। ফুলি খালা, এসব কী শুনি? বাবা বলেন, যা শুনেছ ঠিকই শুনেছ। এভাবে আর থাকতে পারব না। আমাকে জ্ঞান দিতে এসো না। বোনেরা মুখ মলিন করে চলে গেল। কয়েক দিন আবার দুই চাচাকে নিয়ে বাবা কোথায় যেন যান। আমাকে দেখে বলেন, শোন, আমি মেয়ে দেখতে যাই, যদি পছন্দ হয় তবে বিয়ে করে চলে আসব। আমি ভাবতে পারি না, বাবা কী বলছেন! চুপ করে থাকি। বাবা মিটিমিটি হাসেন। বাবার সঙ্গে কথা বন্ধ।
আজ আবার ঘরে এসে বলেন, আবির, তুমি আমার সাথে যাবে, কাল আমরা মেয়ে দেখতে যাব। মেয়ের বাবা তোমাকে দেখতে চায়। আমি বলি, তোমার মেয়েদের বলো। বোনদের ফোন করে বলি, ওরা বলে, তুই যা। তুই বাবার বন্ধু হিসেবে সব কথা শুনিস, মার কথা রাখ। অগত্যা বাবার সাথে গেলাম। আমাকে দেখে মেয়ের বাবা বলেন, এই বুঝি আপনার ছেলে, বেশ। চাচারা বলেন, মেয়ে নিয়ে আসেন। ভদ্রলোক মেয়ে নিয়ে এলেন। দেখে আমি তো অবাক। এত সুন্দর মেয়েকে বয়স্ক লোকের কাছে বিয়ে দেবে! ওদের মাথা খারাপ! চাচাদের বললেন, কিছু বলো। তারা বললেন, আমরা একবার বলেছি, এবার আবির বলুক। আমি বললাম, সব সময় তোমার কাছে থাকবে বাবা, আমার মেয়ে পছন্দ হয়েছে। জি, তবে দিনক্ষণ দেখেন। আমি চুপ করে আছি। বাবা গিয়ে মেয়ের গলায় একটা চেইন পরিয়ে দিয়ে বললেন, আপনার ইচ্ছা ছিল ছেলেমেয়ে দেখবে। আল্লাহর হুকুমে সব হয়। ভদ্রলোক বলেন, মেয়েরা এলেই পারত। বাবা বলেন, পরে আসতে পারবে, আমরা উঠি তাহলে। ভদ্রলোক বললেন, ছেলে, ছেলের বাবা ও আপনারা এসেছেন, একটু মিষ্টিমুখ করেন। এই বলে অনেক খাবার এনে দিলেন।
বাসায় এসে ভাবছি, এত সুন্দর মেয়েটাকে একটা বয়স্ক লোকের সাথে বিয়ে দেবে! বোনেরা ফোন করে বলে, দাদা, কেমন দেখলে? আমি বলি, তোরা কেন এলি না, আমাকে সমুদ্রে ফেলে দিলে। ফোন রেখে দিয়ে ভাবি, আমার কেউ নাই। চুনিকে বিয়ে করলে এই দিনটা আমায় দেখতে হতো না। চুনি আমাকে ধোঁকা দিল, তাই বিয়ের কথা ভাবিনি। এখন আমার কেউ নাই, মনের দুঃখে গেয়ে উঠি, ‘যদি ডাক শুনে কেউ না আসে, তবে একলা চলো রে।’ রাতে মায়ের কথা খুব মনে পড়ে। সকালে নাশতা খেতে যাইনি। বাবা ডেকে বলেন, আবির, একটু এসো। বাবার ঘরে যাই। তিনি বলেন, বসো। মেয়ের বাবা ফোন করেছিলেন, তারা ১৫ তারিখ বিয়েটা সারতে চান। আমি তোমার বোনদের বাড়ি যাব। তুমি আমার সাথে চলো, বিয়ের বাজার করতে হবে। আমি বললাম, তোমার মেয়েরাই পারবে, আমার কাজ আছে।
