জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশন সম্প্রতি সমাপ্ত হয়েছে। এর মধ্য দিয়ে শেষ হয়ে গেল দুনিয়াজুড়ে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের নানামুখী কারবার। জাতিসংঘের ঐতিহাসিক পটভূমিটাও ছিল একটা ঐতিহাসিক জন্মের মুহূর্ত। ১৯৪৫ সালের ২৫ এপ্রিল যুক্তরাষ্ট্রের সানফ্রান্সিসকো নগরীতে বিশ্বের প্রতিটি নির্যাতিত মানুষের কল্যাণের লক্ষ্য নিয়ে একটি সনদ স্বাক্ষর সম্মেলনের আয়োজন করা হয়েছিল, যে অনুষ্ঠানে যোগ দিয়েছিলেন বিশ্বের ৫০টি দেশের প্রতিনিধিরা এবং তাদের সম্মিলিত উদ্যোগে ওই দিন ১১১টি অনুচ্ছেদ-বিশিষ্ট একটি সনদ চূড়ান্ত হয়েছিল, যার নাম জাতিসংঘ সনদ। ১৯৪৫ সালের ২৪ অক্টোবর আনুষ্ঠানিকভাবে জাতিসংঘ প্রতিষ্ঠার ঘোষণার কথাও প্রচারিত হয়েছিল সেই সময়। এর ধারাবাহিকতায় নিরাপত্তা পরিষদের পাঁচ সদস্য ও স্বাক্ষরদানকারী অন্যান্য সদস্যরাষ্ট্র নিয়ে জাতিসংঘের যাত্রা শুরু হয়েছিল নিউইয়র্ক নগরীর প্রধানতম বাণিজ্যকেন্দ্র ম্যানহাটনের ইস্ট রিভারের পাশে এবং ফার্স্ট অ্যাভিনিউ ও ৪২ থেকে ৪৮তম স্ট্রিটের মাঝে অবস্থিত ৫০৯ ফুট উচ্চতাবিশিষ্ট ভবনটিতে। এর নির্মাণকাজ ১৯৪৮ সালে শুরু হয়ে শেষ হয়েছিল ১৯৫২ সালে। ওই ভবনটি ১৭ একর জায়গাজুড়ে অবস্থিত। কথিত আছে, ওই জায়গাটি ক্রয় করার পেছনে যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক উপরাষ্ট্রপতি নেলসন রকফেলার মুখ্য ভূমিকা পালন করেছিলেন। তার পিতা জন রকফেলার ক্রয়মূল্যের মূল অংশের বড় অংশ পরিশোধ করেছিলেন বলে প্রমাণ আছে। নিউইয়র্ক ছাড়াও জাতিসংঘের আরও তিনটি অতিরিক্ত সহায়ক ও আঞ্চলিক সদর দফতর রয়েছে জেনেভা, ভিয়েনা ও নাইরোবিতে। তবে নিউইয়র্কেই রয়েছে তার সদর দফতর, যেখানে প্রধান ছয়টি অঙ্গসংগঠন কাজ করে থাকে। ওই সদর দফতরেই প্রতিবছর সেপ্টেম্বর মাসের তৃতীয় মঙ্গলবার সাধারণ পরিষদের অধিবেশন বসে। সেখানে যোগ দিয়ে থাকেন ১৯৩টি সদস্যরাষ্ট্রের রাষ্ট্রপ্রধান, সরকারপ্রধানসহ রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বরা।
এবারকার সম্মেলন ছিল বহু মত-পথের সম্মিলিত রূপের এক অবিস্মরণীয় অধ্যায়। বিশ্বের মানবতাবাদী মানুষেরা দেখেছে—ফিলিস্তিনের লাখ লাখ নিরীহ মানুষের খুনে রঞ্জিত খুনি নেতানিয়াহুকে কীভাবে বয়কট করতে হয়, তারও নমুনা। তার চেয়েও ভয়ংকর ছিল বিশ্বের এক নম্বর পরাশক্তিসম্পন্ন দেশের সর্বময় ক্ষমতাধর ব্যক্তিটি যখন জাতিসংঘের ভাষণে নির্মম কণ্ঠে উচ্চারণ করলেন, তিনি ইরানকে মাটির সঙ্গে মিশিয়ে দিতে চান এবং সেটা অচিরেই সম্পন্ন করবেন তিনি। এতক্ষণে মানবতা নামক শব্দটি বাকপ্রতিবন্ধীর ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়ে পড়েছে। যদিও যারা তখন অধিবেশন কক্ষে অবস্থান নিয়েছেন, তাদের প্রতিক্রিয়ার বিষয়টি পরিষ্কার করল না মিডিয়ার সঙ্গে জড়িত কোনো একটা সংস্থাও। তার পেছনে যে কারণটি জাজ্বল্যমান সত্য, তার খবরও রাখেন দুনিয়ার মানুষেরা। গত কয়েক বছর ধরে বিশ্বজুড়ে যুদ্ধের নামে যে সকল নারকীয় তাণ্ডবে ক্ষত-বিক্ষত জীবন্ত মানুষের বেঁচে থাকার ইতিহাস, সেই অবস্থায় জাতিসংঘের অধিবেশন কক্ষে দুনিয়ার নেতৃবৃন্দের সামনে এমন আস্ফালন দুনিয়া ধ্বংসেরই ইঙ্গিত দেয়। যদিও অনেকের মতে, তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধের সামনে দাঁড়িয়ে আছে বিশ্ব ব্যবস্থা, যেকোনো সময়েই