​প্রবাসীদের হৃদয়ের রক্তক্ষরণ বন্ধ হবে কবে?

প্রকাশ : ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১৮:৪৮ , অনলাইন ভার্সন
৩০ লাখ শহীদ, ২ লাখ সম্ভ্রমহারা মা-বোনের গগনবিদারী আর্তনাদ এবং সর্বস্তরের বাঙালিদের যথাসর্বস্ব আত্মত্যাগ ও এক সাগর রক্তের বিনিময়ে একাত্তর সালে বিশ্বমানচিত্রে স্বাধীন-সার্বভৌম বাংলাদেশের স্থান লাভ ছিল মুক্তিকামী বিশ্ববাসীর জন্য অনন্ত অনুপ্রেরণা ও আত্মত্যাগের উষ্ণ প্রস্রবণ। বস্তুত, জাতি-ধর্ম-বর্ণ-গোষ্ঠী নির্বিশেষে সাবেক পূর্ব পাকিস্তানের অধিকারবঞ্চিত আবালবৃদ্ধবনিতা অর্থাৎ সশস্ত্র-নিরস্ত্র, সামরিক-বেসামরিক, শিক্ষক-ছাত্র, শিক্ষিত-নিরক্ষর, কৃষক-শ্রমিক, জেলে-তাঁতি, কামার-কুমার সবাই একাত্তরের মুক্তি তথা মরণসংগ্রামে ঝাঁড়িয়ে পড়েছিল। তাদের ব্যতিক্রমী আত্মত্যাগ গোটা বিশ্ববাসীকে তাক লাগিয়ে দিয়েছিল। প্রবাসী বাঙালিরাও সেই অবিনশ্বর কীর্তি স্থাপনে গৌরবোজ্জ্বল ভূমিকা পালন করেছিলেন। যুক্তরাষ্ট্রপ্রবাসী বাঙালিরা বিশ্ব রাজধানী হিসেবে খ্যাত নিউইয়র্কের ঐতিহ্যবাহী ম্যাডিসন স্কয়ার গার্ডেনে জর্জ হ্যারিসনের তত্ত্বাবধানে বাংলাদেশ কনসার্টের আয়োজনের করে বাংলাদেশের গণহত্যার করুণ কাহিনি বিশ্ববাসীর গোচরীভূত করেছিলেন। ফলে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে নতুন দিগন্তের উন্মোচন ঘটে। যুক্তরাষ্ট্র ও চীন পাকিস্তানের প্রতি তাদের হটকারী সমর্থন প্রত্যাহারে বাধ্য হয় এবং মুক্তিযুদ্ধের প্রতি জনসমর্থন বিশ্বময় ছড়িয়ে পড়ে। বলার অপেক্ষা রাখে না, আমাদের মুক্তিযুদ্ধ ক্ষমতার হাতবদল কিংবা ভৌগোলিক মানচিত্র বদলের জন্য নিছক কোনো যুদ্ধ ছিল না। এটি ছিল মূলত শোষণ-বঞ্চনা ও সর্ববিধ বৈষম্যমুক্তি এবং আইনের শাসন, সৌভ্রাতৃত্ব, সাম্যবাদ, গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার বজ্রকঠোর সংকল্প। তাই বীর বাঙালি অনেকটা খালি হাতেই শক্তিশালী পাক বাহিনীকে শোচনীয় পরাজয়বরণে বাধ্য করতে সক্ষম হয়েছিল। দীর্ঘ ৯ মাসের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের পর একাত্তরের ১৬ ডিসেম্বর ঐতিহাসিক সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে পূর্বাঞ্চলীয় কমান্ড লেফটেন্যান্ট জেনারেল অরোরার নিকট লেফটেন্যান্ট জেনারেল নিয়াজির নেতৃত্বাধীন অত্যাধুনিক সমরাস্ত্র সজ্জিত ৯৬ হাজার পাক হানাদার বাহিনীর নিঃশর্ত আত্মসমর্পণের মাধ্যমে রক্তিম সূর্যখচিত স্বাধীন-সার্বভৌম বাংলাদেশ বিশ্ব মানচিত্রে গৌরবোজ্জ্বল স্থান দখল করেছিল।

