সম্প্রতি সৌদি আরবে দুই প্রবাসী বাংলাদেশি, যার মধ্যে একজন পুরুষ এবং অন্যজন নারী, এই দুজনকে মসজিদের ভেতরে অনৈতিক কাজের অজুহাতে শিরশ্ছেদের মাধ্যমে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছে। কাজটা কী ধরনের অনৈতিক, সেই সম্পর্কে যদিও স্পষ্ট কোনো ব্যাখ্যা দেওয়া হয়নি, তবে যেহেতু মসজিদের ভেতরে কথিত ওই দুই বাংলাদেশি ওই ধরনের নৈতিকতা-বিবর্জিত কাজে জড়িত হয়ে পড়েছিলেন বলে রাষ্ট্রীয় প্রচারমাধ্যমের বদৌলতে বিশ্বব্যবস্থাকে অবহিত করার প্রয়াস দেখিয়েছে সৌদি প্রশাসন, অতএব ওই নৈতিকতা-বর্জিত ঘটনার গুরুত্ব নেহাত কম নয়। বিষয়টা আমলে নিয়েই খুব জানতে ইচ্ছে করছে, সেই অনৈতিক কাজের ধরনটা আসলে কী ধরনের ছিল? এটা বিশ্বাস করতে কষ্ট হচ্ছে, কোনো মুসলমান আর যা-ই করুক, মসজিদের ভেতরে মারাত্মক ধরনের নৈতিকতা-বর্জিত কোনো কাজ করতে সাহস করবে এতটা পশুপ্রবৃত্তির কেউ হতে পারে? মসজিদ একটা পবিত্র স্থান, তাই এ ধরনের পবিত্র একটি প্রাঙ্গণের ভেতরে চরম নৈতিকতাবিরোধী কোনো কাজ করার আগে একবার হলেও মুসলিম মাত্রই বিষয়টা নিয়ে চিন্তা করবে। তার পরও মানুষের মানসিক ত্রুটি থাকতেই পারে। হয়তো আবেগের বশে জড়িয়ে ধরে একজন আরেকজনকে চুমু খেয়েছিল। কিন্তু তার জন্য মসজিদের ভেতরের অংশকে চুমু খাওয়ার জন্য নিরাপদ স্থান বিবেচনার কী কারণ থাকতে পারে, সৌদি প্রশাসনের বরাতে তার কোনো ব্যাখ্যা ছিল না। এটা অনুমান করা যায়, দণ্ডপ্রাপ্ত আসামিদের ভেতরের যুবকটি হয়তো মসজিদের কাজে নিযুক্ত কর্মচারীদের মধ্যকার কেউ একজন হবেন। আর অন্যজন ধারেকাছের কোনো সৌদি পরিবারের গৃহকর্মী হতে পারেন। যেভাবে বাংলাদেশের নিম্নবিত্ত পরিবারের এমন অনেক নারী গৃহকর্মীর পেশা গ্রহণ করে সৌদি আরবের বিভিন্ন প্রান্তরে বসবাস করে থাকেন। হতে পারে তিনিও সেই রকম একজন।
ইতিহাসের মতে, গৃহকর্মী পরিচয়ে ১৯৯১ সালে সৌদি আরবে প্রাথমিকভাবে নারী শ্রমিক পাঠানোর কাজটা শুরু হলেও মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে নারী শ্রমিক পাঠানো সংক্রান্ত একটি দ্বিপাক্ষিক চুক্তিতে স্বাক্ষর করেছিল বাংলাদেশ এবং সৌদি সরকার ১৯৯৫ সালে। ওই চুক্তির পরে ওই বছরের মার্চ মাস থেকে সৌদি আরবসহ মধ্যপ্রাচ্যের দেশসমূহে ব্যাপক মাত্রায় নারী শ্রমিক কাজের উদ্দেশ্যে গমন করেছিলেন। তাদের ওই সময়কার সংখ্যা সরকারি হিসাব মতে ৩২ হাজার ৩১৭ জনের মতো ছিল। হিসাবটা শুধু ১৯৯১ সাল থেকে ২০১৫—শুধু ওই চব্বিশ বছরের। তার পরের হিসাব লাখের ঘর ছাড়িয়ে গেছে। শুধু একটু আর্থিক ফায়দা লাভের আশায় কত নারী পতঙ্গের মতো ছুটে গেছেন ওইসব দেশে। কত মা কোলের সন্তানকে সংসারের অন্য মানুষের জিম্মায় ছেড়ে দিয়ে ধু ধু মরুভূমির কঠিন প্রান্তরে পাড়ি জমিয়েছিলেন দুটো বাড়তি পয়সা রোজগারের আশায়। সংসারের আয় বরকতের স্বপ্ন নিয়ে ঘর ছাড়লেও প্রায় ৯৯ শতাংশ ওইসব নারী শ্রমিকের অভিজ্ঞতা সুখকর ছিল না। প্রায় সকলেই শারীরিক, মানসিক নির্যাতনের শিকারে পরিণত হয়ে এক ভীতিকর জীবনযাপনে বাধ্য হয়েছেন। কারণ ফিরে আসার পথ প্রায় বন্ধই ছিল। দালালের হাতে ধরিয়ে দেওয়া দাস হতে স্বাক্ষর করেছিলেন যে সকলে? তার খেসারত দিতে হয়েছে অনেককে আত্মহত্যার পথে পা বাড়িয়ে। মালিকের শারীরিক চাহিদা মেটাতে গিয়ে অন্তঃসত্ত্বা হয়েছেন কেউ কেউ। সেই সংখ্যাটাও নেহাত কম ছিল না। এ ধরনের একটি হিসাব দিয়েছিল আল-জাজিরা। তাদের দেওয়া তথ্যমতে ২০১৫ থেকে ২০১৮ সালের মধ্যে ওইসব নির্যাতনের শিকারে পরিণত হয়ে সৌদি আরবে ৬৬ জন বাংলাদেশি নারী শ্রমিকের মৃত্যু হয়েছে, যাদের মধ্যে ৫২ জন আত্মহত্যা করেছিলেন।
বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় শ্রমবাজার হচ্ছে সৌদি আরব। যদিও মধ্যপ্রাচ্যের অন্যান্য দেশেও বিপুলসংখ্যক নারী শ্রমিক কাজের সূত্রে গিয়েছেন কিন্তু সৌদিতে সেই সংখ্যা বড় মাপের। তার কারণ, একসময় বাংলাদেশ সৌদি আরবের সঙ্গে একটা চুক্তিতে স্বাক্ষর করেছিল, যেখানে বলা হয়েছিল, সৌদিতে যদি একজন নারী শ্রমিক পাঠানো সম্ভব হয়, তবে তার বদলে বাংলাদেশ থেকে দুজন পুরুষ শ্রমিক নেওয়ার ব্যবস্থা করবে সৌদি সরকার। এই দাসখতে স্বাক্ষর করেছিল বাংলাদেশ। বাংলাদেশ জনশক্তি কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর তথ্যমতে, এই চুক্তির শর্ত মানতে হলে সৌদিতে নারী গৃহশ্রমিক পাঠাতে বাধ্য ছিল বাংলাদেশ এবং সেই শর্ত মানতে গিয়েই অবাধে বাংলাদেশের নিম্নবিত্ত পরিবারের গৃহবধূ থেকে কিশোরী সকল শ্রেণির নারীকে বিদেশ যেতে উৎসাহ জুগিয়েছে রাষ্ট্রীয় প্রশাসন। যদিও পরবর্তী পর্যায়ে ওইসব নারী শ্রমিকের জীবনের নানা ঘাত-প্রতিঘাতের কারণে মহিলা পরিষদসহ অন্যান্য মানবাধিকার সংস্থা মধ্যপ্রাচ্যে নারী শ্রমিক পাঠানোর বিষয়ে জোরালো