​যুক্তরাষ্ট্র-ইরান যুদ্ধ ছড়িয়ে পড়ছে মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে

প্রকাশ : ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১১:৪১ , অনলাইন ভার্সন
বিশ্ববাসী ভাবতে শুরু করেছিল যুক্তরাষ্ট্র-ইরান যুদ্ধ হয়তো অচিরই থেমে যাবে। যুদ্ধে লিপ্ত যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান শুভবুদ্ধির পরিচয় দিয়ে একটি শান্তি সমঝোতায় উপনীত হবে। ইতিমধ্যেই দুই দেশ যুদ্ধের কারণে বিপুল ক্ষয়ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছে। যুদ্ধের কারণে সৃষ্ট অর্থনৈতিক সংকট যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান উভয় দেশকেই বিপর্যয়ের দিকে নিয়ে যাচ্ছে। দুই দেশের মানুষকেই চরম বিপর্যয়ের মুখোমুখি হতে হচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্রে জ্বালানি তেলের সংকট সৃষ্টি শিল্পসহ সকল উৎপাদন খাতকেই নাজুক অবস্থার মধ্যে ফেলে দিচ্ছে। জ্বালানি তেলের মূল্য বৃদ্ধি পাচ্ছে, তার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে বাজারে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম। নিম্নবিত্ত, মধ্যবিত্ত মানুষের নাভিশ্বাস উঠছে জীবিকা নির্বাহে। বাংলাদেশসহ বিশ্বের অন্যান্য দেশে মানুষের বাজারের ফর্দ ছোট হয়ে আসছে দিনকে দিন। কলকারখানা বন্ধ হয়ে যাওয়ার খবর পাওয়া যাচ্ছে। মানুষ কর্মহীন হয়ে পড়ছে।

কিন্তু না, যুদ্ধ থামার কোনো ইঙ্গিতই নেই। বরং প্রতিদিন বিধ্বংসী হয়ে উঠছে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান দুই দেশের কোনো দেশের মধ্যেই শুভবুদ্ধি উদয় হওয়ার কোনো লক্ষণ নেই। পাল্টাপাল্টি হামলা তীব্র থেকে তীব্রতর হচ্ছে। হরমুজ প্রণালি দিয়ে জ্বালানি ও পণ্যবাহী জাহাজ চলাচল আরও সংকুচিত হচ্ছে। শুধু তা-ই নয়, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের কর্মকর্তাদের মুখ থেকে যেসব হুঁশিয়ারি শোনা যাচ্ছে, তাতে যুদ্ধ যে আসলে কোন দিকে মোড় নেয়, তা এ মুহূর্তে বলা কঠিন। তবে এ কথা বলা যায়, যুদ্ধ সহজে থামছে না এবং এ যুদ্ধ তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধের আলামত কি না, তাই-বা কে জানে। ইতিমধ্যে মধ্যপ্রাচ্যের এ যুদ্ধ আরও অনেক যুদ্ধকে উসকে দিচ্ছে। ইয়েমেন-সৌদি আরব, সশস্ত্র বিদ্রোহী গোষ্ঠী হুতির মধ্যে তীব্র লড়াই চলছে। সরকারি বাহিনীর সমর্থনে সৌদি আরব ইয়েমেনে বোমা ফেলে পরিস্থিতি আরও জটিল করে তুলছে। এদিকে হুতি বিদ্রোহীরা তাদের লড়াইয়ের তীব্রতা বাড়িয়ে দিয়ে তাদের অভিযান অব্যাহত রেখেছে। নতুন নতুন এলাকা হুতিরা তাদের দখলে নিয়ে এগিয়ে চলেছে।