বিস্ফোরণ ঘটবে তার। আর সেই অবস্থায় মাইক্রোফোন হাতে নিয়ে তুরস্কের সাবেক প্রধানমন্ত্রীকে কাঁদতে দেখা গেল। আর ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান আবেগতাড়িত কণ্ঠে এক হাতে আমেরিকার হামলায় নিহত ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ খামেনির ছবি এবং অন্য হাতে তুলে ধরলেন একটি নাই হয়ে যাওয়া শিশুর রক্তমাখা গোলাপি রঙের একটি স্কুলব্যাগ। ইসরায়েল-আমেরিকার যৌথ হামলার মুখে পড়ে ২০২৬ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি দক্ষিণ ইরানের মিনার শহরে অবস্থিত একটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের স্কুল চলাকালীন মার্কিন বাহিনী কর্তৃক একটি টমাহক ক্রুজ মিসাইল হামলায় প্রাণ হারিয়েছিল ১৬৮ জন শিশু শিক্ষার্থী ছাড়াও আরও ১৪ জন বেসামরিক মানুষ। সেই বীভৎস ঘটনার স্মৃতি হিসেবে তিনি স্কুলব্যাগটি নিয়ে এসেছিলেন। দুনিয়ার ইতিহাসে এত বড় মানবিক বিপর্যয় ঘটিয়েও যারা ন্যূনতম লজ্জাবোধ করার প্রয়োজন অনুভব করে না, সেই তারাই জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের সভাকক্ষে দাঁড়িয়ে ১৯৩টি দেশের রাষ্ট্রপ্রধান, সরকারপ্রধান এবং উল্লেখযোগ্য সংখ্যক রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বের সামনে হাত তুলে বাকিটুকুও ধুলায় মিশিয়ে দেওয়ার যখন হুংকার দেন, তখন জাতিসংঘের মতো ‘ঠুঁটো জগন্নাথ’ হয়ে পড়া একটি প্রতিষ্ঠানের টিকে থাকার যৌক্তিকতা নিয়েও প্রশ্ন ওঠা শুরু হয়। এই প্রশ্নটা সামনে রেখেই লিবিয়ার প্রয়াত নেতা মুয়াম্মার গাদ্দাফি ২০০৯ সালে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের সভায় জাতিসংঘ সনদের কপি ছিঁড়ে টুকরো টুকরো করে স্পিকারের উদ্দেশে ছুড়ে দিয়ে প্রতিষ্ঠানটির অসাড়তার প্রমাণ দিতে শুধু চাননি, পরবর্তীতে তার দীর্ঘ শাসনামলে আর কোনো দিন তিনি জাতিসংঘের কোনো একটা অধিবেশনেও যোগ দেওয়ার প্রয়োজনবোধ করেননি। আর বর্তমান বিশ্বের ক্ষমতাধর আরেকটি দেশ চীন, যার নেক নজরে যাওয়ার ইচ্ছা নিয়ে আমাদের মোড়ল রাষ্ট্রের সর্বময় ক্ষমতাধর ব্যক্তিটির প্রাণান্ত প্রয়াস চোখে পড়ার মতো। সেই চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিন পিং অধিবেশন চলাকালীন নিউইয়র্কে শারীরিকভাবে উপস্থিত থাকার পরেও জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে উপস্থিত হওয়ার কোনো গরজই দেখাননি, যদিও ওই সময় আমেরিকান প্রেসিডেন্টের দেওয়া লাল গালিচা সংবর্ধনা শেষে যৌথ মিটিংয়ে তিনি উপস্থিত থেকে কার্যত জাতিসংঘ যে আর ধর্তব্যের মধ্যে পড়ে না, সেটাই বোঝাতে চেয়েছেন।
২০০৬ সালে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট জর্জ বুশ অধিবেশনে এক দীর্ঘ ভাষণ দিয়েছিলেন। ইতিহাসের তথ্যমতে, ওই ভাষণের পর ভেনেজুয়েলার তৎকালীন প্রেসিডেন্ট হুগো শাভেজ বুশকে ‘শয়তান’ বলে বক্তব্য রাখতে গিয়ে বলেছিলেন, ‘গতকাল এক শয়তান এসে দাঁড়িয়েছিল ওই জায়গায়, আজ আমি যেখানে এসে দাঁড়িয়েছি।’ তার পরও জাতিসংঘ ঢোঁড়া সাপের মতো পথ চলতে গিয়ে অনেক সময় অনেক কৃতী পুরুষকে তাদের কথা বলার সুযোগ করে দিয়েছিল। তাদের মধ্যে ফিলিস্তিনের প্রয়াত নেতা ইয়াসির আরাফাত। তিনি জাতিসংঘের সদস্য না হয়েও ১৯৭৪ সালে প্রথমবারের মতো অধিবেশনে বক্তব্য রেখেছিলেন। আর বাংলাদেশের নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান তার জীবদ্দশায় মাত্র একবার জাতিসংঘে যাওয়ার সুযোগ পেয়েছিলেন। ১৯৭৪ সালে বাংলাদেশ জাতিসংঘের সদস্যপদ লাভ করে। ওই বছরের ১৭ সেপ্টেম্বরে অনুষ্ঠিত সাধারণ পরিষদে শেখ মুজিব বাংলায় ভাষণ দিয়েছিলেন। জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের প্রথম নারী সভাপতি ছিলেন ভারতের বিজয়লক্ষ্মী পণ্ডিত, তিনি জওহরলাল নেহরুর বোন ছিলেন। ১৯৫৩ সালে অনুষ্ঠিত অষ্টম অধিবেশনে সভাপতি হিসেবে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন তিনি।
পণ্ডিত জওহরলাল নেহরু ১৯৪৮, ১৯৫৫, ১৯৫৬ ও ১৯৬০—এই চারবার জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে যোগ দিয়ে বক্তব্য রেখেছিলেন। আর তার কন্যা শ্রীমতী ইন্দিরা গান্ধী ১৯৬৮, ১৯৮১ এবং তার পুত্র রাজীব গান্ধী যোগ দিয়েছিলেন ১৯৮৫ ও ১৯৮৮—এই দুবার। বাংলাদেশের রাজনীতিবিদদের মধ্যে জিয়াউর রহমান মাত্র একবার ১৯৮০ সালে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে যোগ দিয়ে বক্তব্য রেখেছিলেন। তার স্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া ১৯৯৩ সালের ১ অক্টোবর অনুষ্ঠিত সাধারণ পরিষদের ৪৮তম অধিবেশনে প্রথমবারের মতো যোগ দিলেও পরবর্তীতে ১৯৯৫, ২০০২ ও ২০০৫—এই চারবার তিনি অধিবেশনে যোগ দিয়ে বক্তব্য রেখেছিলেন।
জেনারেল এরশাদ যোগ দিয়েছিলেন ১৯৮৭ সালে মাত্র একবার। বিচারপতি লতিফুর রহমান ২০০১ সালে মাত্র একবার অংশগ্রহণের সুযোগ পেয়েছিলেন। সেনাসমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান হিসেবে ফখরুদ্দীন আহমদ একবারের মতো ২০০৮ সালে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে যোগ দিয়ে বক্তব্য রাখার সুযোগ পেয়েছিলেন। অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান হিসেবে ড. মুহাম্মদ ইউনূস মোট দুবার জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে যোগ দিয়ে বক্তব্য রেখেছেন। প্রথমবার ২০২৪ সালের ৭৯তম অধিবেশনে এবং দ্বিতীয়বার ২০২৫ সালের ৮০তম অধিবেশনে। আর বর্তমান সরকারের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান প্রথমবারের মতো এবার ২০২৬ সালের ৮১তম অধিবেশনে যোগ দিলেন। তবে পতিত সরকারের স্বৈরশাসক শেখ হাসিনার রেকর্ডকে বিশ্ব রেকর্ডের পর্যায়ে ফেলে ইতিহাসের এক অনন্য অধ্যায় হিসেবে দেখারও দাবি জানান কেউ কেউ। কারণ শেখ হাসিনা তার দীর্ঘ শাসনামলে মোট ২১ বার জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে যোগ দিয়ে বক্তব্য রাখার সুযোগ পেয়েছেন। প্রথমবার গিয়েছিলেন ১৯৯৬ সালে, তারপর ক্রমান্বয়ে ১৯৯৭, ১৯৯৮, ১৯৯৯, ২০০০, ২০০১, ২০০৯, ২০১০, ২০১১, ২০১২, ২০১৩, ২০১৪, ২০১৫, ২০১৬, ২০১৭, ২০১৮, ২০১৯, ২০২০, ২০২১, ২০২২ এবং ২০২৩—মোট ২১ বার তিনি জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে যোগ দিয়েছিলেন। এই দিক দিয়ে বিশ্বের আর কোনো দেশের কোনো সরকারপ্রধানের এমন ইতিহাস সৃষ্টির আগেও যেমন রেকর্ড ছিল না, আগামীতেও থাকার বিন্দুমাত্র কোনো সুযোগ নেই। এসব কাহিনি কেবল বাংলাদেশেই ডালপালা মেলে। যেমন এবারকার অধিবেশনে বাংলাদেশের জন্য একটু অন্য মাত্রার ভাবমূর্তি বিশ্ব ইতিহাসে একটু বেশিভাবেই নাড়া দিয়েছিল। কারণ ৮১তম ওই অধিবেশনে সভাপতিত্ব করেছেন বাংলাদেশের বর্তমান সরকারের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান। কারও কোনো