৫ আগস্ট দিল্লির ফরেন করেসপন্ডেন্টস ক্লাবে (FCC) এক অডিও সংবাদ সম্মেলনে বাংলাদেশের ক্ষমতাচ্যুত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ডিসেম্বর মাস নাগাদ দলীয় নেতাদের নিয়ে আদালতে আত্মসমর্পণের মাধ্যমে দেশে ফেরার ঘোষনা দেন, যা নিয়ে বিশেষ করে আওয়ামী ও ভারতপন্থী বিভিন্ন মহলে ইদানীং ব্যাপক বিচার-বিশ্লেষণ হতে দেখা যায়। এসব মহল তাদের বহুলাংশে মনগড়া ও আজগুবি বিশ্লেষণে তার দেশে ফেরার ঘোষণায় এমন মনোভাব ব্যক্ত করছেন, যা শুনে মনে হতে পারে তার দেশে ফেরা একেবারে নিশ্চিত এবং এই সিদ্ধান্তের হেরফের হওয়ার কোনো সম্ভাবনা নেই। দেশে ফেরার পর তার নেতৃত্বে বর্তমান কথিত জঙ্গিবাদী সরকারের স্থলে দেশে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের শক্তির পুনর্জন্ম হবে। পরে ১৫ সেপ্টেম্বর বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল কর্তৃক ওবায়দুল কাদেরসহ আরও কতিপয় আওয়ামী নেতার ফাঁসির দণ্ড হলে শেখ হাসিনা একটি ভারতীয় মিডিয়াকে এক টেলিফোন সাক্ষাৎকারে সদলবলে নয় বরং তিনি একাই দেশে ফিরবেন বলে জানান। আগের সিদ্ধান্ত পরিবর্তনের কারণ হিসেবে জেনে-বুঝে তিনি অন্যদের বিপদের মুখে ঠেলে দিতে চান না এবং অন্য নেতারা স্ব স্ব ইচ্ছানুযায়ী দেশে ফিরবেন বলে জানান। এর ফলে তার দেশে ফেরা নিয়ে রাজনৈতিক মহলে ইতিমধ্যে সৃষ্ট সন্দেহ-সংশয় আরও ঘনীভূত হতে দেখা যায়। অবশ্য দেশে ফিরলে গ্রেপ্তার এমনকি ফাঁসিকাষ্ঠে ঝুলে মৃত্যুর সমূহ সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও তার দেশে ফেরার পথে এসব কোনো কিছুই বাধা না হওয়ার কথাও তিনি পুনর্ব্যক্ত করেন। তার অনুপস্থিতিতে দেশের মানুষের কথিত অশেষ দুঃখ-কষ্ট এবং দলীয় নেতা-কর্মীদের কথিত সরকারি জুলুম-নির্যাতন থেকে উদ্ধার ও মুক্ত করতে তার দেশে ফেরার বিকল্প নেই। তাদের দুঃসময়ে জনগণের পাশে দাঁড়াতে তিনি গ্রেপ্তার ও মৃত্যুঝুঁকি পর্যন্ত পরোয়া করেন না।
পরিহাসের বিষয় (Ironically), দীর্ঘ দেড় দশকের অধিককালব্যাপী তার শাসনামলে তিনি বিরোধী নেতা-কর্মীদের গণহারে গ্রেফতার করে কারাগারে প্রেরণ, গুম, খুন, হত্যা, আয়নাঘর এবং সর্বোপরি আরও দীর্ঘ মেয়াদে ক্ষমতায় থাকার উগ্র ও একপ্রকার বিকৃত ইচ্ছার বশবর্তী হয়ে তার স্বৈরশাসনের বিরুদ্ধে আন্দোলনরত ছাত্র-জনতাকে যেখানে পাওয়া যাবে সেখানে হত্যা (Shoot at sight), এমনকি হেলিকপ্টার ব্যবহার করে উপর থেকে নির্বিচারে গুলি করে তাদেরকে হত্যা-নির্মূলের নির্দেশ দিতে তার বিবেকে এতটুকু বাধেনি। তার মতো এহেন একজন ‘ফ্রাঙ্কেনস্টাইনে’র মুখ থেকে দেশের মানুষের দুঃখ-কষ্টে ব্যথিত হওয়ার বক্তব্যকে আর যা-ই হোক তামাশা ও মায়াকান্না (Crocodile tears) ছাড়া অন্য কিছু ভাবা যায় কি না, সে প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক।