বাসায় এসে দেখি বোনেরা এসেছে, ওদের কিছু বলি না। বোনেরা বলে, ভাই, মন খারাপ করিস না। বাবা আমাদের জন্য সুখ-আহ্লাদ বিসর্জন দিয়েছেন। ভাই, বাবাকে কিছু বলিস না। মনে মনে বলিস, মা, তুমি হারিয়ে যাবে, তা কী করে সম্ভব। বাবা তার মেয়েদের হাতে টাকা দিলেন, লিস্ট করে নাও। মেয়ের হলুদ ও বিয়ের শাড়ি, তোমাদের জামাইদের আর যাদের দরকার কিনিও। ফুলির জন্যও কিনবা। আমার ও আবিরের জন্য একরকম পাঞ্জাবি কিনবা। গয়না কেনার সময় আমি যাব। কাল বাড়িতে রংমিস্ত্রি আসবে। আবিরকে বলি তোমাদের সাথে যেতে। নতুন বউ আসবে, সেই মেয়েটার অনেক স্বপ্ন আছে, বিয়ের গাড়িটা আবির পছন্দ করলে ভালো হয়। জামাইরা সম্মতি দেয়। তারা আমাকে জোর করে নিয়ে যায়। আমি মনে মনে জিদ করি, এমন গাড়ি পছন্দ করব, বাবার মাথা ঘুরবে। কেনাকাটা শেষ।
আজ ১৫ তারিখ। সকালে বোনের শাশুড়ি বলেন, বেয়াই, আজ বিকেলে বিয়ে, তাই এখন হলুদ দিতে হবে। আমি বলি, বাবাকে হলুদ দেন। তিনি বলেন, না, তোমাদের বাড়ির নিয়ম হলো, বাবা যদি দ্বিতীয় বিয়ে করেন, তবে বাবা ছেলেকে আগে হলুদ দেবে, পরে ছেলে বাবাকে হলুদ দেবে। আমি বলি, এটা কোনো নিয়ম হতে পারে না। বোনের শাশুড়ি বলেন, এটাই তোমাদের বাড়ির নিয়ম। আমি রেগে গিয়ে দুই বোনকে বলি, বাবার সব কথাই শুনেছি। কিন্তু এই নিয়ম মানতে পারব না। তারা বলে, এটা কর, আজকের পর আর তোকে কেউ বিরক্ত করবে না। বোনদের কথামতো হলুদের পিঁড়িতে বসি। বাবা হাসেন আর আমাকে হলুদ মেখে দেন। বাবার হলুদ দেওয়ার পর জামাইরা আমাকে হলুদ দেয়। তারপর সবাই হলুদ খেলা নিয়ে আনন্দ-উল্লাস করে। হলুদ খেলা শেষে বাবা সবাইকে বলেন, তোমরা গোসল সেরে খেয়ে তৈরি হও। গেটে ঝুড়িভরা ফুল। বাবা জামাইদের বলেন, বাসর সাজানো হবে। আমার মনে খুব কষ্ট হচ্ছে, এই বয়সে আবার বাসর, আমার মাকে কত ছোট করা হলো। বাবা নিজে বরযাত্রী নিয়ে তৈরি হন, আমাকে তৈরি করে দেন। আমার মন খারাপ দেখে বোনেরা বলে, ভাই, মন খারাপ করিস না। বাবা বলেন, আবির, তুমি মায়ের কাছে যাও, দোয়া চাও, বলো যে কাজে যাই দোয়া করিয়ো, যেন ভালোমতো করে আসতে পারি। বোনদেরও বলেন, তোমরা যাও, মায়ের কাছে দোয়া চাও। বোনেরা মায়ের ফটোর কাছে গিয়ে কাঁদল, মা, তুমি ভাইকে দোয়া করো, ও নতুন জীবনে পা দিতে যাচ্ছে, ওর জীবন যেন শান্তিময় ও সুখময় হয়, তুমি সহায় হও। বাবাও মায়ের ফটোর কাছে কাঁদেন, অনু, দোয়া করিয়ো, যেন আমি সব কাজ সুন্দরমতো করে আসতে পারি।
এবার দই মঙ্গলের পালা। বোনের শাশুড়ি বলেন, বেয়াই, প্রথমে আপনি একটু দই খাওয়ান, পরে আবির জামাইদের নিয়ে আপনাকে খাওয়াবে। আবির, ফুলি খালা ও মুরব্বিদের সালাম করো। গাড়িতে উঠতে যাব, এমন সময় ফুলি খালা এক গ্লাস দই দিল খাওয়ার জন্য। সব বরযাত্রী গাড়িতে, সাথে আমিও দুই জামাইসহ গাড়িতে উঠি।
