উৎসব মানেই আনন্দ, উদযাপনের নানা আয়োজন। দীর্ঘ এক বছরের অপেক্ষার পর আমাদের সবচেয়ে প্রিয় এবং অন্তরের উৎসব দুর্গাপূজা বা দুর্গোৎসব একেবারে দোরগোড়ায় চলে এসেছে। প্রতিবছরই দুর্গা মায়ের মর্ত্যধামে ফেরার অনন্দে মেতে ওঠে এই ধরিত্রী, বিশেষ করে বাঙালিদের মধ্যে এই পুজোর উন্মাদনা একটু বেশিই থাকে। দুর্গাপূজা মানে শুধু চোখ-ধাঁধানো প্যান্ডেল আর অপূর্ব সুন্দর প্রতিমা দেখা নয়। এর গভীরে জড়িয়ে আছে বেশ কিছু আচার-অনুষ্ঠান বা রিচুয়াল, যা প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্তরে পালিত হয়ে আসছে। এই রিচুয়ালগুলোর অনেকগুলোরই উৎস হয়তো প্রাচীন কৃষিভিত্তিক সমাজের কোনো প্রথায়, আবার কোনোটি হয়তো আধুনিক নাগরিক জীবনের সৃষ্টি। এই আচারগুলোই উৎসবটিকে একটি ছন্দ দেয়, একটি কাঠামো দেয়। এগুলো পূজার ধর্মীয় আবহের বাইরেও এক গভীর সামাজিক ও সাংস্কৃতিক তাৎপর্য বহন করে, যা উৎসবটিকে আরও বর্ণময় এবং অর্থপূর্ণ করে তোলে।
বাংলার মানুষের বারো মাসে তেরো পার্বণ, সারা বছরই বাঙালির জীবন নানা প্রকার উৎসবের আলোয় মুখরিত হয়ে থাকে। এই সব উৎসবের মধ্যে দুর্গাপূজা হলো বাঙালির শ্রেষ্ঠ উৎসব। দুর্গাপূজা বাঙালির হৃদয়ে এক আলোকোজ্জ্বল উৎসব। শরৎকালে দেবী দুর্গার আবির্ভাবের এই উৎসব শুধু ধর্মীয় অনুষ্ঠান নয়, এটি বাঙালির হৃদয়ের সঙ্গে গভীরভাবে জড়িয়ে থাকা একটি আবেগপ্রবণ সময়। দেবী দুর্গা, যিনি মহিষাসুরকে বধ করে পৃথিবীতে শান্তি প্রতিষ্ঠা করেন, তিনি শক্তির প্রতীক এবং অশুভের বিরুদ্ধে শুভ শক্তির জয়ের প্রতিরূপ। বর্ষার শেষে সোনালি রোদে বসুন্ধরা ঝলমল করে ওঠে, ফসল পরিপূর্ণ হয়ে ওঠে, সরোবরে পদ্মফুল ফোটে, চারদিকে কাশফুলে ভরে ওঠে, তখন আকাশে-বাতাসে বেজে ওঠে আনন্দময়ী মা দুর্গার আগমনী বার্তা।
বহুকাল ধরেই বাঙালির আবেগের জায়গার একটি দুর্গাপূজা। আগেও সেটাই ছিল, এখনো আছে। দুর্গাপূজা মানেই মনের গভীরে অগাধ টুকরো টুকরো স্মৃতি। পূজার উৎসব-আনন্দ সময়ের সঙ্গে সঙ্গে পরিবর্তিত হয়। আনন্দের রকমফের আর কি! তবে ছেলেবেলার পূজা আর আজকের অর্থাৎ বড়বেলার পূজার অনুভূতির মধ্যে ব্যাপক পার্থক্য রয়েছে। বয়সের কারণেই হয়তো।
পূজা মানেই নতুন জামা-কাপড় কেনা, ঘরদোর পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন করা, নাড়ু, মোয়া, মুড়কি বানানো। হিন্দুদের বাড়িতে বাড়িতে গুড় জ্বাল দেওয়ার মিষ্টি গন্ধ ভেসে আসে। পূজার কয়েক দিন ধরে চলে খাওয়াদাওয়ার উৎসব। খাবারগুলো কিন্তু বছরের অন্য সময় তৈরি হয় না। বাড়িতে বাড়িতে আত্মীয়-স্বজনদের ভিড় লেগে থাকে।
দুর্গাপূজা বলতে আমার স্মৃতিতে জেগে আছে বাবার দেওয়া নতুন কাপড়। বছরে সেই পূজা উপলক্ষেই কাপড়-চোপড় পেতাম। তখন এত রেডিমেট কাপড় পাওয়া যেত না। ফলে পূজার বেশ কিছুদিন আগে থেকেই ছুটতাম দর্জির কাছে। বিস্তর মাপজোক দিয়ে আসতাম। তারপর অপেক্ষায় থাকতাম কবে দর্জির কাছ থেকে সেসব পাব। আজ সন্তানদের জন্য যা করছি; সেটাই আমরা পেতাম। তা ছাড়া জামা-জুতোও পেতাম। তবে বছরে ওই একবারই। এখানেই আকর্ষণটা বেশি ছিল। কারণ বছরে ওই একবারই নতুন কাপড় পাওয়ার যে আনন্দ, সেটি যোগ হতো পূজার সঙ্গে। ঠিক এ কারণেই আরও বেশি আকর্ষণীয় হয়ে থাকত দুর্গাপূজা।