বন্দুক হাতে থাকা এক ব্যক্তির সামনে গুলিবর্ষণে নিহত কয়েক ব্যক্তির দেহ পড়ে রয়েছে এবং বন্দুকধারী ব্যক্তির বন্দুকের নল দিয়ে তখনো ধোঁয়া বেরোচ্ছে (Smoking Gun) দেখার পরও নিহত ব্যক্তিদের খুনি কে তা নিয়ে যেমন সন্দেহের তেমন অবকাশ থাকে না, তেমনিভাবে বিপুল সংখ্যক মানুষের হতাহতের ঘটনায় শেখ হাসিনার জড়িত থাকার বিষয়টি সন্দেহাতীতভাবে (Prima Facie) প্রমাণিত হওয়ায় তিনি আদালত কর্তৃক ফাঁসির দণ্ড প্রাপ্ত হয়েছেন, যদিও তিনি এসব হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে নিজের জড়িত থাকার অভিযোগকে সর্বৈব মিথ্যা ও রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত উল্লেখ করে এসব হত্যাকাণ্ডের জন্য তিনি নন বরং জঙ্গি-সন্ত্রাসীরা দায়ী বলে দাবি করেন।
ফাঁসির দণ্ড নিয়ে তার দেশে ফেরার ঘোষণা কতটা আন্তরিক ও বাস্তব, নাকি এর পেছনে অন্য কোনো উদ্দেশ্য রয়েছে, স্বাভাবিকভাবে তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। মানুষের জীবন একটাই। মৃত্যু হলে সে জীবন আর ফিরে পাওয়া যায় না। মৃত্যুর পর ‘না ফেরার দেশে চলে যাওয়া’ কথাটা এই বাস্তবতা থেকেই প্রচলিত হয়েছে। সে জন্য মৃত্যুকে এড়িয়ে দীর্ঘকাল বেঁচে থাকতে মানুষের চেষ্টা ও ব্যাকুলতার অন্ত থাকে না। কিছু মহামানব, যারা তাদের সুমহান কীর্তি ও আদর্শ চারিত্রিক গুণাবলির জন্য দৈহিকভাবে মরেও অমর বলে বিবেচিত হন, সেই সব মহামানবের মধ্যেও দীর্ঘজীবী হওয়ার আকাঙ্ক্ষা বা বাসনা ছিল না, তা বলার উপায় নেই। বলা বাহুল্য, শেখ হাসিনা কোনোভাবে ও বিচারে সেসব মহামানবের কাতারে পড়েন না, বরং সন্দেহাতীতভাবে তার কৃতকর্মের জন্য তিনি নির্মম-নিষ্ঠুর মানুষদের কাতারভুক্ত একজন ব্যক্তি। তার নির্মমতা ও নিষ্ঠুরতার পরিচয় পেতে কাউকে খুব বেশি কষ্ট করতে হবে না। তারই প্রিয়ভাজন একজন জেনারেল জিয়াউল আহসান, যিনি তার শাসনামলে বাংলাদেশ টেলিকমিউনিকেশন মনিটরিং সংস্থার প্রধান ছিলেন, সেখান থেকে প্রাপ্ত টেলিফোন রেকর্ডিং শুনলেই হত্যাকাণ্ডে তার জড়িত থাকার ‘স্মোকিং গানে’র সুস্পষ্ট প্রমাণ মিলে যাবে। এসব রেকর্ডিংয়ে শেখ হাসিনাকে স্পষ্টভাবে ছাত্র-জনতা তথা আন্দোলন দমনে নির্বিচার গুলিবর্ষণ করতে এমনকি প্রয়োজনে মৃত্যুঘাতী অস্ত্র (Lethal weapon) ব্যবহারে নির্দেশ দিতে শোনা যায়। রেকর্ডিংয়ের কণ্ঠস্বর ও কথাগুলো যে শেখ হাসিনারই, তা বিদেশে এ-সংক্রান্ত পরীক্ষা-নিরীক্ষার কাজে প্রতিষ্ঠিত সংস্থার মাধ্যমে নিশ্চিত করা হয়। সে কারণে মানুষ ‘স্মোকিং গান’ হাতে থাকার পরও হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে তার কোনোরূপ যোগসূত্র নেই, শেখ হাসিনার এ দাবি একেবারেই ধোপে টেকে না। তিনি নির্দোষ, এ দাবি তার কিছু অন্ধ সমর্থক ছাড়া আর কেউ বিশ্বাস করবে, এটা মনে করার কারণ নেই।
এ প্রসঙ্গে ৭০ দশকের গোড়ার দিকে যুক্তরাষ্ট্রের ওয়াটারগেট কেলেঙ্কারির কথা মনে পড়ছে। সে সময় ওয়াশিংটন ডিসির ওয়াটারগেট ভবনে (complex) ডেমোক্র্যাটিক পার্টির সদর দপ্তরে প্রবেশ করে সেখানে আড়িপাতার যন্ত্র (Bugging and wiretapping device) রাখার অভিযোগ ওঠে এবং এর পেছনে তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট রিচার্ড নিক্সনের হাত থাকার অভিযোগ করা হয়। ওয়াশিংটন পোস্টের সাংবাদিক বব উডওয়ার্ড কার্ল বার্নস্টিন এ ঘটনায় নিক্সনের জড়িত থাকার বিষয়টি পত্রিকায় ফাঁস করে দিলে এ নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রে ব্যাপক চাঞ্চল্যের পাশাপাশি নিক্সনের বিরুদ্ধে নিন্দা-সমালোচনার ঝড় ওঠে। নিক্সন অবশ্য এ ঘটনার সঙ্গে তার জড়িত থাকার অভিযোগ পুরোপুরি অস্বীকার করে এ সম্পর্কে তিনি কিছুই জানেন না বলে দাবি করেন। এই প্রেক্ষাপটে আদালত ১৯৭২ সালের ২৩ জুনের একটি অডিও টেপ প্রকাশের আদেশ দেন। ওই টেপে নিক্সনকে স্পষ্টভাবে জাতীয় নিরাপত্তার অজুহাতে এফবিআইকে আড়িপাতা সংক্রান্ত চলমান তদন্ত অবিলম্বে বন্ধের নির্দেশ দিতে শোনা যায়। মার্কিন কংগ্রেসে অভিশংসিত হয়ে অপসারিত হওয়া থেকে রক্ষা পেতে পরে নিক্সন পদত্যাগ করেন।
প্রশ্ন উঠেছে, ছাত্র-জনতার বিপ্লবে দেশত্যাগের দুই বছর পর হঠাৎ করে দিল্লির নিরাপদ ও আরাম-আয়েশের জীবন ছেড়ে জেল ও জীবনের ঝুঁকি থাকা সত্ত্বেও কেন শেখ হাসিনা এ সময়ে দেশে ফিরতে চাইছেন। অভিজ্ঞ মহলের মতে, দেশের মানুষের দুঃখ-কষ্ট লাঘব ও নেতা-কর্মীদের দুর্দিনে পাশে থাকার তার অভিপ্রায়, একটি কথার কথা মাত্র। প্রকৃতপক্ষে এর পেছনে বর্তমানে বাংলাদেশে বিদ্যমান তীব্র বিদ্যুৎ, গ্যাস ও জ্বালানি সংকটে দেশের মানুষের মধ্যে সৃষ্ট ক্ষোভ ও অসন্তোষকে পুঁজি করে দেশে থাকা একপ্রকার নিষ্ক্রিয় দলীয় নেতা-কর্মী-সমর্থকদের চাঙা ও উজ্জীবিত করে রাজনীতিতে নিজেকে ও দলকে সক্রিয় তথা প্রাসঙ্গিক রাখার ক্ষেত্র প্রস্তুত করাই তার দেশে ফেরার ঘোষণার মূল লক্ষ্য। তার ধারণা, মানুষের মধ্যে বিরাজমান হতাশা ও অসন্তোষের মধ্যে তার ফিরে আসার বার্তা তাদেরকে সক্রিয় করতে টনিকের মতো কাজ করবে এবং তার প্রত্যাবর্তনের পক্ষে একধরনের গণজোয়ার সৃষ্টিতে সহায়ক হবে। তার দীর্ঘ শাসনামলে বিদ্যুৎ, গ্যাস ও জ্বালানি ক্ষেত্রে এ ধরনের অসহনীয় তীব্র সংকট না হওয়ায় বহু মানুষ তার তথাকথিত দক্ষ ও যোগ্য নেতৃত্বের মূল্যায়নপূর্বক