মেয়ের বাড়ির গেটে সবাই বরকে দেখার জন্য হইচই করছে। মেয়ের বাবা সবাইকে বলেন, বরকে সময়মতো দেখতে পাবে। দুই জামাই এবং আরও একজন আমাকে নিয়ে একটা রুমে যায়। আমি বাবাকে খুঁজি। জামাইরা আমাকে বিয়ের পোশাক পরাতে আসে। আমি অবাক! জামাইদের বলি, এসব কী হচ্ছে? ওরা বলে, দাদা, সারপ্রাইজ। কিসের সারপ্রাইজ? আমাকে কাপড় পরিয়ে বিয়ের মণ্ডপে নিয়ে গেল। গিয়ে দেখি কাজী সাহেব, বাবা ও মেয়ে বসে আছে। বিয়ে হয়ে গেল। বাবার সঙ্গে কোনো কথা নেই। বিয়ের নিয়মকানুন শেষে আমার হাতে রত্নাকে তুলে দেওয়া হলো। রত্নার কান্নায় যেন আকাশ ভারী হয়ে উঠল। বউ নিয়ে বাড়ি আসি।
বাড়িতে আসার পর ফুলি খালা আর দুই খালা সব নিয়মকানুন শেষ করেন। বোনেরা রত্নাকে ঘরে বসিয়ে দিল। মনে মনে ভাবি, আমার জীবনে কী ঘটে গেল। গোলাপ ও রজনীর গন্ধে ঘর ছেয়ে গেছে। আমি রত্নাকে বলি, যাও, ফ্রেশ হয়ে এসো। রত্না ফ্রেশ হয়ে এসে আমাকে সালাম করে। এ কী, সালাম করছ কেন? আপনি আমার স্বামী, যেদিন দেখতে গেলেন, আপনাকে দেখে আল্লাহর কাছে বলেছি, হে আল্লাহ, এই ছেলেটা যেন আমার বর হয়। আল্লাহ আমার কথা কবুল করেছেন। এবার ঘুমাও, শুয়ে পড়ো। কখন যে চোখে নিদ্রাদেবী ভর করেছে, টের পাইনি। সকালে বোনদের ডাকে ঘুম ভাঙে। তারা বলে, ভাই, ভাবিকে নিয়ে নিচে আয়, বাবা ডাকেন। ফ্রেশ হয়ে বাবার ঘরে যাই। বাবা বলেন, আবির, তোমার রাগ কমল? আমি জিজ্ঞেস করি, কেন বাবা? তিনি বলেন, এই যে তোমাকে সারপ্রাইজ দিয়েছি বলে। সারপ্রাইজ না দিলে তুমি বিয়ে করতে চাইতে না। তোমার শ্বশুর আমার কলেজ-জীবনের বন্ধু। এখন চাকরি-জীবনের বন্ধু। তার পরামর্শেই এই কাজটা করতে পেরেছি। আমি আবেগাপ্লুত হয়ে বলি, সন্তানদের জন্য বাবার কী পরিমাণ ভালোবাসা থাকে, তা আমরা বুঝতে পারি না। সর্বোচ্চ ভালোবাসা দিয়ে আপনি তা প্রমাণ করলেন। বাবার ঋণ কখনো শোধ করা যায় না। বাবা বললেন, তোমরা তোমাদের মায়ের কাছে যাও। বৌমাকে বলো, তার শাশুড়ির দোয়া নিতে। জামাই ও মেয়েদেরও বলি, তোমরাও যাও। আরেকটা কথা বলি, তোমরা ফুলিকে সম্মান করিয়ো, ওকে অবহেলা করো না। ও তোমাদের মায়ের মতো করে মানুষ করেছে। বউমা ও জামাইরা ফুলিকে সালাম করো। ফুলি ওদের গলায় চেইন দিয়ে আশীর্বাদ করে। বাবা আরও বলেন, আজ থেকে রত্না আমারই মেয়ে। মায়ের গয়না নিয়ে এসে বাবা বলেন, আবির, এগুলো রত্নাকে পরিয়ে দাও। এরপর মায়ের ফটোর কাছে গিয়ে বলেন, এবার আমাকে তোমার কাছে টেনে নাও। আমরা বলি, বাবা, এটা কী বলো! তুমি না থাকলে আমরা কী করে বাঁচব?