আপত্তি উত্থাপন করেও ছিল কিন্তু বিগত সরকারের উচ্চপর্যায়ে এ বিষয়ে কোনোই পদক্ষেপ নিতে দেখা যায়নি। তার পেছনের কারণ ছিল ওই দাসখতে স্বাক্ষর দেওয়া শর্তের বিষয়টি। ফলে নারী শ্রমিকদের জীবন কঠিন থেকে কঠিনতর হয়েছে। কিন্তু প্রতিকারের কোনো পথ খোলা ছিল না তাদের সামনে। ওই বিষয়ে একজন মহিলা শ্রমিকের উচ্চারণ ছিল, ‘দিনে যদি বাপ আসত, তবে রাতের অন্ধকারে ছেলে হামলে পড়ত আমার শরীরের ওপর।’
সত্য ছিল শতভাগ মুসলমান অধ্যুষিত সৌদি আরবের গৃহস্বামীদের দৈনন্দিন জীবনযাত্রার প্রতিচ্ছবির এটা একটা রূপ। কিন্তু ধর্মীয় বিধান অনুযায়ী ‘জেনা’ শব্দটি একটি চূড়ান্ত যাত্রার আপত্তিকর শব্দ—শরিয়া আইনে ওই জেনাকারীর সর্বোচ্চ শাস্তি হিসেবে শিরশ্ছেদের বিধান থাকা সত্ত্বেও শুধু মালিক হওয়ার অজুহাতে তারা সকল আইন-কানুনের ঊর্ধ্বে। নিরীহ এবং অসহায় নারী শ্রমিকদের শরীর নিয়ে যথেচ্ছাচার করার অধিকার ছিল একচেটিয়া ওই অসৎ ধনকুবেরদের হাতের মুঠোয়। ফলে নারী শ্রমিকের জীবন এক অনিশ্চিত অন্ধকারের হাতে বন্দী।
গত ১৪ অক্টোবর মৃত্যুদণ্ড পাওয়া দুই প্রবাসী বাংলাদেশির মধ্যে নারীটির বয়স কত ছিল, সে সম্পর্কে সঠিক কোনো তথ্য হাতে নেই, যদিও অনুমান করতে অসুবিধা হয় না যে সেই নারীটি নিশ্চয় গৃহকর্মীর ভিসা নিয়েই সৌদি আরবে গিয়েছিল। এবং সেখানেই পরিচয় ঘটে দুজনের—তারপরই এই এক অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনায় জীবন দিতে হলো দুজনকে। জেদ্দায় অবস্থিত বাংলাদেশ কনস্যুলেট নাকি বিষয়টা জানত না। অথচ আন্তর্জাতিক আইনে অন্য কোনো দেশের অধিবাসীদের সম্পর্কে এ ধরনের আইন প্রয়োগের আগে বিষয়টা সংশ্লিষ্ট দেশের আঞ্চলিক কার্যালয়ে জানানোর বিধান থাকা সত্ত্বেও সৌদি কর্তৃপক্ষ সেই বিষয়ে ন্যূনতম সহানুভূতি দেখানোর প্রয়োজনবোধ করেনি। যদি বাংলাদেশি অভিবাসী না হয়ে অন্য কোনো দেশের মানুষ হতেন তারা, তাহলে হয়তো অন্য পন্থা অবলম্বন করতে দেখা যেত সৌদিকে। মিসকিন জাতি বলে কথা। তাই দুঃখজনক বিষয় হলো দণ্ডপ্রাপ্ত সেই দুই আসামি আত্মপক্ষ সমর্থনেরও কোনো সুযোগ পেলেন না।