তাকে রাজনীতি ও ক্ষমতায় ফিরে পেতে আগ্রহী হবে। এই সংকট অব্যাহত ও বজায় থাকলেই কেবল জনমনে তার সম্পর্কে এহেন আগ্রহ বজায় থাকবে এবং পরে বিদ্যমান পরিস্থিতির ইতিবাচক উত্তরণ ঘটলে জনমনে তার সম্পর্কে সৃষ্ট ধারণা বদলে যেতে পারে, যা রাজনীতি ও ক্ষমতায় ফেরার তার লালিত আকাঙ্ক্ষা ও স্বপ্নকে ভেস্তে দিতে পারে। ডিসেম্বর নাগাদ বিদ্যমান পরিস্থিতির বড় ধরনের উন্নতির সম্ভাবনা কম মনে করেই এ সময়ের মধ্যে তার দেশে ফেরার ঘোষণা এসেছে বলে কেউ কেউ মনে করেন।
প্রসঙ্গত বলে রাখা প্রয়োজন, হালের বিদ্যুৎ, গ্যাস ও জ্বালানি সংকট রাতারাতি বা বিগত ছয়-সাত মাসের কোনো সিদ্ধান্ত বা ব্যর্থতার কারণে সৃষ্টি হয়নি। এর পেছনে বহু বছরের অব্যবস্থাপনা এবং প্রকাশ্য-অপ্রকাশ্য অনেক কারণ (দুর্নীতি ইত্যাদি) জড়িত। অভিযোগ রয়েছে, ভারত থেকে বিদ্যুৎ, গ্যাস আমদানি অব্যাহত রাখতে একাধিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের নির্মাণকাজ সম্পন্ন হওয়ার পরও তা চালুর কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি। অনুরূপভাবে বিগত কয়েক দশকে বিপুলসংখ্যক বহুতলবিশিষ্ট অট্টালিকা ও বাসাবাড়ি নির্মাণ ও গ্যাসনির্ভর শিল্প-কারখানা স্থাপিত হলেও বর্ধিত গ্যাসের চাহিদা মেটাতে নতুন গ্যাসক্ষেত্র আবিষ্কারের তেমন কোনো অর্থবহ পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি। বঙ্গোপসাগরে ভারতীয়রা গ্যাস ড্রিলিংয়ের ব্যাপক উদ্যোগ নিলেও অজ্ঞাত কারণে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে এহেন পদক্ষেপ নিতে দেখা যায়নি। ব্যাপক মাত্রায় ড্রিলিংয়ের কারণে বাংলাদেশে গ্যাসের মূল কেন্দ্র তিতাস-সুরমা বেসিনের গ্যাস নিঃশেষ হয়ে এসেছে, যেমনটি যুক্তরাজ্যের ক্ষেত্রে হতেও দেখা যায়। সে দেশের তেল-গ্যাসের মূল কেন্দ্র উত্তর সাগরের তেল-গ্যাসের ৯০ ভাগের বেশি ইতিমধ্যে ব্যবহৃত হয়ে যাওয়ায় বর্তমানে যুক্তরাজ্যকে তেল-গ্যাসের জন্য রাশিয়াসহ বিকল্প উৎসের সন্ধান করতে হচ্ছে। ইরান যুদ্ধের কারণে অন্য একাধিক দেশের মতো বাংলাদেশকেও মধ্যপ্রাচ্য থেকে জ্বালানি তেল ও এলএনজি আমদানিতে বেগ পেতে হচ্ছে।
শেখ হাসিনার দেশে ফেরার ঘোষণায় উল্লসিত অতি উৎসাহী একশ্রেণির দলীয় নেতা-কর্মীকে ইতিমধ্যে ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে ‘গ্যাস দে, বিদ্যুৎ দে, নইলে গদি ছেড়ে দে’, ‘শেখ হাসিনা আসবে, বাংলাদেশ হাসবে’ জাতীয় সেøাগান তুলে মিছিল করে যানবাহনে অগ্নিসংযোগ, ককটেল বিস্ফোরণের মতো নাশকতামূলক তৎপরতায় লিপ্ত হতে দেখা যাচ্ছে, যা দেশে অরাজক ও অস্থিতিশীল পরিস্থিতি সৃষ্টি করে ঘোলা পানিতে মাছ শিকারের ষড়যন্ত্র ছাড়া আর কিছুই নয়। মিডিয়া