​প্রবাসী

প্রকাশ : ২০২৬-১০-০১ ১০:৫৪:০০ , অনলাইন ভার্সন
মায়ের বাঁধন, স্বপ্নসুধা, ভালোবাসার জন্মভূমি ছেড়ে স্বপ্নীল জীবন গড়ার প্রত্যয়ে প্রতিবছর হাজার হাজার ছেলেমেয়ে দেশ ছাড়ে। পাহাড়-পর্বত এমনকি বিশ্বের সবচেয়ে ভয়ংকর অ্যামাজন জঙ্গল ও সমুদ্রপথ পাড়ি দেয়। এই ভয়ংকর বিপৎসংকুল পথ পাড়ি দিয়ে কেউ কেউ সফল হলেও অনেকে জীবনের তরে হারিয়ে যায় পরজীবনে। অর্থনৈতিক দৈন্য গোছাতে সচ্ছল জীবন লাভের আশায় এবং পরিবারের সদস্য মা-বাবা-ভাই-বোন আর সন্তানদের জীবনের আশার আলো আনতে যে মানুষটি দিনের পর দিন প্রবাসে পরবাস যাপন করেন, কোনো এক অজানা কারণে সেই হয়ে ওঠে একসময় পরিবারের খলনায়ক। তার অর্থ দিয়ে দেশ সমৃদ্ধ হয়, পরিবার চলে, স্ত্রী-সন্তানের মুখে হাসি ফোটে, সচ্ছল জীবন লাভ করে কিন্তু দিনের পর দিন যান্ত্রিক পর্যায়ে সে নিজেকে হারিয়ে ফেলে এক অজানা গন্তব্যে।

আমাদের দেশ সোনার দেশ। সে দেশে সোনা ফলে, যদি ফলক সোনা ফলানোর সঠিক কাজ করে। একটা দেশের সৌন্দর্য, নিরাপত্তা, অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি এবং উন্নত জীবন নির্ভর করে সে দেশের আইনকানুন আর মানুষের কর্মসংস্থান, কর্মকুশলতার ওপর। দেশের গন্ডি পেরিয়ে প্রবাসে আসার পর সবার একটি উদ্দেশ্য থাকে, তা হলো নিরাপত্তা আর অর্থনৈতিক উন্নয়নের আশা। আর তারা সেটা লাভ করে প্রবাসের যথাযথ কর্মসংস্থান, সে দেশের নিরাপত্তা আর নিজের পরিশ্রমের মাধ্যমে। এ তিনটি যেকোনো দেশে থাকলে সে দেশের কোনো সুস্থ মানুষ নিজের সচ্ছলতার জন্য প্রবাসে পরবাস করে না।

একজন মুক্তিযোদ্ধা দেশের সার্বভৌমত্বের প্রতীক আর একজন প্রবাসী দেশের ও পরিবারের অর্থনৈতিক মুক্তির প্রতীক। কিন্ত অনেক ক্ষেত্রে দুজনই অবহেলিত ও অপমানিত। একজন দেশের দেশবিরোধী ষড়যন্ত্রের কাছে, আরেকজন পারিবারিক ষড়যন্ত্রের কাছে। প্রবাসে পান্তাভাত আর কাঁচামরিচ খেয়ে কোটি টাকা পাঠিয়ে দেশে গিয়ে দেখে ব‍্যাংকে টাকা নেই অথবা ঘরে স্ত্রী নেই আর প্রবাসে ১২ ঘণ্টা পরিশ্রম করে ক্লান্ত দেহ নিয়ে বাসায় ফিরে দেখে বাসা ফাঁকা। পারিবারিক কলহ আর পরকীয়ায় জড়িত হয়ে অনেক প্রবাসীর পরিবার আজ ধ্বংস। প্রবাসজীবনের সবচেয়ে কষ্টের এবং বিরহের যাত্রা হলো যখন কোনো পরিবার এমন ষড়যন্ত্রের সম্মুখীন হয়ে পরিবারহারা হয়, তখন প্রবাসজীবন হয়ে ওঠে হতাশা আর বিফলতায় ভরা। তার জন‍্য প্রয়োজন সামাজিক সচেতনতা, সোশ্যাল মিডিয়ার যথাযথ ব্যবহার, পারিবারিক মর্যাদাবোধ, একে অপরের প্রতি আস্থা ও বিশ্বাস সর্বোপরি নিজেদের প্রতি দায়বদ্ধতা। এ বিষয়গুলোর যথাযথ প্রয়োগ একজন প্রবাসীকে করে মর্যাদাবান ও পারিবারিক জীবনে এনে দেয় সফলতা।