এদিকে গাজা ও লেবাননে যুদ্ধবাজ নেতানিয়াহুর নির্দেশে ইসরায়েলি বাহিনী তাদের বর্বরতা চালিয়ে হাজার হাজার ফিলিস্তিনি ও লেবানিজকে হত্যা করে চলেছে। গাজায় মানবাধিকার বলে কিছু নেই। মুসলিম বিশ্ব তো বটেই, যারা অন্য সময় মানবাধিকারের কথা বলে মুখে ফেনা তোলে, তারা যেন গাজা ও লেবাননের ব্যাপারে মুখে কুলুপ এঁটে রাখে। ইসরায়েলি বাহিনীর নিষ্ঠুরতার কোনো সীমা নেই। তারা নির্বিচারে গাজা ও লেবাননে গণহত্যা চালিয়ে যাচ্ছে। তাদের বর্বর হামলা থেকে হাসপাতাল, মসজিদ, স্কুল-কলেজ এমনকি যারা সর্বস্ব হারিয়ে খোলা আকাশের নিচে তাঁবু খাটিয়ে কোনো রকমে একটু বেঁচে থাকার লড়াই চালাচ্ছে, সবখানে তারা বিমান হামলা চালিয়ে মানুষ মারছে। তারা যেন হিটলারের বিরুদ্ধে প্রতিশোধ না নিতে পেরে নিরীহ মুসলমানদের হত্যা করে তার প্রতিশোধ তুলে নিচ্ছে।

ইরান-যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধ গত ২৮ ফেব্রুয়ারি শুরু হয়। সেপ্টেম্বরে সপ্তম মাসে পড়েছে। এর মধ্যে ‘এই থামছে থামছে’ করে এখনো থামেনি যুদ্ধ। কখনো তীব্র, কখনো মন্থর গতিতে যুদ্ধ চলে আসছে। যুদ্ধ থামাতে বহুপক্ষীয় সমঝোতা আলোচনাও হয়েছে। সহমত হতে হতেও একবিন্দুতে পৌঁছানো হয়নি কোনো পক্ষের। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প যুদ্ধ বন্ধে ভাসা ভাসা কথা বললেও কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করেননি, এমনটাই বিশ্বাস করেন শান্তিপ্রিয় মানুষ। পাকিস্তান ও তুরস্ক বারবার শান্তি বৈঠকে ইরান-যুক্তরাষ্ট্রকে বসালেও শেষ পর্যন্ত সাফল্য দেখতে পায়নি।

যুদ্ধ তাই চলছে। বলা যায়, আরও জোরালোভাবে চলছে এবং তা ছড়িয়ে পড়ছে। এই কঠিন বাস্তবতা অস্বীকার করা যায় না। যুক্তরাষ্ট্র বহুভাবে ইরানকে নতিস্বীকার করার জন্য চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। কখনো সামরিক অভিযান চালাচ্ছে ইরানকে পর্যুদস্ত করতে। কখনো সর্বাত্মক অর্থনৈতিক অবরোধের ব্যবস্থা গ্রহণ করছে। এ ক্ষেত্রে কোনো দেশ প্রকাশ্যে বা গোপনে ইরানকে সাহায্য করলে তার বিরুদ্ধেও সর্বাত্মক অর্থনৈতিক অবরোধ দেওয়ার হুমকি দিয়ে রেখেছে। কিন্তু ইরান যুক্তরাষ্ট্রের কোনো হুমকিতেই চোখ নামাচ্ছে না। তারা কেবল আত্মরক্ষাই করছে না, তারা আগ্রাসী আক্রমণও চালাচ্ছে মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন স্থাপনায়। এতে যুক্তরাষ্ট্র একেবারে কম ক্ষতিরও শিকার হচ্ছে না। অনেক বিশ্ব মিডিয়াতেও আমেরিকার অস্ত্র সরবরাহে ঘাটতির কথা বলা হচ্ছে এবং সে কারণেই যুক্তরাষ্ট্র এখন অর্থনৈতিক যুদ্ধের পথেই হাঁটছে না, সামরিক হামলাও বৃদ্ধি করেছে। যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধ শুরু করেছিল ইরানে ইসলামি বিপ্লবী সরকারের পতন ঘটিয়ে নিজেদের পছন্দের সরকার বসিয়ে আপন আকাঙ্ক্ষা ইচ্ছামতো পূরণ করতে। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রের হিসাব ভেনিজুয়েলার মতো মেলেনি। ইরান ‘জ্বলেপুড়ে ছারখার তবু মাথা নোয়াবার নয়’। আর এই হিসাব না মেলাতেই যুক্তরাষ্ট্রকে বারবার সামরিক ফ্রন্টে, আবার কখনো অর্থনৈতিক ফ্রন্টে যুদ্ধ চালাতে হচ্ছে। কিন্তু তাতেও ফল পাচ্ছে না।