পূজার দিনগুলোতে ঘোরাঘুরি ছিল সবচেয়ে বেশি আনন্দের। তবে আমার মনে হয়, একালের পূজায় আড়ম্বরতা বাড়লেও সেই ঐতিহ্য আর নেই। তখন পূজায় ঢাকের বাইরে কোনো বাদ্য থাকত না। এখন পূজা মানেই বড় বড় ডিজে বক্স। উচ্চস্বরে শব্দ। হই-হুল্লোড় করা। এসব পূজার মূল আবহকে আড়াল করছে। মাত্র কয়েকটা দিন দেবী দুর্গা আমাদের মাঝে থাকবেন। দেবী দুর্গা সপরিবারে মর্ত্যে তার পিতৃগৃহে বেড়াতে এসেছেন। বিজয়া দশমীতে বিসর্জনের মধ্য দিয়ে পূজার সমাপ্তি ঘটবে। দেবীর মূর্তি বিসর্জনের মধ্য দিয়ে বিদায় নিলেও ভক্তদের মনের গভীরে ঠিকই থেকে যান তিনি।
আমাদের ছোটবেলার চেয়ে এখন দুর্গাপূজার সংখ্যা বেড়েছে। কিন্তু বাড়েনি আতিথেয়তা, আনন্দ, উৎসবের মাতামাতি। রং পরিবর্তন হয়েছে ভিন্নভাবে। সনাতনী রূপ থেকে তা আধুনিক ডিজেতে পরিণত হয়েছে। পূজা তো শুধু আনন্দে মাতামাতি করার জন্যই নয়। এটি ধর্মীয় আবহের রূপও বটে। পরিবারসহ দেবী দুর্গার আগমন একটি ঐতিহাসিক কাহিনির প্রচলিত রূপ। দেবীর সঙ্গে আসেন কার্তিক, গণেশ, লক্ষ্মী, সরস্বতীও। নবমী পূজার পর আসে দশমী, অর্থাৎ ‘বিজয়া দশমী’। এই দিনটি একদিকে যেমন মহিষাসুরকে বধ করে দেবীর জয়ের দিন, তেমনি অন্যদিকে তাঁর বিদায়ের দিন—উমা ফিরে যাচ্ছেন কৈলাসে, তাঁর শ্বশুরবাড়িতে। এই দ্বৈত অনুভূতিই দিনটিকে একই সঙ্গে আনন্দ ও বিষাদে ভরিয়ে তোলে।
অভয়শক্তি দেন। তিনি বলপ্রদায়িনী। মা দুর্গা আমাদের শক্তির প্রতীক, আমাদের অন্তরের সাহসের উৎস। মায়ের কৃপায় জীবন আলোকিত হোক, আঁধার কেটে আলো আসুক, মানুষ মানুষকে ভালোবাসুক। মনের সব আঁধার, কলুষতা দূর হোক। শুভ শারদীয়া!
লেখক : সভাপতি, বাংলাদেশ বেদান্ত সোসাইটি, নিউইয়র্ক।
বাংলার মানুষের বারো মাসে তেরো পার্বণ, সারা বছরই বাঙালির জীবন নানা প্রকার উৎসবের আলোয় মুখরিত হয়ে থাকে। এই সব উৎসবের মধ্যে দুর্গাপূজা হলো বাঙালির শ্রেষ্ঠ উৎসব। দুর্গাপূজা বাঙালির হৃদয়ে এক আলোকোজ্জ্বল উৎসব। শরৎকালে দেবী দুর্গার আবির্ভাবের এই উৎসব শুধু ধর্মীয় অনুষ্ঠান নয়, এটি বাঙালির হৃদয়ের সঙ্গে গভীরভাবে জড়িয়ে থাকা একটি আবেগপ্রবণ সময়। দেবী দুর্গা, যিনি মহিষাসুরকে বধ করে পৃথিবীতে শান্তি প্রতিষ্ঠা করেন, তিনি শক্তির প্রতীক এবং অশুভের বিরুদ্ধে শুভ শক্তির জয়ের প্রতিরূপ। বর্ষার শেষে সোনালি রোদে বসুন্ধরা ঝলমল করে ওঠে, ফসল পরিপূর্ণ হয়ে ওঠে, সরোবরে পদ্মফুল ফোটে, চারদিকে কাশফুলে ভরে ওঠে, তখন আকাশে-বাতাসে বেজে ওঠে আনন্দময়ী মা দুর্গার আগমনী বার্তা।
বহুকাল ধরেই বাঙালির আবেগের জায়গার একটি দুর্গাপূজা। আগেও সেটাই ছিল, এখনো আছে। দুর্গাপূজা মানেই মনের গভীরে অগাধ টুকরো টুকরো স্মৃতি। পূজার উৎসব-আনন্দ সময়ের সঙ্গে সঙ্গে পরিবর্তিত হয়। আনন্দের রকমফের আর কি! তবে ছেলেবেলার পূজা আর আজকের অর্থাৎ বড়বেলার পূজার অনুভূতির মধ্যে ব্যাপক পার্থক্য রয়েছে। বয়সের কারণেই হয়তো।
পূজা মানেই নতুন জামা-কাপড় কেনা, ঘরদোর পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন করা, নাড়ু, মোয়া, মুড়কি বানানো। হিন্দুদের বাড়িতে বাড়িতে গুড় জ্বাল দেওয়ার মিষ্টি গন্ধ ভেসে আসে। পূজার কয়েক দিন ধরে চলে খাওয়াদাওয়ার উৎসব। খাবারগুলো কিন্তু বছরের অন্য সময় তৈরি হয় না। বাড়িতে বাড়িতে আত্মীয়-স্বজনদের ভিড় লেগে থাকে।
দুর্গাপূজা বলতে আমার স্মৃতিতে জেগে আছে বাবার দেওয়া নতুন কাপড়। বছরে সেই পূজা উপলক্ষেই কাপড়-চোপড় পেতাম। তখন এত রেডিমেট কাপড় পাওয়া যেত না। ফলে পূজার বেশ কিছুদিন আগে থেকেই ছুটতাম দর্জির কাছে। বিস্তর মাপজোক দিয়ে আসতাম। তারপর অপেক্ষায় থাকতাম কবে দর্জির কাছ থেকে সেসব পাব। আজ সন্তানদের জন্য যা করছি; সেটাই আমরা পেতাম। তা ছাড়া জামা-জুতোও পেতাম। তবে বছরে ওই একবারই। এখানেই আকর্ষণটা বেশি ছিল। কারণ বছরে ওই একবারই নতুন কাপড় পাওয়ার যে আনন্দ, সেটি যোগ হতো পূজার সঙ্গে। ঠিক এ কারণেই আরও বেশি আকর্ষণীয় হয়ে থাকত দুর্গাপূজা।
পূজার দিনগুলোতে ঘোরাঘুরি ছিল সবচেয়ে বেশি আনন্দের। তবে আমার মনে হয়, একালের পূজায় আড়ম্বরতা বাড়লেও সেই ঐতিহ্য আর নেই। তখন পূজায় ঢাকের বাইরে কোনো বাদ্য থাকত না। এখন পূজা মানেই বড় বড় ডিজে বক্স। উচ্চস্বরে শব্দ। হই-হুল্লোড় করা। এসব পূজার মূল আবহকে আড়াল করছে। মাত্র কয়েকটা দিন দেবী দুর্গা আমাদের মাঝে থাকবেন। দেবী দুর্গা সপরিবারে মর্ত্যে তার পিতৃগৃহে বেড়াতে এসেছেন। বিজয়া দশমীতে বিসর্জনের মধ্য দিয়ে পূজার সমাপ্তি ঘটবে। দেবীর মূর্তি বিসর্জনের মধ্য দিয়ে বিদায় নিলেও ভক্তদের মনের গভীরে ঠিকই থেকে যান তিনি।
আমাদের ছোটবেলার চেয়ে এখন দুর্গাপূজার সংখ্যা বেড়েছে। কিন্তু বাড়েনি আতিথেয়তা, আনন্দ, উৎসবের মাতামাতি। রং পরিবর্তন হয়েছে ভিন্নভাবে। সনাতনী রূপ থেকে তা আধুনিক ডিজেতে পরিণত হয়েছে। পূজা তো শুধু আনন্দে মাতামাতি করার জন্যই নয়। এটি ধর্মীয় আবহের রূপও বটে। পরিবারসহ দেবী দুর্গার আগমন একটি ঐতিহাসিক কাহিনির প্রচলিত রূপ। দেবীর সঙ্গে আসেন কার্তিক, গণেশ, লক্ষ্মী, সরস্বতীও। নবমী পূজার পর আসে দশমী, অর্থাৎ ‘বিজয়া দশমী’। এই দিনটি একদিকে যেমন মহিষাসুরকে বধ করে দেবীর জয়ের দিন, তেমনি অন্যদিকে তাঁর বিদায়ের দিন—উমা ফিরে যাচ্ছেন কৈলাসে, তাঁর শ্বশুরবাড়িতে। এই দ্বৈত অনুভূতিই দিনটিকে একই সঙ্গে আনন্দ ও বিষাদে ভরিয়ে তোলে।
অভয়শক্তি দেন। তিনি বলপ্রদায়িনী। মা দুর্গা আমাদের শক্তির প্রতীক, আমাদের অন্তরের সাহসের উৎস। মায়ের কৃপায় জীবন আলোকিত হোক, আঁধার কেটে আলো আসুক, মানুষ মানুষকে ভালোবাসুক। মনের সব আঁধার, কলুষতা দূর হোক। শুভ শারদীয়া!
লেখক : সভাপতি, বাংলাদেশ বেদান্ত সোসাইটি, নিউইয়র্ক।