জিএম কাদেরের বাসায় দিনেদুপুরে হামলা ও মবকারীর লাভ-ক্ষতি

প্রকাশ : ২২ অক্টোবর ২০২৬, ১২:১৭ , অনলাইন ভার্সন
জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান ও সাবেক বিরোধীদলীয় নেতা জনাব জিএম কাদেরের উত্তরার বাসায় গত ১২ অক্টোবর সকাল ১০টা ৪০ থেকে ১০টা ৪৫ মিনিটের দিকে হামলা ও ভাঙচুর চালানো হয়। বিক্ষোভকারীদের অভিযোগ ও কারণ হিসেবে জানা যায়, এক গণমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ঘটনার কিছুদিন আগে জিএম কাদের ক্ষমতাচ্যুত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে যোগাযোগের কথা অকপটে স্বীকার করেছিলেন।
কথিত স্বৈরাচারবিরোধী সাধারণ জনগণ ব্যানারে আসা একদল বিক্ষোভকারী জিএম কাদেরের বাসভবনের সামনে জড়ো হয়ে ইট-পাটকেল নিক্ষেপ ও জানালার কাচ ভাঙচুর করে। বিক্ষোভকারীরা তাঁকে ভারতের দালাল ও জুলাই আন্দোলনের শহীদদের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতক বলে অভিহিত করে এবং অবিলম্বে তাঁর গ্রেপ্তারের দাবি জানায়।
অন্যদিকে ঘটনার সঙ্গে রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ এনে জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান জিএম কাদের এবং জাতীয় পার্টির মহাসচিব ব্যারিস্টার শামীম হায়দার পাটোয়ারী একে একটি পরিকল্পিত হামলা বলে দাবি করেছেন। জনাব জিএম কাদের অভিযোগ করেছেন, এই হামলার পেছনে স্থানীয় বিএনপি, জামায়াতে ইসলামী এবং ইনকিলাব মঞ্চ ও এনসিপির নেতাকর্মী ও সমর্থকেরা জড়িত ছিলেন। জাতীয় পার্টি এই ঘটনার তীব্র নিন্দা জানিয়েছে এবং জড়িতদের ২৪ ঘণ্টার মধ্যে গ্রেপ্তারের আলটিমেটাম দিয়েছে। হামলার প্রতিবাদে জাতীয় পার্টির নেতা-কর্মীরা ঢাকায় প্রতিবাদ মিছিল ও বিক্ষোভ কর্মসূচি পালন করেছেন।
পুলিশের উত্তরা বিভাগের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, খবর পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছানোর আগেই হামলাকারীরা সেখান থেকে চলে যায় এবং বর্তমানে এ বিষয়ে তদন্ত চলছে।
জিএম কাদেরের বাসভবনে হামলার এই ঘটনাটি বর্তমান বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলবে বলে রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও দলগুলো মনে করছে।
এমনিতেই জাতীয় পার্টির ওপর রাজনৈতিক চাপ ও কোণঠাসা পরিস্থিতি এবং অস্তিত্বের সংকট বিরাজ করছিল। আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে বিরোধী দল হিসেবে ভূমিকা রাখার পর থেকে জাতীয় পার্টি এমনিতেই সংকটে ছিল। শেখ হাসিনার সঙ্গে যোগাযোগের স্বীকারোক্তির পর এই হামলা দলটিকে রাজনৈতিকভাবে আরও বেশি কোণঠাসা এবং ডিফেন্সিভ অবস্থানে ঠেলে দেওয়ার চেষ্টা বলে অনেকে মন্তব্য করেন।
আবার এ হামলা দলটির জন্য আশীর্বাদও হতে পারে। হামলার পর জাতীয় পার্টিও কিছু কৌশলগত সুবিধা নেওয়ার চেষ্টা করতে পারে। যেমন রাজনীতিতে যেকোনো হামলার পর আক্রান্ত দল নিজেকে রাজনৈতিক প্রতিহিংসার শিকার বা ভিকটিম হিসেবে উপস্থাপন করার সুযোগ পায়। জাতীয় পার্টি এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে আন্তর্জাতিক মহলে এবং দেশের মানুষের কাছে প্রচার করার সুযোগ পাবে, তারা একটি শান্তিপূর্ণ ও গণতান্ত্রিক দল হওয়া সত্ত্বেও তাদের ওপর অন্যায়ভাবে চড়াও হওয়া হচ্ছে।