সূত্রমতে, সম্প্রতি ঢাকার গুলশানে আওয়ামী সমর্থকদের এক ঝটিকা মিছিল থেকে পুলিশ প্রায় ১৮০ জনকে গ্রেপ্তার করে। এ ছাড়া ঢাকার কেরানীগঞ্জ থেকে ককটেল ও মুখোশ নির্মাণের বিপুল পরিমাণ সরঞ্জামসহ আওয়ামী লীগের একজন নেতাকে গ্রেপ্তার করা হয়, যা কিসের আলামত বহন করে, তা খুলে বলার প্রয়োজন রয়েছে বলে মনে করি না। যাদের জন্য তাদের গ্রেপ্তার ও কারাভোগ, সেই সব নেতারা বিদেশে দিব্যি নিরাপদে আরাম-আয়েশে জীবন কাটাচ্ছেন। এটা দেখে ‘ভাবিয়া করিও কাজ করিয়া ভাবিও না’ প্রবাদ বাক্যটির কথা মনে পড়ে গেল। শেখ হাসিনা ও দলীয় নেতাদের বাংলাদেশে সম্ভাব্য প্রত্যাবর্তনে দেশের মানুষ ‘হাসবে’ কি না জানি না, তবে অতীতে তাদের যাবতীয় অপকর্মের (গুম, খুন, আয়নাঘর, দুর্নীতি ইত্যাদি) কথা মনে করে আদালতে আত্মসমর্পণের পূর্বে পুলিশের নিরাপত্তাবেষ্টনী ভেঙে ছাত্র-জনতা তাদেরকে গণধোলাই দিতে ঝাঁপিয়ে পড়বে না, তার নিশ্চয়তা নেই। লেখক : কলামিস্ট
পরিহাসের বিষয় (Ironically), দীর্ঘ দেড় দশকের অধিককালব্যাপী তার শাসনামলে তিনি বিরোধী নেতা-কর্মীদের গণহারে গ্রেফতার করে কারাগারে প্রেরণ, গুম, খুন, হত্যা, আয়নাঘর এবং সর্বোপরি আরও দীর্ঘ মেয়াদে ক্ষমতায় থাকার উগ্র ও একপ্রকার বিকৃত ইচ্ছার বশবর্তী হয়ে তার স্বৈরশাসনের বিরুদ্ধে আন্দোলনরত ছাত্র-জনতাকে যেখানে পাওয়া যাবে সেখানে হত্যা (Shoot at sight), এমনকি হেলিকপ্টার ব্যবহার করে উপর থেকে নির্বিচারে গুলি করে তাদেরকে হত্যা-নির্মূলের নির্দেশ দিতে তার বিবেকে এতটুকু বাধেনি। তার মতো এহেন একজন ‘ফ্রাঙ্কেনস্টাইনে’র মুখ থেকে দেশের মানুষের দুঃখ-কষ্টে ব্যথিত হওয়ার বক্তব্যকে আর যা-ই হোক তামাশা ও মায়াকান্না (Crocodile tears) ছাড়া অন্য কিছু ভাবা যায় কি না, সে প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক।
বন্দুক হাতে থাকা এক ব্যক্তির সামনে গুলিবর্ষণে নিহত কয়েক ব্যক্তির দেহ পড়ে রয়েছে এবং বন্দুকধারী ব্যক্তির বন্দুকের নল দিয়ে তখনো ধোঁয়া বেরোচ্ছে (Smoking Gun) দেখার পরও নিহত ব্যক্তিদের খুনি কে তা নিয়ে যেমন সন্দেহের তেমন অবকাশ থাকে না, তেমনিভাবে বিপুল সংখ্যক মানুষের হতাহতের ঘটনায় শেখ হাসিনার জড়িত থাকার বিষয়টি সন্দেহাতীতভাবে (Prima Facie) প্রমাণিত হওয়ায় তিনি আদালত কর্তৃক ফাঁসির দণ্ড প্রাপ্ত হয়েছেন, যদিও তিনি এসব হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে নিজের জড়িত থাকার অভিযোগকে সর্বৈব মিথ্যা ও রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত উল্লেখ করে এসব হত্যাকাণ্ডের জন্য তিনি নন বরং জঙ্গি-সন্ত্রাসীরা দায়ী বলে দাবি করেন।