বাংলাদেশের পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদকে বলতে শোনা গেল, ‘এই শাস্তি বাংলাদেশিদের জন্য একটা শিক্ষণীয় বিষয়।’ উনি যদি বলতেন জেনাকারীর শাস্তি ধর্মীয় বিধানমতে কী হওয়া উচিত, তাহলেও একটা সন্তোষজনক জবাব পাওয়া যেত। কিন্তু উনি বললেন, ‘মানুষ যখন যে দেশে থাকবে, সেই দেশের আইন মেনেই চলবে, না হলে কী হয় এই বিচার সেই শিক্ষাই দিয়েছে সকলকে।’ কত বাস্তব অভিজ্ঞতার ওপর ভিত্তি করেই যেন কথাগুলো বললেন তিনি। মাননীয় প্রতিমন্ত্রী যে দেশের বাসিন্দা তার সেই দেশের আইন এ বিষয়ে কতটা উদার, তার নমুনা তো দেখছে বিশ্ববাসী। একটা পাঁচ বছরের শিশুকন্যা থেকে শুরু করে সত্তর বছরের বৃদ্ধা কারও জীবনের নিরাপত্তা নেই দেশে। মাদ্রাসাশিক্ষক কর্তৃক কিশোর শিক্ষার্থীদের বলাৎকারের কাহিনি যে কীভাবে মনুষ্য সমাজকে কলঙ্কিত করছে, প্রতিমন্ত্রীর ভাষায় ‘যে দেশের যে নিয়ম সেটাই আইন’। আর সেই আইনের ফাঁক-ফোকর দিয়ে দশকের পর দশক ধরে চিহ্নিত ফাঁসির আসামিরা দিব্যি কারাগারের ভেতরে শুয়ে-বসে দিন গুজরান করে দিলেও আইন চলে না আইনের পথে, মাঝখানে বাতাস হাহাকার তোলে গগনজুড়ে আইনের বাংলাদেশ।
ইতিহাসের মতে, গৃহকর্মী পরিচয়ে ১৯৯১ সালে সৌদি আরবে প্রাথমিকভাবে নারী শ্রমিক পাঠানোর কাজটা শুরু হলেও মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে নারী শ্রমিক পাঠানো সংক্রান্ত একটি দ্বিপাক্ষিক চুক্তিতে স্বাক্ষর করেছিল বাংলাদেশ এবং সৌদি সরকার ১৯৯৫ সালে। ওই চুক্তির পরে ওই বছরের মার্চ মাস থেকে সৌদি আরবসহ মধ্যপ্রাচ্যের দেশসমূহে ব্যাপক মাত্রায় নারী শ্রমিক কাজের উদ্দেশ্যে গমন করেছিলেন। তাদের ওই সময়কার সংখ্যা সরকারি হিসাব মতে ৩২ হাজার ৩১৭ জনের মতো ছিল। হিসাবটা শুধু ১৯৯১ সাল থেকে ২০১৫—শুধু ওই চব্বিশ বছরের। তার পরের হিসাব লাখের ঘর ছাড়িয়ে গেছে। শুধু একটু আর্থিক ফায়দা লাভের আশায় কত নারী পতঙ্গের মতো ছুটে গেছেন ওইসব দেশে। কত মা কোলের সন্তানকে সংসারের অন্য মানুষের জিম্মায় ছেড়ে দিয়ে ধু ধু মরুভূমির কঠিন প্রান্তরে পাড়ি জমিয়েছিলেন দুটো বাড়তি পয়সা রোজগারের আশায়। সংসারের আয় বরকতের স্বপ্ন নিয়ে ঘর ছাড়লেও প্রায় ৯৯ শতাংশ ওইসব নারী শ্রমিকের অভিজ্ঞতা সুখকর ছিল না। প্রায় সকলেই শারীরিক, মানসিক নির্যাতনের শিকারে পরিণত হয়ে এক ভীতিকর জীবনযাপনে বাধ্য হয়েছেন। কারণ ফিরে আসার পথ প্রায় বন্ধই ছিল। দালালের হাতে ধরিয়ে দেওয়া দাস হতে স্বাক্ষর করেছিলেন যে সকলে? তার খেসারত দিতে হয়েছে অনেককে আত্মহত্যার পথে পা বাড়িয়ে। মালিকের শারীরিক চাহিদা মেটাতে গিয়ে অন্তঃসত্ত্বা হয়েছেন কেউ কেউ। সেই সংখ্যাটাও নেহাত কম ছিল না। এ ধরনের একটি হিসাব দিয়েছিল আল-জাজিরা। তাদের দেওয়া তথ্যমতে ২০১৫ থেকে ২০১৮ সালের মধ্যে ওইসব নির্যাতনের শিকারে পরিণত হয়ে সৌদি আরবে ৬৬ জন বাংলাদেশি নারী শ্রমিকের মৃত্যু হয়েছে, যাদের মধ্যে ৫২ জন আত্মহত্যা করেছিলেন।
বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় শ্রমবাজার হচ্ছে সৌদি আরব। যদিও মধ্যপ্রাচ্যের অন্যান্য দেশেও বিপুলসংখ্যক নারী শ্রমিক কাজের সূত্রে গিয়েছেন কিন্তু সৌদিতে সেই সংখ্যা বড় মাপের। তার কারণ, একসময় বাংলাদেশ সৌদি আরবের সঙ্গে একটা চুক্তিতে স্বাক্ষর করেছিল, যেখানে বলা হয়েছিল, সৌদিতে যদি একজন নারী শ্রমিক পাঠানো সম্ভব হয়, তবে তার বদলে বাংলাদেশ থেকে দুজন পুরুষ শ্রমিক নেওয়ার ব্যবস্থা করবে সৌদি সরকার। এই দাসখতে স্বাক্ষর করেছিল বাংলাদেশ। বাংলাদেশ জনশক্তি কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর তথ্যমতে, এই চুক্তির শর্ত মানতে হলে সৌদিতে নারী গৃহশ্রমিক পাঠাতে বাধ্য ছিল বাংলাদেশ এবং সেই শর্ত মানতে গিয়েই অবাধে বাংলাদেশের নিম্নবিত্ত পরিবারের গৃহবধূ থেকে কিশোরী সকল শ্রেণির নারীকে বিদেশ যেতে উৎসাহ জুগিয়েছে রাষ্ট্রীয় প্রশাসন। যদিও পরবর্তী পর্যায়ে ওইসব নারী শ্রমিকের জীবনের নানা ঘাত-প্রতিঘাতের কারণে মহিলা পরিষদসহ অন্যান্য মানবাধিকার সংস্থা মধ্যপ্রাচ্যে নারী শ্রমিক পাঠানোর বিষয়ে জোরালো আপত্তি উত্থাপন করেও ছিল কিন্তু বিগত সরকারের উচ্চপর্যায়ে এ বিষয়ে কোনোই পদক্ষেপ নিতে দেখা যায়নি। তার পেছনের কারণ ছিল ওই দাসখতে স্বাক্ষর দেওয়া শর্তের বিষয়টি। ফলে নারী শ্রমিকদের জীবন কঠিন থেকে কঠিনতর হয়েছে। কিন্তু প্রতিকারের কোনো পথ খোলা ছিল না তাদের সামনে। ওই বিষয়ে একজন মহিলা শ্রমিকের উচ্চারণ ছিল, ‘দিনে যদি বাপ আসত, তবে রাতের অন্ধকারে ছেলে হামলে পড়ত আমার শরীরের ওপর।’
সত্য ছিল শতভাগ মুসলমান অধ্যুষিত সৌদি আরবের গৃহস্বামীদের দৈনন্দিন জীবনযাত্রার প্রতিচ্ছবির এটা একটা রূপ। কিন্তু ধর্মীয় বিধান অনুযায়ী ‘জেনা’ শব্দটি একটি চূড়ান্ত যাত্রার আপত্তিকর শব্দ—শরিয়া আইনে ওই জেনাকারীর সর্বোচ্চ শাস্তি হিসেবে শিরশ্ছেদের বিধান থাকা সত্ত্বেও শুধু মালিক হওয়ার অজুহাতে তারা সকল আইন-কানুনের ঊর্ধ্বে। নিরীহ এবং অসহায় নারী শ্রমিকদের শরীর নিয়ে যথেচ্ছাচার করার অধিকার ছিল একচেটিয়া ওই অসৎ ধনকুবেরদের হাতের মুঠোয়। ফলে নারী শ্রমিকের জীবন এক অনিশ্চিত অন্ধকারের হাতে বন্দী।