এ ধরনের ঘটনা দলের অভ্যন্তরীণ ঐক্য বৃদ্ধি করতে পারে। বিগত কয়েক বছর ধরে জাতীয় পার্টির ভেতরে নানামুখী কোন্দল ও বিভাজন ছিল। দলীয় চেয়ারম্যানের ওপর এ ধরনের সরাসরি হামলার ফলে দলের তৃণমূল ও শীর্ষ নেতাদের মধ্যে সাময়িকভাবে ভেদাভেদ ভুলে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার এবং রাজপথে নিজেদের শক্তিমত্তা প্রদর্শনের একটি সুযোগ তৈরি করে দিয়েছে। এ ছাড়া এ ধরনের ঘটনায় রাজনৈতিক অস্তিত্ব জানান দেওয়ার মোক্ষম সুযোগ তৈরি হয়। হামলার পর ২৪ ঘণ্টার আলটিমেটাম এবং রাজপথের কর্মসূচির ঘোষণা দেওয়ার মাধ্যমে দলটি কর্মী-সমর্থকদের পুনরায় চাঙা করার এবং রাজনীতিতে তাদের সক্রিয় উপস্থিতির জানান দেওয়ার একটি অসিলা পায়।
বর্তমান পরিস্থিতিতে বিএনপি-জামায়াতের সঙ্গে জাতীয় পার্টি ও সমমনা দলগুলোর দূরত্ব তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। জাতীয় পার্টি এই হামলার জন্য সরাসরি বিএনপি, জামায়াতে ইসলামী ও এনসিপিকে দায়ী করেছে। এর ফলে অন্তর্বর্তী সরকারের সংস্কার ও ভবিষ্যৎ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে দলগুলোর মধ্যে যে ঐকমত্যের প্রয়োজন ছিল, তাতে বড় ধরনের ফাটল ধরবে। পারস্পরিক কাদা-ছোড়াছুড়ি ও রাজনৈতিক প্রতিহিংসা আরও বৃদ্ধি পেতে পারে বলে অনেকেই আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন।
জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান জিএম কাদেরের উত্তরার বাসভবনে হামলায় দেশে এবং আন্তর্জাতিক মহলে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। আন্তর্জাতিক মহলে সৃষ্ট নেতিবাচক উদ্বেগ প্রশমন করতে সরকার সুনির্দিষ্ট কিছু আইনি, কূটনৈতিক ও কৌশলগত পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে।
ঢাকায় অবস্থানরত বিদেশি কূটনীতিক, বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, ইউরোপীয় ইউনিয়ন এবং ভারতকে আশ্বস্ত করতে সরকার কূটনৈতিক চ্যানেলে বার্তা দিচ্ছে। সরকার পুনর্ব্যক্ত করছে, এটি কোনো রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় দমন-পীড়ন নয়, বরং বিক্ষুব্ধ জনতার একটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা। (সূত্র : কালের কণ্ঠ)
প্রকাশ্য দিবালোকে এই হামলা আন্তর্জাতিক অংশীজনদের কাছে সরকারের আইনের শাসন বজায় রাখার সক্ষমতা এবং সব দলের জন্য সমান রাজনৈতিক সুযোগ নিশ্চিত করার প্রতিশ্রুতির ওপর একটি বড় পরীক্ষা হিসেবে দেখা দিচ্ছে।
আন্তর্জাতিক মহলে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি যেন ক্ষুণ্ন না হয়, সে জন্য পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে বিদেশি অংশীজনদের আশ্বস্ত করা হচ্ছে যে বাংলাদেশে প্রতিটি নাগরিক এবং রাজনৈতিক নেতার নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সরকার প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।
নির্বাচিত সরকারের জন্য আইনশৃঙ্খলা ও অন্তর্ভুক্তিমূলক রাজনীতির চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় তা নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে। ঢাকার একটি আবাসিক এলাকায় দিনেদুপুরে একটি প্রধান রাজনৈতিক দলের চেয়ারম্যানের বাসায় এ ধরনের হামলা সরকারের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের সক্ষমতাকে প্রশ্নের মুখে ফেলে দিয়েছে।