একজন প্রবাসী প্রবাসে থেকে যে পরিশ্রম করে, সেই পরিশ্রম যদি দেশে করে এবং দেশের প্রতিটি মানুষ করে, তাহলে বাংলাদেশ সত্যিই সোনার দেশ হবে। আমাদের কাছের দেশ দক্ষিণ কোরিয়ার কথা প্রাসঙ্গিক। সে দেশের কোনো খনিজ সম্পদ নেই কিন্তু তাদের প্রতিটি মানুষের দুটি হাতই যথেষ্ট। তারা তাদের দুটি হাত দিয়ে সে দেশকে বর্তমান বিশ্বের শিক্ষা, অর্থনীতি ও প্রযুক্তির স্বর্ণশিখরে তুলে ফেলেছে। তাই তো আদি শিক্ষায় বলা আছে, ‘পরিশ্রমে আনে ধন, পুণ্যে আনে সুখ, আলস্য আনে দরিদ্রতা, পাপে আনে দুঃখ।’ এ কথাটি দক্ষিণ কোরিয়ার সর্বস্তরের লোক প্রতিপালন করে বলে আজ তারা আমেরিকার মতো দেশে বিশাল অঙ্কের বিনিয়োগকারীদের অন্যতম দেশ হিসেবে পরিচিত। তারা পরিবারের এক সদস্য আরেক সদস্যের কাছে নির্ভরশীল নয়। কিন্তু আমাদের দেশের কোনো মানুষ যখন বিদেশে প্রবাসী হয়ে নিজেকে আত্মপ্রতিষ্ঠার চেষ্টা করে, পরিবারের আর দশজন ভাইবোন এমনকি আত্মীয়স্বজন সবাই তার দিকে তীর্থের কাকের মতো চেয়ে থাকে কবে আসবে প্রবাসীর টাকা। তারা মনে করে প্রবাস মানে টাকা, গাড়ি, বাড়ি, সুখ আর প্রাচুর্যে ভরা স্বর্গসুখ। তারা কখনো ভাবে না, সে কেমন আছে, কী কাজ করে, কীভাবে সে প্রবাসে টিকে আছে?

একজন প্রবাসী যখন জীবনযুদ্ধে কাজের চাপে আর দেশের সামাজিকতার পরিবেশ থেকে ছিন্ন হয়ে ভিন্ন এক দেশের পরিবেশ-পরিস্থিতির সঙ্গে মানিয়ে নিতে হাঁপিয়ে ওঠে, তখন দেশের মানুষ মনে করে টাকার পাহাড়ে সুখের ঠেলায় ওই প্রবাসী সবাইকে ভুলে গেছে। কিন্তু বাস্তবতা ভিন্ন। তাই পরনির্ভরশীল নয়, স্বনির্ভরতার মানসিকতা আমাদের অর্জন করতে হবে।

আমরা এমন এক জাতি, যাদের মধ্যে পারিবারিক বন্ধন, সংস্কৃতি, জাতীয়তাবোধ এবং দেশপ্রেম এত বেশি যে একজন প্রবাসী প্রবাসে এসেও নিজ সমাজ, সংস্কৃতি, সাংগঠনিক, ধর্মীয় ও রাজনৈতিক চর্চা থেকে কখনো নিজেকে দূরে সরিয়ে রাখতে পারে না। অনেক ক্ষেত্রে এসব বিষয়ের সুনির্দিষ্ট ও যথাযথ ব্যবহার করতে না পারলে জাতীয়, সামাজিক ও পারিবারিক জীবনে নেমে আসে বিপর্যয়।

আমাদের ভিন্নমত থাকতে, ভিন্ন পথ থাকতে পারে, ভিন্ন ধর্ম থাকতে পারে কিন্তু পারস্পরিক বন্ধনের মেলবন্ধনে যদি ঘাটতি থাকে, তাহলে নৈতিকতা-বিবর্জিত সামাজিক অবক্ষয় আমাদের জীবনে বিপর্যয় নিয়ে আসবে। এ থেকে উত্তরণ গুরুত্বপূর্ণ, বিশেষ করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুক, টুইটার এবং টিকটকের মতো প্ল্যাটফর্মগুলোর সদ্ব্যবহার করতে হবে। একজন প্রবাসী একজন অর্থনৈতিক যোদ্ধা, একজন সহনশীল মানুষ। তার সঙ্গে ভালো ব‍্যবহার করুন, তাকে তার ন‍্যায‍্য সম্মান দিন। তার ব‍্যক্তিগত জীবনে আঘাত নয়, বরং তাকে সহযোগিতা করুন। তবেই প্রবাস হবে সুবাসে ভরা।
Thikana
M M Shahin, Chairman, Board of Editors, Thikana
Corporate Headquarter
THIKANA : 7409 37th Ave suite 403 Jackson Heights, NY 11372
Phone : 718-472-0700/2428, 718-729-6000
Fax: + 1(866) 805-8806
Bangladesh Bureau
THIKANA : 70/B, Green Road, (Panthapath), 5th Floor, Dhaka, BD.
E-Mail : [email protected]
For Advertisement : [email protected]