ফাঁসির দণ্ড নিয়ে তার দেশে ফেরার ঘোষণা কতটা আন্তরিক ও বাস্তব, নাকি এর পেছনে অন্য কোনো উদ্দেশ্য রয়েছে, স্বাভাবিকভাবে তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। মানুষের জীবন একটাই। মৃত্যু হলে সে জীবন আর ফিরে পাওয়া যায় না। মৃত্যুর পর ‘না ফেরার দেশে চলে যাওয়া’ কথাটা এই বাস্তবতা থেকেই প্রচলিত হয়েছে। সে জন্য মৃত্যুকে এড়িয়ে দীর্ঘকাল বেঁচে থাকতে মানুষের চেষ্টা ও ব্যাকুলতার অন্ত থাকে না। কিছু মহামানব, যারা তাদের সুমহান কীর্তি ও আদর্শ চারিত্রিক গুণাবলির জন্য দৈহিকভাবে মরেও অমর বলে বিবেচিত হন, সেই সব মহামানবের মধ্যেও দীর্ঘজীবী হওয়ার আকাঙ্ক্ষা বা বাসনা ছিল না, তা বলার উপায় নেই। বলা বাহুল্য, শেখ হাসিনা কোনোভাবে ও বিচারে সেসব মহামানবের কাতারে পড়েন না, বরং সন্দেহাতীতভাবে তার কৃতকর্মের জন্য তিনি নির্মম-নিষ্ঠুর মানুষদের কাতারভুক্ত একজন ব্যক্তি। তার নির্মমতা ও নিষ্ঠুরতার পরিচয় পেতে কাউকে খুব বেশি কষ্ট করতে হবে না। তারই প্রিয়ভাজন একজন জেনারেল জিয়াউল আহসান, যিনি তার শাসনামলে বাংলাদেশ টেলিকমিউনিকেশন মনিটরিং সংস্থার প্রধান ছিলেন, সেখান থেকে প্রাপ্ত টেলিফোন রেকর্ডিং শুনলেই হত্যাকাণ্ডে তার জড়িত থাকার ‘স্মোকিং গানে’র সুস্পষ্ট প্রমাণ মিলে যাবে। এসব রেকর্ডিংয়ে শেখ হাসিনাকে স্পষ্টভাবে ছাত্র-জনতা তথা আন্দোলন দমনে নির্বিচার গুলিবর্ষণ করতে এমনকি প্রয়োজনে মৃত্যুঘাতী অস্ত্র (Lethal weapon) ব্যবহারে নির্দেশ দিতে শোনা যায়। রেকর্ডিংয়ের কণ্ঠস্বর ও কথাগুলো যে শেখ হাসিনারই, তা বিদেশে এ-সংক্রান্ত পরীক্ষা-নিরীক্ষার কাজে প্রতিষ্ঠিত সংস্থার মাধ্যমে নিশ্চিত করা হয়। সে কারণে মানুষ ‘স্মোকিং গান’ হাতে থাকার পরও হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে তার কোনোরূপ যোগসূত্র নেই, শেখ হাসিনার এ দাবি একেবারেই ধোপে টেকে না। তিনি নির্দোষ, এ দাবি তার কিছু অন্ধ সমর্থক ছাড়া আর কেউ বিশ্বাস করবে, এটা মনে করার কারণ নেই।
এ প্রসঙ্গে ৭০ দশকের গোড়ার দিকে যুক্তরাষ্ট্রের ওয়াটারগেট কেলেঙ্কারির কথা মনে পড়ছে। সে সময় ওয়াশিংটন ডিসির ওয়াটারগেট ভবনে (complex) ডেমোক্র্যাটিক পার্টির সদর দপ্তরে প্রবেশ করে সেখানে আড়িপাতার যন্ত্র (Bugging and wiretapping device) রাখার অভিযোগ ওঠে এবং এর পেছনে তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট রিচার্ড নিক্সনের হাত থাকার অভিযোগ করা হয়। ওয়াশিংটন পোস্টের সাংবাদিক বব উডওয়ার্ড কার্ল বার্নস্টিন এ ঘটনায় নিক্সনের জড়িত থাকার বিষয়টি পত্রিকায় ফাঁস করে দিলে এ নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রে ব্যাপক চাঞ্চল্যের পাশাপাশি নিক্সনের বিরুদ্ধে