যাহোক, ১৯৭১ সাল থেকে ২০২৬ সাল—দীর্ঘ ৫৫ বছর। এই দীর্ঘ পথপরিক্রমায় ব্যক্তিজীবন থেকে সমাজজীবনে, রাষ্ট্রীয় পর্যায় থেকে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে সংঘটিত হয়েছে নানা উত্থান-পতন এবং অসংখ্য রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার হয়েছে হাতবদল। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির জগতে ঘটেছে বৈপ্লবিক পরিবর্তন। মান্ধাতার আমলের অজানা-অচেনা জগৎকে নিয়ে গড়ে উঠেছে গ্লোবাল ওয়ার্ল্ড। চিকিৎসাবিজ্ঞানের অভাবনীয় উন্নতি সনাতনী আমলের কালাজ্বর-কলেরা-বসন্ত-হাম-প্লেগ-জলাতঙ্ক ইত্যাদি প্রাণঘাতী রোগব্যাধিকে নির্বাসনে পাঠিয়েছে। উন্নত-উন্নয়নশীল-অনুন্নত সর্বত্র প্রসূতি এবং শিশুমৃত্যুর হার সন্তোষজনক পর্যায়ে নেমে এসেছে। তবে হার্ট অ্যাটাক নামক সাইলেন্ট কিলার (নীরব ঘাতক); দূরারোগ্য ক্যান্সার, উচ্চ রক্তচাপ, কোলেস্টেরল ইত্যাদি প্রাণসংহারী ব্যাধি অদ্যাবধি চিকিৎসাবিজ্ঞানীদের শিরঃপীড়ার কারণ হিসেবে দোর্দণ্ড প্রতাপে অগণিত প্রাণ ছিনিয়ে নিয়েছে।
অবশ্য বাংলাদেশের পটভূমিতে সার্বিক বিচার-বিশ্লেষণ করতে গেলে সর্বাপেক্ষা অপ্রত্যাশিত ও অনাকাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন সূচিত হয়েছে মনুষ্যত্ববোধ, জীবনাচরণ, পারিবারিক-সামাজিক-কৃষ্টি-সংস্কৃতি ও ধর্মীয় মূল্যবোধের ক্ষেত্রে। সনাতনী ভ্রাতৃত্ববোধে পচন ধরেছে এবং যৌথ পরিবার-ব্যবস্থা সমাজ ও রাষ্ট্র থেকে প্রায় বিদায় নিয়েছে। মনুষ্যত্ববোধের নির্বাসন এবং পশুত্ববোধের অবাধ রাজত্ব প্রতিষ্ঠিত হয়ে রাজনীতিতে আদর্শগত এবং গুণগত বৈপ্লবিক পরিবর্তন সূচিত হয়েছে। পেশিশক্তি ও কালোটাকার মালিক এবং আমলা-কামলাদের দৌরাত্ম্যে ত্যাগী ও দেশপ্রেমিক রাজনীতিবিদগণ বহুলাংশে কোণঠাসা। সবিশেষ প্রণিধানযোগ্য, স্বাধীনতাত্তোর বাংলাদেশে সর্বাপেক্ষা উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন ঘটেছে উঠতি বয়সী তরুণ-তরুণী, যুবক-যুবতী এবং ভাগ্যান্বেষী জনতার মন-মানসিকতা ও চিন্তা-চেতনায়। হালাল উপায়ে জীবিকার্জন, জ্ঞানচর্চা, উন্নতমানের জীবনযাপন ইত্যাদি নানা অভিলাষ-আকাঙ্ক্ষার বাস্তবায়নের লক্ষ্যে তারা নিরুদ্দেশের উদ্দেশে পা বাড়িয়েছিল ঝাঁকে ঝাঁকে। স্বজনদের স্নেহসান্নিধ্য ছিন্ন করে এবং করুণাকাতর মুখচ্ছবিকে পেছনে ফেলে তারা দুর্গম-দুর্লঙ্ঘ-শ্বাপদসংকুল বন-বাদাড় মাড়িয়েছে এবং মরণসাগর পাড়ি দিয়েছে অপরিসীম সাহসিকতার সঙ্গে। অবশ্য মৃত্যুঞ্জয়ী হওয়ার দুর্মর বাসনাকে পাথেয় করে মরণসাগর পাড়ি দিতে গিয়ে যারা হিংস্র প্রাণীর খাবার হয়েছিল কিংবা মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েছিল, তাদের মৃতদেহের সন্ধানও মেলেনি। সৌভাগ্যক্রমে যারা আটলান্টিকের এপাড়সহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে মাথা গোঁজার ঠাঁই নিয়েছে, প্রকারান্তরে সময়ের অগ্রযাত্রায় তারাই দেশমাতৃকার অন্যতম ত্রাতার ভূমিকা দখল করেছে।

