অস্ত্র হাতে মাদকবিরোধী অভিযানে প্রতিমন্ত্রী ইশরাক, তদন্তের নির্দেশ ডিএমপির

প্রকাশ : ১৮ অক্টোবর ২০২৬, ১৩:৪০ , অনলাইন ভার্সন
আগ্নেয়াস্ত্র হাতে নিয়ে মাদকবিরোধী অভিযানে অংশ নেওয়া মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী ইশরাক হোসেন ও তাঁর সহযোগীদের কর্মকাণ্ড তদন্তের নির্দেশ দিয়েছে ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি)। তদন্তে আইনের ব্যত্যয় পাওয়া গেলে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে জানিয়েছে পুলিশ। 

রোববার দুপুরে ডিএমপির মিডিয়া সেন্টারে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে ডিএমপির গোয়েন্দা বিভাগের (ডিবি) প্রধান শফিকুল ইসলাম এ তথ্য জানান। তিনি বলেন, এ ঘটনায় ডিএমপির ওয়ারী বিভাগের উপকমিশনারকে তদন্তের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।

গত শনিবার বিকেলে রাজধানীর গেন্ডারিয়া রেলস্টেশনসংলগ্ন দয়াগঞ্জ ঘুঁটিঘর রেলগেট এলাকায় এ ঘটনা ঘটে। মাদকবিরোধী অভিযানের নামে প্রতিমন্ত্রীর অস্ত্র হাতে নিয়ে লোকজনকে ধাওয়া করার ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর এ নিয়ে আলোচনা-সমালোচনা শুরু হয়। ভিডিওতে তাঁর সঙ্গে থাকা কয়েকজনের হাতেও আগ্নেয়াস্ত্র দেখা যায়। একজনকে আটক এক তরুণকে লাথি মারতেও দেখা যায়। 

ভিডিও ঘিরে আলোচনা-সমালোচনা
প্রতিমন্ত্রী ইশরাক হোসেনের ফেসবুক পেজে প্রকাশিত ভিডিওটির শিরোনাম ছিল, ‘ইশরাকের অ্যাকশন: মাদক আস্তানা গুঁড়িয়ে বিক্রেতাদের পুলিশে সোপর্দ’। ভিডিওটি প্রকাশের পর দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। পরে সেটি পেজ থেকে সরিয়ে নেওয়া হয় বলে সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে।

ভিডিওতে দেখা যায়, গাড়ি থেকে নেমে হাতে আগ্নেয়াস্ত্র নিয়ে প্রতিমন্ত্রী কয়েকজনকে ধরতে নির্দেশ দিচ্ছেন। এ সময় তাঁকে চিৎকার করে বলতে শোনা যায়, ‘এই ধর ধর ধর।’ তাঁর পাশে থাকা একজনকে বলতে শোনা যায়, ‘একেবারে গুলি করে দেব।’

এরপর প্রতিমন্ত্রীর সঙ্গে থাকা দেহরক্ষীরা কয়েকজনকে ধরতে এগিয়ে যান। তাঁদের মধ্যে একজনকে এক তরুণকে লাথি মারতে দেখা যায়। ভিডিওর কিছু অংশে প্রতিমন্ত্রীর হাতে থাকা পিস্তল অস্পষ্ট করে দেওয়া হলেও অন্য অংশে সেটি স্পষ্ট দেখা যায়। তাঁর সঙ্গে থাকা আরও দুজনের হাতেও আগ্নেয়াস্ত্র দেখা যায়।

ভিডিওর আরেক অংশে এক তরুণকে বলতে শোনা যায়, ‘স্যার, আমি কিছু করিনি। আমি গরিব মানুষ স্যার।’ জবাবে প্রতিমন্ত্রী বলেন, ‘পুলিশ আসবে, তারপর কথা হবে।’

ঘটনাস্থলে প্রতিমন্ত্রীর সঙ্গে ছিলেন ঢাকা মহানগর দক্ষিণ ছাত্রদলের সাবেক আহ্বায়ক পাভেল শিকদার। তিনি জানান, শনিবার বেলা তিনটা থেকে সাড়ে তিনটার মধ্যে তাঁরা সেখানে যান। স্থানীয় বাসিন্দাদের বারবার অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে প্রতিমন্ত্রী ওই এলাকায় গিয়েছিলেন। পুলিশকেও খবর দেওয়া হয়েছিল, তবে পুলিশ পৌঁছাতে দেরি করে বলে দাবি করেন তিনি।

প্রতিমন্ত্রীর বক্তব্য, অস্ত্র বৈধ
সমালোচনার মুখে প্রতিমন্ত্রী ইশরাক হোসেন জানিয়েছেন, তাঁর হাতে থাকা আগ্নেয়াস্ত্রটি বৈধ। তাঁর দাবি, গেন্ডারিয়া রেলস্টেশনসংলগ্ন দয়াগঞ্জ ঘুঁটিঘর এলাকায় মাদক ব্যবসার অভিযোগ নিয়ে স্থানীয় বাসিন্দারা দীর্ঘদিন ধরে তাঁকে জানিয়ে আসছিলেন। পুলিশকে বিষয়টি অবহিত করলেও কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি বলে তিনি অভিযোগ করেন।

ইশরাকের ভাষ্য, এ বিষয়ে পুলিশের সঙ্গে তিনি অন্তত ৩০ থেকে ৪০টি বৈঠক করেছেন। পুলিশ জনবল ও যানবাহনের সংকটসহ বিভিন্ন সমস্যার কথা জানিয়েছে। ওই এলাকায় অভিযানে গিয়ে অতীতে কয়েকজন পুলিশ সদস্য গুলিবিদ্ধ হয়েছিলেন বলেও দাবি করেন তিনি। এ কারণে নিজের নিরাপত্তার জন্য অস্ত্র সঙ্গে নিয়েছিলেন বলে জানান প্রতিমন্ত্রী।