দয়ায় নয়—রীতিমতো ভোটযুদ্ধে অবতীর্ণ হয়েই সাইপ্রাসের প্রার্থী আন্দ্রেয়াস এস কাকোরিসকে ৮ ভোটের ব্যবধানে পরাজিত করে আগামী এক বছরের জন্য তিনি এই সম্মানজনক অবস্থানে পৌঁছেছেন। ১৯০ ভোটের মধ্যে ড. খলিল ৯৯ ভোট এবং কাকোরিস ৯১ ভোট পান। বাংলাদেশের ইতিহাসে তার এই অবস্থান দ্বিতীয় স্থানে রয়েছে, কারণ ৪০ বছর আগে ১৯৮৬ সালে জাতিসংঘের ৪১তম অধিবেশনে তৎকালীন পররাষ্ট্রমন্ত্রী হুমায়ুন রশীদ চৌধুরী প্রথমবারের মতো সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে সভাপতিত্ব করার গৌরব অর্জন করেছিলেন। জাতীয় ইলেকট্রনিক মিডিয়ায় বারবার করে ড. খলিলুর রহমানের এই অর্জনকে হাইলাইট করার চেষ্টা করা হলেও একবারের জন্যও আরেক বর্ণাঢ্য জীবনের অধিকারী মানুষ হুমায়ুন রশীদ চৌধুরীর নামটা উচ্চারিত হলো না। হয়তো তার তৎকালীন রাজনৈতিক পরিচয়টা প্রধান প্রতিবন্ধকতার কারণ হয়ে উঠেছিল বলেই। তিনি শুধু আওয়ামী লীগ শাসনামলের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ছিলেন না, একাত্তরের মহান মুক্তিযুদ্ধের সক্রিয় অগ্রণী ব্যক্তিত্বদের ভেতরকার একজনও ছিলেন। তবে ড. খলিলুর রহমান তার উদ্বোধনী ভাষণে হুমায়ুন রশীদ চৌধুরীর নাম উচ্চারণ করে সম্মান দেখিয়েছেন। জাতি তার জন্য তাকেও সম্মান দেখাবে আগামীতে ইনশা আল্লাহ। কারণ প্রকৃতি ঠিকই ইতিহাস তৈরিতে একটা সহায়ক ভূমিকা পালন করে থাকে; এই কথা ব্যক্তিমাত্রই মনে রাখা প্রয়োজন।
তবে বিএনপি-সমর্থিত দলীয় ব্যক্তিত্বদের উচ্ছ্বাস ছিল অন্য মাত্রার। এবারকার অধিবেশনে তারেক রহমানের উপস্থিতি নিয়ে ‘জিয়া পরিবারের তৃতীয় প্রজন্মের বিজয়’—এ কথা যারা বারবার করে শোনাতে চেয়েছিল, তাদের জ্ঞাতার্থে ইতিহাস তৈরির পেছনের আরও কিছু তথ্য তুলে ধরতে চাই। আর তা হলো আমাদের উপমহাদেশের ইতিহাসে এ ধরনের নজির কিন্তু আগেই তৈরি হয়েছিল, যেমন ভারতের নেহরু পরিবারের তিন সদস্য—জওহরলাল নেহরু, ইন্ধিরা গান্ধী ও রাজীব গান্ধী। এই তিনজন ছাড়াও নেহরুর বোন বিজয়লক্ষ্মী পণ্ডিত মোট চারজন জাতিসংঘের অধিবেশনে যোগ দিয়ে ভাষণ দেওয়ার গৌরব অর্জন করেছিলেন। তা ছাড়া ১৯৫৬ সালে শ্রীলঙ্কার সলোমন বন্দরনায়েক, ১৯৭১ সালে তার স্ত্রী শ্রীমাভো বন্দরনায়েক এবং ১৯৯৫ সালে তাদের কন্যা চন্দ্রিকা কুমারাতুঙ্গা বন্দরনায়েক একইভাবে ইতিহাস তৈরি করে গেছেন। অতএব, ইতিহাস না জেনে ইতিহাস তৈরিতে মিথ্যার মসলা মিশিয়ে গাঁজাখুরি কথাবার্তা যত কম বলা যায়, জাতির জন্য ততই মঙ্গল।
শেষ করব আরেকটা কথা বলে। এবারকার ৮১তম অধিবেশন শেষে আরও একটা বড় খবর সকলের চোখে প্রশ্নবোধক চিহ্নের মতো জেগে উঠেছে। আর তা হলো তারেক রহমানের কন্যা জাইমা রহমানের জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের সভাপতির কার্যালয়ে লিগ্যাল অফিসার হিসেবে নিয়োগদানের বিষয়টি। একটা প্রশ্ন বারবার ঘুরেফিরে উঁকি মারতে শুরু করেছে, তারেক রহমান সাহেব কি তার পূর্বসূরি শেখ হাসিনার দেখিয়ে দেওয়া পথ ধরে হাঁটা শুরু করেছেন? শেখ হাসিনার ক্ষমতার দাপটে একসময় তার কন্যা পুতুল বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া অঞ্চলের আঞ্চলিক পরিচালক পদে দায়িত্ব পালনের সুযোগ পেয়েছিলেন ভুয়া শিক্ষার সনদ দেখিয়ে। তারেক রহমানের কন্যার ক্ষেত্রে একই বিষয় প্রাধান্য পেলেও আমাদের একটা কথাই বলার থাকে আর তা হলো বাংলাদেশের বর্তমান সমাজব্যবস্থায় পাঁচ বছরের একটা শিশুকন্যা থেকে ষাট বছরের বৃদ্ধা কারুরই যেখানে নিরাপত্তা নেই, প্রতিদিন একটা মাসুম শিশুকন্যা ধর্ষিতা হয়ে শেষ পর্যন্ত খুনের শিকার হয়ে মৃত্যুবরণ করছে। অথচ বিচারের নামে কালক্ষেপণের সুযোগে অপরাধীরা জেলখানার নিরাপদ আশ্রয়ে খেয়েদেয়ে দিব্যি সময় কাটাচ্ছে। কিন্তু সেই নির্মম হত্যার শিকারে পরিণত হওয়া শিশুকন্যাটির রেখে যাওয়া পরিবারের সদস্যরা নিরাপত্তাহীনতায় দিন যাপন করছে। দেশজুড়ে বিচারহীনতার কালচার, আর তার সুযোগে দিনরাত অপরাধী শয়তানদের কাজ-কারবারে সাধারণ মানুষের নাভিশ্বাস ওঠার জোগাড়। এই অবস্থায় বর্তমান প্রধানমন্ত্রী দেশের শিশুকন্যাদের জীবনকে নিরাপত্তাহীনতার জাঁতাকালে ফেলে দিয়ে নিজ কন্যার জীবনকে নিরাপত্তার চাদরে মুড়িয়ে রাখবেন, এতটা নির্মম না হলেও পারতেন। শুধু একটা কথা স্মরণ করিয়ে দিতে চাই, দেশের জনগণের জানমালের নিরাপত্তা বিধানের কথা বলে যে বা যারাই অতি চালাকির আশ্রয় নেয়, ইতিহাস কিন্তু ঠিকই প্রতিশোধ নেয় এবং নিতে জানে।
এবারকার সম্মেলন ছিল বহু মত-পথের সম্মিলিত রূপের এক অবিস্মরণীয় অধ্যায়। বিশ্বের মানবতাবাদী মানুষেরা দেখেছে—ফিলিস্তিনের লাখ লাখ নিরীহ মানুষের খুনে রঞ্জিত খুনি নেতানিয়াহুকে কীভাবে বয়কট করতে হয়, তারও নমুনা। তার চেয়েও ভয়ংকর ছিল বিশ্বের এক নম্বর পরাশক্তিসম্পন্ন দেশের সর্বময় ক্ষমতাধর ব্যক্তিটি যখন জাতিসংঘের ভাষণে নির্মম কণ্ঠে উচ্চারণ করলেন, তিনি ইরানকে মাটির সঙ্গে মিশিয়ে দিতে চান এবং সেটা অচিরেই সম্পন্ন করবেন তিনি। এতক্ষণে মানবতা নামক শব্দটি বাকপ্রতিবন্ধীর ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়ে পড়েছে। যদিও যারা তখন অধিবেশন কক্ষে অবস্থান নিয়েছেন, তাদের প্রতিক্রিয়ার বিষয়টি পরিষ্কার করল না মিডিয়ার সঙ্গে জড়িত কোনো একটা সংস্থাও। তার পেছনে যে কারণটি জাজ্বল্যমান সত্য, তার খবরও রাখেন দুনিয়ার মানুষেরা। গত কয়েক বছর ধরে বিশ্বজুড়ে যুদ্ধের নামে যে সকল নারকীয় তাণ্ডবে ক্ষত-বিক্ষত জীবন্ত মানুষের বেঁচে থাকার ইতিহাস, সেই অবস্থায় জাতিসংঘের অধিবেশন কক্ষে দুনিয়ার নেতৃবৃন্দের সামনে এমন আস্ফালন দুনিয়া ধ্বংসেরই ইঙ্গিত দেয়। যদিও অনেকের মতে, তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধের সামনে দাঁড়িয়ে আছে বিশ্ব ব্যবস্থা, যেকোনো সময়েই বিস্ফোরণ ঘটবে তার। আর সেই অবস্থায় মাইক্রোফোন হাতে নিয়ে তুরস্কের সাবেক প্রধানমন্ত্রীকে কাঁদতে দেখা গেল। আর ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান আবেগতাড়িত কণ্ঠে এক হাতে আমেরিকার হামলায় নিহত ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ খামেনির ছবি এবং অন্য হাতে তুলে ধরলেন একটি নাই হয়ে যাওয়া শিশুর রক্তমাখা গোলাপি রঙের একটি স্কুলব্যাগ। ইসরায়েল-আমেরিকার যৌথ হামলার মুখে পড়ে ২০২৬ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি দক্ষিণ ইরানের মিনার শহরে অবস্থিত একটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের স্কুল চলাকালীন মার্কিন বাহিনী কর্তৃক একটি টমাহক ক্রুজ মিসাইল হামলায় প্রাণ হারিয়েছিল ১৬৮ জন শিশু শিক্ষার্থী ছাড়াও আরও ১৪ জন বেসামরিক মানুষ। সেই বীভৎস ঘটনার স্মৃতি হিসেবে তিনি স্কুলব্যাগটি নিয়ে এসেছিলেন। দুনিয়ার ইতিহাসে এত বড় মানবিক বিপর্যয় ঘটিয়েও যারা ন্যূনতম লজ্জাবোধ করার প্রয়োজন