নিন্দা-সমালোচনার ঝড় ওঠে। নিক্সন অবশ্য এ ঘটনার সঙ্গে তার জড়িত থাকার অভিযোগ পুরোপুরি অস্বীকার করে এ সম্পর্কে তিনি কিছুই জানেন না বলে দাবি করেন। এই প্রেক্ষাপটে আদালত ১৯৭২ সালের ২৩ জুনের একটি অডিও টেপ প্রকাশের আদেশ দেন। ওই টেপে নিক্সনকে স্পষ্টভাবে জাতীয় নিরাপত্তার অজুহাতে এফবিআইকে আড়িপাতা সংক্রান্ত চলমান তদন্ত অবিলম্বে বন্ধের নির্দেশ দিতে শোনা যায়। মার্কিন কংগ্রেসে অভিশংসিত হয়ে অপসারিত হওয়া থেকে রক্ষা পেতে পরে নিক্সন পদত্যাগ করেন।
প্রশ্ন উঠেছে, ছাত্র-জনতার বিপ্লবে দেশত্যাগের দুই বছর পর হঠাৎ করে দিল্লির নিরাপদ ও আরাম-আয়েশের জীবন ছেড়ে জেল ও জীবনের ঝুঁকি থাকা সত্ত্বেও কেন শেখ হাসিনা এ সময়ে দেশে ফিরতে চাইছেন। অভিজ্ঞ মহলের মতে, দেশের মানুষের দুঃখ-কষ্ট লাঘব ও নেতা-কর্মীদের দুর্দিনে পাশে থাকার তার অভিপ্রায়, একটি কথার কথা মাত্র। প্রকৃতপক্ষে এর পেছনে বর্তমানে বাংলাদেশে বিদ্যমান তীব্র বিদ্যুৎ, গ্যাস ও জ্বালানি সংকটে দেশের মানুষের মধ্যে সৃষ্ট ক্ষোভ ও অসন্তোষকে পুঁজি করে দেশে থাকা একপ্রকার নিষ্ক্রিয় দলীয় নেতা-কর্মী-সমর্থকদের চাঙা ও উজ্জীবিত করে রাজনীতিতে নিজেকে ও দলকে সক্রিয় তথা প্রাসঙ্গিক রাখার ক্ষেত্র প্রস্তুত করাই তার দেশে ফেরার ঘোষণার মূল লক্ষ্য। তার ধারণা, মানুষের মধ্যে বিরাজমান হতাশা ও অসন্তোষের মধ্যে তার ফিরে আসার বার্তা তাদেরকে সক্রিয় করতে টনিকের মতো কাজ করবে এবং তার প্রত্যাবর্তনের পক্ষে একধরনের গণজোয়ার সৃষ্টিতে সহায়ক হবে। তার দীর্ঘ শাসনামলে বিদ্যুৎ, গ্যাস ও জ্বালানি ক্ষেত্রে এ ধরনের অসহনীয় তীব্র সংকট না হওয়ায় বহু মানুষ তার তথাকথিত দক্ষ ও যোগ্য নেতৃত্বের মূল্যায়নপূর্বক তাকে রাজনীতি ও ক্ষমতায় ফিরে পেতে আগ্রহী হবে। এই সংকট অব্যাহত ও বজায় থাকলেই কেবল জনমনে তার সম্পর্কে এহেন আগ্রহ বজায় থাকবে এবং পরে বিদ্যমান পরিস্থিতির ইতিবাচক উত্তরণ ঘটলে জনমনে তার সম্পর্কে সৃষ্ট ধারণা বদলে যেতে পারে, যা রাজনীতি ও ক্ষমতায় ফেরার তার লালিত আকাঙ্ক্ষা ও স্বপ্নকে ভেস্তে দিতে পারে। ডিসেম্বর নাগাদ বিদ্যমান পরিস্থিতির বড় ধরনের উন্নতির সম্ভাবনা কম মনে করেই এ সময়ের মধ্যে তার দেশে ফেরার ঘোষণা এসেছে বলে কেউ কেউ মনে করেন।
প্রসঙ্গত বলে রাখা প্রয়োজন, হালের বিদ্যুৎ, গ্যাস ও জ্বালানি সংকট রাতারাতি বা বিগত ছয়-সাত মাসের কোনো সিদ্ধান্ত বা ব্যর্থতার কারণে সৃষ্টি হয়নি। এর পেছনে বহু বছরের অব্যবস্থাপনা এবং প্রকাশ্য-অপ্রকাশ্য অনেক কারণ (দুর্নীতি ইত্যাদি) জড়িত। অভিযোগ রয়েছে, ভারত থেকে বিদ্যুৎ, গ্যাস আমদানি অব্যাহত রাখতে একাধিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের নির্মাণকাজ সম্পন্ন হওয়ার পরও তা চালুর কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি। অনুরূপভাবে বিগত কয়েক দশকে বিপুলসংখ্যক বহুতলবিশিষ্ট অট্টালিকা ও বাসাবাড়ি নির্মাণ ও গ্যাসনির্ভর শিল্প-কারখানা স্থাপিত হলেও বর্ধিত গ্যাসের চাহিদা মেটাতে নতুন গ্যাসক্ষেত্র আবিষ্কারের তেমন কোনো অর্থবহ পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি। বঙ্গোপসাগরে ভারতীয়রা গ্যাস ড্রিলিংয়ের ব্যাপক উদ্যোগ নিলেও অজ্ঞাত কারণে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে এহেন পদক্ষেপ নিতে দেখা যায়নি। ব্যাপক মাত্রায় ড্রিলিংয়ের কারণে বাংলাদেশে গ্যাসের মূল কেন্দ্র তিতাস-সুরমা বেসিনের গ্যাস নিঃশেষ হয়ে এসেছে, যেমনটি যুক্তরাজ্যের ক্ষেত্রে হতেও দেখা যায়। সে দেশের তেল-গ্যাসের মূল কেন্দ্র উত্তর সাগরের তেল-গ্যাসের ৯০ ভাগের বেশি ইতিমধ্যে ব্যবহৃত হয়ে যাওয়ায় বর্তমানে যুক্তরাজ্যকে তেল-গ্যাসের জন্য রাশিয়াসহ বিকল্প উৎসের সন্ধান করতে হচ্ছে। ইরান যুদ্ধের কারণে অন্য একাধিক দেশের মতো বাংলাদেশকেও মধ্যপ্রাচ্য থেকে জ্বালানি তেল ও এলএনজি আমদানিতে বেগ পেতে হচ্ছে।
শেখ হাসিনার দেশে ফেরার ঘোষণায় উল্লসিত অতি উৎসাহী একশ্রেণির দলীয় নেতা-কর্মীকে ইতিমধ্যে ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে ‘গ্যাস দে, বিদ্যুৎ দে, নইলে গদি ছেড়ে দে’, ‘শেখ হাসিনা আসবে, বাংলাদেশ হাসবে’ জাতীয় সেøাগান তুলে মিছিল করে যানবাহনে অগ্নিসংযোগ, ককটেল বিস্ফোরণের মতো নাশকতামূলক তৎপরতায় লিপ্ত হতে দেখা যাচ্ছে, যা দেশে অরাজক ও অস্থিতিশীল পরিস্থিতি সৃষ্টি করে ঘোলা পানিতে মাছ শিকারের ষড়যন্ত্র ছাড়া আর কিছুই নয়। মিডিয়া সূত্রমতে, সম্প্রতি ঢাকার গুলশানে আওয়ামী সমর্থকদের এক ঝটিকা মিছিল থেকে পুলিশ প্রায় ১৮০ জনকে গ্রেপ্তার করে। এ ছাড়া ঢাকার কেরানীগঞ্জ থেকে ককটেল ও মুখোশ নির্মাণের বিপুল পরিমাণ সরঞ্জামসহ আওয়ামী লীগের একজন নেতাকে গ্রেপ্তার করা হয়, যা কিসের আলামত বহন করে, তা খুলে বলার প্রয়োজন রয়েছে বলে মনে করি না। যাদের জন্য তাদের গ্রেপ্তার ও কারাভোগ, সেই সব নেতারা বিদেশে দিব্যি নিরাপদে আরাম-আয়েশে জীবন কাটাচ্ছেন। এটা দেখে ‘ভাবিয়া করিও কাজ করিয়া ভাবিও না’ প্রবাদ বাক্যটির কথা মনে পড়ে গেল। শেখ হাসিনা ও দলীয় নেতাদের বাংলাদেশে সম্ভাব্য প্রত্যাবর্তনে দেশের মানুষ ‘হাসবে’ কি না জানি না, তবে অতীতে তাদের যাবতীয় অপকর্মের (গুম, খুন, আয়নাঘর, দুর্নীতি ইত্যাদি) কথা মনে করে আদালতে আত্মসমর্পণের পূর্বে পুলিশের নিরাপত্তাবেষ্টনী ভেঙে ছাত্র-জনতা তাদেরকে গণধোলাই দিতে ঝাঁপিয়ে পড়বে না, তার নিশ্চয়তা নেই। লেখক : কলামিস্ট