জীবনঝুঁকি নিয়ে প্রবাসের বৈরী পরিবেশে তারা উদয়াস্ত হাড়ভাঙা পরিশ্রমের বিনিময়ে অর্থোপার্জন করেছে এবং সেই অর্থের সিংহভাগের সাহায্যে স্বদেশস্থিত স্বজনদের ভরণপোষণ এবং জীবনধারণের ব্যবস্থা করেছে। পাশাপাশি আবহমান বাংলার সহস্র বছরের কৃষ্টি-সংস্কৃতি, সামাজিক-ধর্মীয় ও পারিবারিক মূল্যবোধকে ভিন দেশের নতুন আবহে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে দেওয়ারও সম্ভাব্য উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। মেল্টিংপটের অবশ্যম্ভাবী করুণ পরিণতির কবল থেকে স্বজন এবং পোষ্যদের রক্ষাকল্পে আমেরিকা প্রবাসী বাংলাদেশিরা নিজেদের স্বতন্ত্র সামাজিক-সাংস্কৃতিক-রাজনৈতিক-ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান ও বিনোদনকেন্দ্র গড়ে তুলেছে। বাংলাদেশিদের স্বতন্ত্র বাণিজ্যিক এবং অন্যান্য ধরনের প্রতিষ্ঠানের সাফল্য আটলান্টিকের এ পাড়ে বর্তমানে বহু কমিউনিটির ঈর্ষার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। আবার কবিতা ও সাহিত্যচর্চা এবং দেশের সঙ্গে প্রবাসের সেতুবন্ধ গড়ে তোলার স্বার্থে নব্বইয়ের দশকে নিউইয়র্কে গড়ে ওঠা নিজস্ব প্রিন্ট এবং পরবর্তীতে ইলেকট্রনিক মিডিয়া মাধ্যম বর্তমানে বিশ্ব অভিবাসীর সজাগ দৃষ্টি আকর্ষণ করছে। এ ছাড়া হিমাঙ্কের নিচের তাপমাত্রা উপেক্ষা করে প্রবাসী বাঙালিদের একুশের প্রভাতফেরি, পহেলা বৈশাখের পান্তা-ইলিশ উৎসব, পিঠা-পার্বণ ও অন্যান্য উৎসব-আনন্দ বিশ্ব অভিবাসীর আমেরিকায় বাংলাদেশকে মূর্তিমান করে তোলে। বস্তুত, সুদূর এই প্রবাসে প্রত্যেক প্রবাসী বাংলাদেশিকে একজন অলিখিত রাষ্ট্রদূত বললে আমার ব্যক্তিগত দৃষ্টিতে সম্ভবত বাড়িয়ে বলা হবে না।

অবশ্য দীর্ঘ ৫৫ বছরেও বাংলাদেশে আইনের শাসন ও ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠিত না হওয়ায় এবং গণতন্ত্র প্রাতিষ্ঠানিক রূপ না পাওয়ায় সর্বোপরি রেমিট্যান্স-যোদ্ধা নামে স্বীকৃত অভিবাসীদের আত্মত্যাগ ও অবদান চরমভাবে উপেক্ষিত হওয়ায় অভিবাসী বাংলাদেশিদের অন্তরে অশান্তির অনল দাউদাউ করে জ্বলছে। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, স্বার্থপর, দুর্নীতিপরায়ণ, দখলদার রাজনীতিবিদ-আমলা-সিন্ডিকেট চক্র রাষ্ট্রীয় কোষাগার লুণ্ঠন করে দেশের অর্থনীতিকে বারবার আইসিইউতি পাঠিয়েছে। গার্মেন্টস শিল্প, চামড়াশিল্পসহ সরকারি-বেসরকারি সকল প্রতিষ্ঠানে লালবাতি জ্বলার উপক্রম হয়েছে একাধিকবার। প্রাকৃতিক দুর্যোগ-মহামারি, লাগাতার হরতাল, অতিবৃষ্টি-অনাবৃষ্টি, দীর্ঘস্থায়ী খরা, প্লাবন ইত্যাদি কারণে বিগত ৫৫ বছরে বাংলাদেশের অর্থনীতি বহুবার মুমূর্ষু দশায় উপনীত হয়েছে। সৌভাগ্যক্রমে সেই চরম দুর্যোগপূর্ণ মুহূর্তগুলোতে একমাত্র প্রবাসীরাই নিজেদের উদয়াস্ত হাড়ভাঙা রেমিট্যান্সের মাধ্যমে মুমূর্ষু অর্থনীতিকে পুনর্জীবিত করেছেন।

মোদ্দাকথা, বাংলাদেশের বিগত ৫৫ বছরের অর্থনৈতিক ও উন্নয়ন অবকাঠামোসহ রাজনৈতিক উত্থান-পতন, পটপরিবর্তন, আন্দোলন-সংগ্রাম ইত্যাদি প্রশ্নে প্রবাসীদের অবদান ও আত্মত্যাগ অস্বীকার করার বিন্দুমাত্র অবকাশ নেই। অথচ জাতীয় নির্বাচনে প্রবাসীদের প্রতিনিধি মনোনয়ন, মন্ত্রিসভায় প্রবাসীর স্থান লাভ প্রশ্নে অনেক নামী-দামি নেতা-নেত্রীর মুখে মেঘ উড়তে শুরু করে। বাংলাদেশের অনেক বিদগ্ধজনের দৃষ্টিতে পার্লামেন্ট সদস্য, জনপ্রতিনিধি নির্বাচন, মন্ত্রিত্ব ইত্যাদি প্রশ্নে প্রবাসীদের দেশপ্রেম প্রশ্নবিদ্ধ। অথচ প্রবাসের লাখো প্রাচুর্য এবং অঢেল ঐশ্বর্যের মাঝেও প্রবাসীদের দেশপ্রেম সর্বদা অটুট। তাই তারা নিজেদের কষ্টার্জিত অর্থে স্বদেশ ও সরকারের প্রতিনিধিদের যথাসাধ্য আপ্যায়ন করেন এবং জমকালো অনুষ্ঠান আয়োজনের মাধ্যমে দেশাত্মবোধের বহিঃপ্রকাশ ঘটান। সাদামাটা ভাষায় বলা যায়, জাতীয় নির্বাচন, মন্ত্রিত্ব ইত্যাদি প্রশ্নে প্রবাসীরা না ঘরকা, না ঘাটকা। এই না-পাওয়ার বেদনা প্রবাসীদের হৃদয়ে প্রতিনিয়ত রক্তক্ষরণ ঘটাচ্ছে। এই রক্তক্ষরণ কবে বন্ধ হবে, সেটাও প্রবাসীদের অজানা।
তাই বর্তমান মন্ত্রিপরিষদে প্রবাসী রাজনীতিবিদদের মধ্যে যোগ্যতাসম্পন্ন কাউকে অন্তর্ভুক্ত করা যায় কি না, তা বিবেচনার জন্য প্রধানমন্ত্রীর প্রতি সবিনয় অনুরোধ রইল। পরিশেষে প্রধানমন্ত্রী জনাব তারেক রহমানের সুস্বাস্থ্য ও দীর্ঘায়ু এবং জাতিসংঘ সফরের সাফল্য কামনা করছি।
লেখক : সাবেক প্রধান শিক্ষক
গ্রন্থকার ও সহযোগী সম্পাদক, ঠিকানা
Thikana
M M Shahin, Chairman, Board of Editors, Thikana
Corporate Headquarter
THIKANA : 7409 37th Ave suite 403 Jackson Heights, NY 11372
Phone : 718-472-0700/2428, 718-729-6000
Fax: + 1(866) 805-8806
Bangladesh Bureau
THIKANA : 70/B, Green Road, (Panthapath), 5th Floor, Dhaka, BD.
E-Mail : [email protected]
For Advertisement : [email protected]