অনুভব করে না, সেই তারাই জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের সভাকক্ষে দাঁড়িয়ে ১৯৩টি দেশের রাষ্ট্রপ্রধান, সরকারপ্রধান এবং উল্লেখযোগ্য সংখ্যক রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বের সামনে হাত তুলে বাকিটুকুও ধুলায় মিশিয়ে দেওয়ার যখন হুংকার দেন, তখন জাতিসংঘের মতো ‘ঠুঁটো জগন্নাথ’ হয়ে পড়া একটি প্রতিষ্ঠানের টিকে থাকার যৌক্তিকতা নিয়েও প্রশ্ন ওঠা শুরু হয়। এই প্রশ্নটা সামনে রেখেই লিবিয়ার প্রয়াত নেতা মুয়াম্মার গাদ্দাফি ২০০৯ সালে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের সভায় জাতিসংঘ সনদের কপি ছিঁড়ে টুকরো টুকরো করে স্পিকারের উদ্দেশে ছুড়ে দিয়ে প্রতিষ্ঠানটির অসাড়তার প্রমাণ দিতে শুধু চাননি, পরবর্তীতে তার দীর্ঘ শাসনামলে আর কোনো দিন তিনি জাতিসংঘের কোনো একটা অধিবেশনেও যোগ দেওয়ার প্রয়োজনবোধ করেননি। আর বর্তমান বিশ্বের ক্ষমতাধর আরেকটি দেশ চীন, যার নেক নজরে যাওয়ার ইচ্ছা নিয়ে আমাদের মোড়ল রাষ্ট্রের সর্বময় ক্ষমতাধর ব্যক্তিটির প্রাণান্ত প্রয়াস চোখে পড়ার মতো। সেই চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিন পিং অধিবেশন চলাকালীন নিউইয়র্কে শারীরিকভাবে উপস্থিত থাকার পরেও জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে উপস্থিত হওয়ার কোনো গরজই দেখাননি, যদিও ওই সময় আমেরিকান প্রেসিডেন্টের দেওয়া লাল গালিচা সংবর্ধনা শেষে যৌথ মিটিংয়ে তিনি উপস্থিত থেকে কার্যত জাতিসংঘ যে আর ধর্তব্যের মধ্যে পড়ে না, সেটাই বোঝাতে চেয়েছেন।
২০০৬ সালে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট জর্জ বুশ অধিবেশনে এক দীর্ঘ ভাষণ দিয়েছিলেন। ইতিহাসের তথ্যমতে, ওই ভাষণের পর ভেনেজুয়েলার তৎকালীন প্রেসিডেন্ট হুগো শাভেজ বুশকে ‘শয়তান’ বলে বক্তব্য রাখতে গিয়ে বলেছিলেন, ‘গতকাল এক শয়তান এসে দাঁড়িয়েছিল ওই জায়গায়, আজ আমি যেখানে এসে দাঁড়িয়েছি।’ তার পরও জাতিসংঘ ঢোঁড়া সাপের মতো পথ চলতে গিয়ে অনেক সময় অনেক কৃতী পুরুষকে তাদের কথা বলার সুযোগ করে দিয়েছিল। তাদের মধ্যে ফিলিস্তিনের প্রয়াত নেতা ইয়াসির আরাফাত। তিনি জাতিসংঘের সদস্য না হয়েও ১৯৭৪ সালে প্রথমবারের মতো অধিবেশনে বক্তব্য রেখেছিলেন। আর বাংলাদেশের নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান তার জীবদ্দশায় মাত্র একবার জাতিসংঘে যাওয়ার সুযোগ পেয়েছিলেন। ১৯৭৪ সালে বাংলাদেশ জাতিসংঘের সদস্যপদ লাভ করে। ওই বছরের ১৭ সেপ্টেম্বরে অনুষ্ঠিত সাধারণ পরিষদে শেখ মুজিব বাংলায় ভাষণ দিয়েছিলেন। জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের প্রথম নারী সভাপতি ছিলেন ভারতের বিজয়লক্ষ্মী পণ্ডিত, তিনি জওহরলাল নেহরুর বোন ছিলেন। ১৯৫৩ সালে অনুষ্ঠিত অষ্টম অধিবেশনে সভাপতি হিসেবে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন তিনি।
পণ্ডিত জওহরলাল নেহরু ১৯৪৮, ১৯৫৫, ১৯৫৬ ও ১৯৬০—এই চারবার জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে যোগ দিয়ে বক্তব্য রেখেছিলেন। আর তার কন্যা শ্রীমতী ইন্দিরা গান্ধী ১৯৬৮, ১৯৮১ এবং তার পুত্র রাজীব গান্ধী যোগ দিয়েছিলেন ১৯৮৫ ও ১৯৮৮—এই দুবার। বাংলাদেশের রাজনীতিবিদদের মধ্যে জিয়াউর রহমান মাত্র একবার ১৯৮০ সালে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে যোগ দিয়ে বক্তব্য রেখেছিলেন। তার স্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া ১৯৯৩ সালের ১ অক্টোবর অনুষ্ঠিত সাধারণ পরিষদের ৪৮তম অধিবেশনে প্রথমবারের মতো যোগ দিলেও পরবর্তীতে ১৯৯৫, ২০০২ ও ২০০৫—এই চারবার তিনি অধিবেশনে যোগ দিয়ে বক্তব্য রেখেছিলেন।