বাংলাদেশ সরকারের প্রধান লক্ষ্যগুলোর একটি হলো সব দলের জন্য একটি ভীতিহীন রাজনৈতিক পরিবেশ তৈরি করা। এ ধরনের ঘটনা প্রমাণ করে, রাজনীতিতে এখনো চরমপন্থী মনোভাব বা মব জাস্টিস বা উচ্ছৃঙ্খল জনতার শাসন সক্রিয় রয়েছে, যা একটি সুষ্ঠু নির্বাচনের পরিবেশ তৈরিতে বাধা সৃষ্টি করতে পারে।
বিক্ষোভকারীরা নিজেদের স্বৈরাচারবিরোধী সাধারণ জনগণ বলে দাবি করলেও রাজনৈতিক নেতাদের বাসায় হামলা বা ভাঙচুরের ঘটনা জুলাই বিপ্লবের মূল চেতনা বা যেখানে আইনের শাসন ও সাম্যের কথা বলা হয়েছে, তা ক্ষুণ্ন করতে পারে। সাধারণ মানুষের মধ্যে এটি রাজনৈতিক প্রতিহিংসার নতুন রূপ হিসেবেও বিবেচিত হয়েছে।
বিভিন্ন আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে এ সংবাদ গুরুত্বসহকারে প্রচার করা হয়েছে। ডয়চে ভেলে-সহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক মিডিয়ায় এই হামলার খবর গুরুত্ব দিয়ে প্রচার করার ফলে বিশ্ব দরবারে বাংলাদেশের নতুন রাজনৈতিক রূপান্তরের যে ইতিবাচক ভাবমূর্তি তৈরি হচ্ছিল, তা কিছুটা ধাক্কা খায়। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় দেখতে চায়, নতুন সরকার কোনো ধরনের প্রতিশোধমূলক বা প্রতিহিংসার রাজনীতি প্রশ্রয় দিচ্ছে না।
হামলাকারীরা যেহেতু প্রকাশ্যে ভারতের দালাল বা ভারত-বিরোধী স্লোগান দিয়ে আক্রমণ করেছে, তাই স্বাভাবিকভাবেই ভারতের মূলধারার গণমাধ্যমগুলোতে, যেমন India Today, Firstpost-এ এই খবরটি অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে প্রচারিত হয়েছে।
এ ধরনের ঘটনা প্রতিবেশী ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের দ্বিপাক্ষিক ও ভূ-রাজনৈতিক সম্পর্কে একধরনের মনস্তাত্ত্বিক চাপ সৃষ্টি করে। সেখানে ধারণা তৈরি হতে পারে যে বাংলাদেশে ভারত-সম্পর্কিত বা উদারপন্থী রাজনৈতিক দলগুলো চরম অনিরাপত্তার মধ্যে রয়েছে।
সরকার আন্তর্জাতিক মহলের নেতিবাচক প্রভাব কাটাতে ‘অপরাধীদের শাস্তি নিশ্চিত করা’ এবং ‘আইনের শাসন সমুন্নত রাখা’—এই দুটি মূলনীতিকে সামনে রেখে কূটনৈতিক ও প্রশাসনিকভাবে পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার চেষ্টা করছে বলে অভিজ্ঞ মহল মনে করছেন।
বাংলাদেশে সাম্প্রতিক সময়ে গড়ে ওঠা এই বিপজ্জনক মব কালচার বা উচ্ছৃঙ্খল জনতার শাসন থেকে বের হয়ে আসার জন্য একটি দীর্ঘমেয়াদি ও সুনির্দিষ্ট জাতীয় পরিকল্পনা প্রয়োজন। রাষ্ট্রবিজ্ঞানী, সমাজবিজ্ঞানী এবং আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, এই সংস্কৃতি থেকে মুক্তি পেতে রাষ্ট্র ও সমাজকে যৌথভাবে কাজ করতে হবে।
লেখক : কবি ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক।
 
Thikana
M M Shahin, Chairman, Board of Editors, Thikana
Corporate Headquarter
THIKANA : 7409 37th Ave suite 403 Jackson Heights, NY 11372
Phone : 718-472-0700/2428, 718-729-6000
Fax: + 1(866) 805-8806
Bangladesh Bureau
THIKANA : 70/B, Green Road, (Panthapath), 5th Floor, Dhaka, BD.
E-Mail : [email protected]
For Advertisement : [email protected]