তাই তো সামরিক বিশেষজ্ঞদের ধারণা, যুক্তরাষ্ট্র-ইরান যুদ্ধ দীর্ঘস্থায়ী হবে। যুক্তরাষ্ট্র যতই হরমুজ প্রণালিকে নিজেদের ভূখণ্ড দাবি করুক, এর মীমাংসা সহজে হচ্ছে না। কারণ যুক্তরাষ্ট্র দাবি করলেই সেটা বাস্তবে রূপ নিয়ে নেবে আর যুদ্ধ থেমে যাবে—হিসাবটা এত সহজ নয়। আর বিশ্বব্যাপী এর ফল ভালো হবে না। বিশ্ব অর্থনীতিতে ভয়ংকর প্রভাব পড়বে। আমেরিকাও এর বাইরে থাকবে না। আমেরিকার অর্থনীতির টান নাগরিক সমাজকে স্পর্শ করবে। এখন যে অবস্থা, তার চেয়েও কত ভয়ংকর হবে, ভাবা যায় না। মধ্যপ্রাচ্যের তেল সরবরাহ কমতে থাকবে। বিশ্বব্যাপী শিল্প-কারখানা বন্ধ হয়ে যেতে থাকবে, বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যের তেলের ওপর নির্ভরশীল দেশগুলোর। বাংলাদেশসহ যেসব দেশের অর্থনীতির বড় একটি অংশ নির্ভর করে মধ্যপ্রাচ্যে জনশক্তি রপ্তানির ওপর, সেসব দেশ ভয়ংকর অর্থনৈতিক সংকটে পতিত হবে।

বাংলাদেশে জ্বালানি সংকটের ফলে ইতিমধ্যেই গার্মেন্টসসহ অনেক শিল্প-কারখানা বন্ধ হয়ে গেছে। বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের দ্বিতীয় বৃহত্তম খাত জনশক্তি রফতানিও বন্ধ হবে, যদি মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধ দীর্ঘস্থায়ী বা আরও ভয়ংকর রূপ নেয়। এরপর থাকবে প্রবাসীদের রেমিট্যান্স। সেটার ওপরও প্রভাব পড়বে, যদি যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে জীবনযাত্রার ব্যয় আরও বেড়ে যায়। তখন এর প্রভাব রেমিট্যান্সের ওপর পড়বেই। সেই বিপদ থেকে উদ্ধার পাওয়া বাংলাদেশ এবং অন্যান্য অনেক দেশের জন্যই কঠিন হবে। কী ভয়ংকর অবস্থা বিশ্বজুড়েই সৃষ্টি হবে, ভাবতে গেলেও ভয় লাগে।

সুতরাং বিশ্ববাসীর কামনা—যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের শুভবুদ্ধির উদয় হোক। ইসরায়েলকেও শুভবুদ্ধি নিয়ে বিশ্ব শান্তির পথে এগিয়ে আসতে হবে। কেননা বিশ্বজুড়েই বিশ্বাস, ইসরায়েলের স্বার্থেই ট্রাম্পের এ যুদ্ধে জড়ানো। তাই একটি শান্তির বিশ্ব গড়তে সকল পক্ষকেই এগিয়ে আসতে হবে। শান্তিকামী বিশ্ববাসীর প্রার্থনা, শান্তির পথে সবাই এগিয়ে আসবেন এবং শান্তির মধ্য দিয়েই সকল সংকটের সমাধান খুঁজবেন। যুদ্ধ কোনো সংকটের সমাধান দেয় না, সংকটের জন্ম দেয়। শত কোটি বছর ধরে যে সভ্যতা গড়ে ওঠে, যুদ্ধ এক নিমেষেই সেই সভ্যতা ধ্বংস করে দেয়। তাই বিশ্বময় এ সেøাগান জোরালো হোক : ‘যুদ্ধ নয় শান্তি চাই’।
Thikana
M M Shahin, Chairman, Board of Editors, Thikana
Corporate Headquarter
THIKANA : 7409 37th Ave suite 403 Jackson Heights, NY 11372
Phone : 718-472-0700/2428, 718-729-6000
Fax: + 1(866) 805-8806
Bangladesh Bureau
THIKANA : 70/B, Green Road, (Panthapath), 5th Floor, Dhaka, BD.
E-Mail : [email protected]
For Advertisement : [email protected]