জেনারেল এরশাদ যোগ দিয়েছিলেন ১৯৮৭ সালে মাত্র একবার। বিচারপতি লতিফুর রহমান ২০০১ সালে মাত্র একবার অংশগ্রহণের সুযোগ পেয়েছিলেন। সেনাসমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান হিসেবে ফখরুদ্দীন আহমদ একবারের মতো ২০০৮ সালে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে যোগ দিয়ে বক্তব্য রাখার সুযোগ পেয়েছিলেন। অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান হিসেবে ড. মুহাম্মদ ইউনূস মোট দুবার জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে যোগ দিয়ে বক্তব্য রেখেছেন। প্রথমবার ২০২৪ সালের ৭৯তম অধিবেশনে এবং দ্বিতীয়বার ২০২৫ সালের ৮০তম অধিবেশনে। আর বর্তমান সরকারের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান প্রথমবারের মতো এবার ২০২৬ সালের ৮১তম অধিবেশনে যোগ দিলেন। তবে পতিত সরকারের স্বৈরশাসক শেখ হাসিনার রেকর্ডকে বিশ্ব রেকর্ডের পর্যায়ে ফেলে ইতিহাসের এক অনন্য অধ্যায় হিসেবে দেখারও দাবি জানান কেউ কেউ। কারণ শেখ হাসিনা তার দীর্ঘ শাসনামলে মোট ২১ বার জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে যোগ দিয়ে বক্তব্য রাখার সুযোগ পেয়েছেন। প্রথমবার গিয়েছিলেন ১৯৯৬ সালে, তারপর ক্রমান্বয়ে ১৯৯৭, ১৯৯৮, ১৯৯৯, ২০০০, ২০০১, ২০০৯, ২০১০, ২০১১, ২০১২, ২০১৩, ২০১৪, ২০১৫, ২০১৬, ২০১৭, ২০১৮, ২০১৯, ২০২০, ২০২১, ২০২২ এবং ২০২৩—মোট ২১ বার তিনি জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে যোগ দিয়েছিলেন। এই দিক দিয়ে বিশ্বের আর কোনো দেশের কোনো সরকারপ্রধানের এমন ইতিহাস সৃষ্টির আগেও যেমন রেকর্ড ছিল না, আগামীতেও থাকার বিন্দুমাত্র কোনো সুযোগ নেই। এসব কাহিনি কেবল বাংলাদেশেই ডালপালা মেলে। যেমন এবারকার অধিবেশনে বাংলাদেশের জন্য একটু অন্য মাত্রার ভাবমূর্তি বিশ্ব ইতিহাসে একটু বেশিভাবেই নাড়া দিয়েছিল। কারণ ৮১তম ওই অধিবেশনে সভাপতিত্ব করেছেন বাংলাদেশের বর্তমান সরকারের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান। কারও কোনো দয়ায় নয়—রীতিমতো ভোটযুদ্ধে অবতীর্ণ হয়েই সাইপ্রাসের প্রার্থী আন্দ্রেয়াস এস কাকোরিসকে ৮ ভোটের ব্যবধানে পরাজিত করে আগামী এক বছরের জন্য তিনি এই সম্মানজনক অবস্থানে পৌঁছেছেন। ১৯০ ভোটের মধ্যে ড. খলিল ৯৯ ভোট এবং কাকোরিস ৯১ ভোট পান। বাংলাদেশের ইতিহাসে তার এই অবস্থান দ্বিতীয় স্থানে রয়েছে, কারণ ৪০ বছর আগে ১৯৮৬ সালে জাতিসংঘের ৪১তম অধিবেশনে তৎকালীন পররাষ্ট্রমন্ত্রী হুমায়ুন রশীদ চৌধুরী প্রথমবারের মতো সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে সভাপতিত্ব করার গৌরব অর্জন করেছিলেন। জাতীয় ইলেকট্রনিক মিডিয়ায় বারবার করে ড. খলিলুর রহমানের এই অর্জনকে হাইলাইট করার চেষ্টা করা হলেও একবারের জন্যও আরেক বর্ণাঢ্য জীবনের অধিকারী মানুষ হুমায়ুন রশীদ চৌধুরীর নামটা উচ্চারিত হলো না। হয়তো তার তৎকালীন রাজনৈতিক পরিচয়টা প্রধান প্রতিবন্ধকতার কারণ হয়ে উঠেছিল বলেই। তিনি শুধু আওয়ামী লীগ শাসনামলের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ছিলেন না, একাত্তরের মহান মুক্তিযুদ্ধের সক্রিয় অগ্রণী ব্যক্তিত্বদের ভেতরকার একজনও ছিলেন। তবে ড. খলিলুর রহমান তার উদ্বোধনী ভাষণে হুমায়ুন রশীদ চৌধুরীর নাম উচ্চারণ করে সম্মান দেখিয়েছেন। জাতি তার জন্য তাকেও সম্মান দেখাবে আগামীতে ইনশা আল্লাহ। কারণ প্রকৃতি ঠিকই ইতিহাস তৈরিতে একটা সহায়ক ভূমিকা পালন করে থাকে; এই কথা ব্যক্তিমাত্রই মনে রাখা প্রয়োজন।