গত ১৪ অক্টোবর মৃত্যুদণ্ড পাওয়া দুই প্রবাসী বাংলাদেশির মধ্যে নারীটির বয়স কত ছিল, সে সম্পর্কে সঠিক কোনো তথ্য হাতে নেই, যদিও অনুমান করতে অসুবিধা হয় না যে সেই নারীটি নিশ্চয় গৃহকর্মীর ভিসা নিয়েই সৌদি আরবে গিয়েছিল। এবং সেখানেই পরিচয় ঘটে দুজনের—তারপরই এই এক অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনায় জীবন দিতে হলো দুজনকে। জেদ্দায় অবস্থিত বাংলাদেশ কনস্যুলেট নাকি বিষয়টা জানত না। অথচ আন্তর্জাতিক আইনে অন্য কোনো দেশের অধিবাসীদের সম্পর্কে এ ধরনের আইন প্রয়োগের আগে বিষয়টা সংশ্লিষ্ট দেশের আঞ্চলিক কার্যালয়ে জানানোর বিধান থাকা সত্ত্বেও সৌদি কর্তৃপক্ষ সেই বিষয়ে ন্যূনতম সহানুভূতি দেখানোর প্রয়োজনবোধ করেনি। যদি বাংলাদেশি অভিবাসী না হয়ে অন্য কোনো দেশের মানুষ হতেন তারা, তাহলে হয়তো অন্য পন্থা অবলম্বন করতে দেখা যেত সৌদিকে। মিসকিন জাতি বলে কথা। তাই দুঃখজনক বিষয় হলো দণ্ডপ্রাপ্ত সেই দুই আসামি আত্মপক্ষ সমর্থনেরও কোনো সুযোগ পেলেন না।
বাংলাদেশের পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদকে বলতে শোনা গেল, ‘এই শাস্তি বাংলাদেশিদের জন্য একটা শিক্ষণীয় বিষয়।’ উনি যদি বলতেন জেনাকারীর শাস্তি ধর্মীয় বিধানমতে কী হওয়া উচিত, তাহলেও একটা সন্তোষজনক জবাব পাওয়া যেত। কিন্তু উনি বললেন, ‘মানুষ যখন যে দেশে থাকবে, সেই দেশের আইন মেনেই চলবে, না হলে কী হয় এই বিচার সেই শিক্ষাই দিয়েছে সকলকে।’ কত বাস্তব অভিজ্ঞতার ওপর ভিত্তি করেই যেন কথাগুলো বললেন তিনি। মাননীয় প্রতিমন্ত্রী যে দেশের বাসিন্দা তার সেই দেশের আইন এ বিষয়ে কতটা উদার, তার নমুনা তো দেখছে বিশ্ববাসী। একটা পাঁচ বছরের শিশুকন্যা থেকে শুরু করে সত্তর বছরের বৃদ্ধা কারও জীবনের নিরাপত্তা নেই দেশে। মাদ্রাসাশিক্ষক কর্তৃক কিশোর শিক্ষার্থীদের বলাৎকারের কাহিনি যে কীভাবে মনুষ্য সমাজকে কলঙ্কিত করছে, প্রতিমন্ত্রীর ভাষায় ‘যে দেশের যে নিয়ম সেটাই আইন’। আর সেই আইনের ফাঁক-ফোকর দিয়ে দশকের পর দশক ধরে চিহ্নিত ফাঁসির আসামিরা দিব্যি কারাগারের ভেতরে শুয়ে-বসে দিন গুজরান করে দিলেও আইন চলে না আইনের পথে, মাঝখানে বাতাস হাহাকার তোলে গগনজুড়ে আইনের বাংলাদেশ।