তাঁর দাবি, তিনি কাউকে গুলি করেননি এবং অস্ত্র দিয়ে কাউকে ভয়ও দেখাননি। মাদক ব্যবসার বিরুদ্ধে সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে তোলার অংশ হিসেবেই তাঁরা সেখানে অভিযান চালিয়েছেন।

তবে গেন্ডারিয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মনিরুজ্জামান জানিয়েছেন, পুলিশ ওই এলাকায় নিয়মিত অভিযান চালিয়েছে। গত ১১ অক্টোবর ৩০০ পুলিশ সদস্যের অংশগ্রহণে একটি অভিযান পরিচালিত হয়। এতে ডিএমপির গোয়েন্দা বিভাগ ও বিশেষায়িত পুলিশ সদস্যরাও অংশ নেন। প্রতিমন্ত্রীর অভিযোগের বিষয়ে তিনি বলেন, পুলিশের অভিযান ও ফলাফল সম্পর্কে প্রতিমন্ত্রীকে নিয়মিত অবহিত করা হয়েছে।  

নির্বাচনী হলফনামায় অস্ত্রের তথ্য ছিল না কেন
প্রতিমন্ত্রী ইশরাক হোসেনের নির্বাচনী হলফনামায় আগ্নেয়াস্ত্র থাকার তথ্য উল্লেখ না করার বিষয়টিও আলোচনায় এসেছে। এ বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, শরিফ ওসমান হাদী গুলিবিদ্ধ হওয়ার পর ২০২৫ সালের ১১ ডিসেম্বর তিনি অস্ত্রটি সংগ্রহ করেন। তাঁর দাবি, অস্ত্র নেওয়ার সময় নির্বাচনী হলফনামায় তা উল্লেখ করার সুযোগ ছিল না।

তবে অস্ত্রটির বৈধতা এবং তা বহনের অনুমতি থাকলেও প্রকাশ্যে এভাবে অস্ত্র প্রদর্শন করে মাদকবিরোধী অভিযানে অংশ নেওয়ার আইনগত সুযোগ রয়েছে কি না, সে প্রশ্ন উঠেছে।

স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ২০২৫ সালের ‘আগ্নেয়াস্ত্রের লাইসেন্স প্রদান, নবায়ন ও ব্যবহার নীতিমালা’র ২৫ অনুচ্ছেদে বৈধ আগ্নেয়াস্ত্র বহন ও ব্যবহারের শর্ত নির্ধারণ করা হয়েছে। ওই অনুচ্ছেদের ‘ক’ উপ-অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, বৈধ অস্ত্র আত্মরক্ষার জন্য বহন বা ব্যবহার করা যাবে। তবে অন্যের মধ্যে ভীতি বা বিরক্তি সৃষ্টি হতে পারে, এমনভাবে অস্ত্র প্রদর্শন করা যাবে না।  

পুলিশের দায়িত্ব নিয়ে প্রশ্ন
ঘটনাটি ঘিরে জননিরাপত্তা নিশ্চিত করা, মাদকবিরোধী অভিযান পরিচালনা এবং আইন প্রয়োগের দায়িত্ব কার—সে প্রশ্নও সামনে এসেছে। স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগের ভিত্তিতে জনপ্রতিনিধি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দিতে পারেন। কিন্তু নিজে আগ্নেয়াস্ত্র হাতে নিয়ে অভিযান পরিচালনা করা এবং সন্দেহভাজন ব্যক্তিদের ধাওয়া করার আইনগত সীমা কী, তা তদন্তের মাধ্যমে স্পষ্ট হওয়া প্রয়োজন।

বিশেষ করে ভিডিওতে আটক এক তরুণকে লাথি মারার দৃশ্য এবং একজনের মুখে গুলি করার হুমকির মতো বক্তব্যের বিষয়টিও খতিয়ে দেখা জরুরি। ভিডিওতে যাঁদের আটক করা হয়েছে, তাঁদের বিরুদ্ধে মাদকসংক্রান্ত অভিযোগের সত্যতা, তাঁদের কাছ থেকে কোনো মাদক উদ্ধার হয়েছে কি না এবং অভিযানের সময় কী ঘটেছিল—এসব বিষয়ও যথাযথ তদন্তের মাধ্যমে নিশ্চিত হওয়া প্রয়োজন।

এ ঘটনায় ডিএমপির ওয়ারী বিভাগের উপকমিশনারকে তদন্তের দায়িত্ব দেওয়ার কথা জানিয়েছে পুলিশ। এখন তদন্তে প্রতিমন্ত্রী ও তাঁর সহযোগীদের কর্মকাণ্ড, আগ্নেয়াস্ত্র বহন ও প্রদর্শনের পরিস্থিতি এবং সংশ্লিষ্ট আইন ও নীতিমালা লঙ্ঘিত হয়েছে কি না, তা নির্ধারণের অপেক্ষা। তদন্তে আইন লঙ্ঘনের প্রমাণ পাওয়া গেলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে জানিয়েছে ডিএমপি।

ঠিকানা/এসআর
Thikana
M M Shahin, Chairman, Board of Editors, Thikana
Corporate Headquarter
THIKANA : 7409 37th Ave suite 403 Jackson Heights, NY 11372
Phone : 718-472-0700/2428, 718-729-6000
Fax: + 1(866) 805-8806
Bangladesh Bureau
THIKANA : 70/B, Green Road, (Panthapath), 5th Floor, Dhaka, BD.
E-Mail : [email protected]
For Advertisement : [email protected]