তবে বিএনপি-সমর্থিত দলীয় ব্যক্তিত্বদের উচ্ছ্বাস ছিল অন্য মাত্রার। এবারকার অধিবেশনে তারেক রহমানের উপস্থিতি নিয়ে ‘জিয়া পরিবারের তৃতীয় প্রজন্মের বিজয়’—এ কথা যারা বারবার করে শোনাতে চেয়েছিল, তাদের জ্ঞাতার্থে ইতিহাস তৈরির পেছনের আরও কিছু তথ্য তুলে ধরতে চাই। আর তা হলো আমাদের উপমহাদেশের ইতিহাসে এ ধরনের নজির কিন্তু আগেই তৈরি হয়েছিল, যেমন ভারতের নেহরু পরিবারের তিন সদস্য—জওহরলাল নেহরু, ইন্ধিরা গান্ধী ও রাজীব গান্ধী। এই তিনজন ছাড়াও নেহরুর বোন বিজয়লক্ষ্মী পণ্ডিত মোট চারজন জাতিসংঘের অধিবেশনে যোগ দিয়ে ভাষণ দেওয়ার গৌরব অর্জন করেছিলেন। তা ছাড়া ১৯৫৬ সালে শ্রীলঙ্কার সলোমন বন্দরনায়েক, ১৯৭১ সালে তার স্ত্রী শ্রীমাভো বন্দরনায়েক এবং ১৯৯৫ সালে তাদের কন্যা চন্দ্রিকা কুমারাতুঙ্গা বন্দরনায়েক একইভাবে ইতিহাস তৈরি করে গেছেন। অতএব, ইতিহাস না জেনে ইতিহাস তৈরিতে মিথ্যার মসলা মিশিয়ে গাঁজাখুরি কথাবার্তা যত কম বলা যায়, জাতির জন্য ততই মঙ্গল।
শেষ করব আরেকটা কথা বলে। এবারকার ৮১তম অধিবেশন শেষে আরও একটা বড় খবর সকলের চোখে প্রশ্নবোধক চিহ্নের মতো জেগে উঠেছে। আর তা হলো তারেক রহমানের কন্যা জাইমা রহমানের জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের সভাপতির কার্যালয়ে লিগ্যাল অফিসার হিসেবে নিয়োগদানের বিষয়টি। একটা প্রশ্ন বারবার ঘুরেফিরে উঁকি মারতে শুরু করেছে, তারেক রহমান সাহেব কি তার পূর্বসূরি শেখ হাসিনার দেখিয়ে দেওয়া পথ ধরে হাঁটা শুরু করেছেন? শেখ হাসিনার ক্ষমতার দাপটে একসময় তার কন্যা পুতুল বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া অঞ্চলের আঞ্চলিক পরিচালক পদে দায়িত্ব পালনের সুযোগ পেয়েছিলেন ভুয়া শিক্ষার সনদ দেখিয়ে। তারেক রহমানের কন্যার ক্ষেত্রে একই বিষয় প্রাধান্য পেলেও আমাদের একটা কথাই বলার থাকে আর তা হলো বাংলাদেশের বর্তমান সমাজব্যবস্থায় পাঁচ বছরের একটা শিশুকন্যা থেকে ষাট বছরের বৃদ্ধা কারুরই যেখানে নিরাপত্তা নেই, প্রতিদিন একটা মাসুম শিশুকন্যা ধর্ষিতা হয়ে শেষ পর্যন্ত খুনের শিকার হয়ে মৃত্যুবরণ করছে। অথচ বিচারের নামে কালক্ষেপণের সুযোগে অপরাধীরা জেলখানার নিরাপদ আশ্রয়ে খেয়েদেয়ে দিব্যি সময় কাটাচ্ছে। কিন্তু সেই নির্মম হত্যার শিকারে পরিণত হওয়া শিশুকন্যাটির রেখে যাওয়া পরিবারের সদস্যরা নিরাপত্তাহীনতায় দিন যাপন করছে। দেশজুড়ে বিচারহীনতার কালচার, আর তার সুযোগে দিনরাত অপরাধী শয়তানদের কাজ-কারবারে সাধারণ মানুষের নাভিশ্বাস ওঠার জোগাড়। এই অবস্থায় বর্তমান প্রধানমন্ত্রী দেশের শিশুকন্যাদের জীবনকে নিরাপত্তাহীনতার জাঁতাকালে ফেলে দিয়ে নিজ কন্যার জীবনকে নিরাপত্তার চাদরে মুড়িয়ে রাখবেন, এতটা নির্মম না হলেও পারতেন। শুধু একটা কথা স্মরণ করিয়ে দিতে চাই, দেশের জনগণের জানমালের নিরাপত্তা বিধানের কথা বলে যে বা যারাই অতি চালাকির আশ্রয় নেয়, ইতিহাস কিন্তু ঠিকই প্রতিশোধ নেয় এবং নিতে জানে।